শ্রীশ্রীমায়ের কথা (প্রথম ভাগ)

প্রথম ভাগ

Shri Shri Mayer Katha ~ 1st Part

=========

পরিচয় 

১৭৭৫ শকাব্দ, ১২৬০ সাল ৮ই পৌষ, বৃহস্পতিবার, কৃষ্ণাসপ্তমী তিথি, রাত্রি ২ দণ্ড ৯ পল, ইংরেজী ১৪৫৩ খ্রীষ্টাব্দ, ২২শে ডিসেম্বর বাঁকুড়া জেলায় জয়রাম বাটী গ্রামে জননী সারদেশ্বরী জম্মগ্রহণ করেন। 


জয়রামবাটী গ্রামে শ্রীরামচন্দ্র মুখােপাধ্যায় অতি নিষ্ঠাবান ধার্মিক ব্রাহ্মণ ছিলেন, মা তাঁহারই তনয়ারূপে ধরণীকে কৃতার্থ করিতে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন।

১২৬৬ সালে শ্রীশ্রীমার বয়স যখন মাত্র ছয় বৎসর তখন যুগাবতার শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের সহিত তাঁহার শুভ পরিণয় হয়। ইহার প্রায় সাত বৎসর পরে তিনি শ্বশুরালয় কামারপুকুরে প্রথম আসেন।

এই যে বিবাহ, ইহা একটি আশ্চর্য পরিণয়। শােনা যায়, বিবাহের পূর্বেই রমণীগণের বন-ভোজনস্থলে ঠাকুর ও মা যখন নিজ নিজ জননীর সঙ্গে বন ভােজনে আসিয়াছিলেন তখন তাঁহাদের প্রথম সাক্ষাৎ হইয়াছিল। ইহার পর যখন ঠাকুরের নানাস্থানে বিবাহ সম্বন্ধ হইতেছিল তখন কন্যা যে নির্দিষ্ট হইয়াই আছেন এ কথা ঠাকুর স্পষ্টই জানাইয়াছিলেন এবং জয়রামবাটী গ্রামের সেই ছয় বৎসরের কুমারীটিই তাঁহার মনােনীতা ও নিরূপিতা বলিয়া প্রকাশ করিয়াছিলেন। 

কিন্তু বিবাহের পর সেই মনোনীত পত্নীর জন্য তাঁহার বিশেষ আগ্রহ দেখা যায় নাই। প্রায় সাত বৎসর পরে ১২৭৩ সালে মা কামারপুকুরে প্রথম আসেন। নিতান্ত অল্প বয়স বলিয়া এতদিন তাঁহাকে আনা হয় নাই। ইহার পাঁচ বৎসর পরে ১২৭৮ সালে ফাগুন মাসে মা দক্ষিণেশ্বরে প্রথম আসেন। দক্ষিণেশ্বরে মা নহবতে থাকিতেন। অতি প্রত্যুষে কেহ উঠিবার পূর্বেই তাহার স্নান প্রভৃতি হইয়া যাইত। মন্দিরে কর্মচারী অনেক, অতিথি ও সাধুসন্ন্যাসীর সমাগমও যথেষ্ট, কিন্তু কেহই তাহার ছায়াটি পর্যন্ত দেখিতে পাইত না। ঠাকুর সর্বদাই ভাবে মগ্ন রহিতেন আর সেই ভাবাবেশেই তাঁহাকে যা কিছু সম্ভাষণ করিতেন তাহাতেই মায়ের আনন্দের সীমা থাকিত না। যতটুকু স্বামীর সেবাকার্যের ভার পাইতেন তাহাই তাহাকে পরিতৃপ্ত রাখিত এবং সেই তৃপ্তিইে তিনি পরমানন্দিতা রহিতেন। 

ইহার পর ১২৮০ সালে জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজার দিন রাত্রে ঠাকুর মাকে ষোড়শীপূজা করেন এবং তাঁহাদের অপূর্ব দাম্পত্য সম্বদ্ধে এইটিই সম্পূর্ণ পরিচয়।

আগেই বলিয়াছি, এই বিবাহ একটি আশ্চর্য পরিণয়। ভাবুকের মনে ইহাতেই হরগৌরীর দাম্পত্যমাধুর্যে-চিত্র জাগরিত হয়। সম্পূর্ণ কামগন্ধহীন একান্ত প্রীতিপূর্ণ এই যে দাম্পত্যপ্রেম, জগৎ-সংসারে ইহার অনুরূপ কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ ইহা এমন সহজ ও সরলভাবপূর্ণ যে বিন্দু মাত্রও অস্বাভাবিকতা তাহাতে নাই। একবার মা পদব্রজে দক্ষিণেশ্বরে আসিছেন, তখন পথ হারাইয়া পথে বিপন্ন হইয়া দস্যুর ন্যায় বলিষ্ঠ ও ভীষণ আকৃতির এক অপরিচিত ব্যক্তি ও তাহার স্ত্রীর দেখা পাইয়া তৎক্ষণাৎ তাহাকে পিতৃ-সম্বোধন করিয়া বলিতেছেন, “বাবা, আমি পথ হারিয়েছি। তোমার জামাই দক্ষিণেশ্বরে থাকেন-সেইখানে আমি যাচ্ছি।” এই ‘তােমার জামাই কথাটিতে মায়ের সরল ও প্রীতপূর্ণ মনের ভাবটি কি সুন্দরভাবেই প্রকাশ পাইয়াছে! ঠাকুরের সেবার প্রত্যেক খুঁটিনাটি কাজে মায়ের কত আনন্দ? সব সময়ই নিতান্ত লজ্জাশীলা কুলবধুর ন্যায় অতি মৃদু; আচরণ - যেন হ্রীর শোভন গুন্ঠনে মা সর্বদাই গুন্ঠিতা, অথচ সঙ্কোচহীন সহজ ভাব। পথ ভুলিয়া জন শূন্য মাঠে বলিষ্ঠ ভীষণাকৃতি অপরিচিতের সঙ্গে সাক্ষাতে মা যে ভাবে অতি সহজে “বাবা, আমি পথ হারিয়েছি” এবং “তােমার জামাই দক্ষিণেশ্বরে থাকেন” বলিয়া তাহাকে এক কথাতেই পরমাত্মীয় করিয়া লইয়াছিলেন--অতি সাহসিকা কোন বয়ােধিকাও তাহা পারেন কি-না সন্দেহ। অথচ মা নিতান্ত সরলা গ্রাম্য মেয়ে মাত্র। স্বামি-সন্দর্শনের আশায় অতিমাত্র আনন্দিত হইয়া পথ চলিতেছেন, তাঁহার অনভ্যস্ত পথক্লেশে তাঁহাকে ক্লিষ্টা করিতে পারিতেছে না, কোন আশঙ্কাই তাঁহার মনে উদ্বেগের ছায়াপাত করিতে পারিতেছে না, আবার সকলের উপরেই তাঁহার আত্মীয়ভাব এবং সে আত্মীয়তার প্রভাব অতিক্রম করিবার মতো শক্তি কাহারও আছে কি-না সন্দেহ। 

মা সরলা, মা গ্রাম্য কুমারী, লেখাপড়াও শিখেন নাই। কত সময়ে মা যেন জগৎসংসারে কিছুই বুঝেন না, তাঁহার সরলতায় এমনিই মনে হইতে পারে, কিন্তু সেই সরলতার ভিতর গভীর বুদ্ধিমত্তা অঙ্গাঙ্গিভাবে সন্নিবেশিত। পূজ্যপাদ স্বামী সারদানন্দ-প্রণীত ‘লীলাপ্রসঙ্গ’ হইতে একটি স্থান মাত্র এখানে উদ্ধৃত করিলাম-“দক্ষিণেশ্বরে একদিন দিনের বেলায় আমাদের পরমারাধ্যা শ্রীশ্রীমাতা ঠাকুরানীকে পান সাজিতে ও তাঁহার বিছানাটা ঝাড়িয়া ঘরটা ঝাঁটপাট দিয়া পরিষ্কার করিয়া রাখিতে বলিয়া ঠাকুর কালীঘরে শ্রীশ্রীজগন্মাতাকে দর্শন করিতে যাইলেন। তিনি ক্ষিপ্রহস্তে ঐ সকল কাজ প্রায় শেষ করিয়াছেন, এমন সময় ঠাকুর মন্দির হইতে ফিরলেন—একেবারে যেন পুরােদস্তুর মাতাল। চক্ষু রক্ত বর্ণ, হেথায় পা ফেলিতে হােথায় পড়িতেছে, কথা এড়াইয়া অস্পষ্ট অব্যক্ত হইয়া গিয়াছে। ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া ঐ ভাবে টলিতে টলিতে একেবারে শ্রীশ্রীমার নিকট উপস্থিত হইলেন। শ্রীশ্রীমা তখন একমনে গৃহকার্য করিতেছেন, ঠাকুর যে তাঁহার নিকট ঐ ভাবে আসিয়াছেন তাহা জানিতেও পারেন নাই। এমন সময় ঠাকুর মাতালের মতাে তাঁহার অঙ্গ ঠেলিয়া তাঁহাকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, ‘ওগো, আমি কি মদ খেয়েছি ? তিনি পশ্চাৎ ফিরিয়া ঠাকুরকে ঐরূপ ভাবাবস্থ দেখিয়া একেবারে স্তম্ভিত! বলিলেন, না, না, মদ খাবে কেন ? ঠাকুর ‘তবে কেন টলছি ? তবে কেন কথা কইতে পাচ্ছি না? আমি মাতাল ?” শ্রীশ্রীমা - না, না, তুদি মদ খাবে কেন ? তুমি মা কালীর ভাবমৃত খেয়েছ। ঠাকুর “ঠিক বলেছ বলিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন।” 

অন্যত্র আবার, ঠাকুর যখন পানিহাটিতে যাইবেন, মাও সঙ্গে যাইতে চাহেন কি-না জিজ্ঞাসা করিলেন। মায়ের সঙ্গিনীরা যাইতে চাহিলেও মা যাইতে চাহিলেন না। ঠাকুর তাহাতে আনন্দিত হইয়া বলিলেন, “ও খুব বুদ্ধিমতী, যেতে চাইল না। গেলে পরে লোকে বােলতাে-হংস - হংসী একত্রে এসেছে।” মা কেন যে যাইতে চাহিলেন না সে সম্বন্ধে তিনি নিজেই বলিয়াছেন, “উনি আমি যাইব কি-না জিজ্ঞাসা করিলেন কিন্তু আমার সঙ্গে যেতে হবে’ এ কথা তাে বলিলেন না। ইহাতেই আমার মনে হল না যাওয়াই ভাল।” 

ঠাকুরের সহিত শ্রীশ্রীমার সরল ভাবের বিষয়ে অতিশয় সৌসাদৃশ্য দেখা যায়। ঠাকুর যেমন গলার ব্যথা কিসে সারে ইহাকে-তাহাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, মাও সেইরুপ অসুখের সময় “কি অসুখ হ’ল বাপু, একি আর সারবে না মা! আমায় যে বিছানায় পেড়ে ফেললে। কি করি বল দেখি।” ইত্যাদি বলিতেছেন। আবার শশধর তর্কচূড়ামণি অসুস্থ স্থানে মানসিক শক্তিপ্রয়ােগ করিয়া অসুখ -সারাইবার কথা বলিতেই ঠাকুর যেমন “পন্ডিত হয়ে ওকি কথা বল গাে ! যে মন সচ্চিদানন্দকে দিয়েছি তা কি আবার ফিরিয়ে এনে হাড়-মাসের খাঁচায় দেওয়া  যায় ?” দৃঢ়ভাবে এই উত্তর দিয়াছেন, মাও তেমনি যদি কেহ অনুনয় করিয়া প্রার্থনা করিয়াছেন, “আপনি একবার বলুন অসুখ সেরে যাবে, তা হলে নিশ্চয় অসুখ সেরে যাবে।” তা হলে কি বলতে পারি ? মা, ঠাকুর যা করেন তা তাে হবে; আমি আর কি বলবাে?” ইহা ভিন্ন অন্য উত্তর পাওয়া যায় নাই। যদি কেহ জেদ করিয়া বলিয়াছে, “আপনি একবার মুখে বলন, তা হলে নিশ্চয় অসুখ সেরে যাবে, তাহা হইলেও “আমি কি তা বলতে পারি ? ঠাকুর যা করেন তাই হবে।”—তাঁহার এই একই উত্তর ছিল। 
তাঁহার ভালবাসা ক্ষণে ক্ষণে তাঁহাকে নব নব ভাবে বিভাবিত করিত। এক জনের একটিমাত্র সন্তান সন্ন্যাসী হইয়া গিয়াছে, তিনি মায়ের নিকট আসিয়া নিজের মনের তাপ জানাইতে গিয়া অশ্রুবর্ষণ করিতেছেন, শ্রীমারও চোখে জল, মা বলিতেছেন, “আহা! তাই তাে, একটি মাত্র সন্তান, প্রাণের ধন, এমন করে সন্ন্যাসী হয়ে গেলে মা কি করে প্রাণ ধরে বল দেখি?’ আবার অপর একদিন একজন যখন তাঁহার দুইটি সন্তানই সন্ন্যাসী হইবার জন্য ব্রহ্মচর্য লইয়াছে ইহা জননীর কাছে জানাইয়া বলিতেছেন, “মা, সন্তানের কল্যাণ হয় সেইটিই মায়ের কামনা। কি আছে সংসারে ? ছেলে যদি পরম কল্যাণের পথে যায়, তার চেয়ে আনন্দের বিষয় কি আছে ?” মা তখন সহর্ষে বলিতেছেন, “ঠিক বলেছ মা, পরম কল্যাণের পথে যদি ছেলে যায়, তার চেয়ে আনন্দ কি হতে পারে ?” এই যে বিভিন্ন স্থানে মায়ের বিভিন্ন ভাবের উক্তি উভয়ই তাঁহার আন্তরিক ; একটিতে তিনি সন্তানহারা মায়ের দুঃখের সম-অংশিনী, আবার অপরটিতে মা যে সন্তানের প্রকৃত কল্যাণের বিষয় বুঝিয়াছেন ইহা দেখিয়া পরমানন্দিত। 

জননীর অনেক কন্যাই মনে করেন-মা আমাকে অতিশয় ভালবাসেন, কখনও আমাকে ভুলেন না। অযােগ্যা এই দীনা লেখিকাও তাহাদের মধ্যে একজন। মা অতি নিকটেই থাকিতেন, দর্শনের জন্য ইচ্ছাও যে প্রবল হইত না এমন নহে। কিন্তু সঙ্কোচ সব সময়েই বাধা দিত। তথাপি যখনই যতদিন পরেই মায়ের দশন পাইয়াছি তখনই মনেপ্রাণে অনুভব করিয়াছি-মা আমাকে একবারও ভুলেন নাই। 

সেই অপারস্নেহময়ী জননী যেমন তাঁহার পিতৃহীনা দুঃখিনী স্নেহপাত্রী রাধু’র সকল অত্যাচার অম্নানমুখে সহ্য করিয়াছেন, সেইরূপ তাহার সকল সন্তানেরই অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করিয়াছেন। জয়রামবাটীতে ইদানীং ম্যালেরিয়ায় ভুগিয়া তাহার শরীর অত্যন্ত দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল ; সে সময় হয়তাে মধ্যাহ্নে বিশ্রাম করিতেছেন এমন সময় বহুদূর হইতে দর্শনপ্রার্থী পথশ্রান্ত ভক্ত আসিয়া উপস্থিত হইলেন। জননী তখনই তাহার পরিচর্যার প্রয়ােজনের জন্য বিশ্রাম ত্যাগ করিয়াছেন। তাহাদের শতজনের শত আবদার-কেহ বা মায়ের হাতের অন্ন গ্রহণ না করিয়া জলগ্ৰহণ করিবেন না এই সংকল্প করিয়াছেন মা তখনই রন্ধনশালায় প্রবেশ করিলেন; কেহ বা ধূলিপায়ে মায়ের চরণপূজা করিয়া পরে প্রসাদান্ন গ্রহণ করবেন বলিয়া আবদার ধরিয়াছেন, স্নেহময়ী সন্তানের সে আবদারও পূরণ করিতেছেন। শত অবুঝ সন্তানের মায়ের উপর শত দাবী। সহিষ্ণুতার প্রতিমূর্তি করুণময়ী জননী সকল প্রকারেই স্নেহ-সুধায় তাহাকে শান্ত করিতেছেন-মায়ের এই ছবি প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, কিন্তু আবার অনুরূপ দঢ়তারও অভাব ছিল না। তাঁহার অসুস্থ অবস্থায় একদিন একজন গৈরিকবস্ত্রপরিহিতা মহিলা তাঁহার চরণদর্শন করিতে আসিয়াছিলেন। তিনি মায়ের নিকট দীক্ষা লইবার জনা অতিশয় ব্যাকুল হইয়া আসিয়াছেন। মা তখন খাটের উপর শুইয়াছিলেন। তিনি যেমন পদধূলি লইবার জন্য অগ্রসর হইয়াছেন, অমনি মা যেন সন্ত্রস্তা হইয়া বলিলেন, “কর কি, কর কি, পায়ে হাত দিও না ; গৈরিকধারিণী সন্ন্যাসিনী তুমি, পায়ে হাত দিয়ে কেন আমাকে অপরাধী কর ?” মেয়েটি নিতান্ত দুঃখিত হইয়া উত্তর করিলেন, “অনেক আশা করে 
যে আপনার কাছে এসেছি, আপনি আমায় দীক্ষা দেবেন বলে !” 

মা বলিলেন, “ব্যস্ত হলে কি কিছু হয়, মা? সময় হলে নিজেই হবে। দীক্ষা কি তােমার হয় নি ? গেরুয়া কে দিয়েছেন। যার কাছে সাধন পেয়েছ, নিষ্ঠা করে তাঁকেই ধরে থাক, সময়ে হবে।”  মেয়েটি অবশেষে বলিলেন, “গেরুয়া কেহ দেন নাই, আমি নিজেই ধারণ করেছি। আর যে সাধন-প্রণালী পেয়েছি তাতে মনে শান্তি পাচ্ছি না।” 

মা তখন বলিলেন, “আজ আমি বড় অসুস্থ ; তােমার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারলাম না বলে মনে দুঃখ করাে না। কিন্তু মা, এটি মনে রেখাে, গেরুয়া পরা খুব সহজ নয়। এই যে সব আশ্রমের ত্যাগী ছেলেরা ঠাকুরের জন্য সব ছেড়ে এসেছে, এরাই গেরুয়া পরার অধিকারী। গেরুয়া পরা কি যার-তার কাজ ?” এই সব বলিয়া মিষ্টি কথায় তাঁহাকে বিদায় দিলেন।

কিন্তু মা তাহাকে পায়ের ধুলা নিতে দিলেন না। 

মা অসুস্থ থাকিতেই তাঁহার জন্মতিথির দিন আসিল, সেদিন তাঁহার চরণ পুজা করিতে বহু ভক্তের সমাবেশ হইয়াছে। মা তখন খুব দুর্বল, বার বার জ্বর হইতেছিল। মা পালঙ্কে অবগুণ্ঠিতা হইয়া বসিয়া আছেন, শত শত ভক্ত চরণপূজা করিতে আসিতেছেন, মা সস্নেহে সকলের পূজা গ্রহণ করিতেছেন। করা সত্ত্বেও পূজায় বহু সময় লাগিল, কিন্তু মা সমভাবেই প্রসন্নময়ীরূপে সস্তান দের অর্চনা গ্রহণ করিতেছেন। এই দৃশ্যটি আজও মনে অঙ্কিত রহিয়াছে। 

শ্রীশ্রীমায় স্বরূপ ভাষার তুলি দিয়া আঁকিতে পারি, এমন ক্ষমতা আমার নাই। আমি যখন মার দশন পাই নাই, আমার মেয়ে তখন নিবেদিতা স্কুলে পড়িত, তাহার কাছে প্রথম মায়ের প্রত্যক্ষ সংবাদ পাই। তার পূর্বে কেবল মনে কল্পনা লইয়াই তৃপ্ত থাকিতাম। আমার মেয়ে প্রথম আসিয়া আমাকে তাহার প্রত্যক্ষ সংবাদ জানাইল। সে বলিল, “মা, মাকে আমরা দর্শন করতে গিয়েছিলাম, তিনি যে কত সুন্দর, কত ভাল, তুমি দেখলে বুঝতে পারবে। আমার এত ভাল লেগেছে মা, সে আর কি বলবাে। কেবলি মনে হচ্ছিল, তুমি যদি একবারটি তাঁকে দেখতে।” তাহার এই কথা শুনিয়া খুঁটাইয়া খুঁটাইয়া তাহার কাছে মায়ের মধুর প্রসঙ্গ জিজ্ঞাসা করিলাম। সেও আনন্দের সহিত বলল—কেমন তিনি খাইতে বসিয়া হাসিতে হাসিতে বালিকাদের সম্ভাষণ করিতেছিলেন, অল্পাহারের জন্য গােলাপ-মার কাছে তিরস্কৃতা হইয়া তাঁহার দিকে চাহিয়া হাসিতেছিলেন, সকলকে তাঁহার প্রসাদ কত স্নেহের সঙ্গে হাতে হাতে ভাগ করিয়া দিতেছিলেন। সেই ছবিটি যেন তাহার বর্ণনায় মনের মধ্যে আঁকা হইয়া গেল। সেইদিন হইতে তাহার কাছে মায়ের কথা প্রত্যহ শুনিতে পাইতাম, আর মনে অভিমান প্রবল হইয়া উঠিত ; কেবল মনে হইত সবাইকে আপন করে নিয়ে আমায় কেন এতদূরে রেখেছেন ? অবশেষে একদিন বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেল। মায়ের দর্শন পাইলাম। 

আজ তিনি দুর্লভ, তিনি ধ্যানগম্য। ১৩২৭ সালের ৪ঠা শ্রাবণ রাত্রি ১টা ৩০ মিনিটের সময় চিন্ময়ী জননী মৃন্ময় ঘট ভাঙ্গিয়া দিয়াছেন, জড়দৃষ্টি  তাঁহার দর্শনের অধিকার হারাইয়াছে, কিন্তু জগৎ তাহার পাদস্পর্শে পবিত্র হইয়া কি সম্পত্তি লাভ করিয়াছে, তাহাই অনুভব করিবার আজ সময় আসিয়াছে। 

শ্ৰীমতী সরলাবালা দাসী

সারদামণি দেবী 

শাস্ত্রে গৃহস্থের প্রশংসা আছে, সন্ন্যাসীরও প্রশংসা আছে। শাস্ত্রে ইহাও লিখিত আছে এবং সহজ বুদ্ধিতেও ইহা বুঝা যায় যে, গার্হস্থ্য আশ্রম অন্য সব আশ্রমের মূল। কিন্তু গৃহস্থমাত্রেরই জীবন প্রশংসনীয় বা নিন্দনীয় নহে, সন্ন্যাসী মাত্রেরও জীবন প্রশংসনীয় বা নিন্দার্হ নহে। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের ভগবদ্দত্ত শক্তি, হৃদয়-মনের গতি প্রভৃতির দ্বারা স্থির হয় যে, ভগবান কিরূপ জীবন যাপন করিয়া কি কাজ করিবার নিমিত্ত কাহাকে সংসারে পাঠাইয়াছেন। যিনি যে আশ্রমে আছেন, তদুচিত জীবন যাপন করেন কি-না, তাহা বিবেচনা করিয়া তিনি আত্মপ্রসাদ বা আত্মগ্লানি অনুভব করিতে পারেন। যিনি যে আশ্রমের মানুষ, কেবল সেই আশ্রমের নামের ছাপটি দেখিয়া তাহার জীবনের উৎকর্ষ অপকর্ষ সার্থকতা-ব্যর্থতা নির্ধারিত হইতে পারে না। ব্যক্তি-নির্বিশেষে গৃহস্থাশ্রম অপেক্ষা সন্ন্যাসের বা সন্ন্যাসাশম অপেক্ষা গার্হস্থ্যের উৎকর্ষ বা অপকর্য বিবেচিত হইতে পারে না। 

সাধারণতঃ ইহাই দেখা যায় যে, যাঁহারা সন্ন্যাসী তাঁহার হয় কখনও বিবাহই করেন নাই, কিংবা বিবাহ করিয়া থাকিলে পত্নীর সহিত সমুদয় সম্বন্ধ বর্জন করিয়া এবং তাঁহাকে ত্যাগ করিয়া গৃহত্যাগী হইয়াছেন। পরমহংস রামকৃষ্ণ সন্ন্যাসী ছিলেন, কিন্তু তিনি চব্বিশ বৎসর বয়সে বিবাহ করিয়াছিলেন। বাল্যকালে যখন তাঁহার বিচার করিবার ক্ষমতা ছিল না, তখন কিংবা তাঁহার অনভিমতে কে তাঁহার বিবাহ দেন নাই। তাঁহার বিবাহ তাঁহার সম্মতিক্রমে হইয়াছিল-তাঁহার জীবন-চরিতে লিখিত আছে যে, তাঁহারই নির্দেশ-অনুসারে পাত্রী-নির্বাচন হইয়াছিল। কিন্তু তিনি একদিকে যেমন পত্নী লইয়া সাধারণ গৃহস্থের ন্যায় ঘর করেন নাই, তাঁহার সহিত কখন কোন দৈহিক সম্বন্ধ হয় নাই, অন্য দিকে আবার তাঁহাকে পরিত্যাগও করেন নাই। বরং তাঁহাকে নিকটে রাখিয়া স্নেহ উপদেশ ও নিজের দৃষ্টান্ত দ্বারা তাঁহাকে সহধর্মিণীর মতাে করিয়া গড়িয়া তুলিয়াছেন। ইহা তাঁহার জীবনের একটি বিশেষত্ব। 

কিন্তু বিশেষত্ব কেবল রামকৃষ্ণের নহে। তাঁহার পত্নী সারদামণি দেবীরও বিশেষত্ব আছে। সত্য বটে রামকৃষ্ণ সারদামণিকে শিক্ষাদি দ্বারা গডিয়া তুলিয়াছিলেন। কিন্তু যাহাকে শিক্ষা দেওয়া হয়, শিক্ষা গ্রহণ করিয়া তাহার দ্বারা উপকৃত ও উন্নত হইবার ক্ষমতা তাহার থাকা চাই। একই সুযোগ্য গুরুর ছাত্র তাে অনেক থাকে, কিন্তু সকলেই জ্ঞানী ও সৎ হয় না। সােনা হইতে যেমন অলঙ্কার হয়, মাটির তাল হইতে তেমন হয় না। 

এইজন্য সারদামণি দেবীর জীবন-কথা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানিতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাহার কোন জীবন চরিত নাই। পরমহংসদেবের জীবন-চরিতে প্রসঙ্গক্রমে সারদামণি দেবী সম্বন্ধে স্থানে স্থানে অল্প অল্প যাহা লিখিত আছে, তাহা দ্বারাই কৌতুহল-নিবৃত্তি করিতে হয়। সম্ভব হইলে রামকৃষ্ণ ও সারদামণির ভক্তদিগের মধ্যে কেহ এই মহীয়সী নারীর জীবন-চরিত ও উক্তি লিপিবদ্ধ করিবেন, এই অনুরােধ জানাইতেছি। হয়তাে একাধিক জীবন-চরিত লিখিত হইবে । তাহার মধ্যে একটি এমন হওয়া উচিত, যাহাতে সরল ও অবিমিশ্র ভাবে কেবল তাঁহার চরিত ও উক্তি থাকিবে, কোন প্রকার ব্যাখ্যা, টীকা-টিপ্পনী, ভাষ্য থাকিবে না। রামকৃষ্ণের এইরূপে একটি জীবন-চরিতের প্রয়ােজন। ইহা বলিবার উদ্দেশ্য এই যে, রামকৃষ্ণমণ্ডলীর বাহিরের লােকদিগের রামকৃষ্ণ ও সারদামণিকে স্বাধীনভাবে নিজ নিজ জ্ঞানবুদ্ধি অনুসারে বুঝিবার সুযোগ পাওয়া আবশ্যক। মণ্ডলীভূক্ত ভক্তদিগের জন্য অবশ্য অন্যবিধ জীবন-চরিত থাকিতে পারে। 

গৃহস্থাশ্রমে রামকৃষ্ণের নাম ছিল গদাধর। সাংসারিক বিষয়ে তাহার পূর্ণমাত্রায় উদাসীনতা ও নিরন্তর উদ্মনাভাব দূর করিবার জন্য তাঁহার “স্নেহময়ী মাতা ও অগ্রজ উপযুক্ত পাত্রী দেখিয়া তাঁহার বিবাহ দিবার পরামর্শ স্থির করেন।” 

“গদাধর জানিতে পারিলে পাছে ওজর আপত্তি করে, এজন্য মাতা ও পুত্রে পূর্বোক্ত পরামর্শ অন্তরালে হইয়াছিল। চতুর গদাধরের কিন্তু ঐ বিষয় জানিতে অধিক বিলম্ব হয় নাই। জানিতে পারিয়াও তিনি উহাতে কোন আপত্তি করেন নাই। বাটীতে কোন একটা অভিনব ব্যাপার উপস্থিত হইলে বালক-বালিকারা যেরুপ আনন্দ করিয়া থাকে, তদ্রুপ আচরণ করিয়াছিলেন।" 

চারিদিকের গ্রামসকলে লােক প্রেরিত হইল, কিন্তু মনােমত পাত্রীর সন্ধান পাওয়া গেল না। তখন গদাধর বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রামের শ্রীরামচন্দ্র মুখােপাধ্যায়ের কন্যার সন্ধান বলিয়া দেন। তাঁহার মাতা ও ভ্রাতা ঐস্থানে অনুসন্ধান করিতে লােক পাঠাইলেন, সন্ধান মিলিল। অল্পদিনেই সকল বিষয়ের কথাবার্তা স্থির হইয়া গেল। সন ১২৬৬ সালের বৈশাখের শেষভাগে শ্রীরামচন্দ্র মুখােপাধ্যায়ের পঞ্চমবর্ষীয়া একমাত্র কন্যার সহিত গদাধরের বিবাহ হইল। বিবাহে তিনশত টাকা পণ লাগিল। তখন গদাধরের বয়স তেইশ পূর্ণ হইয়া চব্বিশে চলিতেছে। 

গদাধরের মাতা চন্দ্রাদেবী “বৈবাহিকের মনস্তুষ্টি ও বাহিরের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য জমিদার বন্ধু লাহা বাবুদের বাটী হইতে যে গহনাগুলি চাহিয়া বধূকে বিবাহের দিনে সাজাইয়া আনিয়াছিলেন, কয়েকদিন পরে ঐগুলি ফিরাইয়া দিবার সময় যখন উপস্থিত হইল, তখন তিনি যে আবার নিজ সংসারের দারিদ্রচিন্তায় অভিভূত হইয়াছিলেন, ইহাও স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়। নববধুকে তিনি বিবাহের দিন হইতে আপনার করিয়া লইয়াছিলেন। বালিকার অঙ্গ হইতে অলঙ্কারগুলি তিনি কোন প্রাণে খুলিয়া লইবেন, এই চিন্তায় বৃদ্ধার চক্ষু, এখন জলপূর্ণ হইয়াছিল। অন্তরের কথা তিনি কাহাকেও না বলিলেও গদাধরের উহা বুঝিতে বিলম্ব হয় নাই। তিনি মাতাকে শান্ত করিয়া নিদ্রিতা বধুর অঙ্গ হইতে গহনাগুলি এমন কৌশলে খুলিয়া লইয়াছিলেন যে, বালিকা উহার কিছুই জানিতে পারে নাই। বুদ্ধিমতী বালিকা কিন্তু নিদ্রা ভঙ্গ বলিয়াছিল, আমার গায়ে যে এইরুপ সব গহনা ছিল, তাহা কোথায় গেল ? চন্দ্রাদেবী সজলনয়নে তাহাকে ক্লোড়ে সান্ত্বনাপ্রদানের জন্য বলিয়াছিলেন, ‘মা! গদাধর তােমাকে ঐ সকলের অপেক্ষাও উত্তম অলঙ্কারসকল ইহার পর কত দিবে।" 

চন্দ্রাদেবী যে অর্থে এই কথাগুলি বলিয়াছিলেন, সে অর্থে না হইলেও অন্য অর্থে ভবিষ্যৎকালে কথাগুলি অক্ষরে অক্ষরে সত্য হইয়াছিল। 

“এইখানেই কিন্তু ঐ বিষয়ের পরিসমাপ্তি হইল না। কন্যার খুল্লতাত তাহাকে ঐদিন দেখিতে আসিয়া ঐকথা জানিয়াছিলেন এবং অসন্তোষ প্রকাশপূর্বক ঐদিনেই তাহাকে পিত্রালয়ে লইয়া গিয়া ছিলেন। মাতার মনে ঐ ঘটনায় বিশেষ বেদনা উপস্থিত হইয়াছে দেখিয়া গদাধর তাঁহার ঐ দুঃখ দূর করিবার জন্য পরিহাসচ্ছলে বলিয়াছিলেন, উহারা এখন যাই বলুক করুক না, বিবাহ তাে আর ফিরিবে না।" 

ইহার পর সন ১২৬৭ সালের অগ্রহায়ণ মাসে সারদামণি সপ্তম বর্ষে পদার্পণ করিলে কুলপ্রথা-অনুসারে স্বামীর সহিত পিত্রালয় হইতে দুই ক্রোশ দূরবর্তী কামারপুকুর গ্রামে স্বশুরালয়ে আসিয়াছিলেন। 

অতঃপর বহু বৎসর রামকৃষ্ণ কামারপুকুরে ছিলেন না। ১২৭৪ সালে তিনি, যে ভৈরবী ব্রাক্ষণী তাঁহার সাধনে সহায়তা করিয়াছিলেন তাঁহার এবং ভাগিনেয় হৃদয়ের সহিত কামারপুকুরে আবার আগমন করেন। 

বহুকাল পরে তাঁহাকে পাইয়া এই দরিদ্র সংসারে এখন আনন্দের হাট-বাজার বসিল এবং নববধুকে আনাইয়া সুখের মাত্রা পূর্ণ করিবার জন্য রমণীগণের নির্দেশে জয়রামবাটী গ্রামে লােক প্রেরিত হইল। বিবাহের পর সারদামণি একবার মাত্র স্বামীকে দেখিয়াছিলেন। তখন তিনি সাত বৎসরের বালিকা মাত্র। সুতরাং ঐ ঘটনা সম্বন্ধে তাঁহার কেবল এইটুকু মনে ছিল যে, ভাগিনেয় হৃদয়ের সহিত রামকৃষ্ণ জয়রামবাটী আসিলে কোন নিভৃত অংশে লুকাইয়াও তিনি রক্ষা পান নাই। হৃদয় তাঁহাকে খুজিয়া বাহির করিয়া কোথা হইতে অনেকগুলি পদ্মফুল আনিয়া বালিকা মাতুলানী লজ্জা ও ভয়ে সঙ্কুচিতা হইলেও তাঁহার পা পূজা করিয়াছিল। ইহার প্রায় ছয় বৎসর পরে তাঁহার তের বৎসর বয়সের সময় তাঁহাকে শ্বশুরবাড়ি কামারপুকুর লইয়া যাওয়া হয়। সেখানে তিনি একমাস ছিলেন, কিন্তু রামকৃষ্ণ তখন দক্ষিণেশ্বরে থাকায় তাঁহার সহিত দেখা হয় নাই। উহার ছয় মাস আন্দাজ পরে আবার শ্বশুরবাড়ি আসিয়া দেড় মাস ছিলেন। তখন স্বামীর সহিত দেখা হয় নাই। তাহার তিন-চার মাস পর যখন তিনি বাপের বাড়িতে ছিলেন তখন খবর আসিল রামকৃষ্ণ আসিয়াছেন, তাঁহাকে কামারপকুরে যাইতে হইবে। তখন তাঁহার বয়স তের বৎসর ছয়-সাত মাস। 

রামকৃষ্ণ এই সময়ে একটি সুমহৎ কর্তব্য সাধনে যত্নবান হইলেন। পত্নীর তাঁহার নিকট আসা-না-আসা সম্বন্ধে রামকৃষ্ণ উদাসীন থাকিলেও যখন সারদামণি তাঁহার সেবা করিতে কামারপুকুরে উপস্থিত হইলেন, তখন তিনি তাঁহাকে শিক্ষা দীক্ষাদি দিয়া তাঁহার কল্যাণসাধনে তৎপর হইলেন। 

রামকৃষ্ণকে বিবাহিত জানিয়া “শ্রীমদাচার্য তােতাপুরী তাঁহাকে এক সময় বলিয়াছিলেন, ‘তাহাতে আসে যায় কি? স্ত্রী নিকটে থাকিলেও যাহার ত্যাগ, বৈরাগ্য, বিবেক, বিজ্ঞান সর্বতােভাবে অক্ষুন্ন থাকে সেই ব্যক্তিই ব্রহ্মে যথার্থ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে ; স্ত্রী ও পুরুষ উভয়কেই যিনি সমভাব আত্মা বলিয়া সর্বক্ষণ দৃষ্টি ও তদনুরুপ ব্যবহার করতে পারেন; তাঁহারই যথার্থ, ব্ৰহ্ম বিজ্ঞান লাভ হইয়াছে, স্ত্রী পুরুষে ভেদদৃষ্টিসম্পন্ন অপর সকলে সাধক হইলেও ব্রহ্ম বিজ্ঞান হইতে বহু দুরে রহিয়াছে।” 

তােতাপুরীর এই কথা রামকৃষ্ণের মনে উদিত হইয়া তাঁহাকে দীর্ঘকালব্যাপী সাধনলব্ধ নিজের বিজ্ঞানের পরীক্ষায় এবং নিজ পত্নীর কল্যাণসাধনে নিযুক্ত করিয়াছিল। কর্তব্য বলিয়া বিবেচিত হইলে তিনি কোন কাজ উপেক্ষা করিতে বা আধসারা করিয়া ফেলিয়া রাখিতে পারিতেন না। এ বিষয়েও তাহাই হইল। 

“ঐহিক পারত্রিক সকল বিষয়ে সর্বতােভাবে তাঁহার মুখাপেক্ষী বালিকা-পত্নীকে শিক্ষা প্রদান করিতে অগ্রসর হইয়া তিনি ঐ বিষয় অর্ধনিম্পন্ন করিয়া ক্ষান্ত হন না। দেবতা, গুরু ও অতিথি প্রভৃতির সেবা ও গৃহকর্মে যাহাতে তিনি কুশলা হয়েন, টাকার সদব্যবহার করতে পারেন এবং সর্বোপরি ঈশ্বরে সর্বস্ব সমর্পণ করিয়া দেশকালপাত্রভেদে সকলের সহিত ব্যবহার করিতে নিপুনা হইয়া উঠেন, তদ্বিষয়ে এখন হইতে তিনি বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়াছিলেন।” 

চৌদ্দ বৎসর বয়সের সময় যখন সারদামণি দেবীর স্বামীর নিকট হইতে শিক্ষা লাভ আরম্ভ হয়, তখন তিনি স্বভাবতই নিতান্ত বালিকা-ভাব-সম্পন্ন ছিলেন। 

কামারপুকুর অঞ্চলের বালিকাদিগের সহিত কলিকাতার বালিকাদিগের তুলনা করিবার অবসর যিনি লাভ করিয়াছেন, তিনি দেখিয়াছেন কলিকাতা অঞ্চলের বালিকাদিগের দেহের ও মনের পরিণতি অল্প বয়সেই উপস্থিত হয়, কিন্তু কামারপুকুর প্রভৃতি গ্রামসকলের বালিকাদিগের তাহা হয় না। পবিত্র নির্মল গ্রাম্য বায়ুসেবন এবং গ্রামমধ্যে যথাতথা স্বচ্ছন্দ বিহারপূর্বক স্বাভাবিকভাবে জীবন অতিবাহিত করিবার জন্যই বােধহয় ঐরুপ হইয়া থাকে।” 

পবিত্ৰা বালিকা রামকৃষ্ণের দিব্য সঙ্গ ও নিঃস্বার্থ আদরযত্ন-লাভে ঐ কালে অনির্বচনীয় আনন্দে উল্লসিত হইয়াছিলেন। পরমহংসদেবের স্ত্রীভক্তদিগের নিকট তিনি ঐ উল্লাসের কথা অনেক সময় এইরূপে প্রকাশ করিয়াছেনঃ

“হৃদয় মধ্যে আনন্দের পূর্ণ ঘট যেন স্থাপিত রহিয়াছে--ঐকাল হইতে সর্বদা এইরূপ অনুভব করিতাম। সেই ধীর স্থির দিব্য উল্লাসে অন্তর কতদূর কিরূপ পূর্ণ থাকিত তাহা বলিয়া বুঝাইবার নহে!” 

কয়েক মাস পরে রামকৃষ্ণ যখন কামারপুকুর হইতে কলিকাতায় ফিরিলেন, সারদামণি তখন অত্যন্ত আনন্দ-সম্পদের অধিকারিণী হইয়াছেন--এইরূপ অনুভব করিতে করিতে পিত্রালয়ে ফিরিয়া আসিলেন। 

“উহা তাহাকে চপলা না করিয়া শান্তস্বভাবা করিয়াছিল, প্রগলভা না করিয়া চিন্তাশীলা করিয়াছিল, স্বার্থদৃষ্টনিবন্ধা না করিয়া নিঃস্বার্থ প্রেমিকা করিয়াছিল এবং অন্তর হইতে সর্বপ্রকার অভাববােধ তিরােহিত করিয়া মানব সাধারণের দুঃখকষ্টের সহিত অনন্তসমবেদনাসম্পন্না করিয়া ক্রমে তাঁহাকে সাক্ষাৎ প্রতিমায় পরিণত করিয়াছিল। মানসিক উল্লাস প্রভাবে অশেষ শারীরকি কষ্টকে তাঁহাব এখন হইতে কষ্ট বলিয়া মনে হইত না এবং আত্মীয়বর্গের নিকট হইতে আদর-যত্নের প্রতিদান না পাইলে মনে দুঃখ উপস্থিত হইত না। ঐরূপে সকল বিষয়ে সামান্য সন্তুষ্ট থাকিয়া বালিকা আপনাতে আপনি ডুবিয়া তখন পিত্রালয়ে কাল কাটাইতে লাগিলেন।” 

কিন্তু শরীর ঐ স্থানে থাকিলেও তাঁহার মন স্বামীর পদানুসরণ করিয়া এখন হইতে দক্ষিণেশ্বরেই উপস্থিত ছিল। তাঁহাকে দেখিবার এবং তাঁহার নিকট উপস্থিত হইবার জন্য মধ্যে মধ্যে মনে প্রবল বাসনার উদয় হইলেও তিনি উহা যত্নে সংবরণপূর্বক ধৈর্যবিলম্বন করিতেন; ভাবিতে প্রথম দর্শনে যিনি তাঁহাকে কৃপা করিয়া এতদূর ভালবাসিয়াছেন, তিনি তাঁহাকে ভুলিবেন না—সময় হইলেই নিজের নিকট ডাকিয়া লইবেন। | 

“ঐরুপ দিনের পর দিন যাইতে লাগিল এবং হৃদয়ে বিশ্বাস রাখিয়া তিনি ঐ শুভদিনের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। আশাপ্রতীক্ষার প্রবল প্রবাহ বালিকার মনে সমভাবেই বহিতে লাগিল। তাঁহার শরীর কিন্তু মনের ন্যায় সমভাবে থাকিল না, দিন দিন পরিবর্তিত হইয়া সন ১২৭৮ সালের পৌষে তাঁহাকে অষ্টাদশবর্ষীয়া যুবতীতে পরিণত করিল। দেবতুল্য স্বামীর প্রথম সন্দর্শন জনিত আনন্দ তাঁহাকে জীবনের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখ হইতে উচ্চে উঠাইয়া রাখিলেও সংসারে নিরাবিল আনন্দের অবসর কোথায় ?-গ্রামের পুরুষেরা জল্পনা করিতে বসিয়া যখন তাঁহার স্বামীকে ‘উন্মত্ত' বলিয়া নির্দেশ করিত, ‘পরিধানের কাপড় পর্যন্ত ত্যাগ করিয়া হরি হরি করিয়া বেড়ায় ইত্যাদি নানা কথা বলিত, অথবা সমবয়স্কা রমণীগণ যখন তাঁহাকে পাগলের স্ত্রী বলিয়া করুণা বা উপেক্ষার পাত্রী বিবেচনা করিত, তখন মুখে কিছু না বললেও তাঁহার অন্তরে দারুণ ব্যথা উপস্থিত হইত ; উন্মনা হইয়া তিনি তখন চিন্তা করিতেন-তবে কি পূর্বে যেমন দেখিয়াছিলাম তিনি সেরুপ আর নাই ? লােকে যেমন বলিতেছে, তাঁহার কি ঐরূপ অবস্থান্তর হইযাছে? বিধাতার নিবন্ধে যদি ঐরুপই হইয়া থাকে তাহা হইলে আমার তাে এখানে থাকা কর্তব্য নহে, পার্শ্বে থাকিয়া তাহার সেবাতে নিযুক্ত থাকাই উচিত। অশেষ চিন্তার পর স্থির করিলেন, তিনি দক্ষিণেশ্বরে স্বয়ং গমনপূর্বক চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করিবেন-পরে যাহা কর্তব্য বিবেচিত হইবে তদ্রুপ অনুষ্ঠান করিবেন।” 

ফাগুনের দোল-পণিমায় শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মতিথিতে সারদামণি দেবীর দুরসম্পকীয়া কয়েকজন আত্মীয় এই বৎসর গঙ্গাস্নান করিবার নিমিত্ত কলিকাতা আসা স্থির করেন। তিনিও তাঁহাদের সঙ্গে যাইতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। তাঁহারা তাঁহার পিতাকে তাঁহার মত জিজ্ঞাসা করায় তিনি কন্যার এখন কলকাতা যাইবার অভিলাষের কারণ বুঝিয়া তাঁহাকে স্বয়ং সঙ্গে লইয়া কলিকাতা যাইবার বন্দোবস্ত করিলেন। জয়রামবাটী হইতে কলিকাতা রেলে আসা যাইত না, সুতরাং পালকিতে কিংবা পদব্রজে আসা ভিন্ন উপায় ছিল না। ধনী লোকেরা ভিন্ন অন্য সকলকে হাঁটিয়াই আসিতে হইত। অতএব কন্যা ও সঙ্গিগণের সহিত শ্রীরামচন্দ্র মুখােপাধ্যায় হাঁটিয়াই কলিকাতা অভিমুখে রওনা হইলেন। 

“ধানক্ষেত্রের পর ধানক্ষেত্র এবং মধ্যে মধ্যে কমলপূর্ণ দীর্ঘিকানিচয় দেখিতে দেখিতে, অশ্বথ, বট প্রভৃতি বৃক্ষরাজির শীতল ছায়া অনুভব করিতে করিতে তাঁহারা সকলে প্রথম দুই দিন সানন্দে পথ চলিতে লাগিলেন। কিন্তু গন্তব্যস্থল পৌঁছানাে পর্যন্ত ঐ আনন্দ রহিল না। পথশ্রমে অনভ্যস্ত কন্যা পথিমধ্যে একস্থানে দারুণ জ্বরে আক্রান্ত হইয়া শ্রীরামচন্দ্রকে বিশেষ চিন্তান্বিত করিলেন। কন্যার ঐরুপ অবস্থায় অগ্রসর হওয়া অসম্ভব বুঝিয়া তিনি চটিতে আশ্রয় লইয়া অবস্থান করিতে লাগিলেন।” 

প্রাতঃকালে উঠিয়া শ্রীরামচন্দ্র দেখিলেন, কন্যার জ্বর ছাড়িয়া গিয়াছে। পথি মধ্যে নিরুপায় হইয়া বসিয়া থাকা অপেক্ষা তিনি ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়াই শ্রেয় মনে করিলেন। কন্যারও তাহাতে মত হইল, কিছুদূর যাইতে না যাইতে একটি পালকিও পাওয়া গেল। সারদামণি দেবীর আবার জ্বর আসিল। কিন্তু আগেকার মত জোরে না আসায় তিনি অবসন্ন হইয়া পড়িলেন না এবং ঐ বিষয় কাহাকেও কিছু বলিলেনও না। রাত্রি নয়টার সময় সকলে দক্ষিণেশ্বরে, পেীছিলেন। 

সারদামণিকে এইরপ পীড়িত অবস্থায় আসিতে দেখিয়া রামকৃষ্ণ সাতিশয় উদ্বিগ্ন হইলেন। 

‘ঠাণ্ডা লাগিয়া জ্বর বাড়িবে বলিয়া নিজগৃহে ভিন্ন শয্যায় তাঁহার শয়নের বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন এবং দুঃখ করিয়া বারংবার বলিতে লাগিলেন, 'তুমি এতদিনে আসিলে ? আর কি আমার সেজবাবু, (মথুরবাবু) আছে যে তােমার যত্ন হবে?' ঔষধপথ্যাদির বিশেষ বন্দোবস্তে তিন-চার, দিনেই শ্রীশ্রীমাতাঠাকুরানী আনােগ্যলাভ করিলেন।” 

ঐ তিন-চার দিন রামকৃষ্ণ তাঁহাকে দিনরাত নিজগৃহে রাখিয়া ঔষধপথ্যাদি সকল বিষয়ের স্বয়ং তত্ত্বাবধান করিলেন, পরে নহবতঘরে নিজ জননীর নিকট তাঁহার থাকিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। সারদামণি এখন বুঝিলেন, রামকৃষ্ণ আগে যেমন ছিলেন, এখনও তেমনি আছেন, তাঁহার প্রতি তাঁহার স্নেহ ও করুণা পূর্ববৎ আছে। তিনি প্রাণের উল্লাসে পরমহংদেব ও তাঁহার জননীর সেবায় নিযুক্ত হইলেন এবং তাঁহার পিতা কন্যার আনন্দে আনন্দিত হইয়া কয়েকদিন পরে বাড়ি ফিরিয়া গেলেন। 

রামকৃষ্ণ পত্নীর প্রতি কর্তব্যপালনে মনােনিবেশ করিলেন। অবসর পাইলেই, তিনি সারদামণিকে মানবজীবনের উদ্দেশ্য ও কর্তব্য সম্বন্ধে সর্বপ্রকার শিক্ষা প্রদান করিতে লাগিলেন। শুনা যায়, এই সময়েই তিনি পত্নীকে বলিয়াছিলেন, “চাঁদা মামা যেমন সকল শিশুর মামা, তেমনি ঈশ্বর সকলেরই আপনার, তাঁহাকে ডাকিবার সকলেরই অধিকার আছে ; যে ডাকিবে, তিনি তাহাকেই দর্শনদানে কৃতার্থ করিবেন; তুমি ডাক তাে তুমিও তাঁহার দেখা পাইবে।” কেবল উপদেশ দেওয়াতেই রামকৃষ্ণের শিক্ষাপ্রণালী পর্যবসিত হইত না। তিনি শিষ্যকে নিকটে রাখিয়া, ভালবাসায় সর্বতোভাবে আপনার করিয়া লইয়া তাহাকে প্রথমে উপদেশ দিতেন; পরে শিষ্য উহা কাজে কতদূর পালন করিতেছে, সর্বদা সে বিষয়ে তীক্ষ দৃষ্টি রাখিতেন এবং ভ্রমবশতঃ সে বিপরীত অনুষ্ঠান করিলে, তাহাকে,বুঝাইয়া সংশােধন করিয়া দিতেন। সারদামণির সম্বন্ধেও এই প্রণালী অবদলম্বন করিয়াছিলেন। সামান্য বিষয়েও রামকৃষ্ণের এরূপ নজর ছিল যে, তিনি পত্মীকে বলিয়াছিলেন, “গাড়িতে বা নৌকায় যাবার সময় আগে গিয়ে উঠবে আর নামবার সময় কোন জিনিস নিতে ভুল হয়েছে কি-না, দেখেশুনে সকলের শেষে নামবে।” 

কথিত আছে, সারদামণি একদিন এই সময় স্বামীর পদসম্বাহন করিতে করিতে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “আমাকে তােমার কি বলিয়া বােধ হয় ?” রামকৃষ্ণ উত্তর দিয়াছিলেন, “যে মা মন্দিরে আছেন, তিনিই এই শরীরের জন্ম দিয়াছেন ও সম্প্রতি নহবতে বাস করিতেছেন এবং তিনিই এখন আমার পদসেবা করিতেছেন। সাক্ষাৎ আনন্দময়ীর রুপ বলিয়া তােমাকে সত্য দেখিতে পাই।” রামকৃষ্ণ সকল নারীর মধ্যে--অতি হীনচরিত্রা রমণীর মধ্যেও বিশ্বের জননীকে দেখিতেন। 

"উপনিষৎকার ঋষি যাজ্ঞবল্কা-মৈত্রেয়ী-সংবাদে শিক্ষা দিতেছেন--পতির ভিতর আত্মস্বরুপ শ্রীভগবান রহিয়াছেন বলিয়া স্ত্রীর পতিকে প্রিয় বােধ হয় ; স্ত্রীর ভিতর তিনি থাকাতেই, পতিব মন স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হইয়া থাকে।” 

- (বৃহদারণ্যক উপনিষদ, ৫ম ব্রাহ্মণ ) 

এই সময় রামকৃষ্ণ ও সারদামণি এক শয্যায় রাত্রিযাপন করিতেন। দেহ বােধ-বিরহিত রামকৃষ্ণের প্রায় সমস্ত রাত্রি এইকালে সমাধিতে অতিবাহিত হইত। এই সময়ের কথা উল্লেখ করিয়া রামকৃষ্ণ যাহা বলিতেন, তাহাতে বুঝা যায় যে সারদামণি দেবীও যদি সম্পূর্ণ কামনাশূন্যা না হইতেন, তাহা হইলে রামকৃষ্ণের “দেহবুদ্ধি আসিত কি-না, কে বলিতে পারে ?” পৃথিবীর নানা কার্যক্ষেত্রে অনেক প্রসিদ্ধ ললাকের পত্নীদিগের সম্বন্ধে কথিত আছে যে, তাঁহারা উহাদের সহায় হইয়া উহাদের জীবন-পথ সর্ববিধ সাংসারিক বাধাবিঘ্ন. হইতে মুক্ত না রাখিলে, উহারা এত মহৎ কাজ করিতে পারিতেন না। অনেক মহান লােকের পত্নী কেবল যে পতিকে সংসারের খুটিনাটি ও নানা ঝঞ্জাট হইতে নিষ্কৃতি দেন তা নয়, অবসাদ, নৈরাশ্য ও বলহীনতার সময় তাঁহার হৃদয়ে শক্তি ও উৎসাহের সঞ্চার করিয়া থাকেন। আমাদের সমসাময়িক ইতিহাসে রামকৃষ্ণের সুস্পষ্ট মূর্তির অন্তরালে সারদামণি দেবীর মূর্তি এখনও ছায়ার ন্যায় প্রতীত হইলেও তিনি সাত্তিক প্রকৃতির নারী না হইলে রামকৃষ্ণও রামকৃষ্ণ হইতে পারিতেন কি-না, সে বিষয়ে সন্দেহ করিবার কারণ আছে। 

বৎসরাধিক কাল অতীত হইলেও যখন রামকৃষ্ণের মনে একক্ষণের জনাও দেহ বুদ্ধির উদয় হইল না এবং যখন তিনি সারদামণি দেবীকে কখন জগন্মাতার অংশভাবে এবং কখন সচ্চিদানন্দস্বরপ আত্মা বা ব্রহ্মভাবে দৃষ্টি করা ভিন্ন অপর কোন ভাবে দেখিতে ও ভাবিতে সমর্থ হইলেন না, তখন রামকৃষ্ণ আপনাকে পরীক্ষোত্তীর্ণ ভাবিয়া ষোড়শীপূজার আয়ােজন করিলেন এবং সারদামণিদেবীকে অভিষেকপূর্বক পূজা করিলেন। পূজাকালের শেষদিকে সারদামণি বাহ্যজ্ঞান রহিতা ও সমাধিস্থা হইয়াছিলেন বলিয়া লিখিত আছে। 

ইহার পরও তিনি অহঙ্কতা হন নাই, তাঁহার মাথা বিগড়াইয়া যায় নাই। 

যােড়শীপূজার পর তিনি প্রায় পাঁচ মাস দক্ষিণেশ্বরে ছিলেন। তিনি ঐ সময়ে পূর্বের ন্যায় রন্ধনাদি দ্বারা রামকৃষ্ণ ও তাঁহার জননীর এবং অতিথি-অভ্যাগতের সেবা করিতেন এবং দিনের বেলা নহবত ঘরে থাকিয়া রাত্রে স্বামীর শয্যা পার্শ্বে থাকিতেন। সকল প্রকারের খাদ্য ও রন্ধন রামকৃষ্ণের সহ্য হইত না বলিয়া অনেক সময়েই তাঁহার জন্য আলাদা রান্না করিতে হইত। সেই সময় দিবারাত্র রামকৃষ্ণের “ভাব-সমাধির বিরাম ছিল না” এবং কখন কখন “মৃতের লক্ষণসকল তাঁহার দেহে প্রকাশিত হইত।” কখন রামকৃষ্ণের সমাধি হইবে, এই আশঙ্কায় সারদামণির রাত্রিকালে নিদ্রা হইত না। এই কারণে তাঁহার নিদ্রার ব্যাঘাত হইতেছে জানিয়া রামকৃষ্ণ নহবত-ঘরে নিজের মাতার নিকটে তাঁহার শয়নের বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছিলেন। এইরূপে এক বৎসর চারি মাস দক্ষিণেশ্বরে থাকিয়া সারদামণি দেবী সম্ভবতঃ ১২৮০ সালের কার্তিক মাসে কামারপুকুরে ফিরিয়া আসেন। 

তখনকার কথা স্মরণ করিয়া সারদামণি দেবী উত্তরকালে স্ত্রী-ভক্ত-দিগকে বলিতেনঃ

‘সে যে কি অপূর্ব দিব্যভাবে থাকতেন, তা বলে বােঝাবার নয়। কখন ভাবের ঘােরে কত কি কথা, কখন হাসি, কখন কান্না, কখন একেবারে সমাধিতে স্থির হয়ে যাওয়া--এই রকম, সমস্ত রাত। সে কি এক আবির্ভাব আবেশ, দেখে ভয়ে আমার সর্বশরীর কাঁপত, আর ভাবতুম, কখন রাতটা পােহাৰে। ভাৰ সমাধির কথা তখন তাে কিছু বুঝি না ; একদিন তাঁর আর সমাধি ভাঙ্গে না দেখে ভয়ে কেঁদে কেটে হৃদয়কে ডেকে পাঠালাম। সে এসে কানে নাম শুনাতে শুনাতে তবে কতক্ষণ পরে তাঁর চৈতন্য হয়। তার পর ঐরপে ভয়ে কষ্ট পাই দেখে তিনি নিজে শিখিয়ে দিলেন-'এই রকম ভাব দেখলে এই বীজ শুনাবে। তখন আর তত ভয় হােত না, ঐ সৰ শুনালেই তাঁর আবার হুঁশ হোত 

সারদামণি দেবী বলিতেন-- 

“এইরুপে প্রদীপে শলতেটি কি ভাবে রাখিতে হইবে, বাড়ির প্রত্যেকে কে কেমন লােক ও কাহার সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করিতে হইবে, অপরের বাড়ি যাইয়া কিরুপ ব্যবহার করিতে হইবে, প্রভৃতি সংসারের সকল কথা হইতে ভজন, কীর্তন, ধ্যান, সমাধি ও ব্রহ্মজ্ঞানের কথা পর্যন্ত সকল বিষয় ঠাকুর তাঁহাকে শিক্ষা দিয়াছেন।” 

কলিকাতা প্রভৃতি স্থান হইতে অনেক ভদ্রমহিলা দক্ষিণেশ্বরে রামকৃষ্ণের দর্শনে আসিয়া নহবতখানায় সমস্ত দিন থাকিতেন। রামকৃষ্ণ ও তাঁহার জননীর জন্য রন্ধন ব্যতীত ইহাদের জন্য রান্নাও সারদামণি করিতেন। কখন কখন বিধবাদেয় জন্য গােবর গঙ্গাজল দিয়া তিনবার উনুনে পাড়িয়া আবার রান্না চড়াইতে হইত। 

একবার পানিহাটির মহােৎসব দেখিতে যাইবার সময় রামকৃষ্ণ জনৈক স্ত্রী ভক্তের দ্বারা সারদামণি দেবীকে জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইলেন, তিনি যাইবেন কি না -“তােমরা তো যাইতেছ, যদি ওর ইচ্ছা হয় তাে চলুক।” সারদামণি দেবী ঐ কথা শুনিয়া বলিলেন, “অনেক লোক সঙ্গে যাইতেছে, সেখানেও অত্যন্ত ভিড় ভিড় হইবে, অত ভিড়ে নৌকা হইতে নামিয়া উৎসব দর্শন করা আমার পক্ষে দুস্কর হইবে, আমি যাইব না।” তাঁহার এই না যাওয়ার সঙ্কল্পের উল্লেখ করিয়া, পরে রামকৃষ্ণ বলিয়াছিলেন, অত ভিড় - তাহার উপর ভাব-সমাধির জন্য আমাকে সকলে লক্ষ্য করিতেছিল ও (সারদামণি) সঙ্গে না যাইয়া ভালই করিয়াছে, ওকে সঙ্গে দেখিলে লােকে বলিত-হংস-হংসী এসেছে। ও খুব বুদ্ধিমতী।” তারপর পত্নীর বুদ্ধির ও নির্লোভিতার দৃষ্টান্তস্বরূপে তিনি বলেন - 

“মাড়ােয়ারী ভক্ত (লছমীনারায়ণ) যখন দশ হাজার টাকা দিতে চাহিল তখন আমার মাথায় যেন করাত বসাইয়া দিল ; মাকে বলিলাম, “মা, এতদিন পরে আবার প্রলােভন দেখাইতে আসিলি।” সেই সময় ওর মন বুঝিবার জন্য ডাকাইয়া বলিলাম-“ওগাে, এই টাকা দীতে চাহিতেছে, আমি লইতে পারিব না বলিয়া তােমার নামে দিতে চাহিতেছে, তুমি উহা লওনা কেন ? কি বল ?” শুনিয়াই ও বলিল, তা কেমন করিয়া হইবে? টাকা লওয়া হইবে না-আমি লইলে, ঐ টাকা তােমারই হইবে। কারণ আমি উহা রাখিলে, তােমার সেবা ও অন্যান্য আবশ্যকে উহা ব্যয় না করিয়া থাকিতে পারি না। সুতরাং ফলে উহা তােমারই গ্রহণ করা হইবে। তােমাকে লােকে ভক্তিশ্রদ্ধা করে তোমার ত্যাগের জনা—-অতএব টাকা কিছুতেই লওয়া হইবে না। ওর ঐ কথা শুনিয়া আমি হাঁপ ফেলিয়া বাঁচি।” 

যাঁহাকে দরিদ্রতাবশতঃ বিপদসঙ্কুল দুই-তিন দিনের পথ পদব্রজে অতিক্রম করিয়া দক্ষিণেশ্বরে যাইতে হইত, ইহা সেইরূপ অবস্থার নারীর নিঃষ্পৃহতার সুবিবেচনারও অন্যতম দৃষ্টান্ত। |

 “সারদামণি দেবী পানিহাটির মহােৎসব দেখিতে না যাওয়ার কারণ সম্বন্ধে বলিয়াছেন--প্রাতে উনি আমাকে যে ভাবে যাইতে বলিয়া পাঠাইলেন তাহাতেই বুঝিতে পারিলাম, উনি মন খুঁলিয়া অনুমতি দিতেছেন না। তাহা হইলে বলিতেন—হাঁ, যাবে বই কি। ঐরূপ না করিয়া উনি ঐ বিষয়ের মীমাংসার ভার যখন আমার উপর ফেলিয়া বলিলেন, “ও ইচ্ছা হয় তাে চলুক', তখন স্থির করিলাম, যাইবার সঙ্কল্প ত্যাগ করাই ভাল।” 

সারদামণি দেবী বাঙালী হিন্দুকুলবধু, সুতরাং সাতিশয় লজ্জাশীলা ছিলেন। দক্ষিণেশ্বরের বাগানে নহবতখানায় তিনি দীর্ঘকাল স্বামীর ও অতিথি অভ্যাগতের সেবায় আত্মনিয়ােগ করিয়াছিলেন, কিন্তু তখন অল্পলােকেই তাহাকে দেখিতে পাইত। রাত্রি তিনটার পর কেহ উঠিবার বহু, পূর্বেই উঠিয়া প্রাতঃকৃত্য স্নানাদি সমাপন করিয়া তিনি যে ঘরে ঢুকিতেন, সমস্ত দিবস আর বাহিরে আসিতেন না, কেহ উঠিবার বহু, পূর্বে নীরবে নিঃশব্দে আশ্চর্য ক্ষিপ্ৰকারিতার সহিত সকল কার্য সম্পন্ন করিয়া পুজা-জপ-ধ্যানে নিযুক্ত হইতেন। অন্ধকার রাত্রে নহবতখানার সম্মুখস্থ বকুলতলার ঘাটের সিঁড়ি বাহিয়া গঙ্গায় অবতরণ করিবার কালে তিনি এক দিবস এক প্রকাণ্ড কুম্ভীরের গাত্রে প্রায় পদার্পণ করিয়া ছিলেন। কুম্ভীর ডাঙ্গায় উঠিয়া সােপানের উপর শয়ন করিয়াছিল। তাঁহার সাড়া পাইয়া জলে লাফাইয়া পড়িল। তদবধি সঙ্গে আলাে না লইয়া তিনি কখন ঘাটে নামিতেন না। এইরূপ স্বভাব ও অভ্যাস সত্ত্বেও স্বামীর কঠিন কণ্ঠ রােগের চিকিৎসার জন্য শ্যামপুকুরে অবস্থানের সময় “এক মহল বাটীতে অপরিচিত পুরুষসকলের মধ্যে সকল প্রকার শারীরিক অসুবিধা সহ্য করিয়া তিনি যে ভাবে নিজ কর্তব্য পালন করিয়াছিলেন, তাহা ভাবিলে বিস্মিত হইতে হয়।” ডাক্তারের উপদেশ মতাে সুপথ্য প্রস্তুত করিবার লােকাভাবে ঠাকুরের রােগবৃদ্ধির সম্ভাবনা হইয়াছে, শুনিবামাত্র সারদামণি দেবী আপনার থাকিবার সুবিধা অসুবিধার কথা কিছুমাত্র চিন্তা না করিয়া শ্যামপুকুরের বাটীতে আসিয়া ঐ ভার সানন্দে গ্রহণ করেন। তিনি সেখানে থাকিয়া সব প্রধান সেবাকার্যের ভার গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি তখনও রাত্রি তিনটার পবে শয্যাত্যাগ করিতেন, এবং রাত্রি এগারটার পর মাত্র দুইটা পর্যন্ত শয়ন করিয়া থাকিতেন। হিন্দকুল বধু, হইলেও তিনি প্রয়ােজন হইলে পূর্বসংস্কার ও অভ্যাসের বাধা অতিক্রম 
করিয়া প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও সাহসের সহিত যথাযথ আচরণে কতদূর সমর্থা ছিলেন তাহার দৃষ্টান্ত-স্বরপে একটি ঘটনার বিবরণ দিতেছি। 

স্বল্পব্যয়সাধ্য যানের অভাব, অর্থাভাব প্রভৃতি নানা কারণে সেকালে সারদামণি দেবী অনেক সময় জয়রামবাটী ও কামারপুকুর হইতে দক্ষিণেশ্বরে হাঁটিয়া আসিতেন। আসিতে হইলে পথিকগণকে চার-পাঁচ ক্লোশব্যাপী তেলােভােলো ও কৈকলার মাঠ উত্তীর্ণ হইতে হইত। ঐ বিস্তীর্ণ প্রান্তরদ্বয়ে তখন নরহত্যা ডাকাতদের ঘাঁটি ছিল। প্রান্তরের মধ্যভাগে এখনও এক ভীষণ কালীমূর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। এই তেলোভেলোর ডাকাতে-কালীর পূজা করিয়া ডাকাতরা নরহত্যা ও দস্যুতায় প্রবৃত্ত হইত। এই কারণে লােকে দলবদ্ধ না হইয়া এই দুইটি প্রান্তর অতিক্রম করিতে সাহসী হইত না।

একবার রামকৃষ্ণের এক ভাইপাে ও ভাইঝি এবং অপর কয়েকটি স্ত্রীলােক ও পুরুষের সহিত সারদামণি দেবী পদব্রজে কামারপুকুর হইতে দক্ষিণেশ্বরে আগমন করিতেছিলেন। আরামবাগে পেীঁছিয়া তেলাভেলাে ও কৈকলার প্রান্তর সন্ধ্যার পবে পার হইবার যথেষ্ট সময় আছে ভাবিয়া তাঁহার সঙ্গিগণ ঐ স্থানে অবস্থান ও রাত্রিযাপনে অনিচ্ছা প্রকাশ করিতে লাগিল। পথশ্রমে ক্লান্ত থাকিলেও সারদামণি দেবী আপত্তি না করিয়া তাঁহাদের সহিত অগ্রসর হইলেন। তাহারা বরাবর আগাইয়া গিয়া তাহার জন্য অপেক্ষা করিয়া, তিনি নিকটে আসিলে আবার চলিতে লাগিলেন। শেষবার তাঁহারা বলিলেন, এইরূপে চলিলে এক প্রহর রাত্রির মধ্যেও প্রান্তর পার হইতে পারা যাইবে না এবং সকলকে ডাকাতের হাতে পড়িতে হইবে। এতগুলি লােকের অসুবিধা ও আশঙ্কার কারণ হইয়াছেন দেখিয়া তিনি তখন তাঁহাদিগকে তাঁহার নিমিত্ত পথিমধ্যে অপেক্ষা করিতে নিষেধ করিয়া বলিলেন, “তোমরা একেবারে তারকেশ্বরের চটিতে পৌঁছে বিশ্রাম করগে, আমি যত শীঘ্র পারি তােমাদের সঙ্গে মিলিত হচ্ছি।” তাহাতে সঙ্গীরা বেলা বেশী নাই দেখিয়া জোরে হাঁটতে লাগিল ও শীঘ্র দৃষ্টির বহিভূত হইল। সারদামণি দেবীও ক্লান্তি সত্ত্বেও যথাসাধ্য দ্রুত চলিতে লাগিলেন, কিন্তু প্রান্তরমধ্যে পৌছিবার কিছু; পরেই সন্ধ্যা হইল। বিষম চিন্তিত হইয়া তিনি কি করিবেন ভাবিতেছেন, এমন সময় দেখিলেন দীর্ঘাকার ঘােরতর কৃষ্ণবর্ণ এক পুরুষ লাঠি কাঁধে লইয়া তাঁহার দিকে আসিতেছে। তাহার পিছনেও তাহার সঙ্গীর মতাে কে যেন একজন আসিতেছে মনে হইল। পলায়ন বা চীৎকার বৃথা বুঝিয়া তিনি স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই লোকটা তাঁহার কাছে আসিয়া ককশস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “কে গা এসময়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছ ?” সারদামণি বলিলেন, “বাবা, আমার সঙ্গীরা আমাকে ফেলে গেছে, আমিও বােধ হয় পথ ভুলেছি ; তুমি আমাকে সঙ্গে করে যদি তাঁহাদের নিকট পৌঁছিয়ে দাও। তােমার জামাই দক্ষিণেশ্বরে রানী রাসমণির কালীবাড়িতে থাকেন। আমি তাঁহার নিকট যাচ্ছি। তুমি যদি সেখান পর্যন্ত আমাকে নিয়ে যাও তা হলে তিনি তােমার খুব আদরযত্ন করবেন।” এই কথাগুলি বলিতে না বলিতে পিছনের দ্বিতীয় লােকটিও তথায় আসিয়া পৌঁছিল এবং সারদামণি দেবী দেখিলেন সে লােকটি পুরুষটির পত্নী। তাহাকে দেখিয়া বিশেষ আশ্বস্ত হইয়া তিনি তাঁহায় হাত ধরিয়া তাহাকে বলিলেন, “মা, আমি তােমার মেয়ে সারদা, সঙ্গীরা ফেলে যাওয়ায় বিষম বিপদে পড়েছিলাম ; ভাগ্য বাবা ও তুমি এসে পড়লে, নইলে কি করতাম বলতে পারি নে।” 

সারদামণির এইরূপ নিঃসংঙ্কোচ সরল ব্যবহার, একান্ত বিশ্বাস ও মিষ্ট কথায় বাগদী পাইক ও তাহার স্ত্রীর প্রাণ একেবারে গলিয়া গেল। তাহারা সামাজিক আচার ও জাতির পার্থক্য ভুলিয়া সত্যসতাই তাঁহাকে আপনার কন্যার ন্যায় দেখিয়া তাঁহাকে খুব সান্তনা দিতে লাগিল এবং তিনি ক্লান্ত বলিয়া আর তাঁহাকে অগ্রসর হইতে না দিয়া নিকটস্থ গ্রামের এক দোকানে লইয়া গিয়া রাখিল। রমণী নিজ বস্ত্রাদি বিছাইয়া তাঁহার জন্য বিছানা করিয়া দিল এবং পুরুষটি দোকান হইতে মুড়ি-মুড়কি কিনিয়া তাহাকে খাইতে দিল। এইরূপে পিতামাতার ন্যায় আদর ও স্নেহে তাঁহাকে ঘুম পাড়াইয়া ও রক্ষা করিয়া তাহারা রাত কাটাইল এবং ভােরে উঠিয়া তাহাকে সঙ্গে লইয়া তারকেশ্বরে পেীঁছিল। সেখানে এক দোকানে তাঁহাকে রাখিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিল। বাগদিনী তাহার স্বামীকে বলিল, “আমার মেয়ে কাল কিছুই খেতে পায় নি, বাবা তারকনাথের পূজা শীঘ্র সেরে বাজার হতে মাছ তরকারি নিয়ে এস ; আজ তাকে ভাল করে খাওয়াতে হবে।” 

বাগদী পুরুষটি ঐসব করিবার জন্য চলিয়া গেলে সারদামণি দেবীর সঙ্গী ও সঙ্গিনীগণ তাঁহাকে খুজিতে খুঁজিতে সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং তিনি নিরাপদে পৌঁছিয়াছেন দেখিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিল। তখন তিনি তাঁহার রাত্রে আশ্রয়দাতা বাগদী পিতামাতার সহিত তাঁহাদের পরিচয় করাইয়া দিয়া বলিলেন, “এরা এসে আমাকে রক্ষা না করলে কাল রাত্রে যে কি করতুম, বলতে পারি না।” 

তাহার পর সকলে আবার পথ চলা আরম্ভ করিবার জন্য প্রস্তুত হইলে সারদামণি দেবী ঐ পুরুষ ও রমণীকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাইয়া বিদায় প্রার্থনা করিলেন। তিনি বলিয়াছেন -

“এক রাত্রের মধ্যে আমরা পরস্পরকে এতদূর আপনার করিয়া লইয়াছিলাম যে, বিদায়গ্রহণকালে ব্যাকুল হইয়া অজস্র ক্রন্দন করিতে লাগিলাম। অবশেষে সুবিধামত দক্ষিণেশ্বরে আমাকে দেখতে আসিতে পুনঃ পুনঃ অনুরোধপুর্বক ঐকথা স্বীকার করাইয়া লইয়া অতিকষ্টে তাহাদিগকে ছাড়িয়া আসিলাম। আসিবার কালে তাহারা অনেক দূর পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে আসিয়াছিল এবং রমণী পাশ্ববর্তী ক্ষেত্র হইতে কতকগুলি কড়াইশুটি তুলিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে আমার অঞ্চলে বাঁধিয়া কাতর কন্ঠে বলিয়াছিল, মা সারদা রাত্রে যখন মুড়ি খাবি তখন ঐগুলি দিয়ে খাস। পুবোক্ত অঙ্গীকার তাহারা রক্ষা করিয়াছিল। নানাবিধ দ্রব্য লইয়া আমাকে দেখিতে মধ্যে মধ্যে কয়েকবার দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল। উনিও আমার নিকট হইতে সকল কথা শুনিয়া ঐ সময়ে তাহাদিগের সহিত জামাতার ন্যায় ব্যবহার ও আদর আপ্যায়নে তাহাদিগকে পরিতৃপ্ত করিয়াছিলেন। এমন সরল ও সচ্চরিত্র হলেও আমার ডাকাত বাবা পূর্বে কখন কখন ডাকাইতি যে করিয়াছিল, একথা কিন্তু আমার মনে হয়।”

১২৯৩ সালের ৩১শে শ্রাবণ পরমহংসদেব দেহত্যাগ করেন। তখন সারদামণি দেবীর বয়স ৩৩ বৎসর। আমি শুনিয়াছিলাম, স্বামীর তিরােভাবে সারদামণি দেবী বিধবার বেশ ধারণ করেন নাই। ইহা সত্য কিনা জানিবার জন্য পরমহংসদেবের ও সারদামণি দেবীর একজন ভক্তকে চিঠি লিখিয়াছিলাম। তিনি উত্তর দিয়াছেন : 

“শ্রীশ্রীমৎ পরমহংসদেবের দেহরক্ষার সময় মা হাতের বালা খুলিতে গেলে শ্রীশ্রীপরমহংসদেবকে জীবিত অবস্থায় রােগহীন শরীরে যেমন দেখিয়াছিলেন, সেই মূর্তিতে আসিয়া মার হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন---আমি কি মরিয়াছি যে তুমি এয়ােস্ত্রীর জিনিস হাত হইতে খুলিতেছ ? এই কথার পর মা আর কখন শুধু, হাতে থাকেন নাই--পরিধান লাল নরুন-পেড়ে কাপড় এবং হাতে বালা ছিল।” 

আত্মার অমরত্বে এইরুপ বিশ্বাস সকলের থাকিলে সংসারে অনেক দুঃখ পাপ তাপ দুর্গতি দূর হয়।

স্বামীর তিরােভাবে পর সারদামণি দেবী ৩৪ বৎসর বাঁচিয়া ছিলেন। তিনি ১৩২৭ সালের ৪ঠা শ্রাবণ ৬৭ বৎসর বয়সে পরলােকগমন করেন। তার পরবর্তী ভাদ্রমাসের উদ্বোধন’ পত্রে তাঁহার ব্রত, ত্যাগ, নিষ্ঠা, সংযম, সকলের প্রতি সমান ভালবাসা, সেবাপরায়ণতা, দিবারাত্র অক্লান্তভাবে কর্মনুষ্ঠান ও নিজ শরীরের সুখদুঃখের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীনতা, তাঁহার সরলতা, নিরভিমানিতা, সহিষ্ণুতা, দয়া, ক্ষমা, সহানুভূতি ও নিঃস্বার্থপরতা প্রভৃতি গুণ কীর্তিত হইয়াছিল। তাঁহার স্বামীর ও তাঁহার ভক্তেরা তাঁহাকে মাতৃসম্বোধন করিতেন এবং এখনও মা বলিয়াই তাঁহার উল্লেখ করেন। এই মাতৃসম্বোধন সার্থক হউক। 

[ সারদামণি দেবীর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত-রচনা আমার পক্ষে নানা কারণে সহজ হয় নাই। তাঁহাকে প্রণাম করিবার ও তাঁহার সহিত পরিচিত হইবার সৌভাগ্য আমার কখনও না হওয়ায় তাঁহার সম্বন্ধে আমার সাক্ষাৎ কোন জ্ঞান নাই। পুস্তক ও পত্রিকা হইতে আমাকে তাঁহার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করিতে হইয়াছে। কিন্তু তাহা হইতেও যথেষ্ট সাহায্য পাই নাই। ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ’ আমার প্রধান অবলম্বন। ছােট অক্ষরে যাহা ছাপা হইয়াছে, তাহা ছাড়া অন্য অনেক স্থলেও ঐ পুস্তকের ভাষা পর্যন্ত গৃহীত হইয়াছে। উদ্বোধন’ হইতেও অল্প সাহায্য পাইয়াছি। ইহার দুটি প্রবন্ধে ভক্তি-উচ্ছ্বসিত ভাষায় তাঁহার নানা গুণের বন্দনা আছে। যে-সকল কথায়, কাজে, ঘটনায়, আখ্যায়িকায় ঐ সকল গুণ প্রকাশ পাইয়াছিল, তাহা কিছু কিছু লিখিত হইলে ভাল হয়। যাহাতে মানুষের অন্তরের পরিচয় পাওয়া যায় এমন কোনও কথা, কাজ, ঘটনা, আখ্যায়িকা তুচ্ছ নহে। কাহারও জীবন্ত ছবি মানুষের নিকট উপস্থিত করিতে হইলে এগুলি আবশ্যক। ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ’ ব্যতীত সারদামণি দেবীর যে-সকল ফটোগ্রাফ হইতে ছবি প্রস্তুত করাইয়াছি, সেইগুলির এবং কয়েকটি সংবাদের জন্যও আমি ব্রহ্মচারী গণেন্দ্রনাথের নিকট ঋণী। তাঁহাকে তজ্জন্য কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি।

{ প্রবাসী, বৈশাখ, ১৩৩১) 

শ্রীরামানন্দ চট্টোপাধ্যায় 

শ্রীশ্রীমায়ের সহিত শ্রীমতী ৺সরযু বালা 

প্রথম দর্শন-১৩১৭ 
কলিকাতা পটলডাঙার বাসায় শুক্রবার সকালে শ্রীমান - ব’লে গেল, কাল শনিবার মায়ের শ্রীচরণদর্শন করতে যাব; আপনি তৈরী হয়ে থাকবেন।" কাল তবে মায়ের দর্শন পাব! সারা রাত আমার ঘুমই এল না। আজ ১৩১৭ সন, প্রায় চৌদ্দ-পনর বৎসর হয়ে গেল কলিকাতায় আছি, এত কাল পরে মায়ের দয়া হ’ল কি? এত দিনে কি সুযােগ মিলল? পরদিন বৈকালে গাড়ি করে সুমতিকে ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয় হতে নিয়ে শ্রীশ্রীমায়ের শ্রীচরণদর্শন করতে চললুম। কি আকুল আগ্রহে গিয়েছিল, তা ব্যক্ত করার ভাষা জানি না। গিয়ে দেখি মা বাগবাজারে তাঁর বাড়িতে ঠাকুরঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এক পা চৌকাঠের উপর, অপর পা পাপােশখানির ওধারে ; মাথায় কাপড় নেই, বাঁ হাত খানি উচু করে দরজার উপর রেখেছেন, ডান হাতখানি নীচুতে, গায়েরও অধাংশে কাপড় নেই, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। গিয়ে প্রণাম করতেই পরিচয় নিলেন। সুমতি বললে, “আমার দিদি।” সে পূর্বে কয়দিন গিয়েছিল; তখন মা একবার আমার দিকে চেয়ে বললেন, “এই দেখ মা, এদের নিয়ে কি বিপদে পড়েছি। ভাই-এর বউ, ভাইঝি, রাধু, সব জ্বরে পড়ে। কে দেখে, কে কাছে বসে, ঠিক নেই। বস, আমি কাপড় কেচে আসি।” আমরা বসলুম। কাপড় কেচে এসে দুই হাত ভরে জিলিপি-প্রসাদ এনে দিয়ে বললেন, “বৌমাকে (সুমতি) দাও, তুমিও নাও।” সুমতিকে শীঘ্র স্কুলে ফিরতে হবে, তাই সে দিন একটু পরেই প্রণাম করে বিদায় নিলাম। মা বললেন, “আবার এস।” এই পাঁচ মিনিটের জন্য দেখা, আশা মিটল না! অতৃপ্ত প্রাণে বাসায় ফিরলাম। 
৩০শে মাঘ, ১৩১৭
শ্রীশ্রীমা সে দিন বলরামবাবুর বাড়ি গিয়েছিলেন। আমি তার বাগবাজারের বাড়িতে গিয়ে একটু অপেক্ষা করতেই মা ফিরলেন। প্রণাম করে উঠতেই হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কার সঙ্গে এসেছ?” 

আমি বললুম, “আমার এক ভাগ্নের সঙ্গে।” 

মা , { আছ ? বৌমা ভাল আছে? এত দিন আস নি-ভাবছিলুম অসুখ করল না কি। 
বিস্মিত হয়ে ভাবলুম একদিন মাত্র পাঁচ মিনিটের দেখা, তাতে মা আমাদের কথা মনে করেছেন ! ভেবে আনন্দে চোখে জলও এল। 

মা -  (আমার পানে সস্নেহে চেয়ে) তুমি এসেছ, তাই ওখানে (বলরাম বাবুর বাড়িতে বসে আমার মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। 

আমি একেবারে অবাক হয়ে গেলুম ! 

মায়ের একটি শিশু ভাইপাের (ক্ষুদের) জন্য সুমতি দুটি পশমের টুপি দিয়েছিল ; মাকে উহা দিতে এই সামান্য জিনিসের জন্য কতই খুশী হলেন। তক্তাপােশের উপর বসে বললেন, “ব’স এখানে, আমার কাছে।” পাশেই বসলুম, মা আদর করে বললেন, “তােমাকে যেন মা, আরও কত দেখেছি -- যেন কত দিনের জানাশােনা।” 

আমি বললুম, “কি জানি, মা, এক দিন তাে কেবল পাঁচ মিনিটের জন্য এসেছিলাম।” 

মা হাসতে লাগলেন ও আমাদের দুই বােনের অনুরাগ-ভক্তির অনেক প্রশংসা করলেন। আমরা কিন্তু ঐ সকল কথার কতদূর যােগ্য তা জানি না। ক্রমে ক্রমে অনেক শ্রী-ভক্ত আসতে লাগলেন। ভক্তি-বিগলিত চিত্তে সকলেই মায়ের হাসিমাখা স্নেহভরা মুখখানির পানে একদৃষ্টে চেয়ে আছেন, ওরূপ দৃশ্য আমি আর কখনও দেখিনি। মুগ্ধ হয়ে তাই দেখছি, এমন সময় বাসায় ফিরবার অগিদ এল-গাড়ি এসেছে। মা তখন উঠে প্রসাদ দিয়ে ‘খাও খাও’ করে একেবারে মুখের কাছে ধরলেন। অত লােকের মধ্যে একলা অমন করে খেতে আমার লজ্জা হচ্ছে দেখে বললেন, “লজ্জা কি ? নাও।” তখন হাত পেতে নিলুম। “তবে আসি, মা,” বলে প্রণাম করে বিদায় নেবার সময় বললেন, “এস মা, এস, আবার এস। একলা নেমে যেতে পারবে তাে ? আমি আসব ?” এই বলে সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি পর্যন্ত এলেন। তখন আমি বললাম, “আমি যেতে পারব মা। আপনি আর আসবেন না।” মা তাই শুনে বললেন, “আচ্ছা, একদিন সকালে এস।” পরিপূর্ণ প্রাণে ফিরলুম। ভাবলুম—এ কি অদ্ভুত স্নেহ। 

বৈশাখ-সংক্রান্তি ১৩১৮ 

আজ গিয়ে প্রণাম করতেই মা বললেন, “এসেছ মা, আমি মনে করছি কি হল গাে, কেন আসে না। এতদিন আসনি কেন?”

আমি বললুম, “এখানে ছিলুম না, মা, বাপের বাড়ি গিয়েছিলাম।” 

মা - বৌমা (সুমতি) আসে না কেন? পড়াশুনার চাপে ? 

আমি - না, ভগ্নীপতি এখানে ছিলেন না। 

মা - তা, ও তো ইস্কুলে যাচ্ছে । আচ্ছা, ওরা সংসার ধর্ম করে তো ? 

আমি বললুম, “কাকে বলে সংসার, কাকে বলে ধর্ম, তা কি জানি মা-~ আপনিই জানেন।” মা একটু হাসলেন। 

মা ‘কি গরম পড়েছে!’ বলে বাতাস খেতে পাখাখানা হাতে দিয়ে বললেন, “আহা, দুটো ভাত খেয়েই ছুটে আসছ—এখন আমার কাছে একটু শোও।” 

মাকে নীচে মাদুর পেতে দিয়েছে। তাঁর বিছানায় শুতে সঙ্কুচিত হচ্ছি দেখে বললেন, “তাতে কি মা, শােও, আমি বলছি শােও।” অগত্যা শুলুম। মার একটু তন্দ্রা আসছে দেখে চুপ করে আছি এমন সময় দুই-একটি স্ত্রী-ভক্ত এবং শেষে দু’জন সন্ন্যাসিনী এলেন। একজন প্রৌঢ়া, অপরটি যুবতী। মা চোখ বুজেই বলছেন, “কে গাে, গৌরদাসী এলে?” 

যুবতী বললেন, “আপনি কি করে জানলেন, মা?” 

মা বললেন, “টের পেয়েছি। কিছুক্ষণ পরে উঠে বসলেন। 

যুবতী বললেন, “বেলুড় মঠে গিয়েছিলাম। প্রেমানন্দ স্বামীজী খুব খাইয়ে দিয়েছেন, তিনি থাকলে তাে না খেয়ে ফিরবার উপায় নেই।” যুবতী সিন্দুর পরেন নি দেখে মা তাঁকে একটু বকলেন। 

পরে শ্রীশ্রীমায়ের কাছে আমার পরিচয় নিয়ে গৌরীমা একদিন তাঁদের আশ্রমে আমাকে যেতে বলে বললেন, “সেখানে প্রায় ৫০l৬০ জন মেয়েকে শিক্ষা দেওয়া হয়। তুমি সেলাই জান?” আমি সামান্য কিছু জানি বলাতে তিনি তাঁর আশ্রমের মেয়েদের তাই শিখিয়ে আসতে বললেন। 

মায়ের আদেশ নিয়ে গৌরীমার আশ্রমে একদিন গেলুম। তিনি খুব স্নেহ যত্ন করলেন এবং প্রত্যহ দুই এক ঘণ্টা করে এসে মেয়েদের পড়িয়ে যেতে অনুরোধ করলেন। আমি বললাম, এই সামান্য শিক্ষা নিয়ে শিক্ষয়িত্রী হওয়া যায় না। ক, খ পড়তে বলেন তাে পারি।” গৌরীমা কিন্তু একেবারে নাছোড়। অগত্যা স্বীকৃত হয়ে আসতে হল। 

একদিন স্কুলের ছুটি হলে গৌরীমার আশ্রম হতে মায়ের শ্রীচরণদর্শন করতে গেলুম। গ্রীষ্মকাল। সেদিন একটু পরিশ্রান্তও হয়েছিলুম। দেখি, মা একঘর শী-ভক্তের মধ্যে বসে আছেন। আমি গিয়ে প্রণাম করতেই মূখপানে চেয়ে মশারির উপর হতে তাড়াতাড়ি পাখাখানি নিয়ে আমায় বাতাস করতে লাগলেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন, “শীগগির গায়ের জামা খুলে ফেল, গায়ে হাওয়া লাগুক।” কি অপূর্ব স্নেহ-ভালবাসা ! অত লােকের মধ্যে এত আদর-যত্ন ! আমার ভারি লজ্জা করতে লাগল—সবাই চেয়ে দেখছিল ; মা নিতান্ত ব্যস্ত হয়েছেন দেখে জামা খুলতেই হল। আমি যত বলি, “পাখা আমাকে দিন, আমি বাতাস খাচ্ছি,” ততই স্নেহভরে বলতে লাগলেন, “তা হােক, হােক; একটু ঠাণ্ডা হয়ে নাও!” তারপর প্রসাদ ও এক গ্লাস জল এনে খাইয়ে তবে শান্ত হলেন। স্কুলের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তাই দু-একটি কথা কয়েই সেদিন ফিরতে হল। 
১৮ই শ্রাবণ, ১৩১৮ 

আজ সকালে কিছু জিনিসপত্র নিয়ে দীক্ষা নেবার আকাঙক্ষায় গেলাম। কি কি দ্রব্যের দরকার হয়, তা গৌরীমার নিকট জেনে তাঁকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলুম। মায়ের বাড়ি গিয়ে দেখি -  মা তদগতচিত্তে ঠাকুরপুজা করছেন, আমরা যাবার একটু পরে চেয়ে ইঙ্গিতে বসতে বললেন। পূজাশেষ হ'লে গৌরীমা আমার দীক্ষার কথা বললেন। পূর্বে মার সঙ্গে একদিন আমারও ঐ বিষয়ে কথা হয়েছিল। মর্তমান কলা নিয়ে গেছি, মা দেখে বললেন, “এই যে মর্তমান কলা এনেছ। { একজন সাধুর নাম করে) সে কলা খেতে চেয়েছিল, বেশ করেছ।” পরে বললেন, “ঐ আসনখানা নিয়ে আমার বাঁ দিকে এসে বস।” 

আমি বললুম “গঙ্গাস্নান তাে করা হয় নি।” 

মা - তা হােক। কাপড়চোপড় তাে ছেড়ে এসেছ ?” 

কাছে বসলুম। বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করতে লাগল। মা তখন ঘর হতে সবাইকে বেরিয়ে যেতে বললেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “স্বপ্নে কি পেয়েছ ব’ল।” 

আমি বললুম, “লিখে দেব, না মুখে বলব?” 

মা - মুখেই ব’ল। 

দীক্ষার শেষ সময় শ্রীশ্রীমা স্বপ্নে প্রাপ্ত মন্ত্রের অর্থ বলে দিলেন। বললেন, “আগে ঐটি জপ করবে।” পরে তিনি আর একটি বলে দিয়ে বললেন, “শেষে এইটি জপ ও ধ্যান করবে।” 

মন্ত্রটির অর্থ বলবার পূর্বে মাকে কয়েক মিনিটের জন্য ধ্যানস্থ হতে দেখে ছিলুম। মন্ত্র দেবার সময় আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল এবং কেন বলতে পারি না, কাঁদতে লাগলুম। মা কপালে বড় করে একটা রক্ত-চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিলেন। দক্ষিণা ও ঠাকুরের ভােগের জন্য কিছু টাকা দিলুম। শ্রীশ্রীমা পরে গােলাপ-মাকে ডেকে ভােগের টাকা তাঁর হাতে দিলেন। 

দীক্ষার সময় মাকে খুব গম্ভীর দেখলুম। পরে পূজার আসন হতে মা উঠে গেলেন। আমাকে বললেন, “তুমি খানিক ধ্যান, জপ ও প্রার্থনা কর।” আমি ঐরূপ করবার পরে উঠে মাকে প্রণাম করতেই মা আশীর্বাদ করলেন “ভক্তি লাভ হােক।” মনে মনে মাকে বললুম, “দেখাে মা, তােমার কথা মনে রেখো, ফাঁকি দিও না যেন।” 

শ্ৰীশ্ৰীমা এইবার গঙ্গাস্নানে যাবেন -গােলাপ-মা সঙ্গে। আমিও মায়ের কাপড়-গামছা নিয়ে সঙ্গে গেলুম। স্নানের জন্য মা গঙ্গায় নেমেছেন, এমন সময় অল্প অল্প বৃষ্টি আরম্ভ হল। স্নান করে উঠে ঘাটের পাণ্ডা-ব্রাহ্মণকে একটি কলা, একটি আম ও একটি পয়সা দিয়ে মা বললেন, ‘ফল আমি দিলুম বটে, কিন্তু দানের ফল তােমার।” হায়! পাণ্ডাঠাকুর, জান না কার হাতের দান আজ পেলে! আর কত বড় কথা শুনলে! কোটি কামনায় জড়িত মানুষ আমরা ঐ দেববাণীর মর্ম কি বুঝব ! 

আমার কাছ থেকে কাপড়খানি নিয়ে, পরে ভিজে কাপড়খানি আমার হাতে দিয়ে মা বললেন, “চল।” গােলাপ-মা আগে, মা মাঝে, আমি পেছনে চললুম। ছােট একটি ঘটিতে গঙ্গাজল নিয়ে মা রাস্তার ধারে প্রতি বটবৃক্ষে জল দিয়ে প্রণাম করে যেতে লাগলেন। মা তখন রাজার ঘাটে স্নান করতেন। কারণ নূতন, ঘাট (দূর্গাচরণ মুখার্জীর ঘাট) তখনও হয়নি। গােলাপ-মা ছােট একটি ঘড়ায় গঙ্গাজল নিয়ে এসেছিলেন, বাড়িতে ফিরে উহা ঠাকুরঘরে রাখতে গেলেন। নীচের কলতলায় চৌবাচ্চার কাছে একটা ঘটিতে জল ছিল, মা তাই দিয়ে পা ধুয়ে আমায় বললেন, “কাদা লেগেছে, ধুয়ে এস।” আমি জল খুঁজছি দেখে বললেন, “ঐ ঘটির জলেই ধােও না।” 

আমি বললুম, “আপনি যে ও জল ছুঁয়েছেন। 

মা - আগে একটু মাথায় দিয়ে নাও, তা হলেই হবে। 

আমার কিন্তু মন সরল নয়, বললুম “তা কি হয় ? আমি আর একটা পাত্র এনে চৌবাচ্চা হতে জল নিয়ে পা ধুয়ে নিলুম। মা ততক্ষণ আমার জন্য দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর উপরে গিয়ে ঠাকুরের প্রসাদ দু’খানি শালপাতায় সাজিয়ে নিজে একখানি নিলেন এবং আমাকে একখানি দিয়ে কাছে বসে খেতে বললেন। আমি প্রসাদ পাবার পবে মায়ের চরণামৃত পাবার আকাঙ্ক্ষা জানাতে মা বললেন, “তবে জালা হতে একটু কলের জল নিয়ে এস” এবং আমি উহা আনলে পাত্রটি আমাকে হাতে করে ধরে রাখতে বলে নিজে বাম ও দক্ষিণ পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ জলে দিয়ে কি বলতে লাগলেন—বুঝতে পারলুম না, শুধু; ঠোঁট নড়তে দেখলুম। শেষে বললেন, “নাও এখন।” আমি নিজেকে কৃতার্থ জ্ঞান করে উহা পান করলাম। তারপর খেতে খেতে প্রত্যেক জিনিসটি নিজে এক একটু খেয়ে আমার পাতে দিতে লাগলেন।

ক্রমে অনেকগুলি স্ত্রী-ভক্তের আগমন হ’ল। কাউকেই চিনি না। শুনলুম —তাঁরা সকলেই এখানে প্রসাদ পাবেন। ঠাকুরের ভােগের পর আমরা সকলে প্রসাদ পেতে বসলুম। মাও তাঁর নিদিষ্ট আসনে এসে বসলেন। তিনবার অন্ন মুখে দিয়ে মা আমাকে ডাকলেন এবং আমার হাতে প্রসাদ দিলেন। প্রসাদ গ্রহণ করলুম। কি যে একটি সুগন্ধ পেলুম এখনও সে কথা ভাবলে অবাক হই। তারপর একে একে সকলের পাতেই মার প্রসাদ বিতরিত হল। গােলাপ মা সকলকে দিয়ে শেষে নিজে খেতে বসলেন। মা এইবার খুব হাসিখুশি গল্প সল্প করতে করতে খেতে লাগলেন। তাই দেখে আমি হাঁফ ছেড়ে বাচলুম। দীক্ষার সময় হতে এতক্ষণ পর্যন্ত তাঁকে যেন আর এক মা মনে হচ্ছিল। সে কি গম্ভীর, অন্তর্মুখী নিগ্রহানুগ্রহসমর্থী দেবীমূর্তি ! ভয়ে জড়সড় হয়েছিলুম। পরে কত লােককে দীক্ষা দিতে দেখেছি, দু-চার মিনিটেই হয়ে গেছে, কিন্তু সেরূপ গম্ভীর ভাব তাঁর আর কখন দেখিনি। কতজনকে হাসতে হাসতে দাঁড়িয়ে বা বসে দীক্ষা দিয়েছেন। তারা খুশি হয়ে তখনই তৃপ্ত হয়ে চলে গেছে। কৌতুহলাক্রান্ত হয়ে কাউকে বা জিজ্ঞাসাই করে ফেলেছি, “দীক্ষার সময় মায়ের কেমন রুপ দেখলেন ?” একটি বিধবা স্ত্রী-ভক্ত আমার ঐ প্রশ্নে বলেছিলেন, “এই এনিই।” আমি পূর্বে কুলগুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলুম-পরে মায়ের কথা শুনে এখানে দীক্ষা নিতে এসেছি। পূর্বে কুলগুরু, যেটি দিয়েছেন, মা আমাকে সেটি রােজ প্রথমে দশবার জপ করে নিতে বললেন-পরে নিজে যেটি দিয়েছেন সেটি দিয়ে ঠাকুরকে দেখিয়ে বললেন, “উনি গুরু; (অন্য এক মূর্তি দেখিয়ে) আর ইনি ইষ্ট’, আর এই বলে প্রার্থনা করতে বললেন যে ‘ঠাকুর, আমার পূর্বজন্মের, ইহজন্মের কুকর্মের ভার তুমি নাও’ ইত্যাদি। আমার কি হয়েছে বলুন তাে, যখনই জপ করতে বসি, আধ ঘণ্টার বেশী জপ করতে পারি নে, কে যেন ঠেলা দিয়ে তুলে দেয়। আপনাদের এমন হয় ? ভাবি মার কাছে কত কথা বলি—কিছুই বলতে পারি নে। আপনারা তো বেশ মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। মা কি আমাকে ফাঁকি দিলেন ?” আমি কিন্তু অত কথা জানতে চাইনি, স্ত্রীলােকটির প্রায় প্রৌঢ়াবস্থা-সরল ভাবেই নিজেই বলে যাচ্ছেন। আমি বললুম, “যা আপনার ইচ্ছা হবে মায়ের কাছে বলুন না, দু-চার দিন বলতে বলতে সহজ হয়ে আসবে। আমরাও প্রথম প্রথম অত কথা বলতে পারিনি। এখনও এক এক সময় এমন গম্ভীরভাব ধারণ করেন, কাছেই এগুনাে যায় না।” 

বেলা পড়ে আসতে সমাগত ভক্ত-মহিলাগণ শ্রীশ্রীমাকে প্রণাম করে একে একে বিদায় নিতে লাগলেন, কেহ বা আরতি দেখে যাবেন বললেন। শ্রীশ্রীমা কাপড় কেচে এসে ঠাকুরের বৈকালী ভােগ দিয়ে প্রত্যেককে প্রসাদ দিলেন। 

ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে এল। মা রাধু, মাকু প্রভৃতিকে ঠাকুরঘরে এসে জপ করতে বসতে বললেন। তারা আসতে বিলম্ব করায় মা অসন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, “সন্ধ্যার সময় এখন এসে সব জপ টপ করবে, না কোথায় কি করছে দেখ।” একটু পরে তারা এসে জপ করতে বসল। 

পূজনীয় গােলাপ-মা, যোগীন-মা প্রভৃতি এসে সন্ধ্যাকালে ভক্তিভরে শ্রীশ্রীমায়ের পদধুলি গ্রহণ করলেন, মা তাঁদের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। কারও বা চিবুক স্পর্শ করে চুমাে খেলেন, আবার হাতজোড় করে নমস্কারও করলেন। তারপর ঠাকুরপ্রণাম করে একখানি আসন পেতে জপে বসলেন। সন্ধ্যারতির উদ্যোগ হচ্ছে, শ্ৰীশ্ৰীমা কিছুক্ষণ পরে জপ শেষ করে উঠলেন। বাসা হতে একটি ছেলে নিতে এসেছে, মায়ের কাছে বিদায় নিতে গিয়ে বললুম, “মা, কই সেদিনকার সেই কাপড়খানি তাে পরলেন না?” 

মা বললেন, “তাই তাে মা, তখন মনে করে দিলে কই ?” প্রণাম করে বাসায় ফিরলাম। 

স্কুলের কাজের জন্য শীঘ্র আর মায়ের কাছে যেতে সময় পাইনি। অনেক দিন পরে আজ আবার মায়ের পদপ্রান্তে গিয়ে বসতেই মা কত আনন্দ করতে লাগলেন। ভূদেব মহাভারত পড়ছিল। ছেলেমানুষ, পড়তে দেরি হচ্ছিল, মাকে এখন শীঘ্র উঠতে হবে, কারণ প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এল। সেজন্য তিনি ভুদেবকে বললেন, “একে দে, এ জলের মতাে পড়ে দেবে এখন, এ অধ্যায় শেষ না করে তাে উঠতে পারব না।" মায়ের আদেশে মহাভারত পড়তে বসলুম। এর পূর্বে আর কখনও মায়ের কাছে পড়িনি। কেমন লজ্জা লজ্জা করতে লাগল। যা হােক, কোন প্রকারে অধ্যায় শেষ হ’ল। মহাভারতকে মা হাতজোড় করে প্রণাম করে উঠে পড়লেন এবং আমরা সকলে ঠাকুরঘরে আরতি দেখতে গেলুম। মা নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে জপে বসলেন। 

জপান্তে হরিবােল হরিবােল করে উঠে ঠাকুরপ্রণাম করে সকলকে প্রসাদ দিলেন। কথায় কথায় কর্মের কথা উঠল। মা বললেন, “সর্বদা কাজ করতে হয়। কাজে দেহ-মন ভাল থাকে। আমি যখন আগে জয়রামবাটী ছিলাম, দিনরাত কাজ করতুম। কোথাও কারাে বাড়ি যেতুম না। গেলেই লোকে বলত, ‘ও মা, শ্যামার মেয়ের ক্ষ্যাপা জামাই-এর সঙ্গে বে হয়েছে। ঐ কথা শুনতে হবে বলে কোনখানে যেতুম না। একবার সেখানে আমার কি অসুখই করেছিল -কিছুতেই সারে না। শেষে মা সিংহবাহিনীর দুয়ারে হত্যে দিয়ে তবে সারে। বড় জাগ্রত দেবতা, সেখানকার মাটি কৌটায় করে রেখেছি। নিজে খাই এবং রাধুকে রােজ সেই মাটি একটু করে খেতে দিই।”

মায়ের বাড়ির সামনের মাঠে নানা দেশের কতকগুলাে স্ত্রী-পুরুষ বাস করে। নানা প্রকার কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। তার মধ্যে একজনের উপপত্নী ছিল, উভয়ে একতেই বাস করত। ঐ উপপত্নীর কঠিন পীড়া হয়েছিল। মা ঐকথার উল্লেখ করে বললেন, “কি সেবাটাই করেছে মা, এমন দেখিনি। একেই বলে সেবা, একেই বলে টান।” এই বলে ঐরূপে তার সেবার কতই সুখ্যাতি করতে লাগলেন। উপপত্নীর সেবা! আমরা উহা দেখলে ঘৃণায় নাসিকা কুঞ্চিত করতুম, সন্দেহ নাই। মন্দের মধ্য হতেও ভালটুকু যে নিতে হয়, তা কি আমরা জানি !

সামনের মাঠের ঘর হতে একটি দরিদ্রা হিন্দুস্থানী নারী তার রুগ্ন শিশুকে কোলে করে মায়ের আশীর্বাদ নিতে এসেছে। তার প্রতি মায়ের কি দয়া ! আশীর্বাদ করলেন, “ভাল হবে।” তারপর দুটো বেদানা ও কতকগুলো আঙুর ঠাকুরকে দেখিয়ে এনে তাকে দিতে বললেন। আমি মায়ের হাতে ঐগুলাে এনে দিলে মা সেই নিঃস্ব রমণীটিকে দিয়ে বললেন, “তােমার রোগা ছেলেকে খেতে দিও।” আহা! সে কতই খুশি হয়ে যে গেল! বারবার মাকে প্রণাম করতে লাগল।

১৩১৮-পটলডাঙার বাসা হতে বৈকালে গিয়েছি। মায়ের ঘরে গিয়ে বসতেই গােলাপ-মা এসে আমাকে বললেন, একটি সন্ন্যাসিনী গুরুর দেনাশোধ করতে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে কাশী হতে এসেছেন। তােমাকে কিছু দিতে হবে।” আমি সানন্দে স্বীকৃত হলুম। মা হেসে বললেন, “আমাকে ধরেছিল। আমি কি কারো কাছে টাকা চাইতে পারি মা? বললুম থাকো, হয়ে যাবে। গােলাপ-মা বললেন, “হাঁ, মা আমার শেষে হিল্লে { উপায়) করে দিয়েছেন।” মা আস্তে চুপি চুপি আমাকে বলছেন, “গােলাপ তিনখানা গিনি দিয়েছে।” 

খানিক পরে সেই সন্ন্যাসিনী এলেন। তিনি বলরামবাবুর বাড়ি গিয়ে ছিলেন। সেখানে ভক্তেরা তাঁকে যাঁর যা সাধ্য কিছু কিছু দিয়েছেন। শুনলুম, সন্ন্যাসিনী হবার পূর্বে তার বৃহৎ সংসার ও সাত ছেলে ছিল, তারাই এখন কৃতী হয়ে সকল বিষয়ের ভার নিতে তিনি সংসার ত্যাগ করে চলে এসেছেন। 

সন্ন্যাসিনী - গুরু নিন্দা করতে নেই, বলে। 

তারপর তিনি প্রণাম করে বলছেন, “বড় মােকদ্দমাপ্রিয় ছিলেন—এখন বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। আর পারেন না। ওদিকে পাওনাদার ডিক্রী পেয়ে ধরতে চায়। কি করি, তাই তাঁর জন্যে ভিক্ষায় বেরিয়েছি।” 

এই কথা শুনে শ্রীশ্রীমা একটি শ্লোক বললেন, শ্লোকটি মনে পড়ছে না। তবে ভাবটি এই - উচিত কথা গুরুকেও বলা যায়, তাতে পাপ হয় না। 

মা আরও বললেন, “তবে গুরুভক্তি থাকা চাই। গুরু, যেমনই হােক, তাঁর প্রতি ভক্তিতেই মুক্তি। ঠাকুরের শিষ্য-ভক্তদের কি ভক্তি দেখ দেখি। এই গুরুভক্তির জন্যে ওরা গুরুবংশের সকলকে ভক্তি তাে করেই, গুরুর দেশের বিড়ালটাকে পর্যন্ত মান্য করে।” 

সন্ন্যাসিনী রাত তিনটা হতে বেলা আটটা পর্যন্ত জপধ্যান করেন। সেই জন্য একখানি ধােয়া কাপড় চাইলেন ; মা ভুদেবের একখানি কাপড় দিতে বললেন। সন্ন্যাসিনী আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি রাতে থাকবে? থাক তাে তােমায় কিছু শিক্ষা দিতে পারি।” মনে মনে ভাবলুম, আমাদের মার কাছে আবার আপনি কি শিখাবেন! কিন্তু প্রকাশ্যে বললুম, “না, আমার থাকা হবে না।” 

আমার গাড়ি এসেছে। সন্ধ্যারতি হ’তে শ্রীশ্রীমাকে প্রণাম করে বিদায় নিলুম। 

২৮শে মাঘ, ১৩১৮ 
আজ মায়ের কাছে গিয়ে প্রণাম করে বসতেই মা আক্ষেপ করে বললেন, “আহা, গিরিশবাবু মারা গেছেন-আজ চারদিন, চতুর্থীর কাজ, আমায় নিতে এসেছিল। সে নেই আর কি সেখানে যেতে ইচ্ছা করে ? আহা, একটা ইন্দ্রপাত হয়ে গেল! কি ভক্তি-বিশ্বাসই ছিল। গিরিশ ঘােষের সে কথা শুনেছ ? ঠাকুরকে পুত্রভাবে চেয়েছিল। ঠাকুর তাতে বলেছিলেন, হাঁ, বয়ে গেছে আমার তাের ছেলে হয়ে জন্মাতে। তা কে জানে মা, ঠাকুরের শরীর যাবার কিছুকাল পরে গিরিশের এমন একটি ছেলে হ’ল, চার বছর হয়েও কারাে সঙ্গে কথা বলে নি। হাবভাবে সব জানাত। ওরা তাে তাকে ঠাকুরের মতাে সেবা করত। তার কাপড় জামা, খাবার জন্য রেকাব, বাটি, গেলাস, সমস্ত জিনিসপত্র নূতন করে দিলে—সে সব আর কাউকে ব্যবহার করতে দিত না। গিরিশ বলত, ঠাকুরই এসেছেন। তা ভক্তের আবদার, কে জানে, মা। একদিন আমাকে দেখবার জন্যে এমন অস্থির হ’ল যে, আমি উপরে যেখানে ছিলুম— সকলকে টেনে টেনে সেই দিকে উ-উ করে দেখিয়ে দিতে লাগল। প্রথমে কেউ বােঝেনি। শেষে বুঝতে পেরে আমার কাছে নিয়ে গেল, তখন ঐটুকু ছেলে, আমার পায়ের তলায় পড়ে প্রণাম করলে। তারপর নীচে নেমে গিরিশকে ধরে টানাটানি আমার কাছে নিয়ে আসবে বলে। সে তাে হাউহাউ করে কাঁদে আর বলে, ‘ওরে, আমি মাকে দেখতে যাব কি—আমি যে মহাপাপী।’ ছেলে কিন্তু কিছুতেই ছাড়ে না। তখন ছেলে কোলে করে কাঁপতে কাঁপতে, দু’চক্ষে জলধারা, এসে একেবারে আমার পায়ের তলায় সাষ্টাঙ্গ হয়ে পড়ে বললে, “মা, এ হতেই তােমার শ্রীচরণ-দর্শন হ’ল আমার। ছেলেটি কিন্তু, মা, চার বছরেই মারা গেল। 

মা তখন বরানগর কুটীঘাটায় সৌরীন্দ্রমােহন ঠাকুরের ভাড়াটে বাড়িতে ছিলেন 

“এর আগে একদিন গিরিশ ও তার পরিবার তাদের বাড়ির ছাদে উঠেছিল। আমি তখন বলরামবাবুর বাড়িতে, বিকেল বেলা ছাদে গেছি। গিরিশের ছাদ হতে তাকালে যে দেখা যায়, সেটা আমি লক্ষ্য করিনি। পরে তার পরিবারের কাছে শুনলাম, সে গিরিশকে বলেছিল, 'ঐ দেখ, মা ওবাড়ির ছাদে বেড়াচ্ছেন। গিরিশ ঐ কথা শুনে অমনি তাড়াতাড়ি পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে বলেছিল - না না, আমার পাপ-নেত্র, এমন ক'রে লুকিয়ে মাকে দেখব না। এই বলে নীচে নেমে গিছিল।” 

১লা আষাঢ়, ১৩১৯ 

বেলা প্রায় চারটা, শ্রীশ্রীমা অনেক স্বী-ভক্তসঙ্গে বসে আছেন। আমার পরিচিতার মধ্যে তাঁদের ভিতরে আছেন মাস্টার মহাশয়ের স্ত্রী, ডাক্তার দুর্গাপদ বাবুর স্ত্রী, গৌরীমা ও তাঁর পালিতা কন্যা যাঁকে আমি দুর্গাদিদি বলে ডাকি এবং বরেনবাবুর পিসী। আর যাঁরা আছেন, তাঁদের চিনি না। মা হাসিমুখে সকলের সঙ্গে কথা কচ্ছেন। আমাকে দেখে বললেন, “এই যে এস মা, ব’স।” আমি গৌরীমাকে দিয়ে নীচে অফিস ঘর হতে নিবেদিতা’ ও ‘ভারতে বিবেকানন্দ বই দুখানি আনলুম। আমার ইচ্ছা মা ‘নিবেদিতা বইখানির কিছু শুনেন। মাও বই দেখে বলছেন, “ওখানি কি বই গা?” আমি বললুম-“নিবেদিত’। মা বললেন, “পড় তাে মা, একটু শুনি। সেদিন আমাকেও একখানি ঐ বই দিয়ে গিয়েছে, এখনও শোনা হয়নি। যদিও অত লােকের মধ্যে পড়তে লজ্জা করতে লাগল, তথাপি নিবেদিতার সম্বন্ধে সরলাবালা কেমন সুন্দর লিখেছেন, তা মাকে শােনাবার আগ্রহে ও মায়ের আদেশে পড়তে আরম্ভ করলুম। শ্রীশ্রীমা ও সমবেতা স্ত্রী-ভক্তেরা সাগ্রহে শুনতে লাগলেন। নিবেদিতার ভক্তির কথা পড়তে সকলেরই চোখ অশ্রসিক্ত হয়ে উঠল। দেখলাম, মায়ের চোখ দিয়েও তা গড়িয়ে পড়ছে। ঐ প্রসঙ্গে বলতে লাগলেন, “আহা নিবেদিতার কি ভক্তিই ছিল। আমার জন্যে যে কি করবে ভেবে পেত না! রাত্রিতে যখন আমায় দেখতে আসত, আমার চোখে আলো লেগে কষ্ট হবে বলে একখানি কাগজ দিয়ে ঘরের আলােটি আড়াল করে দিত। প্রণাম করে নিজের রুমাল দিয়ে কত সন্তর্পণে আমার পায়ের ধূলাে নিত। দেখতুম, যেন পায়ে হাত দিয়েও সঙ্কুচিত হচ্ছে।” কথাগুলি বলেই মা নিবেদিতার কথা ভেবে স্থির হয়ে রইলেন। তখন উপস্থিত সকলেও নিবেদিতার কথা যা জানতেন বলতে লাগলেন। দুর্গাদিদি বললেন, ভারতের দুর্ভাগ্য যে তিনি এত অল্পদিনে চলে গেলেন।” অপর একজন বললেন, “তিনি যেন ভারতেরই ছিলেন। নিজেও তাই বলতেন। সরস্বতীপূজার দিন খালি পায়ে হােমের ফোঁটা কপালে দিয়ে বেড়াতেন।” পুস্তকপড়া শেষ হ’ল। শ্রীশ্রীমা তখনও মাঝে মাঝে নিবেদিতার জন্য আক্ষেপ করতে লাগলেন। শেষে বললেন, “যে হয় সুপ্রাণী, তার জন্য কাঁদে মহাপ্রাণী (অন্তরাত্মা) , জান মা?”

এইবার মা কাপড় কেচে এসে ঠাকুরের বৈকালী ভােগ দিতে বসলেন। ইতঃপূর্বে কোন সময়ে স্বহস্তে অনেকগুলি ফুলের মালা গেঁথে বৈকালে পরিয়ে দিবেন বলে ঠাকুরের সামনে রেখেছিলেন। ব্রহ্মচারী রাসবিহারী ঐগুলাের নিকটেই ভােগের জন্য রসগােল্লা এনে রেখে গেছেন। তার রস গড়িয়ে ফুলের মালাতে লেগে ডেয়ো পিঁপড়ে ধরেছে। মা হাসতে হাসতে বলছেন, “এইবার ঠাকুরকে পিঁপড়েয় কামড়াবে গাে! ও রাসবিহারী, এ কি করেছ?” এই বলে সযত্নে পিঁপড়ে ছাড়িয়ে ঠাকুরকে পরিয়ে দিলেন। মা ঐরূপে সকলের সামনে নিজের স্বামীকে মালা পরিয়ে সাজিয়ে দিচ্ছেন দেখে রাধুর মা মুখ টিপে টিপে হাসতে লাগলেন। শ্রীশ্রীমা উপস্থিত সকলকে প্রসাদ দিতে গৌরীমাকে বললেন এবং সকলে প্রসাদ পেলেন। 

একজন স্ত্রী-ভক্ত বললেন, “আমার পাঁচটি মেয়ে, মা, বে’ দিতে পারিনি, বড়ই ভাবনায় আছি।” 

শ্ৰীশ্ৰীমা - “বে’ দিতে না পার, এত ভাবনা করে কি হবে? নিবেদিতার স্কুলে রেখে দাও। লেখাপড়া শিখবে, বেশ থাকবে।” 

ঐ কথা শুনে আর একজন স্ত্রী-ভক্ত বললেন, “মায়ের উপর যদি তোমার ভক্তি-বিশ্বাস থাকে, তাহলে ঐ কর, ভাল হবে। মা যখন বলছেন তখন আর ভাবনা কি ?” বলা বাহুল্য মেয়ের মায়ের এ-সব কথা মনে ধরল না। 

অপর একজন বললেন, “এখন ছেলে পাওয়া কঠিন, ছেলে আবার বে’ করতেই চায় না।” 

শ্রীশ্রীমা - ছেলেদের এখন জ্ঞান হচ্ছে, সংসার যে অনিত্য তা তার বুঝতে পারছে। সংসারে যত লিপ্ত না হওয়া যায় ততই ভাল। 

একে একে অনেকেই শ্রীশ্রীমাকে প্রণাম করে বিদায় নিলেন। সন্ধ্যা হয়েছে, পুজনীয়া যোগীন-মা এসে শ্রীশ্রীমাকে প্রণাম করে ঠাকুরের সন্ধ্যারতি করতে বসলেন। মা রাস্তার ধারের বারান্ডায় বসে জপধ্যান করছিলেন। পরে তিনি উঠে আসতে অপর স্ত্রী-ভক্তেরা সকলে প্রণাম করে বিদায়গ্রহণ করলেন। 

সকলে চলে যেতে মাকে একা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, “মা স্ত্রী-লােকদের অশুচি অবস্থায় ঠাকুরকে পূজো করা চলে কি?” 

শ্রীশ্রীমা বললেন, “হ্যাঁ মা, চলে - যদি ঠাকুরের উপর তেমন টান থাকে। এ কথা আমিও ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেছিলুম। ঠাকুর বলেছিলেন, “যদি পূজো না করার জন্যে তােমার মনে খুব কষ্ট হয় তাহলে করবে, তাতে দোষ নেই। নতুবা করো না। তা তুমি পূজো করাে, কিন্তু মনে কোন দ্বিধা এলে করাে না।” সকলকেই যে মা ঐরূপ করতে বলতেন, তা নয়। কারণ দিন কয়েক পরে ঠিক এই একই অবস্থার আর একটি স্ত্রী-ভক্তকে বলেছিলেন, এই অবস্থায় কি ঠাকুর-দেবতার কাজ করতে হয়? তা করাে না।” ঐরূপে মা লােকের মানসিক অবস্থা দেখে কাকে কখন কি বলতেন, তা অনেক সময় বুঝা দুষ্কর হয়ে পড়ে। 

অনেক রাত হয়েছে। এখনও আমাকে নিতে আসেনি। গােলাপ-মা ডেকে জিজ্ঞাসা করাতে নীচে হ’তে কে বললেন, “আমরা বলে দিয়েছি-গৌরীমার সঙ্গে চলে গেছেন বােধ হয়।” শুনে আমি মাকে বলেছি, না আসে, আজ থাকাই যাবে।” 

মা বললেন, “সে তাে কোন ভাবনা নেই, কিন্তু আজ পয়লা - অগস্ত্যযাত্রা, আজ বাড়ি হতে যাত্রা করে এসে কোথাও থাকতে নেই।” 

মনে ভাবলুম - এমন স্থানে যদি অগস্ত্যযাত্রা হয়, সে তাে ভালই। 

রাত্রে ঠাকুরের ভােগের পর সকলে প্রসাদ পেতে বসলেন। মা আমাকে বৈকালে অনেক প্রসাদ দিয়েছিলেন, সেজন্য আমি পুনরায় এখন প্রসাদ পেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করায় গােলাপ-মা বললেন, “কেন গাে, আমাদের বাড়ি এসে উপােস করে থাকবে কেন ?” 

মা বললেন, “না না, দুখানি খাবি বৈকি।” - বলে নিজে একখানি রেকাবিতে চারখানা লুচি, তরকারি, মিষ্টি প্রভৃতি এনে দিলেন। রাত তখন প্রায় এগারােটা; এই সময় শ্রীমান বিনােদ আমাকে নিতে এল, সে গৌরীমার আশ্রমে গিয়ে আমাকে না পেয়ে পুনরায় এসেছে। নীচে সাধু - বম্ভ্রচারিগণ অনেকেই শয়ন করেছেন। মাকে প্রণাম করে বিদায় নিতে বললেন, “থাকা হল না গাে, তা আর একদিন এসে থেকো।” 

আস্তে আস্তে অতি সন্তর্পণে নেমে আসছি, শুনছি—পুজনীয় শরৎ মহারাজ বলছেন, “সাবধানে সিৎড়িতে নামিয়ে নিয়ো, বিনােদ, রাত হয়েছে।” তিনি নীচের বৈঠকখানা ঘরে শুয়েছেন। বাসায় ফিরতে রাত বারটা হয়েছিল। 

আর একদিন গিয়ে দেখে শ্রীশ্রীমা দ্বিপ্রহরের আহারান্তে বিশ্রাম করছেন। আদেশ মতাে তাঁর কাছে শুয়ে বাতাস করছি, এমন সময়ে তিনি সহসা আপন মনেই বলছেন, “তাই তো মা, তােমরা সব এসেছ, তিনি (ঠাকুর) এখন কোথায় ?” শুনে বললুম, “এ জন্মে তাে তাঁর দর্শন পেলুমইনা। কোন জন্মে পাব কি-না তা তিনিই জানেন। আপনার যে দর্শন পেয়ে গেছি—এই আমাদের পরম সৌভাগ্য।” শ্রীশ্রীমা বললেন, “তা বটে।” ভাবতে লাগলুম, কি ভাগ্য যে এ কথাটি স্বীকার করলেন। সব সময়ই তাে দেখি নিজের কথা চেপে যান।

মায়ের কাছে কত লােকের কত রকমের গােপনীয় কথা যে থাকতে পারে - হাবা আমি তা তখন বুঝতে পারতুম না। জানবই বা কেমন করে - মার কাছে তখন অল্পদিন মাত্র যাচ্ছি বই তাে নয়। সেজন্য মার বাড়িতে পৌঁছে তাঁকে দেখতে না পেলে আসবার অপেক্ষা না করে খুঁজে খুঁজে যেখানে তিনি আছেন সেইখানে গিয়ে দেখা করতুম। একদিন বিকালবেলা বেশ সুশ্রী দুটি বৌ মাকে তাঁর ঘরের উত্তরের বারান্ডায় নিয়ে গিয়ে গােপনে কি বলছেন। এমন সময় আমি মাকে দেখতে একেবারে সেইখানে গিয়ে হাজির। শুনতে পেলুম মা তাঁদের বলছেন, “ঠাকুরের কাছে মনের কথা জানিয়ে প্রার্থনা করবে। প্রাণের ব্যথা কেঁদে বলবে—দেখবে তিনি একেবারে কোলে বসিয়ে দেবেন।” বুঝতে বাকি রইল না, বৌ দু’টি মার কাছে সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। আমাকে দেখে তাঁরা লজ্জিত হলেন, আমিও ততােধিক। আমার কিন্তু খুব শিক্ষা হয়ে গেল। মনে মনে স্থির করলাম, আর কখনও সাড়া না দিয়ে মাকে অমন করে দেখতে যাব না। কয়েক মাস পরে মার বাড়িতে বৌ দুটির সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল এবং বুঝেছিলাম তাঁরা উভয়েই সন্তানসম্ভবা হয়েছেন।  

গৌরীমা এসেছেন। তাঁকে একটু ঠাকুরের কথা বলতে অনুরােধ করায় তিনি বললেন, “আমি ঠাকুরের কাছে অনেক আগে গিয়েছিলাম। তারপরে আর সকলে আসতে লাগলেন। এই নরেন, কালী এদের ছোট দেখেছি। বেলা বেশী নেই দেখে আর অধিক কথা হল না। মাকে প্রণাম করে গৌরীমা বিদায় নিলেন।

আমাকে যেতে হবে। মাকে প্রণাম করে বিদায় চাইতে মা বারান্ডায় ডেকে এনে প্ৰসাদ দিলেন ; বলতে লাগলেন, “তবে এস মা। আমার সব ছেলেমেয়ে গুলাে আসে, আবার একে একে চলে যায়। একদিন সকাল সাতটায় এসাে। এখানে প্রসাদ পাবে। 
রথযাত্রা, ৩১শে আষাঢ় ১৩১৯ 

আজ প্রাতে সাতটায় গৌরীমার আশ্রমে গিয়েছিলুম, তিনি প্রসাদ পাবার নিমন্ত্রণ করেছিলেন। ইচ্ছা ছিল, ওখান হতে সকাল সকাল শ্রীশ্রীমায়ের নিকট যাব। কিন্তু সুযােগ হয়ে উঠল না। ঠাকুরের ভােগ ও ভক্তসেবা সাঙ্গ হতে প্রায় দুটো বেজে গেল। চারটার সময় গৌরীমাকে নিয়ে মায়ের কাছে গেলাম, তখন মা বৈকালের ভােগ দিতে বসেছিলেন। ভােগ দিয়ে উঠলে প্রথমে গৌরীমা, পরে আমি মাকে প্রণাম করলাম। গৌরীমা তাঁকে একটু নিভৃতে নিয়ে গেলেন এবং কি কথাবার্তার পর আমাকে ডাকলেন। মার জন্য একখানি গরদ নিয়ে এসেছিলুম। উহা পদপ্রান্তে রেখে প্রণাম করে বললুম, “মা, এখানি পরবেন।” মা হেসে বললেন, “হাঁ, পরবাে বই কি।” গৌরীমা আমাকে স্নেহভরে প্রশংসা করতে লাগলেন। মাও তাতে একটু যােগ দিলেন। ঠাকুরঘরে মাষ্টারমশায়ের স্ত্রী ও কন্যা এবং অন্যান্য স্ত্রী-ভক্তও অনেকে আছেন। সকলকে চিনি না। মাস্টারমশায়ের মেয়ে ও স্ত্রীর সহিত কিছুক্ষণ আলাপ করার পর পুুরুষ-ভক্তেরা মাকে প্রণাম করতে আসছেন শুনে আমরা সকলে বারান্ডায় গেলাম। একটি ভক্ত কতকগুলাে প্রস্ফুটিত গোলাপ, জবা, এক ছড়া সুন্দর জুই ফুলের গােড়ে এবং ফল ও মিষ্টি এনেছিলেন। মায়ের পদপ্রান্তে ঐ সব রেখে চরণপূজা করতে লাগলেন। সে এক সুন্দর দৃশ্য ! মা সহাস্যমুখে স্থির হয়ে বসে - গলায় ভক্ত প্রদত্ত মালা, শ্রীচরণে জবা ও গােলাপ। পূজাশেষে ভক্তটি ফল মিষ্টি প্রত্যেক জিনিস হতে কিছু কিছু নিয়ে মাকে প্রসাদ করে দিতে প্রার্থনা করলেন। গৌরীমা তাই শুনে হাসতে হাসতে বললেন, “শক্ত ভক্তের পাল্লায় পড়েছ মা, এখন খাও।” মাও তাতে হাসতে হাসতে “অত না, অত না--অত খেতে পারব না” বলে একটু খেয়ে ভক্তের হাতে দিতে লাগলেন; ভক্তটি প্রত্যেক দ্রব্য মাথায় ঠেকিয়ে নিয়ে অনির্বচনীয় আনন্দে উল্লসিত হয়ে প্রণাম করে বিদায় নিলেন। মা তখন নিজের গলার ফুলের মালাটি গৌরীমার গলায় পরিয়ে দিলেন। পদে নিবেদিত ফুলগলি ভক্তেরা নিয়ে গিয়েছিলেন। 

ভুদেব রথ তৈরী করেছে। ঠাকুর রথে উঠবেন, সেই আয়ােজন হচ্ছিল। গৌরীমার আশ্রমে বিশেষ কাজ ছিল, তাই তিনি তাড়াতাড়ি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমি সিঁড়ি পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে গিয়ে পুনরায় মায়ের কাছে ফিরে গেলুম। 

কথায় কথায় গৌরীমার কথা উঠল। মা বললেন, “আশ্রমের মেয়েদের ও বড় সেবা করে - অসুখ-বিসুখ হলে নিজের হাতে তাদের গু-মুত পরিষ্কার করে। সংসারে ওর ও-সব তাে আর বড় একটা করা হয়নি, ঠাকুর যে সবই করিয়ে নেবেন - এই শেষ জন্ম কি-না!”

এইবার পাশের ঘরে ঠাকুর রথে উঠলেন। মা তক্তাপােশে বসে অনিমেষ নয়নে তাঁকে দেখতে দেখতে কত যে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন। পরে ভুদেব ও ভক্তেরা মিলে রথ ঠাকুরকে ধরে তুলে নীচে নিয়ে গেলেন এবং রাস্তায়, গঙ্গার ধারে রথ টেনে সন্ধ্যার পর আবার ঘরে আনলেন। এইবার স্ত্রী-ভক্তেরা উপরের ঘরের ভিতর রথ টানলেন। তারপর মা, রাধু, নলিনী দিদি ও আমি টানলুম। যে কেউ আসতে লাগল তাকেই মা আনন্দ করে রথের কথা বলতে লাগলেন। ভক্ত-মহিলারা প্রসাদ নিয়ে একে একে চলে গেলেন। পরে রাত্রির ভােগ-আরতি হতে মা নিজেই একখানি থালায় করে প্রসাদ এনে আমাকে দিলেন। 
সেদিন বাসায় ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে এগারটা হয়ে গিয়েছিল। 

যখন সামনের রাস্তায় রথ টানা হচ্ছিল, মা বলেছিলেন, “সকলে তো জগন্নাথ যেতে পারে না। যারা এখানে ( ঠাকুরকে রথে) দর্শন করলে, তাদেরও হবে।”

রাধাষ্টমী, ২রা আশ্বিন, ১৩১৯ 

গৌরীমার আশ্রমের স্কুলের কার্যে ব্যস্ত থাকায় মায়ের নিকট আর ইচ্ছানুসারে আজকাল যাওয়া হয়ে ওঠে না। রাধাষ্টমীর দিন অবসর পেয়ে গিয়ে দেখি, মা গঙ্গাস্নানে যাবেন বলে পাশের ঘরে তেল মাখছেন। লােকে বলে, তেল মাখলে প্রণাম করতে নেই এবং মানবদেহ ধারণ করলে জগজ্জননীও মানব-রীতির বশীভূত হয়ে চলেন, তাই প্রণাম করলুম না। আমাকে দেখেই মা বললেন, “এস মা, এস, সকালে এসেছ - বেশ করেছ। আজ রাধাষ্টমী দিনও ভাল, বস, আমি স্নান করে আসি।” আমি তাঁর সঙ্গে গঙ্গায় যাব বলায় মা বললেন, “তবে এস।” কিন্তু অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছিল বলে গােলাপ-মা আমাকে কিছুতেই যেতে দিলেন না। মাও তখন গােলাপ-মার মতে মত দিয়ে বললেন, “তবে থাক, মা, আমি এখনি আসছি।” কাজেই রইলুম। ঐরূপ প্রায়ই দেখতে পেতুম-সরলা বধূটির মতাে মা কারও কথার উপর জোর করে কিছু বলতেন না। যা হােক, রাস্তায় মা বেরুতেই জল ধরে গেল। মা তাই বাড়ি ফিরে এসেই আমাকে বললেন, “বেরুতেই জল ধরে গেল দেখে আমি ভাবলুম, আহা, তুমি আসতে চেয়েছিলে, এলে বেশ হত, গঙ্গাদর্শন করে যেতে।” সত্যি কথা বলতে কি, আমি গঙ্গাদর্শনের জন্য যত না হােক, মার সঙ্গে যাবার আকাক্ষাতেই যেতে চেয়ে ছিলুম। কারণ, সংসারে নানা বাধাবিঘ্নের জন্য মার কাছে তাে আসাই হয় না, সেজন্য ভাগ্যক্রমে যে দিন আসা ঘটে, সে দিন আর ইচ্ছা হয় না যে এক মুহূর্তও মাকে চোখের আড়াল করি। গােলাপ-মা মায়ের কথা শুনে বললেন, “নাই বা গেছে, তােমার পা ছুঁলেই সব হবে।” আমিও তাই বলতেই মা বললেন, “আহা সেকি কথা ! গঙ্গা।” ঐরূপে ব্যবহারে বা কথাবার্তায় মা কখন নিজের মহত্ত্বের কথা প্রকাশ করতেন না-অপর সকলের ন্যায় তিনিও একজন সামান্য মানুষ এইরুপই বলতেন এবং দেখাতেন। তবে এও দেখেছি, অন্য কেহ কাছে না থাকলে কখন কখন কার কারও প্রতি কৃপায় তাঁর অসীম মহিমান্বিত জগন্মাতার ভাব প্রকাশ পেত। ঘরে এসেই তক্তাপােশখানির উপর বসে আমাকে বললেন, “বেশ, গঙ্গাস্নান করেও এসেছি।” বুঝলুম যে তাঁর পাদপদ্ম পূজা করব মনে করে এসেছি তা টের পেয়েছেন। মনে মনে বললুম--নিত্যশুদ্ধা তুমি মা, তােমার আবার গঙ্গাস্নান ! তাড়াতাড়ি ফুল চন্দনাদি নিয়ে পদতলে বসতেই বললেন, “তুলসীপাতা থাকে যদি তাে পায়ে দিও না।” পূজাশেষ হলে প্রণাম করে উঠলুম। মা এইবার জল খেতে বসলেন। সেই অপূর্ব স্নেহে কাছে নিয়ে বসা এবং প্রত্যেক জিনিসটির অর্ধেক খেয়ে প্রসাদ দেওয়া। আমিও মহানন্দে প্রসাদ পেলুম। শালপাতাখানিতে করে প্রসাদ খাবার সময় সাধু নাগ মহাশয়ের কথা মনে হ’ল। শ্রীশ্রীমাকে বললুম, “মা, শালপাতায় প্রসাদ পেলেই নাগ মহাশয়ের কথা মনে পড়ে?” 

মা বললেন, “আহা, তার কি ভক্তিই ছিল। এই তাে দেখ শুকনাে কটকটে শালপাতা! একি কেউ খেতে পারে? ভক্তির আতিশয্যে প্রসাদ ঠেকেছে বলে পাতাখানা পর্যন্ত খেয়ে ফেললে! আহা, কি প্রেমচক্ষুই ছিল তার। রক্তাভ চোখ, সর্বদাই জল পড়ছে। কঠোর তপস্যায় শরীরখানি শীর্ণ। আহা, আমার কাছে যখন আসত ভাবের আবেগে সিঁড়ি দিয়ে আর উঠতে পারত না, এমনি ( নিজে দেখিয়ে) থরথর করে কাঁপত - এখানে পা দিতে ওখানে পড়ত। তেমন ভক্তি আর কারও দেখলুম না !” 

আমি বললুম, “বইএ পড়েছি, তিনি যখন ডাক্তারী ব্যবসায় ছেড়ে দিয়ে দিনরাত ঠাকুরের ধ্যানে তন্ময় থাকতেন, তখন তাঁর পিতা একদিন বলেছিলেন, ‘এখন আর কি করবি, নেংটা হয়ে ফিরবি আর ব্যাঙ ধরে খাবি!’ উঠানে একটা মরা ব্যাঙ পড়ে আছে দেখে নাগ মহাশয় কাপড়খানি ফেলে দিয়ে উলঙ্গ হয়ে সেই ব্যাঙটা ধরে খেয়ে পিতাকে বলেছিলেন, “আপনার দুই আদেশই পালন করলুম, আপনি আমার খাওয়া-পরার চিন্তা ছেড়ে ইষ্টনাম করুন'।” 

মা - আহা, কি গুরুভক্তি ! কি শুচি-অশুচিতে সমজ্ঞান! আমি আবার বললুম, “অর্ধোদয়-যােগের সময় কলকাতা ছেড়ে নাগ মহাশয় বাড়ি গিয়েছিলেন, তাতে তাঁর পিতা ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, “গঙ্গাস্নান না করে গঙ্গার দেশ থেকে বাড়ি এলি ? কিন্তু যােগের সময় সকলে দেখে, উঠান ভেদ করে জল উঠে সারা উঠান একেবারে ভেসে যাচ্ছে! আর নাগ মহাশয় - ‘এস মা গঙ্গে, এস মা গঙ্গে’ বলে অঞ্জলি পূর্ণ করে সেই জল মাথায় দিচ্ছেন। তাই দেখে পাড়ার সকলে সেই জলে স্নান করতে লাগল। 

মা - হাঁ, তার ভক্তির জোরে অমন সব অদ্ভুতও সম্ভবে। আমি একখানা কাপড় দিয়েছিলাম, তা মাথায় জড়িয়ে রাখত। তার স্ত্রীও খুব ভাল আর ভক্তিমতী। এই সেবার -  আমের সময় এখানে এসেছিল। এখনাে বেঁচে আছে। 

এই সময় অন্য কয়েকজন স্ত্রী-ভক্ত আসায় কথাটা চাপা পড়ে গেল। মা উঠে তাঁদের প্রণাম নিয়ে আমাকে পান সাজতে যেতে বললেন। খানিক পরে আমি দুটো পান এনে মাকে দিলাম। মা পান দুটি হাতে নিয়ে একটি খেয়ে একটি আমাকে খেতে দিলেন। আমি আবার বাকি পানগুলি সাজতে চলে এলুম। মাও অল্পক্ষণ পরে দুটি স্ত্রী-ভক্তের সহিত সেই ঘরে এসে বসলেন। স্ত্রী-ভক্ত দুটিও সাহায্য করায় খুব শীঘ্রই পানসাজা হয়ে গেল। মা ঠাকুরের পানগুলি আলাদা করে আগে তুলে নিলেন এবং ‘আমার মা লক্ষীরা কত শীগগির সেজে ফেললে’ বলে আনন্দপ্রকাশ করতে লাগলেন। 

এইবার মা তেতলায় গােলাপ-মার ঘরে গেলেন। খানিক পরে আমি সেখানে গিয়ে দেখি, মা ঐ ঘরের দরজার চৌকাঠে মাথা রেখে শুয়ে আছেন - কেমন করে ভিতরে যাই। আমাকে দেখে মা বলছেন, “এস, এস, তাতে দোষ নাই।” মার সর্বত্র এইরূপ ভাব, পরে মা মাথা তুললেন। আমি ঘরে গিয়ে কাছে বসে তাকে বাতাস করতে লাগলুম। মা শুয়ে শুয়ে গৌরীমার স্কুলের নানা কথা, আর গাড়িভাড়া এ-সব কথা পাড়লেন। আমি যথাযথ উত্তর দিতে লাগলুম। এই সময়ে সেই স্ত্রী-ভক্ত দুটি সেখানে এলেন। তাঁদের একজন মায়ের চুল শুকিয়ে দিতে দিতে দু-একটি পাকা চুল বেছে আঁচলে বেঁধে রাখতে লাগলেন। বললেন, কবচ করবেন। মা লজ্জিত হয়ে বললেন, “ও কেন, ও কেন ? কত নুড়ােনুড়াে কাঁচা চুল যে ফেলে দিচ্ছি!” মা এইবার উঠে ছাদে একটু রােদে গেলেন। আমরাও সঙ্গে গেলুম এবং একপাশে দাঁড়িয়ে গঙ্গাদর্শন করতে লাগলুম। এমন সময়ে ঘর হতে গােলাপ-মা বলে উঠলেন, “মা তো সকলকে নিয়ে ছাদে গেলেন, এখন কে খাবে, কে না খাবে, তা আমি কি করে জানি ?” ঐ কথা শুনতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে গিয়ে তাঁকে বললুম, “বিধবাটি কেবল খাবেন না।” রোদে অনেকগুলি কাপড় ছিল, মা আমাকে সেগুলি তুলে ঘরে রাখতে বললেন। আমি তুলছি এমন সময়ে মা নীচে ঠাকুরের ভােগ দিতে নামলেন। আমরাও সকলে নীচে ঠাকুরঘরে এলুম ; ভােগ দেওয়া হলে মা আমাকে মেয়েদের খাবার জায়গা করতে বললেন। পরে সকলে প্রসাদ পেতে বসলুম। মা দুই-এক গ্লাস খাবার পরে আমাদের সকলকে প্ৰসাদ দিলেন। ইহার কিছু পরে আরও দুইটি স্ত্রী ভক্ত এসেছিলেন। তন্মধ্যে একজন বৃদ্ধা সধবা ঠাকুরের সময়ের এবং অপরটি তাঁর পুত্রবধূ! বৃদ্ধাটি খেতে খেতে বললেন, “আহা, ঠাকুর আমাদের যে-সব কথা বলে গেছেন, তা কি আমরা পালতে পেরেছি, তা হলে এত ভােগ ভূগবে কে, মা? সংসার সংসার করেই মরছি - ওকাজ হ’ল না, সেকাজ হল না - এই কেবল করছি।” মা তার ঐ কথায় বললেন, “কাজ করা চাই বই কি, কর্ম করতে করতে কর্মের বন্ধন কেটে যায়, তবে নিষ্কাম ভাব আসে। একদণ্ডও কাজ ছেড়ে থাকা উচিত নয়।” 

আহারান্তে মা এখন একটু বিশ্রাম করবেন - খাটের উপর শয়ন করলেন। সকলেই এখন তাঁর একটু সেবা করতে ব্যগ্র। মা কিন্তু সকলকেই বিশ্রাম করতে বললেন; খানিক পরে বাড়িতে কাজ আছে বলে অপর স্ত্রীলােকেরা সব চলে গেলেন। আমি এবং ঠাকুরের সময়কার একটি বিধবা স্ত্রীলােক রইলাম। আমি এখন মার সেবার ভার একাই পেলুম। বিধবাটি মায়ের কাছে বসে তাঁর সংসারের দুঃখের অনেক কথা বলতে লাগলেন, “মা, আপনার কাছে সকল অপরাধের ক্ষমা পাই, কিন্তু ওদের কাছে ক্ষমা নাই” ইত্যাদি। আমি কথাপ্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলুম, “আপনি ঠাকুরকে দেখেছেন ?” 

ও মা, দেখেছি বই কি! তিনি যে আমাদের বাড়িতে আসতেন। মা তখন বৌটির মতােন থাকতেন।”  

আমি বললুম, “ঠাকুরের দুটো কথা বলুন না - শুনি।” তিনি বললেন, ‘আমি না - মা, মাকে বলতে বল।” কিন্তু মা তখন একটু চোখ বুঁজে আছেন দেখে আমি ওকথা বলতে পারলুম না। খানিক পরে মা নিজেই বলছেন, “যে ব্যাকুল হয়ে ডাকবে সেই তাঁর দেখা পাবে। এই সে দিন* একটি ছেলে মারা গেল। আহা, সে কত ভাল ছিল! ঠাকুর তাদের বাড়ি যেতেন। একদিন পরের গচ্ছিত ২০০.০০ টাকা ট্রামে তার পকেট থেকে মারা যায়, বাড়ি এসে দেখে। ব্যাকুল হয়ে গঙ্গার ধারে গিয়ে কাঁদছে -“হায় ঠাকুর, কি করলে তার অবস্থাও তেমন ছিল না যে নিজে ঐ টাকা শােধ করবে। আহা, কাঁদতে কাঁদতে দেখে ঠাকুর তার সামনে এসে বলছেন, “কাঁদছিস কেন? ঐ গঙ্গার ধারে ইট চাপা আছে দ্যাখ।” সে তাড়াতাড়ি উঠে ইটখানা তুলে দেখে — সত্যই একতাড়া নােট! শরতের কাছে এসে সব বললে। শরৎ শুনে বললে, 'তােরা, তাে এখনাে দেখা পাস, আমরা কিন্তু আর পাই নে। ওরা পাবে কি? ওরা তাে দেখে শুনে এখন গ্যাঁট হয়ে বসেছে। যারা ঠাকুরকে দেখেনি, এখন তাদেরই ব্যাকুলতা বেশী। 

“ঠাকুর তখন দক্ষি্ণেশ্বরে, রাখাল টাখাল এরা সব তখন ছােট। একদিন রাখালের বড় খিদে পেয়েছে, ঠাকুরকে বললে। ঠাকুর ঐ কথা শুনে গঙ্গার ধারে গিয়ে ‘ও গৌরদাসী, আয় না, আমার রাখালের যে বড় খিদে পেয়েছে’, বলে চীৎকার করে ডাকতে লাগলেন। তখন দক্ষিণেশ্বরে খাবার পাওয়া যেত না। খানিক পরে গঙ্গায় একখানা নৌকা দেখা গেল। নৌকাখানা ঘাটে লাগতেই তার মধ্য হতে বলরামবাবু, গৌরদাসী প্রভৃতি নামলাে এক গামলা রসগােল্লা 

নিয়ে। ঠাকুর তাে আনন্দে রাখালকে ডাকতে লাগলেন, ‘ওরে, আয় না রে রসগােল্লা এসেছে, খাবি আয়। খিদে পেয়েছে বললি যে। রাখাল তখন রাগ করে বলতে লাগল, ‘আপনি অমন করে সকলের সামনে খিদে পেয়েছে বললেন কেন?’ তিনি বললেন, ‘তাতে কিরে, খিদে পেয়েছে, খাবি তা বলতে দোষ কি?’ তাঁর 
ঐ রকমই স্বভাব ছিল কি-না।” 

এমন সময় ভুদেব স্কুল থেকে জ্বর নিয়ে এল। মা তার জন্য বিছানা করে দিতে বললেন। বিছানা করে দিলুম। মাকে আজ একবার বলরামবাবুর বাড়ি যেতে হবে, রামবাবুর মাকে দেখতে -- কারণ তিনি রক্তামাশয়ে খুব পীড়িতা। তাই তাড়াতাড়ি উঠে বৈকালের কাজকর্ম সেরে নিতে লাগলেন, বললেন, “একবার যেতেই হবে, মাকুর স্কুলের (নিবেদিতা স্কুলের) গাড়ি এলে দাঁড়াতে বােলাে।” ঠাকুরকে বৈকালী ভােগ দিয়ে উঠে আমাকে কিছু প্রসাদ নেব কি-না জিজ্ঞাসা করায় বললুম, “এখন থাক। মা বললেন, “তবে পরে খেয়াে। নলিনী খেতে দিস।” মাকুর গাড়ি আসতেই বললেন, আমি শীগগির ঘুরে আসছি, তুমি বসে থেকো, আমি না এলে যেও না।” মা ও গোলাপ - মা বলরামবাবুর বাড়ি গিয়ে ঘণ্টাখানেক পরে ফিরে এলেন। এদিকে খবর এসেছিল আমাকে নিয়ে যেতে লােক এসেছে। আমি কিন্তু মার ফিরবার অপেক্ষায় ছিলুম। মা এসেই বললেন, “এই যে আছ মা, আমি এই তােমার জন্যে তাড়াতাড়ি আসছি; জল খেয়েছ?” 

“না, মা।” 

“সে কি, নলিনী খেতে দিস নি ? ব'লে গেলুম।” 

নলিনী ( লজ্জিতভাবে ) - মনে ছিল না, এই দিচ্চি। 

মা - না থাক, এখন আর তােকে দিতে হবে না, আমিই দিচ্চি। ( আমার প্রতি) তুমি চেয়ে খাও নি কেন, মা? এ যে নিজের বাড়ি। 

আমি বললুম, “তেমন খিদে পেলে চেয়ে খেতুম বই কি, মা।” 

মা তাড়াতাড়ি নিজেই কিছু প্রসাদী মিষ্টি এনে দিলেন। আমি আনন্দের সহিত খেলুম। “পান দি” বলে সাজা পান আনতে গেলেন। নলিনী দিদি বললেন, “বােগনোতে আর পান সাজা নেই, দেবে কি?” কিন্তু পুনরায় খুঁজতে গিয়ে মা তাতেই দুটি সাজা পান পেয়ে আমার হাতে দিলেন। আমি প্রণাম করে বিদায় চাইতে “এস মা, আবার এস, দূর্গা, দূর্গা” বলে উঠে বললেন, 
“আমি সঙ্গে যাব কি? একলা নেমে যেতে পারবে? রাত হয়েছে।” 

আমি বললুম, “খুব পারব মা, আপনাকে আসতে হবে না।” মা তবু “দূর্গা, দূর্গা” বলতে বলতে সহাস্য মুখে সিঁড়ি পর্যন্ত এসে দাঁড়ালেন ; আমি বললুম, “আর দাঁড়াতে হবে না মা, আমি বেশ যেতে পারব।” 

আর একদিন - সে দিন অক্ষয় তৃতীয়া, পূর্বোক্ত সধবা বৃদ্ধাটি ও তাঁর বন্ধু, স্নান করে এসে পৈতে আর দু-একটি কি ফল মায়ের হাতে দিতে গেলে মা বললেন, ‘আমাকে কেন ? ভুদেবকে দাও।” তার খানিক পরে, কথায় কথায় আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, “আজকের দিনে আমি তােমাদের আশীর্বাদ করছি, তােমাদের মুক্তি লাভ হােক। জন্ম-মৃত্যু বড় যন্ত্রণা, তা যেন তােমাদের আর ভুগতে না হয়।” 

* ৩১শে ভাদ্র ঠাকুরের প্রিয় ভক্ত তেজচন্দ্র মিত্র দেহত্যাগ করিয়াছিলেন। শ্রীশ্রীমা তাহার কথাই বলিতেছেন 
শেষ সপ্তাহ, অশ্বিন, ১৩১৯ 

পূজার ছুটিতে একদিন সকালেই মার কাছে গেলুম। দেখলুম, মা খুব ব্যস্ত। আমাকে বসতে বলে রাঁচি হতে কে ভক্ত এসেছেন তাঁকে ডাকতে বললেন। ভক্তটি অনেক ফল, ফুল, কাপড় ও একছড়া কাপড়ের গােলাপের মালা - দেখতে ঠিক সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলের মতে - নিয়ে উপরে এলেন। মালাটি মাকে গলায় পরতে অনুরােধ করায় মা উহা পরলেন। এমন সময়ে গােলাপ-মা এসে মালার লােহার তার মায়ের গলায় লাগবে বলে ভক্তটিকে বকলেন। ভক্তটিকে অপ্রতিভ হতে দেখে করুণাময়ী মা বললেন, “না না লাগছে না, কাপড়ের উপর পরেছি।” ভক্তটি প্রণাম করে নীচে গেলেন। 

পরে মা ও আমি জলখাবার (প্রসাদ) খেতে বসলুম। আমি কিছু ফল ও খাবার নিয়ে গিয়েছিলুম মাকে দেবার জন্য। উহা তাঁর কাছে আনতেই মা বললেন, “ঠাকুরকে নিবেদন করে নিয়ে এস।” নিয়ে আসতে তা থেকে একটি আঙ্গুর মুখে দিয়ে বললেন, “আহা, বেশ মিষ্টি তাে।” একখানি কাপড় কয়েকদিন পূর্বে দিয়েছিলাম। সেই কাপড়খানিই পরেছিলেন। আমাকে দেখিয়ে বলেন, “এই দেখ গাে, তােমার কাপড় পরে পরে কালাে করেছি।” অবাক হয়ে ভাবলুম - এই অযােগ্য সন্তানের ওপর তােমার এতই কৃপা ও স্নেহ। মা নিজের পাত হতে প্রসাদ তুলে তুলে আমাকে দিতে লাগলেন। আমি হাত পেতে নিচ্ছি, এমন সময় হঠাৎ একবার তাঁর হাতে আমার হাত ঠেকে গেল। আমি বললুম, “মা হাত ধুয়ে ফেলুন। মা হাতে একটু জল দিয়ে বললেন, “এই হয়েছে। এই সময়ে নলিনী দিদি এসে বসলেন, ইতঃপূর্বে কি কারণে যেন তিনি রাগ করেছিলেন। মা তাঁকে তিরস্কার করে বললেন, “মেয়েমানুষের অত রাগ কি ভাল, সহ্য চাই। শৈশবে বাপ-মায়ের কোল, যৌবনে স্বামীর আশ্রয় ছাড়া মেয়েদের আর কেউ ‘আবরুতে’ পারে না। মেয়েলােক বড় খারাপ জাত, ফস করে একটা যদি কেউ বলেই ফেললে গাে! মানুষের তো কথা - বললেই হ’ল। তাই দুঃখকষ্ট সয়েও ( স্বামী বা বাপ-মায়ের কাছে ) থাকতে হয়।” 

একটু পরে রাধু, এসে হাঁটুর কাপড় তুলে বসেছে। আবার মা তাকে ভর্ৎসনা করতে লাগলেন, “ও কি গো, মেয়েলােকের হাঁটুর কাপড় উঠবে কেন?” এই বলে কি একটি শ্লোক বললেন। তার মানে, হাঁটুর কাপড় উঠলেই মেয়েলােক উলঙ্গের সামিল। 

চন্দ্রবাবুর ভগ্নি এসেছেন। কথায় কথায় তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মার গোঁসাই (স্বামী) আছেন ? এ সব বুঝি ছেলে, মেয়ে, বউ ?” 

আমি - কেন, ঠাকুরের কথা শোনেন নি ? তাঁর শিক্ষাই ছিল কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ। 

তিনি অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “আমি মনে করেছি এরা সব ছেলে, বউ হবে।” 

দূর্গাপূজা আসছে। মা তাই জামাইদের* কাপড় ভাগ ভাগ করে রাখ ছিলেন এবং আমাকে পৃথক করে বেঁধে রাখতে বললেন। আর একখানি কাপড় আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এখানা কুচিয়ে রাখত মা, গণেন পূজোর সময় পরে মঠে যাবে।” 

মধ্যাহ্নের ভােগ ও প্রসাদ পাওয়া হয়ে গেল। আহারান্তে মা বিশ্রাম করছেন। আমি নিকটে বসে বাতাস করছিলুম। মা তাতে বললেন, “ঐখান হতে একটা বালিশ নিয়ে আমার এইখানে শোও, আর বাতাস লাগবে না।” মায়ের বালিশে কি করে শোব মনে করে রাধুর ঘর হতে একটা বালিশ নিয়ে আসতেই মা হেসে বললেন, “ওটা পাগলের (রাধুর মার) বালিশ গাে, তুমি এই বালিশটাই আন না, তাতে দোষ নেই।” রাধুকে ডেকে বললেন, “রাধুও আয়, তাের দিদির পাশে শাে।” 

মার সঙ্গে চন্দ্রবাবুর ভগ্নীর সম্বন্ধে কথা হতে লাগল। মা বললেন, 

‘তা তুমি বললেই পারতে - হাঁ, এই তাে তাঁর স্বামী ঘরে বসে আছেন, আর তােমরা সব ছেলেমেয়ে।” 

আমি - সে তাে জগৎ ব্রহ্মাণ্ডে কত ছেলেমেয়ে আছে, মা। 

মা হাসতে লাগলেন। কথায় কথায় আবার বললেন, ‘কত লোকে কত ভাবে আসে, মা। কেউ হয়তাে একটা শশা এনে ঠাকুরকে দিয়ে কত কামনা করে বলে - “ঠাকুর তােমাকে এই দিলুম, তুমি এই করাে। এমনি কত এই কামনা।” 

মা একটু পাশ ফিরে শুলেন। আমারও একটু তন্দ্রার মত এসেছিল, জেগে দেখি মা পাখা নাড়ছেন। একটু পরেই মা উঠলেন। দেখলুম পাশের ঘরে কয়েকটি লােক বসে আছেন। তন্মধ্যে দুজন গৈরিকধারিণী। তাঁরা মাকে প্রণাম করলেন। ঐ সঙ্গে একটি ছােট ছেলেও এসেছিল, সে প্রণাম করতেই মা প্ৰতিনমস্কার করলেন। তাঁরা মিষ্টি এনেছিলেন, মা আমাকে তুলে রাখতে বললেন এবং হাতমুখ ধুতে গেলেন। পরিচয় জানলুম, তাঁরা কালীঘাটের শিবনারায়ণ পরমহংসের শিষ্যা, সম্প্রতি তাদের গুরুর ওখানে অহােরাত্রব্যাপী এক যজ্ঞ হচ্ছে — ইত্যাদি। একটু পরেই শ্রীশ্রীমা এসে বসলেন। গৈরিকধারীণীদের মধ্যে একজন মাকে বললেন, “আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই।” 

মা - বল। 

গৈরিকধারিণী - মূর্তিপূজায় কিছু সত্য আছে কি-না? আমাদের গুরু, বলেন, মূর্তিপূজা কিছু নয়, সূর্যের ও অগ্নির উপাসনা কর।’

মা - তােমার গুরু, যখন বলেছেন, তখন ওকথা আমায় জিজ্ঞাসা না করাই ঠিক। গুরুবাক্যে বিশ্বাস রাখতে হয়। 

তিনি বললেন, তা হবে না, আপনার মত বলতেই হবে।” মা নিজ মত বলতে পুনরায় অসম্মতি প্রকাশ করলেন। কিন্তু গৈরিকধারিণী একেবারে নাছােড়বান্দা। তখন মা বললেন, “তিনি (তােমার গুরু) যদি সর্বজ্ঞ হতেন  - এই দেখ তােমার জিদের ফল, কথায় কথা বেরুল  তা হলে ঐ কথা বলতেন না। সেই আদিকাল হতে কত লােকে মূর্তি উপাসনা করে মুক্তি পেয়ে আসছে, সেটা কিই নয় ? আমাদের ঠাকুরের ওরূপ সঙ্কীর্ণ ভেদবুদ্ধি ছিল না। ব্রহ্ম সকল বস্তুতেই আছেন। তবে কি জান - সাধুপুরুষেরা সব আসেন মানুষকে পথ দেখাতে, এক এক জনে এক এক রকমের বােল বলেন। পথ অনেক সেজন্যই তাঁদের সকলের কথাই সত্য। যেমন একটা গাছে সাদা, কালাে, লাল নানা রকমের পাখী এসে বসে, হরেক রকমের বােল বলছে। শুনতে ভিন্ন ভিন্ন হলেও সকলগুলিকে আমরা পাখীর বােল বলি—একটাই পাখীর বােল আর অন্যগুলাে পাখীর বােল নয় এরূপ বলি না।” 

তাঁরা কিছুক্ষণ তর্ক করে শেষে নিরস্ত হলেন। তারপর তাঁরা শ্রীশ্রীমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার বাড়ি কোথায়?” 

মা - কামারপুকুর, হগলী জেলায়। 

“এখানকার ঠিকানা কি বলুন, আমরা মাঝে মাঝে আসব।” 

মা ঠিকানা লিখে দিতে বললেন। তাঁরা যে মিষ্টি এনেছিলেন ইতঃপূর্বেই শ্রীশ্রীমা তা হতে ছেলেটিকে দিতে বলেছিলেন এবং আমি তখনই দিয়েছিলুম। একটু পরে তাঁরা বিদায় নিলেন। তাঁরা গেলে শ্রীশ্রীমা বললেন, “মেয়েলােকের আবার তর্ক। জ্ঞানী পুরুষরাই তর্ক করে তাঁকে বড় পেলে। ব্রহ্ম কি তর্কের বস্তু?” একটু পরেই আমার গাড়ী এল। মা বললেন, “এই গাে পটলডাঙ্গার গাড়ী এসেছে বলছে, এখনি এল ?” ঐ কথা বলেই তিনি তাড়াতাড়ি ঠাকুরের বৈকালী ভােগ দিলেন এবং কিছু প্রসাদ, প্রসাদী জলের গ্লাসটি এবং দুটি পান নিয়ে বারান্ডায় আড়ালে গিয়ে ডাকলেন-“এস।” তাঁর স্নেহযত্নে আমার চোখে জল এল। ভাবতে লাগলুম - আবার কত দিনে মার সঙ্গে দেখা হবে। কারণ, পূজার পরেই মা কাশী যাবেন। মা সস্নেহে বললেন, “আবার আসবে।” এমন সময় বাহির হতে চন্দ্রবাবু এসে একটু বিরক্তির সহিত বললেন, “বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে, গাড়ােয়ান দিক করছে, আমি এই সকলকে বলে রাখলাম গাড়ি আসলে কেউ যেন তিলার্ধ দেরী না করেন।” শ্রীশ্রীমা তাই শুনে বললেন, “আহা, তার কি, এই তো যাচ্ছে -- এস মা।” আমি অশ্রুসিক্ত চোখে তাড়াতাড়ি প্রণাম করে নেমে গেলুম। প্রাণের আবেগে সেদিন বাড়িতে কারও সহিত ভাল করে কথা বলতে পারলুম না। সারারাতও ঐ ভাবে কেটে গেল। 

* মায় তিনটি ভ্রাতুষ্পুত্রী - তাদের স্বামীর জন্য। 


 ১৮ই মাঘ, ১৩১৯ 

৩রা মাঘ মা কাশী হ'তে ফিরেছেন। সকালবেলা গিয়ে দেখি, মা পূজা করছেন এবং পূজা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। পূজা শেষ হলে উঠে বললেন, “এই যে, মা, এসেছ, আমি ভাবছি দেখা হ’ল না বুঝি, আবার শীগগির দেশে চলে যাব।” খাবার তৈরী করে নিয়ে গেয়েছি দেখে মা বললেন, “ঠাকুরের আজ মিষ্টি কম দেখে ভাবছিলুম। তা ঠাকুর তাঁর ভােগের জিনিস সব নিজেই যােগাড় করে নিলেন - তা আবার কেমন ঘরের তৈরী সব খাবার?” ঠাকুরকে ঐ সব নিবেদন করা হলে ভক্তদের জন্য এক একখানি শালপাতায় ভাগ ভাগ করে সাজিয়ে দিতে লাগলেন। ভুদেব বললে, “এত দেব কাকে?” 

মা হেসে বললেন, “দেখ ছেলের বুদ্ধি ! নীচে যেসব ভক্তরা আছে তাদের দিবি। দিয়ে আয়গে যা।” 

একটু পরে রাঁচী হতে একটি ভক্ত এসে মাকে প্রণাম করে ফুলের মালা দিলেন এবং বললেন, “সুরেন আপনাকে এই টাকাটি দিয়েছে।” এই বলে টাকাটি মার পদতলে রাখলেন। 

বেলা হয়েছে। রাধু সামনের মিশনারী স্কুলে যাবে বলে খেয়ে দেয়ে কাপড় পরে প্রস্তুত, এমন সময় গােলাপ-মা এসে মাকে বললেন, “বড় হয়েছে মেয়ে, এখন আবার স্কুলে যাওয়া কি ?” এই বলে রাধুকে যেতে নিষেধ করলেন। রাধু কাঁদতে লাগল। 

মা বললেন, “কি আর বড় হয়েছে, যাক না। লেখাপড়া, শিল্প এ সব শিখতে পারলে কত উপকার হবে। যে গ্রামে বিয়ে হয়েছে—এ সব জানলে নিজের এবং অন্যেরও কত উপকার করতে পারবে, কি বল মা?” পরে রাধু স্কুলে গেল। 

অন্নপূর্ণার মা একটি মেয়ে নিয়ে এসেছেন দীক্ষার জন্য। তিনি বললেন, “মা, ও আমাকে খেয়ে ফেললে তােমার কাছে দীক্ষা নেবার জন্যে। কি করি,-, নিয়ে এলুম।” 

মা - “আজ কি করে হবে? জল খেয়েছি। 

অন্নপূর্ণার মা - ও তাে খায় নি। তা মা, তােমার খাওয়ায় তো আর দোষ নেই। 

মা - একেবারে কি ঠিক হয়েই এসেছে ? 

অন্নপূর্ণার মা - হাঁ মা, একেবারে স্থির করেই এসেছে। মা সম্মত হলেন। দীক্ষার পরে শ্রীশ্রীমাকে মেয়েটির কথা বলতে লাগলেন - “ও কি মা, তেমন মেয়ে ! ঠাকুরের বই পড়ে চুল কেটে পুরুষ সেজে তপস্যা করতে তীর্থে বেরিয়ে গিয়েছিল - একেবারে বৈদ্যনাথে গিয়ে হাজির। সেখানে এক বনের মধ্যে বসেছিল। ওর মায়ের গুরু সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন, ওকে দেখতে পেয়ে পরিচয় 
নিয়ে নিজের কাছে রেখে ওর বাপের কাছে সংবাদ পাঠাতে ওর বাপ গিয়ে নিয়ে  এল।”

মা চুপ করে কথাগুলি শুনে বললেন, “আহা, কি অনুরাগ!” আর সকলে বলতে লাগলেন, “ও মা, সে কি গাে ! আমন রূপের ডালি মেয়ে (মেয়েটি খুবই সুশ্রী) কেমন করে রাস্তায় বেরিয়েছিল, হােক গে বাপু ভক্তি অনুরাগ!” 

নলিনী -- বাপরে আমাদের দেশ হলে আর রক্ষে থাকত না। 

অবশ্য এই সব কথা মেয়েটির ও অন্নপূর্ণার মার অসাক্ষাতেই বলা হচ্ছিল। 

নলিনী ও আমার সঙ্গী একটি স্ত্রীলোক উভয়েই স্বামীর কাছে থাকেন না। কি কথার যেন তাঁদের কথা এল। মা বললেন, “ঠাকুর বলতেন, জরু গরু, ধান -  এ তিন রাখবে আপন বিদ্যমান,” আরও বললেন, “এসব চারাগাছের সময়ে বেড়া না দিলে ‘ছাগলে মুড়াবে মাথা’।” 

দুপুরে আহারান্তে সকলে পাশের ঘরে শয়ন করলেন । নূতন মেয়েটিকে মা, একটু শুতে বললেন। সে বললে, “না, মা, আমি দিনের বেলায় শুই না।” আমি তাকে বললুম, “মা বলছেন, কথা শুনতে হয়।” “তবে শুই” বলে সে একটু শুয়ে আবার তখনই উঠে বারান্ডায় গেল। মা বললেন মেয়েটি একটুই চঞ্চল, সেই জন্যেই বেরিয়ে গিয়েছিল।” মা মেয়েটির ঝিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “মেয়েটির স্বামী কি করে ? কেন মেয়েটিকে কাছে নিয়ে রাখে না ?” 

ঝি বললে, “তিনি অল্প মাইনে পান, আর ঘরে কেউ নেই, ওকে নিয়ে গিয়ে একলাও রাখতে পারেন না। তাই শনিবার শনিবার শ্বশুরবাড়ি আসেন।” 

ন্নপূর্ণার মা - ও স্বামীকে বলে, “তুমি আমার কিসের স্বামী, জগৎ-স্বামীই আমার স্বামী। 

মা কোন উত্তর দিলেন না। 

ঠাকুরঘরের উত্তরের বারান্ডায় মেয়েরা সব গল্প করছিলেন। 

বড় গােল হচ্ছিল। মা বললেন, “বলে এস তো, মা, আস্তে কথা বলতে এক্ষুণি শরতের ঘুম ভেঙে যাবে (তিনি নীচে বৈঠকখানা ঘরে শুয়েছিলেন)। ঘরটি এখন নির্জন দেখে মাকে সাধন-ভজন ও দর্শন সম্বন্ধে কয়েকটি কথা জিজ্ঞাসা করলুম। মা বললেন, “ঠাকুর ও আমাকে অভেদ-ভাবে দেখবে, আর যখন যে ভাবে দর্শন পাবে, সেই ভাবেই ধ্যান-স্তুতি করবে, ধ্যান হয়ে গেলেই পূজা শেষ হ’ল। এইখানেই (হৃদয়ে) আরম্ভ ও এইখানে (মস্তকে) শেষ করবে।” এই বলে দেখিয়ে দিলেন। 

 মা - মন্ত্র-তন্ত্র কিছু নয়, মা, ভক্তিই সব। ঠাকুরের মাঝেই গুরু, ইষ্ট, সব পাবে। উনিই সব। 

তারপর কথাপ্রসঙ্গে গৌরীমা ও দূর্গাদেবীর কথা উঠল। মা উভয়ের অনেক সুখ্যাতি করলেন। আর বললেন, “দেখ, মা, চড় খেয়ে রামনাম অনেকেই বলে, কিন্তু শৈশব হ'তে ফুলের মতাে মনটি যে ঠাকুরের পায়ে দিতে পারে, সে-ই ধন্য। মেয়েটি যেন অনাঘ্রাত ফুল। গৌরীদাসী মেয়েটিকে কেমন তৈরী করেছে। ভায়েরা বিয়ে দেবার বহু চেষ্টা করেছিল! গৌরীদাসী ওকে লুকিয়ে হেথা সেথা পালিয়ে পালিয়ে বেড়াত। শেষে পুরী গিয়ে জগন্নাথের সঙ্গে মালা বদল করে সন্ন্যাসিনী করে দিলে। সতী লক্ষী মেয়ে, কেমন লেখাপড়াও শিখেছে। কি একটা সংস্কৃত পরীক্ষাও দেবে শুনছি।” গৌরীমার পূর্বজীবন সম্বন্ধেও অনেক কথা বললেন। তাতে জানলুম, তার জীবনের উপর দিয়ে কম দুঃখ-ঝঞ্জা বয়ে যায় নি। কাশীর কথা ওঠাতে বললেন, “কাশীতে বেশ ছিলুম গাে, আর আমি তাে সঙ্গে করে যদুবংশ সব নিয়ে গিয়েছিলুম, মা।” 

একটু পরে চার-পাঁচটি স্ত্রীলােক এলেন। তাঁরা ডাব ও কিছু অন্য ফল মায়ের চরণপ্রান্তে রাখলেন। একটি স্ত্রীলােক প্রণাম করবার জন্য নিকটে আসবার উপক্রম করলে মা বললেন, “ওখান হতেই কর।” তাঁরা প্রত্যেকেই মার সামনে দু-চারটি পয়সা রেখে প্রণাম করতে লাগলেন । মা পয়সা দিতে বারবার নিষেধ করলেন। তাঁর কিছু উপদেশ চাইতে মা একটু হেসে বললেন, “আমি আর কি উপদেশ দেব। ঠাকুরের কথা সব বইয়ে বেরিয়ে গিয়েছে। তাঁর একটা কথা ধারণা করে যদি চলতে পার, তাে সব হয়ে যাবে।” শ্ৰীশ্ৰীমা খুঁটিনাটি অনেক কথা তাদের জিজ্ঞাসা করলেন। তাঁরা বিদায় নিলে মা আমাকে বললেন, “উপদেশ নেয় তেমন আধার কই ? আধার চাই, মা, নইলে হয় না।” কথায় কথায় ঠাকুরের ভাগ্নে হৃদয় প্রভৃতির কথা উঠল ; দু-একটি কথা হতেই অন্নপূর্ণার মা ঘরে ঢুকতে সেসব কথা চাপা পড়ে গেল। তিনি বললেন, ‘মা, আমি স্বপ্ন দেখেছি, তুমি যেন আমাকে বলছ, আমার প্রসাদ খা, তবে তোর অসুখ সারবে।’ আমি বলছি ঠাকুর নিষেধ করেছেন, আমাকে কারও উচ্ছিষ্ট খেতে। তা মা, আমাকে এখন তােমার প্রসাদ একটু দাও।” মা সম্মত না হওয়ায় তিনি খুব জিদ করতে লাগলেন। 

মা বললেন, “ঠাকুর যা নিষেধ করেছেন, তাই করতে চাও ?” 

অন্নপূর্ণার মা উত্তর করলেন, “তাঁতে ও তােমাতে যতদিন তফাত বােধ ছিল ততদিন ওকথা ছিল, এখন দাও।” মা শেষে তাঁকে প্রসাদ দিলেন। 

কিছুক্ষণ পরে তাঁরা বিদায় নিলেন। গৌরীমার ওখান হয়ে যেতে হবে বলে আমিও একটু পরে বিদায় নিলাম। 

৫ই কি ৬ই ফাল্গুন, ১৩১৯—শ্রীমান শােকহরণের সহিত পুনরায় গিয়েছি। সকালবেলায় পূজা হয়ে গেছে। দেখেই মা বললেন, “এসেছ, মা বেশ করেছ। জয়রামবাটী যাবার দিন বদলে গেছে, ১৩ই নয় ১১ই (ফাল্গুন)। কার সঙ্গে এলে?”

আমি — শােকহরণ নিয়ে এসেছে। অনেক দূরে আছি মা, আসবার সুবিধা হয় না। 

মা শ্ৰীমানের প্রশংসা করে বললেন, “আহা, লক্ষী ছেলে কত কষ্ট করে নিয়ে এসেছে ?” জিজ্ঞাসা করলেন, “জামাই (আমার স্বামী) কেমন আছেন?” 

আমি - বড় ভাল নেই, মা। 

কিছুক্ষণ পরে একখানি চিঠির জবাব লিখে দিতে বললেন। মা বলতে লাগলেন, আর আমি লিখে যেতে লাগলুম। 

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর মা একটু বিশ্রাম করছিলেন, এমন সময় কয়েকজন স্ত্রীলােক দর্শন করতে এলেন। মা শুয়ে শুয়েই তাঁদের কুশল-প্রশ্ন করতে লাগলেন। তাঁরা একটি কথার পর বলতে আরম্ভ করলেন, “আমার একটি ভাল ছাগল আছে, দু’ সের দুধ দেয়। তিনটি পাখী আছে। এ সবই এখন অবলম্বন। আর বয়স তাে কম হয়ে গেল না, মা।” আমার তখন ঠাকুরের কথা মনে পড়ল—“বেড়াল পুষিয়ে মহামায়া সংসার করান।' শ্রীশ্রীমা “হাঁ হাঁ করে যেতে লাগলেন। 

আহা! মা, আমাদের জন্য তোমাকে কতই না সইতে হয়। এই বিশ্রামটুকুর সময়েও যত রাজ্যের বাজে কথা। বৈকাল বেলা একটু পড়ে আসতে আমরা বিদায় নিলুম। 
গত ১১ই ফাল্গুন মা পিত্রালয়ে গিয়েছিলেন। ১৩২০ সনের আশ্বিন মাসের পূজার পূর্বে কলকাতা ফিরেছেন। একদিন বৈকালে গিয়ে দেখি, একটি স্ত্রীলােক তাঁর পদতলে কাঁদছেন - দীক্ষার জন্য। শ্ৰীশ্ৰীমা চৌকীর উপর বসে আছেন। মা সম্পূর্ণ অসম্মত — বলছেন, “আমি তাে তােমাকে পূর্বেই বারণ করেছি; কেন এলে ? আমার শরীর ভাল নয়, এখন হবে না।” সে যতই বলছে, মা আরও বিরক্তি প্রকাশ করছেন, “তােমাদের আর কি ? তােমরা তাে মন্ত্রটি নিয়ে গেলে ; তারপর ?” মেয়েটি তবুও নাছোড়। উপস্থিত সকলেই বিরক্ত হয়ে উঠলেন। শেষে মা বললেন, “পরে এস।” তখন স্ত্রীলােকটি বললে, “তবে আপনার কোন ভক্ত ছেলেকে বলে দিন।” 

মা - তারা যদি না শুনে ? 

মেয়েটি—সে কি, আপনার কথা শুনবে না ?

মা—এ ক্ষেত্রে নাও শুনতে পারে। 

তারপর কিছুতেই না ছাড়তে মা বললেন, “আচ্ছা, খােকাকে* বলে দেবাে, সে দেবে।” তবুও মেয়েটি বলতে লাগলেন, আপনি দিলেই ভাল হয়, আপনি ইচ্ছা করলেই পারেন।” এই বলে দশ টাকার একখানি নোট বের করে বললেন, এই নিন টাকা, যা লাগে আনিয়ে নেবেন।” ঐরূপে টাকা দিবার প্রস্তাবে আমাদের লজ্জা করতে লাগল, রাগও হ’ল। মা এবার তাঁকে ধমকে বলেন, “কি, আমাকে টাকার লােভ দেখাচ্ছ না কি? আমি টাকায় ভুলি না, যাও, টাকা নিয়ে যাও।” এই বলে উঠে গেলেন। 

পরে স্ত্রীলােকটির অনেক অনুনয়-বিনয়ে ঠিক হ’ল মহাষ্টমীর দিন দীক্ষা হবে। মেয়েটি তাে বিদায় নিলেন। মা এইবার পাশের ঘরে এসে ব'সে আমাকে ডাকলেন, “এস, মা, এই ঘরে এস। এতক্ষণ তােমাকে একটা কথাও জিজ্ঞেস করতে পারি নি। কেমন আছ ?” 

বেলা শেষ হয়ে এসেছে, পূজার সময় বলে অনেক স্ত্রীলােক কাপড়, মিষ্টি ইত্যাদি নিয়ে এসেছেন। মা হাসিমুখে তাঁদের কথার উত্তর দিচ্ছেন। খুব গরম, আমি মাকে হাওয়া করতে লাগলুম। একটি মহিলা এসে সাগ্রহে আমার হাত থেকে পাখাখানা চেয়ে নিয়ে মাকে হাওয়া করতে লাগলেন। মায়ের একটু সামান্য সেবার কাজ করতে পেলেও সকলের কি আনন্দ! আহা, কি অপূর্ব 

স্নেহ-করুণাতেই শ্রীশ্রীমা আমাদিগকে চিরবদ্ধ করে গেছেন আর তাঁর অবস্থানে বাগবাজারের মাতৃমন্দির সংসার-তাপদগ্ধ মানুষের কি মধুর শান্তিনিলয়ই হয়েছিল, তা বলা বা বুঝান অসম্ভব। 

এইবার আমিও রওনা হব। মাকে প্রণাম করতে গিয়ে বললুম, “মা, শীঘ্রই একবার বাপের বাড়ি যেতে হবে।” মা সন্দেহে বললেন, “আবার শীগগির এস, মা - চিঠিপত্র দিও।” মার জন্য একখানি কাপড় নিয়ে গিয়েছিলাম, আসবার সময় বলছেন, “তােমার কাপড়খানি দেখিয়ে দিয়ে যাও, মা - পরবাে।”

প্রায় আড়াই মাস পরে আবার একদিন (১৪ই অগ্রহায়ণ) গিয়েছি। সিঁড়ি উঠতেই কল-ঘরে মার সঙ্গে দেখা হল। মা কাপড় কাচতে গিয়েছিলেন। আধভিজে কাপড়েই এসে জিজ্ঞেস করে গেলেন, “এতদিন দেরিতে কেন এলে?” কাপড় কেচে এসে তক্তপােশের উপর বসতে কুশলপ্রশ্নাদির পর কথাপ্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলুম, “সেই যে স্ত্রীলােকটি মন্ত্র নিতে চেয়েছিলেন, তার কি হল, মা ?”

মা -- সে সেদিন নিতে পারলে না। বলেছিলুম আমার অসুখ সারুক, তার পর নেবে- তাই হ’ল। অসুখ হওয়ায় সেদিন সে আসতে পারে নি। তার অনেক পরে একদিন এসে নিয়ে গিয়েছে। 

আমি - তাই তো মা, আপনার মুখ দিয়ে যে কথা বেরিয়ে পড়ে তাই হয়। আমরা আপনার ইচ্ছা না মেনে নিজেরা কষ্ট পাই, আপনিও নিজের অসুস্থ শরীরে অনেক সময় দয়া করে দীক্ষা দিয়ে আমাদের ভােগ নিজ শরীরে নিয়ে আরও বেশী কষ্ট পান।

মা বললেন, “হাঁ, মা, ঠাকুর ঐ কথা বলতেন। নইলে এসব শরীরে কি রােগ হয় ? এর মধ্যে আবার কলেরার মতাে হয়েছিল।” 

আমার ভাতৃবধূ, সঙ্গে গিয়েছিল। মা তাকে দেখে বললেন, “বেশ শান্ত বৌটি। এক ব্যন্নন নুনে পােড়া হলে মুশকিল হােত।” অথাৎ আমার ভাতৃবধূ একটি মাত্র, সে ভাল না হলে তাকে নিয়ে সংসারে থাকা কষ্টকর হােত। 

* স্বামী সুবোধানন্দ-ডাকনাম ‘খোকা’ মহারাজ। 

মাঘ, ১৩২০ 

একদিন সকালে গিয়েছি; বাগান থেকে অনেকগুলি ফুল তুলে নিয়ে গিয়েছিলুম। মায়ের নিকট উহা দিতে মা মহা আনন্দিত হয়ে ঠাকুরকে সাজাতে লাগলেন। নীল রঙের এক রকমের ফুল ছিল। সেইগুলি হাতে করে বললেন, “আহা, দেখছ কি রং! দক্ষিণেশ্বরে ‘আশা' বলে একটি মেয়ে একদিন বাগানে কাল-কাল-পাতা একটি গাছ থেকে সুন্দর একটি লাল ফুল তুলে হাতে নিয়ে খালি বলতে লাগল, ‘এ্যা, এমন লাল ফুল, তার এমন কাল পাতা। ঠাকুর, তােমার একি সৃষ্টি! এই বলে, আর হাউ হাউ করে কাঁদে। ঠাকুর তাই দেখে তাকে বলছেন, তাের হ’ল কি গাে, এত কাঁদছিস কেন ? সে আর কিছু বলতে পারে না, খালি কাঁদে, তখন ঠাকুর তাকে অনেক কথা বলে বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করেন। আহা, এই ফুলগুলি কেমন নীল রং দেখ! ফুল না হলে কি ঠাকুরকে মানায়।” এই বলে মা অঞ্জলি অঞ্জলি ফুল নিয়ে ঠাকুরকে দিতে লাগলেন। প্রথমবার দেবার সময় কয়েকটি ফুল সহসা তাঁর নিজের পায়ে পড়ে গেল দেখে বললেন, “ওমা, আগেই আমার পায়ে পড়ে গেল।” আমি বললুম, “তা বেশ হয়েছে।” মনে ভাবলুম, তােমার কাছে ঠাকুর বড় হলেও আমাদের কাছে তােমরা দুই-ই এক।

একটি বিধবা মহিলা এসেছেন। মাকে তাঁর কথা জিজ্ঞাসা করলুম। মা বললেন, ‘মাসখানেক হ’ল দীক্ষা নিয়েছে। পূর্বে অন্য গুরুর নিকট দীক্ষিত হয়েছিল। তা মা, মনের ভ্রান্তি, আবার এখানে নিলে। গুরু, সবই এক, একথা বুঝলে না।” 

পরে প্রসাদ পাবার পর বিশ্রাম করতে গিয়ে কামারপুকুরের কথা উঠল। মা বললেন, “ঠাকুর যখন পেটের অসুখ করে কামারপুকুরে গিয়েছিলেন, আমি তখন ছেলেমানুষ বউটি ছিলুম গাে। ঠাকুর একটু রাত থাকতেই উঠে আমাকে বলতেন, কাল এই এই সব রান্না করো গাে। আমরা তাই রান্না করতুম। একদিন পাঁচফোড়ন ছিল না, দিদি (লক্ষীর মা) বললে, তা অমনিই হােক, নেই তার কি হবে। ঠাকুর তাই শুনতে পেয়ে ডেকে বলছেন, “সে কি গাে পাঁচফোড়ন নেই, তা এক পয়সার আনিয়ে নাও না; যাতে যা লাগে তা বাদ দিলে হবে না। তােমাদের এই ফোড়নের গন্ধের ব্যান্নন খেতে দক্ষিণেশ্বরের মাছের মুড়াে পায়েসের বাটি ফেলে এলাম আর তাই তােমরা বাদ দিতে চাও?’ দিদি তখন লজ্জা পেয়ে আনতে দিলে। সেই বামুন ঠাকরুণও (যােগেশ্বরী) তখন ওখানে ছিলেন। ঠাকুর তাঁকে মা বলতেন। আমিও তাঁকে শাশুড়ীর মতাে দেখতুম ও ভয় করতুম। তিনি বড় ঝাল খেতেন। নিজে রান্না করতেন—কালে পােড়া । আমাকে খেতে দিতেন, চোখ মুছতুম আর খেতুম। জিজ্ঞাসা করতেন, কেমন হয়েছে। ভয়ে ভয়ে বললুম, 'বেশ হয়েছে। রামলালের মা বলত, ‘হ্যাঁ, যে ঝাল হয়েছে।’ আমি দেখতুম, তিনি তাতে অসন্তুষ্ট হতেন; বলতেন, “বৌমা তো বলেছে ভাল হয়েছে। তােমার বাপু; কিছুতে ভাল হয় না। তােমাকে আর ব্যান্নন দেব না'।” এই বলে মা খুব হাসতে লাগলেন।

আবার ফুলের কথা উঠলো। মা বললেন, “দক্ষিণেশ্বরে থাকতে একদিন আমি রঙ্গনফুল আর জুঁইফুল দিয়ে সাত লহর গড়ে মালা গেঁথেছি ! বিকেল বেলা গেঁথে পাথরের বাটিতে জল দিয়ে রাখতেই কুঁড়িগুলি সব ফুটে উঠল। মাকে পরাতে পাঠিয়ে দিলুম। গয়না খুলে মাকে ফুলের মালা পরানাে হয়েছে। এমন সময়ে ঠাকুর মাকে দেখাতে গিয়েছেন, দেখে একেবারে ভাবে বিভাের। বারবার বলতে লাগলেন, ‘আহা, কাল রঙে কি সুন্দরই মানিয়েছে।’ জিজ্ঞাসা করলেন, “কে এমন মালা গেঁথেছে ? আমি গেঁথে পাঠিয়েছি একজন বলাতে তিনি বললেন, “আহা, তাকে একবার ডেকে নিয়ে এস গাে, মালা পরে মায়ের কি রূপ খুলেছে একবার দেখে যাক। বৃন্দের ঝি গিয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে এল। মন্দিরের কাছে আসতেই দেখি, বলরামবাবু, সুরেনবাবু - এরা সব মায়ের মন্দিরের দিকে আসছেন, আমি তখন কোথায় লুকুই। বৃন্দের আঁচলটি টেনে ঢাকা দিয়ে তার আড়ালে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলুম। ওমা, ঠাকুর তা জানতে পেরে বলছেন, ওগাে, ওদিক দিয়ে উঠো মা। সেদিন এক মেছোনী উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে মরেছে। সামনের দিক দিয়ে এস না। তাঁর ঐ কথা শুনে বলরামবাবুরা সরে দাঁড়ালেন। গিয়ে দেখি-মায়ের সামনে ঠাকুর ভাবে প্রেমে গান ধরে দিয়েছেন।” কয়েকজন স্ত্রী ভক্ত আসাতে উপস্থিত প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেল। আমারও যাবার সময় হয়ে এল। মা বললেন, আমাকে একটি জিনিস দেবেন - কাপড় কেচে এসে। 

আবার মুক্তির কথা উঠল। মা বললেন, “ও কি জান মা, যেন ছেলের হাতের সন্দেশ ! কেউ কত সাধাসাধি করছে, ‘একটু দে না, একটু দে না,’ তা কিছুতেই দেবে না ; অথচ যাকে খুশি হল, টপ করে তাকে দিয়ে ফেললে। একজন সারা জীবন মাথা খুঁড়ে কিছু করতে পারলে না, আর একজন ঘরে বসে পেয়ে গেল। যেমনি কৃপা হ’ল, অমনি তাকে দিয়ে দিলে। কৃপা বড় কথা।” এই বলে কাপড় কাচতে গেলেন। বৈকালী ভােগের পর বেল পাতায় মুড়ে আমাকে যা দেবেন বলেছিলেন দিয়ে বললেন, “মাদুলি করে পরে। এটির কথা কাউকে বোলাে না। তা হলে সবাই আমাকে ছিঁড়ে খাবে।” শ্রীশ্রীমাকে বালিগঞ্জে শ্রীমানের বাসায় যাবার কথা বললুম ; মা বললেন - যাবেন। মা আমায় বললেন, “আমাকে একখানা শীতলপাটি দিও, মা, আমি শোব।” 

আমি - সে তাে আমার সৌভাগ্য, অবশ্য আনব।
এই বলে প্রণাম করে বিদায় নিলাম। 

মা বললেন, “আবার এস।” 

জ্যৈষ্ঠ, ১ম সপ্তাহ - ১৩২১ 

আজ মা বালিগঞ্জের বাসায় আসবেন। পূর্বদিন হ’তে সব বন্দোবস্ত হচ্ছে। মার জন্য পৃথক, আসন, নূতন শ্বেতপাথরের বাসন ইত্যাদি কেনা হয়েছে। মা আসবেন। আনন্দে সারারাত ঘুমই হ’ল না। কথা ছিল, মা অপরাহ্নে আসবেন। পাছে কোন কারণে তাঁর অন্য মত হয়, সেজন্য প্রাতেই শ্রীমান শােকহরণ বাগবাজারে মার বাড়িতে গাড়ি নিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। আর আমরা সংসারের কাজ সব সকাল সকাল চুকিয়ে প্রস্তুত হয়ে রইলাম। মায়ের আসন পেতে চারিদিকে ফুল সাজিয়ে রাখলুম, সমস্ত ঘরদোরে গঙ্গাজল ছড়িয়ে দিলাম, ফুলের মালা গেঁথে রাখলুম এবং বড় দুটি ফুলের তােড়া করে মায়ের আসনের দু'পাশে দিলুম। বেলা পড়তেই পথ চেয়ে আছি কখন মা আসবেন। এইবার এতক্ষণে সেই শুভ মুহূর্ত! গাড়ির শব্দ হতেই সকলে নীচে নেমে এলুম। গাড়ি থামতেই দেখলুম, মা হাসিমুখে স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে আমাদের পানে চেয়ে আছেন। গাড়ি হ'তে নামতেই সকলে তাঁর পদূধলি নেবার জনা ব্যস্ত হলুম।

মায়ের সঙ্গে গােলাপ-মা, ছোটদিদি, নলিনীদিদি, রাধু এবং চার-পাঁচজন সাধু-ব্রহ্মচারী এসেছেন। শ্রীশ্রীমাকে উপরে নিয়ে আসনে বসিয়ে প্রণাম করলুম। মা বললেন, “খেয়েছ তাে ? আমি কত তাড়াতাড়ি করেছি, কিন্তু কিছুতেই আর এর চেয়ে সকালে হয়ে উঠল না। এতক্ষণে তবে আসা হ’ল” এই বলে চিবুকে হাত দিয়ে চুমাে খেলেন। আমি আর বসতে পারলাম না, খাবারের আয়ােজন করতে ও নিমকি ভাজতে হবে। আর সব খাবার ইতঃপূর্বে ঠিক করা ছিল। 

উপরে গ্রামােফোনে গান হচ্ছে। কাজ করতে করতে একটু ফাঁক পেয়ে ছুটে গিয়ে  দেখি - মা কলের গান শুনে ভারী খুশী, আর “কী আশ্চর্য কল করেছে।” - বলে বালিকার মতাে আনন্দ করছেন। খুব গ্রীষ্ম - মা বারান্ডায় শীতল পাটিতে শুয়ে আছেন এবং তাঁর আশেপাশে সবাই বসে আছেন। একটি পাথরের বাটীতে বরফ-জল দেওয়া হয়েছে, মা মাঝে মাঝে খাচ্ছেন। আমাকে দেখতে পেয়ে মা বললেন, “ওগাে, একটু বরফ-জল খেয়ে যাও।” মায়ের প্রসাদী জলটুকু খেয়ে ঠাণ্ডা হয়ে নীচে রান্নাঘরে আবার ছুটে এলুম। আজ এত তাড়াতাড়ি করেও যেন কাজ আর সেরে উঠতে পাচ্ছি নে। | সন্ধ্যার পরে পাশের ঘরে ভােগ সাজান হ’ল। মা এসে গােলাপ-মাকে ঠাকুরের ভােগ নিবেদন করে দিতে বলতে তিনি বললেন, “তুমিই দাও, তুমি উপস্থিত থাকতে আমি কেন ?” তখন শ্রীশ্রীমা নিজেই ভােগ নিবেদন করতে বসলেন এবং “আহা, কি সুন্দর সাজিয়েছে!” বলে তারিফ করতে লাগলেন। এইরুপ সবেতেই বালিকার মতাে আনন্দ প্রকাশ করে আমাদের অপরিসীম আনন্দ দিতে লাগলেন। ভােগ দেওয়া হলে মা ও অন্য সকলে প্রসাদ গ্রহণ করতে বসলেন। সকলের আগে মায়ের খাওয়া হয়ে গেল। বারান্ডায় একখানি বেতের ইজিচেয়ারে বসে আমায় ডেকে বলছেন, “ওগাে, আমায় পান দিয়ে যাও।” আমি তখনও গােলাপ-মায়ের পরিবেশন করছিলুম। তাড়াতাড়ি গিয়ে পান দিয়ে এলুম। মাকে পান চেয়ে খেতে হ’ল বলে একটু লজ্জিতা হলুম। সুমতিকে বললুম, “পান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিস নি, দেখছিস আমি এদিকে রয়েছি ?” একটু পরে মা একবার কলতলায় গেলেন। আমি আলাে নিয়ে সঙ্গে গেলুম। বাগানের এই দিকটি বেশ নির্জন, পথে দু'পাশে ক্রোটন-গাছের সার। মা সস্নেহে বললেন, “আহা, একটুও বসতে পেলে না কাজের জন্যে। যেয়ো ওখানে, তােমার মাকে নিয়ে যেয়াে।” আমার মা বেড়াতে এসেছিলেন। ভাগ্য ক্রমে ঘরে বসেই শ্রীশ্রীমায়ের দর্শন পেয়ে গেলেন।

তারপর বিদায়ের ক্ষণ এল। মোটরগাড়িতে যেতে মায়ের মত নাই। কারণ একবার মাহেশের রথ দেখতে যেতে তাঁর মােটরের তলায় নাকি একটা কুকুর চাপা পড়ে, কিন্তু অত দূরে বাগবাজারে মােটরে না গেলে রাত হবে, কষ্টও হবে বলায় ভক্তদের মতেই শেষে বাজী হলেন। বারবার ঠাকুরকে প্রণাম করে প্রস্তুত হলেন এবং আমাদের আশীর্বাদ করে গাড়িতে উঠলেন।

 *************

একদিন রাত্রে গিয়েছি। মা শুয়ে আছেন। কালাে-বউ (মা ঐ নামেই তাঁকে ডাকতেন) কাছে বসে আছেন। মা উঠে বসলেন - প্রণাম করবো সেইজন্য। প্রণাম করতেই কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে আবার শয়ন করে পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে বললেন। পরে কথাপ্রসঙ্গে বলতে লাগলেন, “শােনাে, মা, বিধাতা যখন প্রথম মানুষ সৃষ্টি করলেন, তখন একপ্রকার সত্ত্বগুণী করেই করলেন। ফলে তারা জ্ঞান নিয়ে জন্মাল, সংসারটা যে অনিত্য তা বুঝতে আর তাদের দেরি হল না। সুতরাং তখনি তারা সব ভগবানের নাম নিয়ে তপস্যা করতে বেরিয়ে পড়ল এবং তার মুক্তিপদে লীন হয়ে গেল। বিধাতা দেখলেন, তবে তাে হল না। এদের দিয়ে তাে সংসারে লীলা-খেলা কিছু করা চলল না। তখন সত্বের সঙ্গে রজঃ তমঃ অধিক করে মিশিয়ে মানুষ সৃষ্টি করলেন। এবার লীলাখেলা চলল ভাল।" এই পর্যন্ত বলে সৃষ্টিপ্রকরণ সম্বন্ধে সুন্দর একটি ছড়া বললেন। তারপর বললেন, “তখন, মা, যাত্রা কথকতা এই সব ছিল। আমরা কত শুনেছি, এখন আর তেমনটি শােনা যায় না।” ইতিমধ্যে কালাে-বউ অন্য ঘরে উঠে গিয়ে নলিনীদিদি ও মাকুর কাছে কি একখানা বই চেঁচিয়ে পড়ছিল। মা তাই শুনে বললেন, “দেখছ মা, অত চেঁচিয়ে পড়ছে, নীচে সব কত লােক রয়েছে, তা হুঁশ নেই ? ” 

রাধারানীর মা এসে বললেন, “লক্ষ্মীমণিরা নবদ্বীপে যাবে, তা তুমি আমায় তাদের সঙ্গে যেতে দিলে না।” ঐ কথা বলেই তিনি অভিমান করে চলে গেলেন। মা বললেন, “ওকে যেতে দেব কি মা, সে (লক্ষ্মী) হ’ল ভক্ত, ভক্তদের সঙ্গে মিশে কত নাচবে গাইবে, হয়তাে জাতের বিচার না করে তাদের সঙ্গে খাবে* ও-তো সে সব ভাল বুঝবে না, দেশে এসে লক্ষ্মীর নিন্দে করবে। 

তুমি দেখেছ লক্ষ্মীকে?” 

আমি বললুম, “না, মা।” 

মা - দক্ষিণেশ্বরেই তাে আছে, দেখাে। দক্ষিণেশ্বরে গেছ তাে ? 

আমি - হ্যাঁ, মা, অনেক বার গেছি। তা তিনি যে সেখানে আছেন, তা জানতুম না। 

মা - দক্ষিণেশ্বরে আমি যে নবতে** থাকতুম, দেখেছ ? 

আমি - বাইরে থেকে দেখেছি। 

মা - ভিতরে গিয়ে দেখাে। ঐ ঘরটুকুর মধ্যেই সব সংসার ছিল - মায় ঠাকুরের জন্য হাঁড়িতে করে মাছ জিয়ান পর্যন্ত। প্রথমে যখন কলকাতায় আসি আগে জলের কল-টল তাে কিছু দেখি নি, একদিন কলঘরে*** গেছি - দেখি কল সোঁ সোঁ করে সাপের মতাে গর্জাচ্ছে। আমি তো মা, ভয়ে এক ছুটে মেয়েদের কাছে গিয়ে বলছি ‘ওগাে, কলের মধ্যে একটা সাপ এসেছে, দেখবে এস। সোঁ সোঁ করছে।’ তারা হেসে বললে, ওগাে, ও সাপ নয়, ভয় পেয়াে না। জল আস বার আগে অমনি শব্দ হয়। আমি তাে হেসে কুটিপাটি। 

এই বলেই মা খুব হাসতে লাগলেন। সে কি সরল মধুর হাসি। আমিও আর হাসি চেপে রাখতে পারলুম না, ভাবলুম—এমনি সরলই আমাদের মা বটেন। 

মা - বেলুড়ে ঠাকুরের উৎসব দেখেছ ? 

আমি - না, মা, কখনও বেলুড়ে যাই নি। শুনেছি, সেখানে মেয়েদের গিয়ে গােল করা সাধু-ভক্তরা পছন্দই করেন না। সেই ভয়ে আরাে যাই নি। 

মা -- যেয়াে না একবার, ঠাকুরের উৎসব দেখতে যেয়াে। 

আর একদিন শ্রীশ্রীমা রাস্তার ধারে বারান্ডায় এসে আমাকে আসনখানি পেতে হরিনামের ঝুলিটি এনে দিতে বললেন, তা এনে দিলে বসে জপ করতে লাগলেন। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, এমন সময় সামনের মাঠে যেখানে কুলি-মজুর-গােছের কতকগুলি লােক স্ত্রী-পূত্র নিয়ে বসবাস করতাে, সেখানে একজন পুরুষ, সম্ভবতঃ তার স্ত্রীকে বেদম মার সুরু করে দিলে - কিল, চড়, পরে এমন এক লাথি মারলে যে, স্ত্রীলোকটির কোলে ছেলে ছিল, ছেলেসুদ্ধ গড়িয়ে এসে উঠানে পড়ে গেল। আহা, তার উপর এসে আবার কয়েক লাথি! মায়ের জপ করা বন্ধ হয়ে গেল। একি আর তিনি সহ্য করতে পারেন? অমন যে অপূর্ব লজ্জাশীলা, গলার স্বরটি পর্যন্ত কেহ কখনও নীচে থেকে শুনতে পেত না—একেবারে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে উঠে তীব্র ভর্ৎসনার স্বরে বললেন, “বলি ও মিনসে, বউটাকে একে বারে মেরে ফেলবি নাকি, আঃ মলাে যা!” লোকটা একবার তাঁর দিকে তাকিয়েই অত যে ক্রোধদ্মত্ত হয়েছিল, যেন সাপের মাথায় ধুলােপড়া দেওয়ার মতাে অমনি মাথা নীচু করে বউটাকে তখনি ছেড়ে দিল। মায়ের সহানুভূতি পেয়ে বউটির তখন কি কান্না! শুনলুম, তার অপরাধ--সে সময়মত ভাত রান্না করে রাখে নি। খানিক পরে পুরুষটার রাগ পড়ল এবং অভিমান ও সাধাসাধির পালা শুরু হ’ল দেখে আমরাও ঘরে চলে এলুম।

কিছুক্ষণ পরে একজন ভিক্ষুকের স্বর রাস্তায় শােনা গেল--“রাধাগোবিন্দ, ও মা নন্দরানী, অন্ধজনে দয়া কর, মা” ইত্যাদি। মা শুনতে পেয়ে বললেন, “প্রায়ই রাতে এই রাস্তা দিয়ে ঐ ভিখারীটি যায়, ‘অন্ধজনে দয়া কর, মা’ আগে এই ওর বুলি ছিল। তা গোলাপ ওকে সেদিন বলেছিল ভাল - “ওরে, সঙ্গে সঙ্গে একবার রাধাকৃষ্ণের নামটিও কর। গৃহস্থেরও কানে যাক, তােরও নাম করা হােক। তা নয়, ‘অন্ধ অন্ধ করেই গেলি। সেই হ’তে ও এখানে এলেই এখন রাধাগােবিন্দ’ বলে দাঁড়ায়। গােলাপ ওকে একখানি কাপড় দিয়েছে, পয়সাও পায়।” 

একদিন সন্ধ্যাবেলা গেছি, শুনি মা বলছেন—“নূতন ভক্তদের ঠাকুরসেবা করতে দিতে হয়, কারণ তাঁদের নবানুরাগ, সেবা হয় ভাল। আর, ওরা সব সেবা করতে করতে এলিয়ে পড়েছে। সেবা কি করলেই হয়, মা ! সেবাপরাধ না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখা চাই। তবে কি জান, মানুষ অজ্ঞ জেনে তিনি ক্ষমা করেন।” জনৈকা সেবিকা কাছে ছিলেন, তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন কিনা বুঝতে পারলুম না - কেননা বললেন, “চন্দনে যেন খিচ না থাকে, ফুল-বিল্বপত্র যেন পােকা-কাটা না হয়। পূজো বা পূজোর কাজের সময় যেন নিজের কোন অঙ্গে, চুলে বা কাপড়ে হাত না লাগে। একান্ত যত্নের সঙ্গে ঐ সব করা চাই। আর ভােগরাগ সব ঠিক সময়ে দিতে হয়। 

রাত্রি প্রায় ৮টা। আজ গিয়ে দেখি, মা তখন ঠাকুরঘরের উত্তরে রাস্তার দিকের বারান্ডায় অন্ধকারে বসে জপ করছেন। পাশের ঘরে আমরা বসবার খানিক পরে মা উঠে এলেন এবং হাসিমুখে বললেন, “এসেছ মা, এস।”

আমি - হ্যাঁ মা, আজ আমরা দু’ বােনে এসেছি। আরতি কি হয়ে গেছে? 

মা - না এখনও হয় নি। তােমরা আরতি দেখ, আমি আসছি। 

আরতি আরম্ভ হ’ল। অনেকগুলি মহিলা ঠাকুরঘরে জপ করতে বসলেন। আরতি সাঙ্গ হলে আমরা প্রণাম করে মায়ের উদ্দেশে পাশের ঘরে গেলুম। ওখানে গেলে এক মুহূর্তও মাকে চোখছাড়া করতে ইচ্ছা হয় না। খানিক পরে মা কাছে এসে বসলেন। একটি বৃদ্ধা অপর একজনের কাছে ভক্তি রসাত্মক একটি গান শিখছিলেন। মা তাই শুনে বললেন, “হাঁ, ও যা শিখাবে—দু ছত্র বলে আবার দু' ছত্র বাদ দিয়ে বলবে! আহা, গান গাইতেন তিনি (ঠাকুর) যেন মধুভরা, গানের উপর যেন ভাসতেন! সে গানে কান ভরে আছে। এখন যে গান শুনি, সে শুনতে হয় তাই শুনি। আর নরেনের কি পঞ্চমেই সুর ছিল। আমেরিকা যাবার আগে আমাকে গান শুনিয়ে গেল ঘুসুড়ীর বাড়িতে। বলেছিল, মা, যদি মানুষ হয়ে ফিরতে পারি, তবেই আবার আসব, নতুবা এই-ই। আমি বললুম, “সে কি! তখন বললে, “না, না, আপনার আশীর্বাদে শীঘ্রই আসব।' আর গিরিশ বাবু এই সেদিনও গান শুনিয়ে গেলেন। সুন্দর গাইতেন।’

রাধু, এই সময় মাকে তার কাছে গিয়ে শুতে বলায় মা বললেন, “তুমি যাও না, শোওগে। আহা, ওরা কতদূর থেকে এসেছে, আমি এদের কাছে একটু বসি।” রাধু, তবু, ছাড়ে না দেখে আমি বললুম, “আচ্ছা, মা, চলুন ও ঘরেই ( ঠাকুরঘরে ) চলুন, শােবেন ।” মা বললেন, “তবে তােমরাও এস।” আমরাও গেলুম। মা শুয়ে শুয়ে কথা বলতে লাগলেন এবং আমি বাতাস করতে লাগলুম। খানিক পরে মা বললেন, “এখন বেশ ঠান্ডা হয়েছে, আর না। আমি তখন পায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলুম। একজন বৃদ্ধা অপর একজনকে যােগশাস্ত্রের ষটচক্রভেদ ও বিভিন্ন পদ্মের বীজাদি সম্বন্ধে কিছু বলছিলেন। গােলাপ-মা বললেন, “ও সব বীজ-মন্ত্র অমন করে বলতে নেই।” তবু তিনি বলতে লাগলেন। মা ঐ সব কথা শুনতে শুনতে সহাস্যে আমাকে বললেন, “ঠাকুর নিজ হাতে আমাকে কুল-কুণ্ডলিনী, ষট়্চক্র একে দিয়েছিলেন।” 

আমি জিজ্ঞাসা করলুম, সেখানি কই, মা ?” 

মা — আহা মা, এত যে হবে তা কি তখন জানি ? সেখানি কোথায় যে হারিয়ে গেল, আর পেলুম না। 

রাত প্রায় এগারটা হয়েছিল। আমরা প্রণাম করে বিদায় নিতে মা আশীর্বাদ করে দুর্গা, দুর্গা” বলতে বলতে উঠে বসলেন। যাবার পূর্বে একান্তে আমাদের বললেন, “দেখ, মা, স্বামী-স্ত্রী একমত হলে তবে ধর্মলাভ হয়।” 

* শ্রীশ্রীঠাকুর বলতেন, ভক্তেরা এক আলাদা জাত, ভক্তের স্বভাব গাঁজাখােরের মতাে ইত্যাদি। 

**উত্তর দিকের নহবতের নীচের কুঠরিতে মা থাকতেন। 

*** কলিকাতা কাঁসারীপাড়ায় গিরিশ ভট্টাচার্যের বাড়ি শ্রীশ্রীমার সহােদয় প্রসন্ন মুখােপাধ্যায়ের বাসায় তখন মা উঠেছিলেন। 
কার্তিক, ১৩২১ 

আমাদের বালিগঞ্জের বাসায় ফুলের অভাব ছিল না। মা ফুল পেলে খুব খুশী হন বলে অনেক ফুল যােগাড় করে নিয়ে একদিন ভােরে মায়ের কাছে গেলুম। দেখি মা সবে পূজার আসনে বসেছেন। আমি ফুলগুলি সাজিয়ে দিতে ভারি খুশী হয়ে পূজোয় বসলেন। শিউলি ফুল দেখে বললেন, “এ ফুল এনে বেশ করেছ। কার্তিক মাসে শিউলি ফুল দিয়ে পূজো করতে হয়। এবার আজ পর্যন্ত এই ফুল ঠাকুরকে দেওয়া হয়নি।” 

আমি আজ মায়ের শ্রীচরণপূজার ফুল আলাদা করে রাখিনি। সেজন্য ভাবলুম, আজ আর বােধ হয় মাকে পূজা করা হবে না; কিন্তু ফলে দেখলুম আমার ঐরুপ ভাববার আগেই মা সকল কথা ভেবে রেখেছেন। কারণ, সমস্ত ফুলগলিতে চন্দন মাখিয়ে মন্ত্রদ্বারা পুস্পশুদ্ধি করে নিয়ে পূজা করতে বসবার সময় দেখলাম তিনি থালার পাশে কিছু ফুল আলাদা করে রেখে দিলেন। পরে পূজা শেষ হলে উঠে বললেন, “এস গো মা, ঐ থালায় তােমার জন্য ফুল রেখেছি, নিয়ে এস।” এই সময় একটি ভক্ত অনেকগুলি ফল নিয়ে মাকে দর্শন করতে উপস্থিত হলেন। ভক্তটিকে দেখে মা খুব আনন্দিত হলেন, কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে চিবুকে হাত দিয়ে চুমো খেলেন। কোন পুরুষ-ভক্তকে এইরূপে আদর করতে আমি এ পর্যন্ত মাকে দেখি নি। তারপর আমাকে বললেন, “মা, তােমার ঐ ফুল হতে চারটি ওকে দাও তাে।” আমি দিতে গেলে ভক্তটি অঞ্জলি পেতে ফুল নিলেন। দেখলুম ভক্তির প্রবাহে তখন তাঁর সর্বাঙ্গ কাঁপছে। তিনি সানন্দে মায়ের পায়ে পুম্পাঞ্জলি দিলেন এবং প্রসাদ নিয়ে বাহিয়ে গেলেন। শুনলুম তিনি রাঁচি হ’তে এসেছেন। তক্তাপােশখানিতে বসে মা এইবার সস্নেহে আমাকে ডেকে বললেন, “এইবার এস গাে।” আমি শ্রীচরণে অঞ্জলি দিয়ে উঠতেই মা চুমাে খেয়ে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। এইবার আমরা পান সাজতে গেলুম। পান সেজে এসে মাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি - মা ছাদে চুল শুকাচ্ছেন। আমাকে দেখে বললেন, “এস, মাথার কাপড় ফেলে দাও, চুল শুকিয়ে নাও, অমন ক'রে ভিজে চুলে থেকো না, মাথায় জল বসে চোখ খারাপ হয়।” এর মধ্যে আর একটি স্ত্রী-ভক্তও তথায় উপস্থিত হলেন। ছাদে অনেক গুলি কাপড় শুকাচ্ছিল, মা আমাকে সেইগুলি তুলে কুঁচিয়ে রাখতে বললেন। আমি কাপড়গুলি তুলছি, এমন সময় গােলাপ-মা শ্রীশ্রীমাকে ডেকে নীচে নেমে আসতে বললেন; কারণ ঠাকুরকে ভােগ দিতে হবে। মা নীচে নেমে গেলেন। আমিও খানিক পরে ঠাকুরঘরে গিয়ে দেখি-মা সলজ্জা বধূটির মতাে ঠাকুরকে বলছেন, “এস, খেতে এস।” আবার গােপালবিগ্রহের কাছে বলছেন, “এস গােপাল, খেতে এস।” আমি তখন তার পিছনে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ আমার দিকে দৃষ্টি পড়তেই হেসে বললেন, “সকলকে খেতে ডেকে নিয়ে যাচ্ছি। এই কথা বলে মা ভােগের ঘরের দিকে চললেন। তাঁর তখনকার ভাব দেখে মনে হল যেন সব ঠাকুররা তাঁর পিছনে চলেছেন। দেখে খানিকক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। 

ভােগের ঘর (সর্বদক্ষিণের ঘর) হতে ফিরে এসে মা পাশের ঘরে সকলকে সঙ্গে নিয়ে প্রসাদ পেতে বসলেন। আহারান্তে পাশের ঘরে বিছানা করে দিলুম, মা শয়ন করলেন। কাছে বসতেই মা বললেন, “শােও, এই খেয়ে উঠেছ।” শুয়েছি, মায়ের একটু তন্দ্রার মতো এসেছে, এমন সময় বলরামবাবুর বাড়ির চাকর “ঠাকুর-মা, ঠাকুর-মা” করে ডেকে ঠাকুরঘরে কতকগুলি আতা রেখে গেল। একটি চুপড়ি তে আতা ছিল, লােকটি নীচে সাধুদের কাছে গিয়ে চুপড়িটি কি করবে জিজ্ঞাসা করায় তাঁরা বললেন, “ও আর কি হবে রাস্তায় ফেলে দে।” সে ফেলে দিয়ে চলে যেতেই মা উঠলেন এবং ঠাকুরঘরের রাস্তার দিকের রাস্তায় গিয়ে আমাকে ডেকে বলছেন, “দেখেছ কেমন সুন্দর চুপড়িটি। ওরা তখন ফেলে দিতে বললে। ওদের কি ? সাধু, মানুষ ও সবে কি আর মায়া আছে ? আমাদের কিন্তু সামান্য জিনিসটিও অপচয় করা সয় না। এটি থাকলে তরকারির খােসাও রাখা চলত।” এই বলে চুপড়িটি আনিয়ে ধুইয়ে রেখে দিলেন। মার এই কথায় ও কাজে আমার বেশ একটু শিক্ষা হয়ে গেল। কিন্তু ‘স্বভাব যায় না মলেও’। 

কিছুক্ষণ পরে নীচে একজন ভিক্ষুক এসে ‘ভিক্ষে দাও’ বলে চীৎকার করছিল। সাধুরা বিরক্ত হয়ে তাকে তাড়া দিয়ে উঠেছেন “যাঃ, এখন দিক করিস নে।” মা তাই শুনতে পেয়ে বললেন, 'দেখেছ দিলে ভিখারীকে তাড়িয়ে। ঐ যে নিজেদের কাজ ছেড়ে একটু উঠে এসে ভিক্ষা দিতে হবে, এইটুকুও আর পারলে না, আলস্য হ’ল। ভিখারীকে একমুঠো ভিক্ষা দিতে পারলে না। যার যা প্রাপ্য, তা হ’তে তাকে বঞ্চিত করা কি উচিত? এই যে তরকারির খােসাটা, এও গরুর প্রাপ্য। ওটিও গরুর মুখের কাছে ধরতে হয়।” 

বেলা প্রায় শেষ হয়ে এল। আমার রওনা হবার সময় হয়ে এসেছে। শ্রীশ্রীমাকে প্রণাম করে কিছু প্রসাদ নিয়ে বিদায় গ্রহণ করলুম। 

আজ সন্ধ্যায় গেছি। কাছে হবে বলে এখন বাগবাজারের বাসায় আছি এবং রােজই প্রায় শেষ বেলায় মার কাছে যাই। নিরিবিলি দেখে আজ তাঁকে একটি স্বপ্নবৃত্তান্ত বললুম, “মা, একদিন স্বপ্নে দেখি আপনি তখন জয়রাম বাটীতে, আমি যেন সেখানে গিয়েছি। ঠাকুরকে সামনে দেখে প্রণাম করে জিজ্ঞেস করলুম, মা কোথায়? তিনি বললেন, ঐ গলি ধরে যাও, খড়ের ঘরে সামনের দাওয়ায় বসে আছে।” মা শয়ন করেছিলেন, উৎসাহে একেবারে উঠে ব'সে বললেন, “ঠিক, মা, ঠিকই তো দেখেছ।” 

আমি - সত্য না - কি, মা? আমার কিন্তু এতদিন ধারণা ছিল, আপনার পিত্রালয় ইটের কোঠাবাড়ি। তাই মাটির দাওয়া, খড়ের চালা দেখে ভাবলুম মনের ভ্রান্তি। 

‘ভগবানের জন্য তপস্যা করা প্রয়োজন' এই কথাপ্রসঙ্গে মা এখন বললেন, “আহা গােলাপ, যোগীন ওরা কত ধ্যান-জপ করেছে। যােগীন কতবার চাতুর্মাস্য করেছে - একবার শুধু কাঁচা দুধ ও ফল খেয়ে ছিল। এখনও কত জপ-ধ্যান করে ! গােলাপের মনে বিকার নেই, দিলে হয় তাে খানিকটা দোকানের রাঁধা আলুর দম খেয়ে!” 

আজ মায়ের বাড়িতে কালীকীর্তন হবে। মঠের সন্ন্যাসী মহারাজেরাই কীর্তন করবেন। রাত প্রায় সাড়ে আটটায় কীর্তন আরম্ভ হল। মেয়েরা গান শুনবার জন্য অনেকেই বারান্ডায় গেলেন। আমি মায়ের পায়ে তেল মালিশ করে দিচ্ছিলুম। ওখান হতেও বেশ শুনা যাচ্ছিল। এই সব গান আরও কতবার শুনেছি, কিন্তু ভক্তদের মুখে গানের শক্তি যেন আলাদা—কতই ভাবপূর্ণ বোধ হ’ল ! চোখে জল আসতে লাগল। শ্রীশ্রীঠাকুর যে-সব গান করতেন, মাঝে মাঝে যখন সেই গান দু-একটি হচ্ছে, মা সােৎসাহে বলতে লাগলেন, “এই গাে, এইটি ঠাকুর গাইতেন।” তারপর যখন ‘মজলাে আমার মনভ্রমরা শ্যামাপদ নীলকমলে’-এই গানটি আরম্ভ হল তখন মা আর শয়ন করে থাকতে পারলেন না-চোখে দু-এক ফোঁটা অশ্রু, উঠে বললেন, “চল মা, বারান্ডায় গিয়ে শুনি।” কীতন শেষ হলে মাকে প্রণাম করে বাসায় ফিরলুম।

২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ 

বৈশাখ মাসে শ্রীশ্রীমা জয়রামবাটী হ’তে এসেছেন। ম্যালেরিয়া জ্বরে ভুগে দেহ জীর্ণ শীর্ণ। একটু সুস্থ হলেই দেখা করা উচিত মনে করে এবং তাঁর অসুস্থ শরীর বলে এখনও কাউকে বড় একটা দর্শন করতে দেয়া হচ্ছে না শুনে এতদিন দেখতে যাইনি। পরে মেয়েদের আসতে বাধা নাই’ - আজ এই মর্মে চিঠি পেয়ে গিয়ে দেখি, মা পাশের ঘরটিতে শুয়ে আছেন। দেহ অত্যন্ত শীর্ণ। আমাকে দেখেই বললেন, “এস, মা, এতদিনে এলে গাে।” 

“হ্যাঁ, মা, কবেই তাে আসতুম, কিন্তু শুনেছিলুম, এখনও আপনার অসুখের জন্য আপনার ভক্ত-ছেলেরা সকলের অবাধ আসাটা পছন্দ করছেন না, তাই এত দিন আসি নি। আপনার জন্যে আমাদের প্রাণ ছটফট করে, আর আপনি বাপের বাড়ি গিয়ে এতদিন আমাদের বেশ ভুলে ছিলেন। তা আপনার তাে সর্বত্রই ছেলেমেয়ে রয়েছে, অভাব তাে নেই।”

মা হেসে বললেন, “না, মা, না তােমাদের কারও কথা আমি ভুলি নি, সকলের কথাই মনে করেছি।”

“আপনার অসুখ শুনে আমরা তাে ভয়েই মরি, না জানি কেমন আছেন।” 

“আগের চেয়ে অনেক ভাল আছি, মা, দেখ না পায়ে হাতে কি ছালচামড়াটা উঠে যাচ্ছে।” 

পায়ে হাত দিয়ে দেখি সত্যিই ঐরূপ হয়েছে। 

একখানি কাপড় নিয়ে গিয়েছিলুম, দিতেই মা বলছেন, “বেশ কাপড়খানি এনেছ, মা, এবার কাপড় কমও আছে, পূজোর সময় তো এখানে ছিলুম না। বউ-মা সেদিন এসেছিল। তারা সব ভাল আছে ?” শ্রীমান শােহরণের কথা জিজ্ঞাসা করে বললেন, “তার এখন কি করে চলছে ? কাজকর্ম-চাকরি কিছুরই তাে এখন সুবিধা নেই। কি পােড়া যুদ্ধ লেগেছে ! কতদিনে যে থামবে, লােকে খেয়ে পরে বাঁচবে! তা এ যুদ্ধটা গােড়ায় লাগল কেন বলতাে, মা?” আমি কাগজপত্রে যা পড়েছিলুম কিছু কিছু বলতে লাগলুম।

অধিক কথা কইলে পাছে তাঁর অসুখ বাড়ে এই ভেবে আজ অল্পক্ষণ থেকে বিদায়গ্রহণ করলুম। 
 ৬ই শ্রাবণ, ১৩২৫ 

রাত সাড়ে সাতটা, মায়ের শ্রীচরণদর্শনে গিয়েছি, প্রণাম করতেই বললেন, এস, মা, বস। ভারি গরম, বসে একটু ঠাণ্ডা হও। তারা গিয়ে পৌঁছেছে --সুমতিরা ? 

“হ্যাঁ, মা, তারা গেলে পরেই আমি এসেছি।” 

মা — একখানা পাখা রাধুকে দিয়ে এস, আর এই মরিচাদি তেলটা নাও। পিঠ মালিশ করে দাও। দেখেছ মা, হাতে পেটে আর জায়গা নেই - আমবাতে ঘামাচিতে ভরে গেছে। 

আমি মালিশ করতে বসতেই আরতির ঘণ্টা বেজে উঠল। মা উঠে বসে করজোড়ে ঠাকুরকে প্রণাম করলেন। অন্য সকলে আরতি দেখতে ঠাকুরঘরে চলে গেলেন। 

মা - দেখ, মা, সকলেই বলে ‘এ দুঃখ, ও দুঃখ - ভগবানকে এত ডাকলুম, তবু, দুঃখ গেল না। কিন্তু দুঃখই তাে ভগবানের দয়ার দান।

সেদিন আমার মনটা বড় দুঃখ-ভারাক্রান্ত ছিল, তাই কি মা টের পেয়ে ঐ কথাগুলি বললেন ? মা বলতে লাগলেন, “সংসারে দুঃখ কে না পেয়েছে বল ? বৃন্দে বলেছিল কৃষ্ণকে, ‘কে বলে তােমাকে দয়াময় ? রাম-অবতারে সীতাকে কাঁদিয়েছ, কৃষ্ণ-অবতারে রাধাকে কাঁদাচ্ছ। আর কংস-কারাগারে দুঃখ-কষ্টে দিনরাত কৃষ্ণ কৃষ্ণ করেছে তােমার পিতামাতা। তবে যে তােমাকে ডাকি তা এইজন্য যে তােমার নামে শমনভয় থাকে না।” 

শচীন ও দেবব্রত মহারাজের কথা উঠল। মা বললেন, “শচীন বড় ভাগ্যবান ছিল। দেবব্রত যে রাতে দেহ রাখলে সেই রাতে বৃষ্টি ঝড়, লােকজন এ মঠে তখন কেউ ছিল না। আর শচীন সকালে গেল - মঠ লােকে ভরপুর।” * দেবব্রত মহারাজের কথায় বললেন, “দেবব্রত যােগী পুরুষ ছিল।”

একটি স্ত্রীলােকের কথা উঠল। মা বললেন, “ওরূপে চেহারার লোকের ভক্তি বড় একটা হয় না—ঠাকুর বলতে শুনেছি।” 

আমি বললুম “হ্যাঁ, মা, আবার কান-তুলসে ভিতরবুঁদে ইত্যাদি আছে, ঠাকুরের বইয়ে পড়েছি।” 

মা - ওঃ সেই কথা বলছ? সে নারায়ণদের বাড়ি গিয়ে ওকথা হয়েছিল। একজন একটি স্ত্রীলােককে রেখেছিল। সে স্ত্রীলােকটি এসে ঠাকুরের নিকট আক্ষেপ করে বলেছিল, ওই তাে আমাকে নষ্ট করেছে। তারপর আমার যত গহনা, টাকা ছিল সে সব নিয়েছে।’ ঠাকুর তাে সকলের অন্তরের সব কথাই জানতে পারতেন, তবু, জিজ্ঞাসা করতেন। স্ত্রীলােকটির কথা শুনে বললেন, ‘তাই নাকি? মুখে কিন্তু, ও তো খুব ভক্তির কথা সব বলে। ঐ কথা বলে তিনি ঐ শ্লোকটি বললেন। যা হােক, মাগী তাে তাঁর কাছে পাপের কথা সব ব্যক্ত করে খালাস পেয়ে গেল। 

নলিনী - তা কি হয়, মা ? পাপের কথা একবার মুখে বললে, আর সব ধুয়ে গেল—তাই যায় কি ? 

মা - তা যাবে না ? তিনি যে মহাপুরুষ, তাঁর কাছে বললে যাবে না ? আর এক কথা শোন, পাপ-পূণ্যপ্রসঙ্গ যেখানে হয় সেখানে যত লােক থাকে, তাদের সকলকেই সেই ভালমন্দের একটু না একটু অংশী হতে হয়। 

নলিনী - তা কেন হবে? 

মা আমাদের বললেন, “শােন, মা, কেমন করে হয়। মনে কর, একজন তােমাদের কাছে তার পাপপূণ্যের কথা বলে গেল। মনে কখনও সেই লোকের কথা উঠলেই সঙ্গে সঙ্গে তার ঐ ভালমন্দ কাজগুলিরও চিন্তা এসে পড়বে। এইরূপে সেই ভাল বা মন্দ দুই-ই তােমাদের মনের উপর একটু কাজ করে যাবে। কি বল, মা, তাই না ?” 

আবার লােকের দুঃখকষ্ট ও অশান্তির কথা ওঠায় মা বলতে লাগলেন, “দেখ, লােকে আমার কাছে আসে, বলে - জীবনে বড় অশান্তি, ইষ্টদর্শন পেলুম না। কিসে শান্তি হবে, মা! - কত কি বলে ! আমি তখন তাদের দিকে চাই, আর আমার দিকে চাই, ভাবি - এরা এমন সব কথা কেন বলে। আমার কি তাহলে সবই অলৌকিক! আমি অশান্তি বলে তাে কখনাে কিছু দেখলুম না। আর ইষ্টদর্শন, সে তাে হাতের মুঠোর ভিতর - একবার বসলেই দেখতে পাই।” 

মার ‘ডাকাত বাবা’র কথাটি বইয়ে পড়েছিলাম। তাঁর নিজমুখে হ'তে সেইটি শােনবার ইচ্ছা হওয়ায় মাকে এখন জিজ্ঞাসা করলুম, “মা, বইয়ে পড়েছি একবার আপনি দক্ষিণেশ্বরে আসছিলেন, লক্ষ্মীদিদি প্রভৃতি সঙ্গে ছিলেন। আপনি নাকি তাদের সমান দ্রুত চলতে না পেরে ও সন্ধ্যা হয়ে আসছে দেখে তাদের এগিয়ে যেতে বলে নিজে অনেক পিছিয়ে পড়েছিলেন। এমন সময় আপনার সেই বাগদি মা - পের সঙ্গে দেখা হয়।” 

মা - আমি একেবারে একলা ছিলুম, তা ঠিক নয়। আমার সঙ্গে আরও দু'জন বৃদ্ধা-গােছের স্ত্রীলােক ছিলেন - আমরা তিনজনেই পিছিয়ে পড়েছিলুম। তারপর সেই রুপাের বালা পরা, ঝাঁকরা চুল, কালাে রং, লম্বা লাঠি হাতে পুরুষটিকে দেখে আমি বড্ড ভয় পেয়েছিলুম। তখন ওপথে ডাকাতি হােত। লােকটি, আমরা যে ভয় পেয়েছি, তা বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করলে, কে গা, তােমরা কোথায় যাবে? আমি বললুম, ‘পুবে’। লােকটি বললে, সে এ পথ নয়, ঐ পথে যেতে হবে।’ আমি তবুও এগুই নে দেখে সে তখন বললে, ভয় নেই, আমার সঙ্গে মেয়েলােক আছে, সে পেছিয়ে পড়েছে। তখন ‘বাপ' ডেকে তার আশ্রয়ে যাই। তখন কি এমনি ছিলুম মা ? কত শক্তি ছিল, তিনদিনের পথ হেঁটে এসেছি, বৃন্দাবন-পরিক্রমা করেছি, কোন কষ্ট হয় নি। 

তারপর মা বললেন, “দক্ষিণেশ্বরে নবত দেখেছ? সেইখানে থাকতুম। প্রথম প্রথম ঘরে ঢুকতে মাথা ঠুকে ঠুকে যেত। একদিন কেটেই গেল। শেষে অভ্যাস হয়ে গিছল। দরজার সামনে গেলেই মাথা নুয়ে আসত। কলকাতা হতে সব মোটাসােটা মেয়েলােকেরা দেখতে যেত, আর দরজায় দুদিকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলত, ‘আহা, কি ঘরেই আমাদের সীতা লক্ষ্মী আছেন গাে - যেন বনবাস গাে! ( নলিনী ও মাকুকে লক্ষ্য করে ) - তােরা হলে কি একদিনও সেখানে থাকতে পারতিস?” 

তাঁরা বললেন, “না, পিসীমা, তােমার সবই আলাদা।” 

আমি বললুম, “গুরুদাস বর্মণের বইয়ে পড়েছি, শেষে না-কি আপনাকে একখানি আটচালা ঘর করে দিয়েছিল এবং ঠাকুর একদিন সেই ঘরে গিয়ে খুব বৃষ্টি আরম্ভ হওয়ায়, নিজের ঘরে আসতে পারেন নি।” 

মা - কৈ, মা, কোথায় আটচালা ? অমনি চালাঘর। শরতের বইয়ে সব ঠিক ঠিক লিখেছে। মাস্টারের বইও বেশ—যেন ঠাকুরের কথাগুলি বসিয়ে দিয়েছে। কি মিষ্টি কথা! শুনেছি, ঐ রকম বই আরও চার-পাঁচ খন্ড হতে পারে এমন আছে। তা এখন বুড়াে হয়েছে, আর পারবে কি? বই বিক্রি করে অনেক টাকাও পেয়েছে শুনেছি সে টাকা সব জমা রেখেছে। আমাকে জয়রামবাটীতে বাড়িটাড়ি করতে প্রায় এক হাজার টাকা দিয়েছে (বাড়ির জন্য ৪০০, ও খরচের জন্য ৫৩০,) আর মাসে মাসে আমাকে দশ টাকা দেয়। এখানে থাকলে কখন কখনও বেশী - বিশ পঁচিশ টাকাও দেয়। আগে যখন স্কুলে চাকরি করত, তখন মাসে দুটাকা করে দিত। 

আমি - গিরিশবাবু, না - কি মঠে অনেক টাকা দিয়েছেন ? 

মা - সে আর কি দিয়েছে? বরাবর দিয়েছিল বটে সুরেশ মিত্তির। তবে হ্যাঁ, কতক কতক দিয়েছে বই কি। আর আমাকে দেড় বছর রেখেছিল বেলুড়ে নীলাম্বরের বাড়িতে। দু'হাজার, পাঁচ হাজার মঠে যে দিয়েছে তা নয়। দেবেই বা কোখেকে ? তেমন টাকাই বা কোথা ছিল? আগে তাে পাষণ্ড ছিল, অসৎসঙ্গে থিয়েটার করে বেড়াত। বড় বিশ্বাসী ছিল, তাই ঠাকুরের অত কৃপা পেয়েছিল। এবারে ঠাকুর ওর উদ্ধার করে গেলেন। এক এক অবতারে এক এক পাষণ্ড উদ্ধার করেছেন। যেমন গৌর-অবতারে জগাই-মাধাই—এই আর কি! ঠাকুর এক সময়ে এও বলেছিলেন, “গিরিশ শিবের অংশ। টাকাতে কি আছে, মা? ঠাকুর তো টাকা ছুঁতেই পারতেন না। হাত বেঁকে যেত। তিনি বলতেন, ‘জগৎটাই যে মিথ্যা। ওরে রামলাল, যদি জানতুম জগৎটা সত্যি তবে তােদের কামারপুকুরটাই সােনা দিয়ে মুড়ে দিয়ে যেতুম। জানি ও সব কিছু না - ভগবানই সত্যি ।’

মাকু আক্ষেপ করছে, কী - এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারলুম না। মা বললেন, “থির কিগাে ? যেখানে থাকবি সেইখানেই থির। স্বামীর কাছে গিয়ে থির হবি ভাবছিস, সে কি করে হবে? তার অল্প মাইনে, চলবে কি করে ? তুই তাে ( এখানে যেন ) বাপের বাড়িতেই রয়েছিস। বাপের বাড়ি লােকে থাকে না ? এই দ্যাখ না, এ রয়েছে নিজের সংসার ছেড়ে। তােরা এতটুকু ত্যাগ করতে পারিস নে ? দ্যাখ না একে, কি শান্ত মতি! আর আমি আছি বলে আছে, আর তােরা থাকতে পারিস নে ?” 

আমি - থাক, মা, ঠাকুরের কথা আর একটু বলুন। 

মা - বইয়ে যে লেখে, সব ঠিক হয় না। আমাকে যে ঠাকুর ষােড়শীপূজা করেছিলেন সে কথা রামের বইয়ে যা লিখেছে তা ঠিক হয় নি। 

ঘটনাটি বলে শেষে বললেন, “বাড়িতে তাে নয়ই—দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের ঘরে যেখানে গােল বারান্ডার কাছে গঙ্গাজলের জালাটি রয়েছে ঐখানে। হৃদয় আয়ােজন করে দিয়েছিল।”

এই সময়ে যােগেন-মা এসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মার সঙ্গে কি কথা বলতে যেতেই মা তাকে বললেন, “এদিকে এস-না, তােমাদের যে দেখতেই পাই নে।” যােগেন-মা হাসতে হাসতে মার কাছে এলেন। আসবার সময় আমার গায়ে তাঁর পা ঠেকে গেল। তিনি হাতজোড় করে প্রণাম করছেন দেখে আমি শশব্যস্তে উঠে প্রণাম করে বলছি, “একি যােগেন-মা, যে আপনার চরণধূলিরও যােগ্য নয় তার গায়ে পা ঠেকেছে বলে প্রণাম।” 

যােগেন-মা - সে কি, মা! ছােট সাপটাও সাপ, বড় সাপও সাপ, তােমরা সব ভক্ত যে। 

মায়ের পানে চেয়ে দেখি মুখে সেই করুণামাখা হাসি। রাত্রি অনেক হয়েছে দেখে কিছুক্ষণ পরে প্রণাম করে বিদায় নিলুম। 

* দেবব্রত মহারাজ যখন দেহত্যাগ করেন তখন শ্রীশ্রীমায়ের (দেশে) কোয়ালপাড়ায় খুব অসুখ। তজন্য পূজনীয় শরৎ মহারাজ প্রভৃতি সব তথায় গিয়েছিলেন। শচীন মহারাজ যখন
দেহ রাখেন তখন সকলেই এখানে, শ্রীশ্রীমাও ছিলেন।

 ১২ই শ্রাবণ, ১৩২৫ 

সন্ধ্যার পরে গিয়েছি। এখনও আরতি আরম্ভ হয় নি। মা রাস্তার ধারের বারাণ্ডায় একটি আসন পেতে বসে জপ করছেন। ভারি গরম, কাছে গিয়ে প্রণাম করে বসতেই মা বাতাস করবার জন্য পাখাখানি হাতে দিলেন। বাতাস করছি, এমন সময় একটি বর্ষীয়সী বিধবা এসে মাকে প্রণাম করতেই মা জিজ্ঞাসা করলেন, কার সঙ্গে এলে ?” 

“দারােয়ানের সঙ্গে এসেছি” বলে তিনি আমার কাছে পাখাখানি চাইলেন মাকে বাতাস করবেন। আমি তখনি দিলুম। 

মা বললেন, “থাক থাক ও-ই দিক।” 

তিনি বললেন, “কেন, মা, আমার হাত দিয়ে একটু হবে না? ওরা তাে দিচ্ছেই।” মা যেন একটু বিরক্ত হলেন। তিনি দু-এক মিনিট বার্তা বললেন, “তবে আসি, মা, মহারাজের কাছে একবার যেতে হবে।” মায়ের পায়ে মাথা রেখে প্রণাম করতেই মা মহা বিরক্ত হয়ে বললেন, “আঃ, পায়ে কেন? একে তাে দেহ খারাপ - এই করে করে তাে এই সব (অসুখ) হল।” তিনি চলে যাবার পরে জল দিয়ে পা ধুয়ে ফেললেন। বিধবা স্ত্রীলােকটি গােলাপ মাকে একটু দেখে এসে (তাঁর খুব অসুখ) পুনরায় মায়ের কাছে বিদায় নিতে এলেন। মা বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, এস গে।” এর পূর্বে মাকে কারো সঙ্গে এমন ব্যবহার করতে আমি চক্ষে দেখি নি। 

পরে মা আমাকে বললেন, “আমার আসনখানা তুলে ঘরে নিয়ে যাও আর বিছানাটা নীচে পেতে দাও।” মা এসে শয়ন করলেন এবং হাঁটুতে ঘি মালিশ করে দিতে বললেন। কিছু পরে বললেন, “এখন পিঠে মরিচাদি তেল মালিশ করে দাও।” 

ললিতবাবুর কথা উঠল। আমি বললুম, “মা, তিনি তাে শুনেছি আপনার কৃপাতেই বেঁচে গেছেন।” 

মা — তার অনেক বাসনা ছিল। তার যা অবস্থা হয়েছিল, মা, বালতি বালতি জল বেরুত পেট থেকে। একেবারে শেষ অবস্থাতেই দাঁড়িয়েছিল? তখন বড় কাতর হয়ে বললে, মা, কামারপুকুরে, জয়রামবাটীতে মন্দির করব, হাসপাতাল দেবাে, আমার বড় আশা ছিল, কিছুই করতে দিলি নি! আহা ! ঠাকুর বাঁচিয়েছেন। ওখানে সব করবার ইচ্ছা ওর মতাে আর কোন ভক্তের নেই। বেঁচেছে, এখন কাজ করুক। আমাকে একটি পুকুর কিনে দিয়েছে। 

১৩ই শ্রাবণ, ১৩২৫

 আজ বৈকালে প্রেমানন্দ স্বামীজী দেহত্যাগ করলেন। রাত্রে মায়ের নিকট গেলুম। মা বললেন, “এসেছ, মা, বস! আজ বাবুরাম আমার চলে গেল। সকাল হতে চক্ষের জল পড়ছে।” এই বলে কাঁদতে লাগলেন। “বাবুরাম আমার প্রাণের জিনিস ছিল। মঠের শক্তি, ভক্তি, যুক্তি সব আমার বাবুরামরুপে গঙ্গাতীরে আলাে করে বেড়াত। বাবুরামের মা ছিল আঁটকুড়ে ঘরের মেয়ে, বাপের বিষয় পেয়েছিল। সে জন্য একটু অহঙ্কার ছিল। নিজেই বলত, ‘হাতে বাউটি, কোমরে সােনার চন্দ্রহার পরে মনে করতুম ধরা যেন সরা। চারিটি সন্তান রেখে সে গেছে। একটি কেবল তার পূর্বে মারা গিয়েছিল।” 

খানিক পরে দেখি, মাঝের ঘরের দক্ষিণের দেয়ালে ঠাকুরের যে বড় ছবি ছিল তার পায়ে মাথা রেখে করুণস্বরে বলছেন, “ঠাকুর, নিলে!” - সে কি মর্মভেদী স্বর ! আমাদেরও বড় কান্না পেতে লাগল। 

এদিকে গোলাপ মার খুব অসুখ - মরণাপন্ন রক্তআমাশয় চলেছে। 

১৪ই শ্রাবণ, ১৩২৫ 

রাত সাড়ে সাতটা। শ্রীশ্রীমা ঠাকুরঘরে বসে আছেন। গিয়ে প্রণাম করে উঠতেই বললেন, ‘বারাণ্ডায় আমার আসনখানি পেতে দাও তাে মা, আর তক্তাপোশের পাশে মেজেয় পাতা ঐ বিছানাটা গুটিয়ে রাখ, আরতির সময় ওরা ওখানে বসে ঋাঁজ বাজাবে।” বিলাস মহারাজ আরতির আয়ােজন করছিলেন। বারাণ্ডায় আসন পেতে দিতে, মা বললেন, “কমণ্ডলুতে গঙ্গাজল আছে, নিয়ে এস।” গঙ্গাজলে হাতমুখ ধুয়ে জপে বসলেন এবং পাখাখানি আমার হাতে দিয়ে বাতাস করতে বললেন। একটু পরেই আরতি আরম্ভ হ’ল। শ্রীশ্রীমা “গুরুদেব, গুরদেব” বলে জোড়হাতে প্রণাম করলেন এবং জপ শেষ করে আরতি দেখতে লাগলেন। আরতি হয়ে গেলে বিলাস মহারাজ শ্রীশ্রীমাকে প্রণাম করে উঠে বললেন, “মা, আজ ভারি গরম।” মা ব্যস্ত হয়ে বললেন, “একটু বাতাস করবে?” 

তিনি বললেন, “কে করবে, মা?”

“কেন, এই মা করবে, করতাে মা।” আমি তার দিকে দু-একবার বাতাস করতেই তিনি বললেন, “না, মা, উনি আপনাকে বাতাস করছেন আপনাকেই করুন।” এই বলে বাইরে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে মা প্রেমানন্দ স্বামীজীর কথা তুলে বললেন, “দেখ, মা, বাবুরামের দেহেতে আর কিছু ছিল না, কেবল কাঠামখানি ছিল।” এমন সময়ে চন্দ্রবাবু, উপরে এসে ঐ কথায় যােগ দিলেন এবং বাবুরাম মহারাজের দেহ সৎকারের জন্য কয়েকজন ভক্ত যে চন্দনকাঠ, ঘি, ধুপ, গুগগুল, ফুল ইত্যাদি চার-পাঁচ শ’ টাকার জিনিস দিয়েছেন তাই বলতে লাগলেন। মা বললেন, “আহা! ওরাই টাকা সার্থক করে নিলে। ঠাকুরের ভক্তের জন্য দেওয়া। ভগবান ওদের দিয়েছেন, আরও দেবেন।” চন্দ্রবাবু প্রণাম করে উঠে গেলেন। মা বলতে লাগলেন, “শােন মা, যত বড় মহাপুরুষই হােক, দেহধারণ করে এলে দেহের ভােগটি সবই নিতে হয়। তবে তফাৎ এই, সাধারণ লােক যায় কাঁদতে কাঁদতে, আর ওঁরা যান হেসে হেসে - মৃত্যুটা যেন খেলা। 

‘আহা! বাবুরাম আমার বালককালে এসেছে। ঠাকুর কত রঙ্গের কথা বলতেন, আর নরেন বাবুরাম এরা আমার হেসে কুটিপাটি হােত। একদিন কাশীপুরে আড়াই সের দুধসুদ্ধ একটা বাটি নিয়ে সিঁড়ি উঠতে গিয়ে আমি মাথা ঘুরে পড়ে পেলুম। দুধ তাে গেলই, আমার পায়ের গােড়ালির হাড় সরে গেল। নরেন, বাবুরাম এসে ধরলে। পরে পা খুব ফুলে উঠল। ঠাকুর তাই শুনে বাবুরামকে বলছেন, তাই তো, বাবুরাম, এখন কি হবে, খাওয়ার উপায় কি হবে? কে আমায় খাওয়াবে? তখন মণ্ড খেতেন। আমি মণ্ড তৈরি করে উপরের ঘরে গিয়ে তাকে খাইয়ে আসতুম। আমি তখন নথ পরম, তাই বাবুরামকে নাক দেখিয়ে হাতটি ঘুরিয়ে ঠারে ঠোরে বলছেন, ‘ও বাবুরাম, ঐ যে ওকে তুই ঝুড়ি করে মাথায় তুলে এখানে নিয়ে আসতে পারিস ?” ঠাকুরের কথা শুনে নরেন, বাবুরাম তাে হেসে খন। এমনি রঙ্গ তিনি এদের নিয়ে করতেন। তারপর তিন দিন পরে ফোলাটা একটু কমলে ওরা আমাকে ধরে ধরে নিয়ে যেত — আমি খাইয়ে আসতুম। ও-কয়দিন গােলাপ-মা মণ্ড তৈরি করে দিয়েছিল, নরেন খাইয়ে দিত। 

“বাবুরাম তার মাকে বলত, ‘তুমি আমাকে কি ভালবাস ! ঠাকুর আমাদের যেমন ভালবাসেন, তুমি তেমন ভালবাসতে জান না। সে বলতাে, আমি মা, আমি ভালবাসি না, বলিস কিরে ? এমনি তাঁর ভালবাসা ছিল। বাবুরাম চার বছরের সময়ই বলত, “আমি বে করব না - বে দিলে মরে যাব। ঠাকুর যখন বলেছিলেন, আমি পরে সুক্ষ্ম শরীরে লক্ষ মুখে খাব,’ বাবুরাম বলেছিল, ‘তােমার লক্ষ-টক্ষ আমি চাই নে, আমি চাই তুমি এই মুখটিতে খাবে, আর আমি এই মুখটিই দেখব।’

“অনেকগুলাে ছেলেপিলে হয় যার, ঠাকুর তাকে গ্রহণ করতেন না। একটা দেহ হতে পঁচিশটা ছেলে বেরুচ্ছে, ওরা কি মানুষ! সংযম নেই, কিছু নেই -  যেন পশু!” 

গােলাপ-মার অসুখ আজ একটু কম। কি ঔষধ দিয়ে জুস দেওয়া হয়েছে - সরলা এসে বললেন ; ডাক্তার বিপিন বাবু বলেছেন, “তিন মাস লাগবে সারতে।” 

মা বললেন, রক্তামাশয় কি সােজা ব্যারাম ! তা লাগবে বইকি। ঠাকুরের অমনি আমের ধাত ছিল। দক্ষিণেশ্বরে এই সময় ( বর্ষাকালে) প্রায় আমাশয় হােত। নবতের দিকে লম্বা বারাণ্ডার ধারে একটা কাঠের বাক্স ফুটো করে নীচে সরা পেতে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে শৌচে যেতেন। আমি সকালেরটা ফেলে আসতুম। বিকালেরটা ওরা ফেলতাে। সেই সময়ে একটি মেয়ে আসে, বললে কাশীতে থাকে। সে প্রদীপের শীষে আঙুল তাতিয়ে প্রত্যহ ঠিক একুশবার করে তাপ দিতে মলদ্বারের ফুলাে টনটনানি কমে গেল। আমি তখন ভাবতুম - একে আমাশয়, তাতে গরম সেক, বেড়েই বা যায়। কিন্তু বাড়ল না, সেরে গেল। 

সেই মেয়েটিই আমাকে সে বাড়ি থেকে নবতে নিয়ে এসেছিল; বলল, “মা, তাঁর এমন অসুখ, আর তুমি এখানে থাকবে ?’ আমি বললুম, “কি করবাে, ভাগ্নে বউটি একা থাকবে, ভাগ্নে (হৃদয়) সেখানে ঠাকুরের কাছে রয়েছে। মেয়েটি বললে, তা হােক, ওরা লােকটোক রেখে দেবে। এখন তোমার কি তাঁকে ছেড়ে দূরে থাকা চলে?' আমি তার কথা শুনে তাঁর সঙ্গে চলে এলুম। কয়েক দিন পরে তিনি একটু সারলে সে মেয়েটি চলে গেল। কোথায় গেল আর কোন খোঁজ পেলুম না। তারপর আর দেখা হয় নি। সে আমার বড় উপকার করেছে। কাশী গিয়েও তাঁর খোঁজ করেছিলুম, পাই নি। তাঁর (ঠাকুরের) প্রয়ােজনে সব কোথা হতে আসত, আবার কোথা চলে যেত। 

“আমিও এক বছর আমাশয়ে ভুগেছি, মা। সে কি শরীর হয়ে গেল। দেশে আমাদের কলুপুকুরের ধারে শৌচে যেতুম। বারবার যেতে কষ্ট হোত বলে সেখানটিতেই শুয়ে পড়ে থাকতুম। একদিন পুকুরজলে শরীর পানে চেয়ে দেখি শুধু হাড় সার হয়েছে, দেহেতে আর কিছু নেই। তখন ভাবলুম - আরে ছিঃ ! এই দেহ, তবে আর কেন ? এইখানেই দেহটি থাক, দেহ ছাড়ি। পরে নিবি ( মা কি নাম বললেন ঠিক মনে নেই) এসে বললে, ‘ওমা, তুমি এখানে পড়ে কেন? চল চল, ঘরে চল - বলে ঘরে নিয়ে এল। এখন আর পুকুরধারে সে সব জায়গা নেই। ভাগ করে সব ঘিরে - ঘুরে নিয়েছে।” 

রাত্রি সাড়ে দশটা হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে আমি বিদায় নিলুম। 

১৫ই শ্রাবণ, ১৩২৫ 

আজ দর্শন করতে গিয়ে সুবিধা থাকায় মার সঙ্গে অনেক কথা হয়েছিল। সবই কিন্তু মঠের সন্ন্যাসী ছেলেদের কথা। প্রেমানন্দ স্বামীজীর দেহরক্ষায় বােধ হয় তাঁর মনে আজকাল ছেলেদের কথা সর্বক্ষণ উদিত হচ্ছিল, তাই তাঁদের কথা তুলে মা বললেন, “ঠাকুরকে ছেলেরা সব বীড়ে ( পরীক্ষা করে ) নিয়ে তবে ছেড়েছে। বরানগর মঠে যখন ওরা ছিল, তখন আহা! নিরঞ্জন-টন ওরা সব কতদিন আধপেটা খেয়ে ধ্যানজপ নিয়ে কাটিয়েছে। একদিন সকলে বলাবলি করলে, “আচ্ছা, আমরা যে ঠাকুরের নামে সব ছেড়ে ছুড়ে এলুম, দেখি তার নাম নিয়ে পড়ে থাকলে তিনি খেতে দেন কি-না। সুরেশবাব এলে কিছু বলা হবে না। ভিক্ষেটিক্ষেও কেউ করতে যাব না। এই বলে সব চাদর মুড়ি দিয়ে ধ্যান লাগিয়ে দিলে। সারাদিন গেল-রাতও অনেক হয়েছে, এমন সময় শোনে দরজায় কে ঘা মারছে। নরেন আগে উঠেছে, বলছে - “দেখ তাে দরজা খুলে কে? আগে দেখ তার হাতে কিছু আছে কি-না। আহা! খুলেই দেখে লালবাবুর মন্দির থেকে (গঙ্গার ধারের শ্রীশ্রীগােপালের বাড়ি) ভাল ভাল সব খাবার নিয়ে একজন লােক এসেছে। দেখে তাে সব মহা খুশীঠাকুরের দয়া টের পেল। তখনি উঠে ঠাকুরকে ভােগরাগ দিয়ে সেই রাতে সকলে প্রসাদ পেলে। এমনি আরও কদিন হয়েছে। সিঁথির বেণী পালের বাড়ি হতেও অমনি করে এক দিন লুচি এসেছিল। এখন ছেলেরা তাে মহাসুখে আছে। আহা! নরেন, বাবুরাম ওরা সব কত কষ্ট করে গেছে। এখন তােমাদের মহারাজ - সেই রাখালকেও আমার কতদিন ভাতের হাল্ডা মাজতে হয়েছে। নরেন একবার গয়া কাশীর দিকে যেতে যেতে দুদিন না খেয়ে এক গাছতলায় পড়েছিল। খানিক পরে দেখে, কে তাকে ডাকছে। দেখে, একটি লোক খানকতক লুচি, তরকারি, মিষ্টি আর এক ঘটি ঠাণ্ডা জল সামনে ধরে বললে, “রামজীর প্রসাদ এনেছি, গ্রহন করুন। নরেন বললে, ‘আমার সঙ্গে তাে তােমার কোন পরিচয় নেই, তুমি ভুল করছ—আর কাউকে দিতে বলেছেন।’ লােকটি মিনতি করে বললে, ‘না মহা রাজজী, আপনার জন্যেই এই সব এনেছি। পরে আমি ঘুমিয়েছি, দেখি কি স্বপ্নে একজন বলছেন - শীগগির ওঠ, অমুক গাছতলায় যে সাধু; আছেন, তাঁকে খাবার দিয়ে আয়। স্বপ্ন ভেবে আমি তাতেও না উঠে পাশ ফিরে শুলুম। তখন আমার গায়ে ধাক্কা দিয়ে তিনি বললেন -- আমি উঠতে বলছি, আর তুই ঘুমােচ্ছিস শীগগির যা। তখন মনে হল মিথ্যা স্বপ্ন নয়, রামজীই হুকুম করছেন। তাই এই সব নিয়ে ছুটে এসেছি। তখন নরেন, ঠাকুরেরই দয়া ভেবে ঐ সব খাবার গ্রহণ করে।

“আর একবার এমনি হয়েছিল। তিন দিন পাহাড়ে হেঁটে হেঁটে নরেনের খিদেয় মুর্ছা যাবার মতাে অবস্থা, এমন সময়ে এক মুসলমান ফকির একটি কাঁকুড় দেয়, সেইটি খেয়ে তবে বাঁচে। নরেন আমেরিকা হতে ফিরে এসে এক সভায় (আলমােড়ায়) একদিন ঐ মুসলমানটিকে একধারে দেখতে পেয়ে উঠে গিয়ে তার হাত ধরে নিয়ে এসে সভার মাঝে বসালে। সকলে বললে, একি ? তখন নরেন বললে, ‘এ আমার জীবনদাতা।'—এই বলে ঘটনাটি সকলকে বললে। তাকে টাকাও দিয়েছিল। সে কিছুতেই নেবে না; বলে, ‘আমি কি করেছি যে টাকা দিচ্ছেন ?’ নরেন তা কি শােনে ?---’বলে দিয়ে দিলে।

“আহা! নরেন আমাকে মঠে নিয়ে গিয়ে প্রথম পূজা (দূর্গাপূজা) যেবার করায়  - সেবার পূজককে* আমার হাত দিয়ে পঁচিশ টাকা দক্ষিণে দেওয়ালে। চৌদ্দশ’ টাকা খরচ করেছিল। পুজোর দিন লােকে লােকারণ্য হয়ে গেছে। ছেলেরা সবাই খাটছে। নরেন এসে বলে কি, ‘মা, আমার জ্বর করে দাও?’ ওমা, বলতে না বলতে খানিক বাদেই হাড় কেঁপে জ্বর এল। আমি বলি, মা, একি হল, এখন কি হবে ? নরেন বললে, কোন চিন্তা নেই মা। আমি সেধে জ্বর নিলম এইজন্য যে, ছেলেগুলাে প্রাণপণ করে তাে খাটছে তবু, কোথায় কি এুটি হবে আর আমি রেগে যাব, বকবাে, চাই কি দুটো থাপ্পড়ই দিয়ে বসবাে, তখন ওদেরও কষ্ট হবে, আমারও কষ্ট হবে। তাই ভাবলুম - কাজ কি, থাকি কিছুক্ষণ জ্বরে পড়ে। তারপর কাজকর্ম চুকে আসতেই আমি বললুম, ও নরেন, এখন তা হলে ওঠ। নরেন বললে, ‘হাঁ মা, এই উঠলুম আর কি।’ এই বলে সুস্থ হয়ে যেমন তেমনি উঠে বসল।

“তাঁর মাকেও পূজার সময় মঠে নিয়ে এসেছিল। সে বেগুন তােলে, লঙ্কা তােলে আর এ বাগান, ও বাগান ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। মনে একটু অহং যে, আমার নরেন এ সব করেছে। নরেন তখন তাকে এসে বলে, ‘ওগাে, তুমি করছ কি? মায়ের কাছে গিয়ে বস না—লঙ্কা ছিঁড়ে বেগুন ছিঁড়ে বেড়াচ্ছ। মনে করছ বুঝি তােমার নরু এ সব করেছে। তা নয়, যিনি করবার তিনিই করেছেন, নরেন কিছু নয়।’ মানে ঠাকুরই করেছেন। আহা! আমার বাবুরাম নেই, কে এবার পুজো করবে?" 

* সেবার কৃষ্ণলাল মহারাজ পূজক ও শশী মহারাজের বাবা তন্ত্রধারক ছিলেন। কৃষ্ণলাল মহারাজ পূজা করলেও তন্ত্রধারকই সব দেখিয়ে শুনিয়ে দেওয়ায় কার্যতঃ তিনিই পূজক ছিলেন শ্রীশ্রীমা পূজক বলতে তাঁকেই লক্ষ্য করেছেন। 

২১শে শ্রাবণ, মঙ্গলবার, অমাবস্যা - ১৩২৫ 

আজ গিয়ে দেখি, মা উত্তরের বারাণ্ডায় বসে জপ করছেন। খানিক পরে পাঁচ-ছয়টি মেয়েলােক মাকে দেখতে এলেন। তাঁরা ঠাকুরপ্রণাম করে বসতেই মা জপ শেষ করে তাঁরা কোথা হতে আসছেন, জিজ্ঞাসা করলেন। নলিনী তাঁদের পরিচয় দিলেন। শুনলাম, তাঁদের মধ্যে একজন চিকিৎসার জন্য এসেছেন, পেটে ‘টিউমার’ (ফোড়া) হয়েছে, ডাক্তার সাহেব বলেছেন অস্ত্র করতে হবে, তাই শুনে তিনি বড় ভয় পেয়েছেন। কে জানে কেন, মা এদের কাউকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে দিলেন না। তাঁরা ঐজন্য বারবার প্রার্থনা করলেও স্বীকৃতা না হয়ে বললেন, “ঐ চৌকাঠ হতে ধুলে নাও।” তাঁরা শেষে অসুস্থ মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, “আপনি আশীর্বাদ করুন যেন ও সেরে উঠে আবার আপনার দর্শন পায়।” মা ভরসা দিয়ে বললেন, “ঠাকুরকে ভাল করে প্রণাম কর, উনিই সব।” পরে যেন একটু অতিষ্ঠভাবে বললেন, তবে তােমরা এখন এস, রাত হ’ল।” তারা ঠাকুরপ্রণাম করে চলে যাবার পর বললেন “গঙ্গাজল ছিটিয়ে ঘর ঝাঁট দিয়ে ফেল, ঠাকুরের ভােগ উঠবে।” বউ আদেশ পালন করলে মা উঠে এসে নীচের বিছানায় শুয়ে গায়ের কাপড় খুলে ফেলে আমার হাতে পাখা দিয়ে বললেন, “বাতাস কর তাে, মা, শরীর জ্বলে গেল। গড় (প্রণাম) করি, মা, কলকাতাকে। কেউ বলে আমার এ দুঃখ কেউ বলে আমার ও দুঃখ, আর সহ্য হয় না। কেউ বা কত কি করে আসছে, কারো বা পঁচিশটা ছেলেমেয়ে -- দশটা মরে গেল বলে কাঁদছে - মানুষ তাে নয়, সব পশু - পশু ! সংযম নেই কিছু নেই! ঠাকুর তাই বলতেন, ‘ওরে এক সের দুধে চার সের জল, ফুঁকতে ফুঁকতে আমার চোখজ্বলে গেল ! কে কোথায় ত্যাগী ছেলেরা আছিস - আয় রে, কথা ক'য়ে বাঁচি। ঠিক কথাই বলতেন। জোরে বাতাস কর মা, আজ বেলা চারটা হতে লােক আসছে, লােকের দুঃখ আর দেখতে পারি না। 

“আহা! আজ বলরামের পরিবারও এসেছিল, বাবুরামের জন্য কত কাঁদলে। বললে, ‘একি আমার যে - সে ভাই।’  তাই তাে, মা, দেবতা ভাই।” 

খানিক পরে তেল মালিশ করতে বললেন। মালিশ করতে করতে বললুম, ‘মা, ডাল রান্না করে এনেছি - ভক্তেরা খাবেন বলে।” মা বললেন, “বেশ করেছ, রাখালও দু'টো ইলিশ মাছ পাঠিয়েছে। বাবুরাম গিয়ে অবধি সে এখনও মাছ খায় নি।” 

এর পূর্বে একদিন রাধুর বর মাংস খেতে চেয়েছিল। সেই কথা এখন - একজন বলায় মা বললেন, “এখন এখানে কেমন করে হবে? এই বাবুরামটি আমার চলে গেছে, সবারই মন খারাপ। এ ঠাকুরের সংসার, তাই কাজকর্ম সব হচ্ছে। তা না হলে কান্নার রােলে বাড়ি ভরে যেতাে, কেউ কি উঠতে পারতাে। তবে খেতে চেয়েছে, দিতেই হবে। তা এরা যদি রান্না করে আনে, তবে হতে পারে।” এই বলে আমার পানে চাইতেই বললুম, ‘জামাই যদি আমাদের হাতে খান তবে অবশ্যই আনতে পারব।” মা বললেন, “তা খাবে না কেন ? খুব খাবে। রান্না করে বামুন ঠাকুরকে দিয়ে পাঠিয়ে দিও। ছেলেদের কারু কারু; অরুচি হয়েছে, জগদম্বার প্রসাদ হলে তারাও একটু একটু খাবে - তা কত হলে হবে যােগীন?”

যােগীন - মা বললেন, “তা তিন-চার টাকার কম হবে না।” 

মা বললেন, “তবে কিছু টাকা নিয়ে যেয়ো।” 

আমি - তা হবে না, মা শােকহরণ রাগ করবে। 

মা হাসতে লাগলেন, বললেন, “তবে থাক।” 

পরের রবিবার কালীঘাট হতে মহাপ্রসাদ আনিয়ে রেঁধে পাঠানাে হল।

২৭শে শ্রাবণ, সােমবার 

আজ মায়ের কাছে যেতেই মা বললেন, “পাঁঠা বেশ হয়েছিল গাে, সব্বাই বেশ খেয়েছে। কেমন করে রাঁধলে? আমি যখন ঠাকুরের জন্য রাঁধতুম কাশীপুরে, কাঁচা জলে মাংস দিতুম, কখানা তেজপাতা ও অল্প মসলা দিতুম, তুলোর মতাে সিদ্ধ হলে নামিয়ে নিলুম।” 

আমি -- সে বােধ হয় যুষ (সুরুয়া) হােত, মা। 

মা - তা হবে। নরেন আমার নানা রকমে মাংস রাঁধতে পারতাে। চিরে চিরে ভাজতাে, আলু চটকে কি সব রাঁধতো - তাকে কি বলে ? 

আমি - বােধ হয় চপ, কাটলেট হবে। 

মা জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি সে সব রাঁধতে পার ?” 

আমি - পারি। কাল জামাইর জন্যে ক'রে আনবাে। শােকহরণের বড় ইচ্ছা, আপনাকে কিছু খাবার তৈরি করে খাওয়ায়। তা আমি যদি রেঁধে আনি, খাবেন আপনি? 

মা - তা খাব না কেন, মা? তুমি হলে আমার মেয়ে। তবে বেশী করো না, অল্প-স্বল্প। দেহ সুস্থ নয় কি-না, আর এই রাস্তাটা দিয়ে আনতে হবে। 

আমি -- আচ্ছা, তাই হবে। 

এই বলে সেদিন বিদায় নিলুম। 

পর দিন কিছু খাবার করে নিয়ে যেতেই মা বলেছেন, “এই দেখ গাে, আবার কত কষ্ট করে এ সব নিয়ে এসেছে। “

নলিনীদিদি বললেন, “তুমি চাও কেন, তাই তাে নিয়ে আসে।” 

মা বললেন, “তা, ওদের কাছে চাইব না--আমার মেয়ে ? আর এটা কি কম সৌভাগ্যের কথা ! কি বল, মা ?” 

আমি - সে তাে ঠিক কথা। মা যে কৃপা করে আনতে বলেন, তাতেই আমরা ধন্য হয়ে যাই। 

আজ অনেক রাত্রি হতে তবে গিয়েছিলুম। ভােগের পর প্রসাদ নিয়ে বাড়ি আসবার সময় বললুম, ‘কাল বােধ হয় আসা হবে না, মা, এক বিয়ে বাড়িতে নিমন্ত্রণ আছে।” 

-“আচ্ছা, তা কাল না এলে ভাববো বিয়ে বাড়ি গেছ।” 

ঘিটা সেদিন ভাল ছিল না; “ভাজা জিনিসগুলো তেমন ভাল হয় নি” মা বলতে আর একদিন ভাল ঘিয়ে কয়েক রকম খাবার, পিঠে, ডাল ও তরকারি রেঁধে নিয়ে গিয়েছিলুম। খেয়ে মা খুব আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। মার ভাইঝি নলিনীদিদির একটু শুচিবাই ছিল। তিনিও সেদিন ঐ সব খাবার খেয়ে বলেছিলেন, “আমার তাে কারুর রান্না রােচে না, কিন্তু এর হাতে খেতে তাে ঘেন্না হচ্ছে না?” মা বললেন, “কেন হবে ?-ও যে আমার মেয়ে।” পরে আমাকে বলছেন, “দ্যাখ, সেদিন যে কচুশাকের অম্বল দিয়েছিলে, তা আমাকে ওরা দেয় নি।”

২৯শে শ্রাবণ, ১৩২৫ 

আজ গিয়ে দেখি মা ডাক্তার দুর্গাপদবাবুর ভগ্নীর সঙ্গে কথা কচ্ছেন। বােডিং-এর দুটি মেয়ে ও ঢাকা হতে একটি বউ এসেছেন। সকলে মাকে ঘিরে বসে আছেন। প্রণাম করে আমি বসলুম। ডাক্তারবাবুর ভগ্নী অল্প বয়সে বিধবা হয়েছেন। তাঁর স্বামীর বিষয় নিয়ে গােল বেঁধেছে, ভাগ্নেরা গােল করছে, উইলের ‘প্রবেট’ পেতে দেরী হচ্ছে, এইসব অনেকক্ষণ কথাবার্তা হল। শেষে মা বললেন, “দান-বিক্রয়ে যখন তােমার অধিকার নেই তখন ভাল লােকের হাতে বন্দোবস্তের ভার দিও। সংসারী বিষয়ী লােকদের কি বিশ্বাস আছে? টাকা কড়ির লোভ সামলে কাজ করতে পারে প্রকৃত সাধু-সন্ন্যাসীতে; তা মা, তুমি অত ভেব না। যা করবার হরি করবেন। তুমি সৎপথে আছ; ঠাকুর কি আর তােমায় কষ্টে ফেলবেন? তবে এখন এস, (গাড়ি এসেছে, বাহির হতে তাগিদ আসছিল) চিঠি পত্র দিও, আবার এস।” 

তিনি বিদায় নেবার পরে শ্রীযুক্ত শ্যামাদাস কবিরাজ গােলাপ-মাকে দেখতে এলেন। তিনি যদি দেখা করতে আসেন ভেবে মা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। পরে তিনি চলে গেছেন শুনে শয়ন করলেন এবং আমার দিকে চেয়ে বললেন, “এইবার তােমার কাজটি কর।” আমি তেল মালিশ করতে বসলুম। 

তেল মাখতে মাখতে মা বললেন, “আহা, গিরিশ ঘােষের বােন আমাকে বড় ভালবাসত, বাড়িতে যা রান্নাবান্না করত আমার জন্যে আগে রেখে নিয়ে আসত। কত রকম রান্না করিয়ে ব্রাহ্মণ দিয়ে নিয়ে এসে, বসে বসে আমাকে খাওয়াত। একদিন বলে কি, মা দুখানা ইলিশমাছ ভাজা খাও না, তােমার আর দোষ কি? আমি বললুম, তা কি হয়, মা? তার ভালবাসা মুখে-দেখান ছিল না। বড় ঘরের বউ ছিল, টাকা পয়সা ছিল সে সব পাঁচ জনে নিয়ে নষ্ট করলে। অতুল পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসা খুলে বসল। তা ছাড়া এক বৎসর স্বামীর চিকিৎসায় অনেক টাকা ব্যয় করেছিল। শেষে মরবার সময় আমার জন্যে একুশ টাকা লিখে দিয়ে গিয়েছিল। বেঁচে থাকতে হাতে করে দিতে লজ্জাবােধ করেছিল—কি বলে মাত্র একশ’টি টাকা দেয়। দেহ রাখাবার পরে, তার ভাই এসে আমাকে টাকাটা দিয়ে যায়। আহা! বোধনের দিন দুপরে আমার সঙ্গে শেষ দেখা করে গেল। যতক্ষণ ছিল সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে লাগল। সেবার পূজোর পরেই আমাদের কাশী যাওয়া হবে বলে সেদিন জিনিসপত্র গুছাতে এঘর ওঘর করে একটু ব্যস্ত ছিলুম। যাবার সময় বললে, তবে আসি, মা। আমি অন্যমনস্ক হয়ে বললুম হাঁ, যাও।' বলতেই থপ থপ করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। সে যেতেই মনে হল, বললম কি ? যাও বললুম ? এমন তাে আমি কাউকে বলি নে! আহা! আর এল না। * কেনই বা অমন কথা মুখ দিয়ে বেরুল?” 

• তিনি সেই দিন রাত্রেই হঠাৎ দেহত্যাগ করেন। মা ঐ দিন বৈকালে মঠে পূজা দেখতে গিয়েছিলেন। 

কিছুক্ষণ অন্য মনে চুপ করে থাকবার পর আমাকে বললেন, “কাল এলে না, মা, কেমন লাল পদ্মগুলি পাঠিয়েছিল শোকহরণ। আমি নিজেই তা দিয়ে ঠাকুরপূজো করেছিলুম। কেমন ঠাকুর সাজিয়েছিলুম। তুমি এসে দেখবে বলে সন্ধ্যার পরও অনেকক্ষণ রেখেছিলুম।”

আজ সন্ধ্যার সময় গিয়ে দেখি, মা শুয়ে আছেন ও রাধু, তার পাশে ভিন্ন পাটিতে শুয়ে গল্প বলবার জন্যে তাঁকে পীড়াপীড়ি করছে। আমাকে দেখেই মা, বললেন, একটি গল্প বলতাে, মা।” আমি মুশকিলে পড়ে গেলুম, মায়ের কাছে কি গল্প বলি। তারপর সেদিন মীরাবাঈ পড়ে গিয়েছিল সেই গল্প’ বললুম। মীরার ‘বিন, প্রেমসে নহি মিলে নন্দলালা” এই দোঁহাটি বলতেই মা: বললেন, “আহা, আহা! তাই তো, প্রেমভক্তি না হলে হয় না।” রাধুর কিন্তু এ গল্পটা বড় মনঃপূত হল না, শেষে সরলা এসে দুয়ােরানী সুয়ােরানীর গল্প বলতে সে খুশী হল। সরলাকে মা খুব ভালবাসেন, তিনি এখন গােলাপ-মার সেবায় নিযুক্তা। সেজন্য একটু পরেই চলে গেলেন। রাধু, বলছে, “আমার পা কামড়াচ্ছে। তাই আমি খানিক টিপে দিতে লাগলুম। রাধুর কিন্তু আমার টেপা পছন্দ হ’ল না, বললে, “খুব জোরে দাও।” মা তাই শুনে বললেন, ঠাকুর আমার গা টিপে দেখিয়ে দিয়ে বলতেন—এমনি করে টেপো।” ঐ কথা বলে মা আমাকে বললেন, “দাও তাে, মা, তােমার হাতখানা।” আমি এগিয়ে দিতেই আমার হাত টিপে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, “ওকে এমনি করে টেপাে।” আমি তেমনি করে খানিকক্ষণ টিপতেই রাধু; ঘুমিয়ে পড়লাে। মা বললেন, “এইবার আমার পায় হাত বুলিয়ে দাও, মশা কামড়াচ্ছে। একটু চুপ করে মা আবার বললেন, “মঠের এবার বড়ই দুর্বৎসর পড়েছে। আমার বাবুরাম, দেবব্রত, শচীন সবাই চলে গেল।” দেবব্রত মহারাজের শরীরত্যাগের কয়েক দিন পূর্বে শ্রীশ্রীমহারাজ উদ্বোধনের বাড়িতে ভূত দেখেছিলেন। সেই কথা মাকে জিজ্ঞাসা করতেই মা বললেন, “আস্তে - ওরা ভয় পাবে। ঠাকুরও অমন কত দেখতেন গাে! একবার বেণী পালের বাগানে রাখালকে সঙ্গে করে গেছেন। তিনি বাগানের দিকে বেড়াচ্ছেন। ভুত এসে বলে কি -- তুমি কেন এখানে এসেছ, জ্বলে গেলুম আমরা। তােমার হাওয়া আমাদের সহ্য হচ্ছে না, তুমি চলে যাও, চলে যাও।' তাঁর পবিত্র হাওয়া, তাঁর তেজ ওদের সহ্য হবে কেন ? তিনি তাে হেসে চলে এসে কারুকে কিছু না বলে খাওয়াদাওয়ার পরেই একখানা গাড়ি ডেকে দিতে বলেন। কথা ছিল - রাতটা ওখানে থাকবেন। তারা বললে, এত রাতে গাড়ি পাব কোথায় ? ঠাকুর বললেন, ‘তা পাবে, যাও। তারা তাে গিয়ে গাড়ি আনলে। তিনি সেই রাতেই গাড়ি করে চলে এলেন। অত রাতে ফটকে গাড়ির শব্দ পেয়ে কান পেতে শুনি - ঠাকুর রাখালের সঙ্গে কথা বলছেন। শুনেই ভাবলুম - ওমা, কি হবে, যদি না খেয়ে এসে থাকেন, কি খেতে দেবাে এই রাতে? অন্য দিন কিছু না কিছু ঘরে রাখতুম—এই সুজি হোক, যাই হােক। কেন না, কখন খেতে চেয়ে বসবেন ঠিক তো ছিল না। তা সেদিন আসবেন না জেনে কিছুই রাখি নি। মন্দিরের ফটক সব বন্ধ হয়ে গেছে, রাত তখন একটা। তিনি হাততালি দিয়ে ঠাকুরদের সব নাম করতে লাগলেন, কি করে যেন দরজা খুলিয়ে নিলেন। আমি বলছি, ও যদুর মা (ঝি), কি হবে ? তিনি শুনে বুঝতে পেরে তার ঘর থেকেই ডেকে বলছেন, ‘তােমরা ভেবো না গো, আমরা খেয়ে এসেছি।’ পরে রাখালকে সেই ভুতের কথা বলতে সে বলছে, ও বাবা, তখন বলনি ভালই করেছ, তা হলে আমার দাঁত কপাটি লেগে যেত; শুনে আমার এমনি ভয় পাচ্ছে।” 

এই বলে মায়ের এই হাসি। 

আমি - মা, ভূতগুলো তাে বড় বেকুব। ঠাকুরের কাছে কোথায় মুক্তি চাইবে তা নয়, চলে যেতে কেন বললে, মা ? 

মা বললেন, “ওদের কি আর মুক্তির বাকি রইল, ঠাকুরের যখন দর্শন পেলে ? নরেন একবার মাদ্রাজে ভুতের পিণ্ড দিয়ে মুক্ত করে দিয়েছিল।” 

আমি মাকে একটি স্বপ্নবৃত্তান্ত বললুম, “মা, একদিন স্বপ্নে দেখি কি যেন আমি স্বামীর সহিত কোথায় যাচ্ছি। যেতে যেতে দেখি-পথের মাঝে কুলকিনারা দেখা যায় না, এমনি এক নদী। গাছতলা দিয়ে নদীর ধারে যাবার সময় আমার হাতে সােনালি রংএর একটা লতা এমন জড়িয়ে গেল যে আর খুলতে পারছি না। সেটাকে ছাড়াবার চেষ্টা করতে করতে নদীর কাছে গিয়ে দেখি, ওপার হতে একটি কালো ছেলে একখানা পারের নৌকা নিয়ে এল। সে বললে, হাতের লতাটা সব কেটে ফেল, তবে পার করব। আমি সেটার প্রায় সবটা কেটে ফেলেছি, একটু কিন্তু আর কিছুতে পারছি না, ইতোমধ্যে আমার স্বামী যেন কোথায় চলে গেলেন, তাঁকে আর দেখতে পেলুম না। শেষে আমি বললুম, ‘একটু আর কাটতে পারছি না। আমাকে কিন্তু পার করতেই হবে।’ এই বলে নৌকায় উঠে পড়লুম। উঠবামাত্র নৌকা ছেড়ে দিলে, স্বপ্নও ভেঙে গেল।” 

মা ঐটি যে দেখলে ঐ ওঁর রূপে ধরে মহামায়া পার করে নিলেন। স্বামী বল, পত্র বল, দেহ বল, সব মায়া। এই সব মায়ার বন্ধন কাটাতে না পারলে পার হওয়া যায় না। দেহে মায়া দেহাত্মবুদ্ধি, শেষে এটাকেও কাটতে হবে। কিসের দেহ, মা, দেড় সের ছাই বই তাে নয়-তার আবার গরব কিসের ? যত বড় দেহখানাই হোক না, পুড়লে, ঐ দেড় সের ছাই। তাকে আবার ভালবাসা। হরিবােল, হরিবােল, জয় মা জগদম্বা, গােবিন্দ, গােবিন্দ, রাধাশ্যাম, গুরুদেব, গঙ্গা গঙ্গা ব্রহ্মবারি। দু'মাস আরা জেলায় কৈলােয়ার বলে এক দেশে ছিলুম সেখানকার জল-বায়ু; ভাল বলে। সঙ্গে গোলাপ, বাবুরামের মা, বলরামের পরিবার, এরা সব ছিল। সে দেশে কি হরিণ, মা, সব দল বেঁধে তিন কোণা ‘ব’-এর মত হয়ে চলেছে। দেখতে না দেখতে এমন ছুট দিলে, সে আর কি বলবাে, যেন পাখা ধরে উড়ে যাচ্ছে। এমন দৌড় দেখিনি। আহা! ঠাকুর বলতেন,’হরিণের নাভিতে কস্তুরী হয়, তখন তার গন্ধে হরিণগুলাে দিকে দিকে ছুটে বেড়ায়, জানে না কোথা হতে গন্ধটি আসছে।’ তেমনি ভগবান এই মানুষের দেহের মধ্যেই রয়েছেন, মানুষ তাঁকে জানতে না পেরে ঘুরে মরছে। ভগবানই সত্য, আর সব মিথ্যা। কি বল, মা ? 

মায়ের গায়ের আমবাত বড় বেড়েছে। মা বলছেন, “তিন বছর হল, মা, এই যে আমবাতে ধরেছে, মলুম এর জ্বালায়। জানি না, মা, কার পাপ আশ্রয় করলে, নইলে এ সব দেহে কি রােগ হয় ?” 

একদিন সন্ধ্যার পর গিয়েছি। দেখি নিবেদিতা স্কুলের কয়েকটি মেয়ে এসেছে-ওখানে দুটি মাদ্রাজী মেয়ে আছেন। তাঁরাও এসেছেন আর মা তাদের পড়াশুনার কথা জিজ্ঞাসা করছেন। তারা ইংরেজী জানেন শুনে মা তাঁদের জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা, আমরা এখন বাড়ি যাব-এর ইংরেজী কর তাে।” তাঁদের দুজনের মধ্যে একজন অন্যকে বলছেন, “তুমি কর।” তারপর ওঁদের মধ্যে বয়ােজ্যষ্ঠা যিনি তিনিই করলেন। মা আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “বাড়ি গিয়ে কি খাবে ?—এর ইংরেজী কি হবে ?” উত্তর শুনে মা খুব খুশি, হাসতে লাগলেন। শেষে জিজ্ঞাসা করলেন, “তােমরা গান জান?” তাঁরা ‘জানি” বলাতে মাদ্রাজী গান গাইতে মা আদেশ করলেন। মেয়ে দুটি মাদ্রাজী গান গাইলেন। মাও শুনতে শুনতে খুব আনন্দ করতে লাগলেন। 

কয়েকদিন পরে আবার মাকে দর্শন করতে গিয়েছি। কিছুক্ষণ পরে দূর্গাদিদি তাঁদের আশ্রমের দুটি বালিকাকে সঙ্গে নিয়ে মায়ের কাছে এলেন। তাঁরা মাকে প্রণাম করতেই মা আশীর্বাদ করে একটি ছােট মেয়েকে বছর আট হবে। জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি গান গাইতে জান?” মেয়েটি বললে, “জানি”। 

মা - গাও তাে, শুনি। 

মেয়েটি একটি গান গাইল। তার দুই-এক ছত্র মনে পড়ছে -

 ‘জয় সারদাবল্লভ, দেহি পদবপ্লব দীন জনে, 
কিঙ্করী গৌরী-তনয়া তােমারি রেখাে মনে।” 

মেয়েটি গৌরীমার শিক্ষিতা, অবিকল গৌরীমার স্বরে গাইল। মা বিস্মিতা হয়ে বললেন, “তাই তাে, ঠিক যেন গৌরদাসী ! সে বেঁচে আছে, তা নইলে বলতুম-“তার প্রেতাত্মা এসে ভর করেছে।” মেয়েটিকে আদর করে চুমাে খেয়ে আর এক দিন এসে গান শুনাতে বললেন। 

৫ই ভাদ্র, ১৩২৫ 

আজ সন্ধ্যার পরে গিয়েছি। মা তাঁর তত্তাপোশের পাশে মেজেতে একটি মাদুরে শুয়ে আছেন। প্রণাম করে কথাপ্রসঙ্গে মাকে জিজ্ঞাসা করলুম, “মা, অনেক দিন এসেছি, এখন কি আমার কালীঘাটের বাসায় যাওয়া উচিত ?” 

মা - থাক না আরও কিছুদিন, সেখানে গেলে এখানটিতে তাে আর এমন করে আসতে পাবে না। একদিন যদি না আস তাে ভাবি কেন এল না গাে। এই কাল আসনি, ভাবলুম অসুখ করল না-কি, আজ না এলে বামুন ঠাকুরকে পাঠিয়ে দিতুম। তবে যদি তােমার স্বামীর কোন অসুখ-বিসুখ করে, আর তার মনের ভাবে বােঝ যে তার ইচ্ছা তুমি এখনি যাও, তা হলে অবিশ্যি যেতে হবে। 

আমি -- তিনি প্রসন্ন থাকলেও লােকে ত, মা, বলে, ঘর-সংসার ছেড়ে এতদিন বােনের বাড়িতে রয়েছে, স্বামীর সেবা, সংসার এ সবও তাে করা কর্তব্য।

মা - ঢের দিন তাে সংসার করলে। লােকের কথা ছেড়ে দাও, তারা অমন বলে থাকে। পুজোর সময় আশ্বিন মাসে তাে সেখানে যেতেই হবে।

আমি - সংসারের জন্য বড় একটা ভাবনা কখনাে ছিল বলে তাে মনে হয় না, 

মা! আপনার কাছে এমন আসতে পাব না, সেই ভাবনাই এখন সর্বদা মনে হয়।

মা - তবে আর কি? থাক না এ মাসটা। 

জনৈকা মহিলা মার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, একজন ব্রহ্মচারী খবর দিয়ে গেলেন। ইতঃপূর্বে বিষম ক্লান্ত হয়ে মা শুয়ে ছিলেন। এই সংবাদ পেয়ে ‘এই আবার একজনকে নিয়ে আসছে। -আঃ-গেলুম, মা’ --বলে বিরক্তিপ্রকাশ করে উঠে বসলেন। খানিক পরে সুন্দর বসন-ভূষণ-পরিহিতা একটি মহিলা মায়ের শয্যাপ্রান্তে এসে বসে মায়ের শ্রীচরণে মাথা রেখে প্রণাম করলেন। মা তাতে বললেন, “ওখানেই কর না, মা, পায়ে কেন ?” তারপর কুশলবার্তা জিজ্ঞাসা করলেন। 

তিনি বললেন, “জানেনই তাে, মা, তাঁর অসুখ।” 
মা - হাঁ শুনেছি। তা এখন কেমন আছেন ? কি অসুখ, কে দেখছেন ? 

তিনি — অসুখ বহুমুত্র ; ডাক্তার দেখছেন। পেটে জল হয়েছে, পা একটু ফুলেছে, ডাক্তার বলছেন—খুব শক্ত ব্যারাম! তা ডাক্তারদের কথা আমি মানি নে। মা, আপনাকে এর উপায় করতেই হবে। আপনি বলুন - তিনি ভাল হবেন। 

মা - আমি কি জানি, মা, ঠাকুরই সব। ঠাকুর যদি ভাল করেন তবেই হবে। তাঁর কাছে প্রার্থনা জানাব। 

তিনি - তা হলেই হল। আপনার কথা কি ঠাকুর ঠেলতে পারেন ? 

এই বলে তিনি আবার শ্রীচরণে মাথা রেখে কাঁদতে লাগলেন। 

মা তাঁকে প্রবােধ দিয়ে বললেন, “ঠাকুরকে ডাকো। তিনি যেন তােমার হাতের নােয়া রাখেন। এখন খাওয়া-দাওয়া কি করেন?” 

তিনি -  এখন লুচি এই সব খান। 

এইরূপে দুই-চারি কথার পরে তিনি মায়ের শ্রীচরণে প্রণাম করে বিদায় নিলেন এবং নীচে পূজনীয় শরৎ মহারাজের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। 

“সব লােকের জ্বালা-তাপে শরীর জ্বলে গেল, মা।” - এই বলে গায়ের কাপড় ফেলে মা শুলেন। আমি তেল মালিশ করার উদ্যোগ করছি এমন সময় আবার মহিলাটির কে আত্মীয় ( সঙ্গে এসেছেন ) প্রণাম করতে এলেন। আবার মাকে উঠতে হল। তিনি চলে যেতে মা পুনরায় শুয়ে বললেন, “এবার যেই আসুক আমি আর উঠছি নে। পায়ের ব্যথায় বারবার উঠতে কত কষ্ট দেখছ তাে, মা। তারপর আমবাতের জ্বালায় সারা পিঠটা এমন করছে। বেশ করে তেলটা ঘষে ঘষে দাও তাে।” তেল মালিশ করবার সময় পুর্বোক্ত মহিলাটির কথা উঠায় মা বললেন, “অমন বিপদ, ঠাকুরের কাছে এসেছে, মাথা মুড় খুঁড়ে মানসিক করে যাবে — তা নয়, কি সব গন্ধটন্ধ মেখে কেমন করে এসেছে দেখেছ ? অমন করে কি ঠাকুরদেবতার স্থানে আসতে হয়। এখানকার সবই কেমন এক রকম!” 

কিছুক্ষণ পরে বৌ এসে আমায় বললে, “লক্ষণ (চাকর) নিতে এসে বসে আছে গাে।” মা সাড়া পেয়ে বৌকে প্রসাদ দিতে বলে বললেন, “এই আমি মাথা তুলেহি, প্রণাম কর গো।” আমি প্রণাম করে রওনা হলুম। 

৬ই ভাদ্র, ১৩২৫ 

সন্ধ্যার পর আজ মার কাছে গিয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করে মাকে প্রণাম করতেই শুনি মা বলছেন (জনৈকা স্ত্রী-ভক্তের সম্বন্ধে কথা উঠেছে), “বৌয়ের উপর তার অতিরিক্ত শাসন। অত কি ভাল? পেছনে থেকে সামনে একটু আলগা দিতে হয়। আহা! ছেলেমানুষ বৌ, তার একটু পরতে খেতে ইচ্ছে হয় না? অমন করে সে যে বলে, যদি আত্মহত্যাই করলে বা কোন দিকে বেরিয়েই গেল তখন কি হবে ?" 

আমাকে দেখে বলছেন, “একটু আলতা পরেছে, তা আর কি হয়েছে। আহা! ওরা তাে স্বামীকে চোখেই দেখতে পায় না - স্বামী সন্ন্যাস নিয়েছে। আমি তাে চোখে দেখেছি, সেবাযত্ন করেছি, রেঁধে খাওয়াতে পেরেছি, যখন বলেছেন কাছে যেতে পেরেছি, যখন বলেন নি এমন কি দুমাস পর্ষন্ত নবত থেকে নামিই নি। দুর থেকে দেখে পেন্নাম করেছি। তিনি বলতেন, ‘ওরে, ওর নাম সারদা, ও সরস্বতী। তাই সাজতে ভালবাসে।’* হৃদয়কে বলেছিলেন, ‘দেখ তাে তাের সিন্দুকে কত টাকা আছে। ওকে ভাল করে দু ছড়া তাবিজ গড়িয়ে দে। তখন তাঁর অসুখ, তবুও আমায় তিনশ টাকা দিয়ে ** তাবিজ গড়িয়ে দেওয়ালেন -  তিনি নিজে টাকাকড়ি ছুঁতেই পারতেন না। 

“ঠাকুর চলে যাবার পর আমার যখন এখানে (কলকাতায়) আসার কথা হল, তখন আমি কামারপুকুরে। ওখানকার অনেকেই বলতে লাগল, ‘ওমা, সেই সব অল্প বয়সের ছেলে, তাদের মধ্যে গিয়ে কি থাকবে।’ আমি তো মনে জানি এখানেই থাকব। তবু সমাজ কি বলে একবার শুনতে হয় বলে অনেককে জিজ্ঞাসা করেছিলুম। কেউ কেউ আবার বলতে লাগল, তা, যাবে বই কি, তারা সব শিষ্য। আমি শুধু, শুনি। পরে আমাদের গায়ে একটি বৃদ্ধা বিধবা আছেন, তিনি ( লাহাদের প্রসন্নময়ী) ভারি ধার্মিক ও বুদ্ধিমতী বলে সকলে তাঁর কথা মানে, আমি তাঁকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, ‘তুমি কি বল ? তিনি বললেন, “সে কি গো? তুমি অবিশ্যি যাবে। তারা শিষ্য, তােমার ছেলের মতাে। একি একটা কথা। যাবে বই কি।’ তাই শুনে তখন অনেকে যাবার মত দিলে। তখন এলুম। আহা! ওরা আমার জন্যে গুরুভক্তির জন্যে জয়রামবাটীর বেড়ালটাকেও পুষছে।”

“মা দুঃখ করতেন, ‘এমন পাগল জামায়ের সঙ্গে আমার সারদার বে দিলুম, আহা ! ঘর-সংসারও করলে না, ছেলেপিলেও হ’ল না, মা বলাও শুনলে না। একদিন ঠাকুর তাই শুনতে পেয়ে বলছেন, ‘শাশুড়ী ঠাকরুণ, সেজন্য আপনি দুঃখ করবেন না -- আপনার মেয়ের এত ছেলেমেয়ে হবে, শেষে দেখবেন মা ডাকের জ্বালায় আবার অস্থির হয়ে উঠবে। তা যা বলে গেছেন তা ঠিক হয়েছে মা।” 

কিছুক্ষণ পরে রাত্রি হ’তে আমি প্রণাম করে বিদায় নিলুম। 

আজ বৈকালে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। মায়ের কাছে যাবার সময় হল, কেমন করে যাই। সন্ধ্যার আধার ঘনিয়ে এসেছে। শোকহরণের ওয়াটার প্রফটা ( সে বুদ্ধিটা শ্রীমানই দিয়েছিলেন) সারা গায়ে জড়িয়ে তাে চললুম। বৃষ্টির ঝাপটা নাকে-মুখে লেগে অস্থির করতে লাগল। তবু সে যে কি আনন্দে, কি টানে ছুটে চলেছি তা বলবার নয়। খিড়কিদরজা দিয়ে গেলুম। সামনে দিয়ে গেলে স্বামীজীরা দেখতে পেয়ে কি ভাববেন, লজ্জা হল। মার কাছে যেতেই আমার বেশ দেখে, মায়ের এই হাসি। কিন্তু যখন প্রণাম করতে গিয়ে তাঁর পায়ে ভিজে কাপড় লাগল (কারণ মাথার কাপড়টা ভিজে গিয়েছিল)

তখন ব্যস্ত হয়ে মা বললেন, “এই যে ভিজে গেছ। শীগগির কাপড় ছাড়, এই রাধুর কাপড়খানা পর।" 

আমি বললুম, “দেখুন, মা, গায়ে হাত দিয়ে, আর কোথাও ভেজেনি, কাপড় ছাড়তে হবে না।”

মা দেখে বললেন, “তাই বটে।” 

মা একখণ্ড ফ্লানেলের কথা বলেছিলেন, তা নিয়ে গিয়েছিলুম। পট্টি বাঁধবার সুবিধা হবে বলে দুদিকে নতুন কাপড় দিয়ে ফিতের মতো করে দিয়েছি দেখে মা ভারি খুশী হলেন। কথায় কথায় জয়রামবাটীর কথা উঠল। 

মা—একবার সেখানে কি দুর্ভিক্ষই লাগল। *** কত লােক যে খেতে না পেয়ে আমাদের বাড়ি আসত ! আমাদের আগের বছরের ধান মরাইবাঁধা ছিল। বাবা সেই সব স্থানে চাল করিয়ে কড়াইয়ের ডাল দিয়ে হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি রাঁধিয়ে রাখতেন, বলতেন, বাড়ির সবাই এই খাবে, আর যে আসবে তাকেও দেবে। আমার সারদার জন্যে খালি ভাল চালের দুটি ভাত করবে। সে আমার তাই খাবে।’ এক একদিন এমন হােত, এত লােক এসে পড়তে যে খিচুড়িতে কুলাত না। তখনি আবার চড়ান হােত। আর সেই গরম গরম খিচুড়ি সব যেই ঢেলে দিত, শিগ়্গির জুড়ােবে বলে আমি দু'হাতে বাতাস করতুম। আহা! খিদের জ্বালায় সকলে খাবার জন্যে বসে আছে। একদিন একটি মেয়েলোক এসেছে, মাথায় রুখো চুল, চোখ উম্মাদের মতাে। এসেই গরুর ডাবায় কুঁড়ো ভিজান ছিল তাই খেতে আরম্ভ করলে। আমরা এত বলছি বাড়ির ভিতরে খিচুড়ি আছে ‘দিচ্ছি, তা আর তার ধৈয্য মানছে না। খিদের জ্বালা কি কম। দেহ ধরলেই খিদে তেষ্টা সব আছে। এবার বাড়িতে অসুখের সময় একদিন মাঝরাতে আমার এমনি খিদে পেলাে। সরলা টরলা সব ঘুমিয়েছে। আহ! ওরা এই খেটে খুটে শুয়েছে, ওদের আবার ডাকবাে? নিজেই শুয়ে শুয়ে চারদিকে হাতড়াতে লাগলুম। দেখি, চারটি খুদভাজা একটা বাটিতে রয়েছে। আবার মাথার বালিশের পাশে দু'খানা বিস্কুটও পেলুম। তখন ভারি খুশী। তাই খেয়ে তো জল খেলুম - জল ঘটিতে সামনেই ছিল। খিদের জ্বালায় খুদভাজা যে খাচ্ছি তা জ্ঞান নেই। 

এই বলে হাসতে লাগলেন। 
তারপর মা বললেন, “সেই সময়ে রাঁচি থেকে একটি ভক্ত বড় বড় পেঁপে এনেছিল। পেঁপেটা আমি বড় ভালবাসি, মা। আমি টুক টুক করে তাকাচ্ছি - আহা! এই পেঁপে আমাকে ওরা একটু দেয় তাে খাই। তা,ওরা দেবে কেন? তখন যে আমার খুব জ্বর। কোয়ালপাড়ায় কি অসুখই করেছিল, মা ! বেহুশ - এই বিছানাতেই বাহ্যে, পেচ্ছাব সব। সে সময় সরলা ও বৌ আমার খুব করেছে। (ক্রন্দনের স্বরে) তাই ভাবছি, মা, আবার তাে তেমনি ভুগতে হবে। তা সেবারে কাঞ্জিলালের ওষুধে সেরে গেল। আহা! মা, কি হাত পায়ের জ্বালা! কাঞ্জিলালের ঠাণ্ডা মােটা পেটটিতে হাত দিয়ে থাকতুম। শরৎও সেবার গিয়েছিল।” 

একটু পরে আমি জিজ্ঞাসা করলুম, আচ্ছা, মা জয়রামবাটী থেকে চিঠি লিখে কেন সেই স্ত্রী - ভক্তটির সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেছিলেন ?” 

মা - ওর ভাব আলাদা। এ ভাবের ( ঠাকুরের ভাবের) নয়। 

বিস্মিত হয়ে গেলুম। ঐ অসুখ-বিসুখে অত ঝঞ্চাটের মধ্যে দূরে থেকেও আমাদের কিসে মঙ্গল হবে তাই চিন্তা। 

আমি তার পরদিন ভাল দেখে পাকা পেঁপে ও আম নিয়ে গেছি। মা কি খুশী, আর আমাদের খুশী করবার জন্য তাঁর কি আনন্দ প্রকাশ করা ! 

মা বলছেন, “এই যে গো কাল যে পেঁপের গল্প হ’ল ঠিক সেই রকম, বেশ আম।" তারপর এই আমটি শরৎকে দিও, এইটি গণেনকে, এইটি জামাইকে - এমনি করে কিছু ভাগ করা হ’ল। ভারি গরম, মায়ের বড় ঘামাচি বেরিয়েছে। 

মা বলছেন, “চন্দন মাখলে ঘামাচি কমতে পারে, কিন্তু তাতে ঠাণ্ডা লাগে।” 

আমি - কাল পাউডার নিয়ে আসব ? মাখলে ঘামাচি কমবে। 

মা - তা এনাে গাে, দেখি তােমাদের পাউডার-ই মেখে। এক ঘটি জল আনতে বলতো, মা, একবার বাইরে যাব। 

বৌ বললে, “জল রেখেছি।” 

মা রাস্তার ধারের বারাণ্ডায় গিয়ে হাসতে হাসতে ডাকছেন, “ও মেয়ে, ও মেয়ে একবার এদিকে এস, শীগগির এস।” আমি কাছে যেতেই বলছেন, “দেখ, দেখ ঐ বেশ্যাবাড়ির সামনে জানালার ধারে একটা লােক, একবার এ-জানালা একবার ও-জানালা করে মরছে - ঢুকতে পারছে না। দেখাে, কি মােহ, কি প্রবৃত্তি! ভিতর থেকে ঐ গানের শব্দ আসছে, আর ও ঢুকতে পারছে না। আহা! মলো গাে ছটফটিয়ে।” মা এমনি করে ঐ কথাগুলি বলছেন যে, হাসি আর চাপতে পারলুম না। তখন মাও হাসেন, আমিও হাসি। হাসতে হাসতে দুজনে ঘরে এলুম।

আমি -- আহা! ভগবানের জন্যে যদি ঐরপ ছটফটানিটুকু হয়। তা হয় না, মা ! 

একটি মেয়ের কথা উঠল। মা বললেন, “কি মােহ হয়েছে, মা, ওর স্বামীর জন্যে! খেয়ে শুয়ে সুস্থির নেই, খেতে খেতে উঠে গিয়ে দেখে আসে। দিনরাত ঘরে বন্দী করে নিয়ে বসে আছে। ওর জন্যে সে তাে কোন জায়গায় বেরতে পর্যন্ত পারে না। ছি! ছি ! আর শরীর কি হচ্ছে দেখ ! একটা ছেলে টেলে হলে যদি ওর এই ভাব কমে।”

বৌ এসে বললে, “তােমায় নিতে এসেছে গাে।” রাতও হয়েছিল অনেক, প্রণাম করে বিদায় নিলুম।

পরদিন মা রাস্তার ধারের বারাণ্ডায় বসে জপ করছেন। ঘরে তাঁকে দেখতে না পেয়ে বারাণ্ডায় গিয়েছি। মা বলছেন, “কিগাে এলে, ব’স!” জপ সারা হ’ল, হরিনামের ঝুলিটি নিজের মাথায় ঠেকিয়ে রেখে দিলেন। মার বাড়ির সামনে তখন মাঠ ছিল, তার পশ্চিম ধারে খােলার ঘরে যে কতকগুলি দরিদ্র লােক ভাড়াটে ছিল এইবার তাদের লক্ষ্য করে বললেন, “এই দেখ সারাদিন খেটে খুটে এসে এখন সব নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছে গাে - দীনার্তরাই ধন্য।” যীশুখ্রীষ্টের মুখ দিয়ে একদিন ঐ কথা বেরিয়েছিল বাইবেলে পড়েছিলুম, মনে পড়লাে। আজ মায়ের মুখেও সেই কথা শুনলুম। একটু পরে মা বললেন, “চল, ঘরে যাই।” বৌ নীচে বিছানা করে রেখেছিল, এসে শুলেন। সকালেই লক্ষণকে দিয়ে পাউডার পাঠিয়ে দিয়েছিলুম। মা বলছেন, “ওগাে, তােমার দেওয়া পাউডার মেখেছিলুম, তাই তাে এই দেখ, ঘামাচিগুলাে মিলিয়ে মজে এসেছে। এই খানটায় বড় হয়েছে, দাও। চুলকানিটাও যেন কমে গেছে। শরতেরও বড় ঘামাচি উঠেছে — আহা! তাকেও কেউ এইটি মাখিয়ে দেয়।” 

আমি বললাম, “ও বাবা, তাকে একথা কে বলতে যাবে মা! ও জিনিসটা যে সৌখিন লােকেরাই ব্যবহার করে থাকে।” শুনে মা হাসতে লাগলেন। 

মায়ের হাঁটুর বাত বড় বেড়েছে। কাল জনৈক ভক্তের দুটি ছেলে ইলেকট্রিক ব্যাটারী লাগিয়েছিল, তাতে একটু কমেছে। আজও সেই দুটি ছেলে এসেছে। ছােট মামী বলছেন, “আমারও কাল থেকে বাত বেড়েছে, আমিও ঐ কলটা লাগাবাে গাে!” মা শুনে হাসতে লাগলেন, বললেন - “দাও তাে বাছা, ওকে।” ছেলে দু’টি তাড়াতাড়ি যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক করে নিয়ে যেই মামীর পায়ে এক বার ব্যাটারী ধরেছে, আর সে কি চীৎকার - “গাে, মলুম গো, সর্ব শরীর ঝিন ঝিন করছে, ছাড় ছাড়!” শুনে সকলের হাসি। এ তাে আর সর্বংসহা জননী নন। তখন ছােট মামী মাকে বলছেন, “কই তুমি তাে এমন হবে বললে নি ?” 

মা — সেরে যাবে, চেচাস নে, একটু সহ্য কর।

তারপর মামী বললেন, “সত্যিই, যেন একটু কমেছে।” 

বিলাস মহারাজ আরতি করে গেলেন। বৌ বছে, “আচ্ছা, এর নামে কোন ‘আনন্দ’ নেই?” 

মা হেসে বলছেন, “আছে বই কি গাে -- ওর নাম বিশ্বেশ্বরানন্দ।” তারপর বলছেন, একজনকে ডাকে কপিল। আচ্ছা, ওর সঙ্গে কি আনন্দ আছে ? কপিলানন্দ নাকি?” (এই সময়ে সরলাদিদি ঘরে ঢুকলেন)

মা - আচ্ছা, কপিল মানে কি ? 

সরলাদিদি বললেন, “কি জানি - বানর বােধ হয়।” 

আমি - সে কি সরলাদিদি, কপি মানে বানর, কপিল মানে নয়। আর সকলের হাসি। 

মা - আবার একজনের নাম আছে ভুমানন্দ। আচ্ছা, এর মানে কি? 

আমি - সে তাে আপনিই ভাল জানেন, মা। 

মা - না, না, তােমরাই বল শুনি। 

আমি - ভুমা মানে তাে সেই অনন্ত বা সর্বব্যাপী পুরুষকেই বুঝায় শুনেছি, মা। 

মা ঐকথা শুনে খুশী হয়ে মুখ টিপে টিপে হাসছেন। সত্যই মা এক এক সময় এমন ভাব দেখান যেন ছেলে মানুষটি - কিছুই জানেন না। আবার অন্য সময়ে দেখেছি, কঠিন আধ্যাত্মিক তত্ত্বের কেমন ব্যাখ্যা করে দিচ্ছেন। যেখানে মানুষের পুঁথিগত বিদ্যায় কুলায় না, তখন আর এক ভাব, যেন সব বুঝেন। মা বললেন, “আর কপিল মানে কি হল ?” মা ওটি শুনতেই চান। 
আমি - কি জানি, মা। কপিল নামে তাে সাংখ্যদর্শন প্রণেতা এক মুনি ছিলেন, আবার কপিল রংও আছে। ওরা কি অর্থে নাম রেখেছেন কি জানি, ঐ কথার আরও হয় তাে অর্থ আছে - মনে পড়ছে না। কাল অভিধান দেখে আসবাে। 

এই সময়ে একদিন বৈকালে গিয়েছি। একজন সন্ন্যাসী শ্রীশ্রীমাকে প্রণাম করতে এসে বলছেন,—“মা মাঝে মাঝে প্রাণে এত অশান্তি আসে কেন? কেন সর্বক্ষণ আপনার চিন্তা নিয়ে থাকতে পারি না? পাঁচটা বাজে চিন্তা কেন এসে পড়ে? মা, ছােটখাটো অনেক জিনিস তাে চাইলেই পাওয়া যায়, পেয়েও এসেছি, আপনাকে কি কোন দিনই পাব না? মা, কিসে শান্তি পাব বলে দিন -~-আপনার কৃপা কি কখনও পাব না? আজকাল দর্শন-টর্শনও বড় একটা হয় না। আপনাকেই যদি না পেলুম তবে বেঁচে থেকেই বা লাভ কি? শরীরটা গেলেই ভাল।” 

মা - সে কি বাছা, ও কথা কি ভাবতে আছে ? দর্শন কি রোজই হয় ? ঠাকুর বলতেন, “ছিপ ফেলে বসলেই কি রোজই রুই মাছ পড়ে? অনেক মাল মসলা নিয়ে একাগ্র হয়ে বসলে কোন দিন বা একটা রুই এসে পড়লাে, কোন দিন বা নাই পড়লো, তাই বলে বসা ছেড়াে না।' জপ বাড়িয়ে দাও। 

যােগীন -মা - হ্যাঁ, নামব্রহ্ম। প্রথম প্রথম মন একাগ্ন না হলেও হবে নিশ্চয়। 

সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করলেন, “কত সংখ্যা জপ করবো আপনি বলে দিন, মা, তবে যদি মনে একাগ্রতা আসে।" 

মা - আচ্ছা, রোজ দশ হাজার করাে, দশ হাজার - বিশ হাজার, যা পার। 

সন্নাসী - মা, একদিন সেখানে ঠাকুরঘরে পড়ে কাঁদছি, এমন সময় দেখলুম, আপনি মাথার পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘তুই কি চাস? আমি বললুম, “মা, আমি আপনার কৃপা চাই, যেমন সুরথকে করেছিলেন।’ আবার বললুম, 'না, মা, সে তাে দূর্গারূপে; আমি সেইরূপে চাই না, এইরূপে!' আপনি একটু হেসে চলে গেলেন। মন তখন আরও ব্যাকুল হল, কিছুই ভাল লাগে না। মনে হল, যখন তাঁকে লাভ করতে পারলুম না, তখন আর আছি কেন? 

মা - কেন, ঐ যেটুকু পেয়েছ তাই ধরে থাক না কেন? মনে ভাববে, আর কেউ না থাক, আমার একজন ‘মা’ আছেন। ঠাকুর যে বলে গেছেন, এখানকার সকলকে তিনি শেষদিনে দেখা দেবেনই—দেখা দিয়ে সব নিয়ে যাবেন। 

সন্ন্যাসী - যেখানে ছিলুম, তিনি খুব ভক্ত-গৃহস্থ। তার স্বী এক বড় লােকের কন্যা, খুব খরচ করেন। মাছ খাবার জন্যে আমাকে বড় অনুরােধ করেন। আমি খাই না। 

মা - মাছ খাবে। খাবার ভিতর আছে কি? মাছ খেলে মাথা ঠাণ্ডা থাকে। তাকে বেশী বাজে খরচ করতে বারণ করবে। ভক্ত গৃহস্থের টাকা থাকলে সাধুদের কত উপকারে লাগে। তাদের টাকাতেই তাে সাধুরা বর্ষাকালে একস্থানে বসে চাতুর্মাস্য করতে পারে। তখন তাে সাধুদের ভ্রমণ করে ভিক্ষা করবার সুবিধা হয় না।

সন্ন্যাসীটি প্রণাম করে নীচে গেলেন। 

* ঠাকর গােলাপ-মাকেও বলেছিলেন, “ও (শ্রীশ্রীমা) সারদা সরস্বতী - জ্ঞান দিতে এসেছে, রূপ থাকলে পাছে অশুদ্ধ মনে দেখে লােকের অকল্যাণ হয়, তাই এবার রূপ ঢেকে এসেছে। 

** তাবিজের জন্য ঠাকুর ৩০০ টাকাই দিয়েছিলেন, কিন্তু তাবিজ গড়াতে কম (২০০ টাকা) লেগেছিল। বাকী ১০০, টাকা শুনেছি শ্রীশ্রীমাকে নগদ দেওয়া হয়েছিল। 

*** ১২৭৯, মায়ের বয়স তখন ১১ বছর। 

১৭ই ভাদ্র, ১৩২৫ 

আমার অসুখ করেছিল, একটু ভাল হতে আজ সন্ধ্যারতির পরে গেছি। মা তখন শুয়েছিলেন। দেখেই বললেন, “কি গাে, ভাল আছ ? অসুখ সেরেছে ?” 

আমি বললাম, “হ্যাঁ, মা।” মা সাংসারিক কুশলপ্রশ্নাদি করতে লাগলেন। ঢাকার একটি শিষ্যা মাসখানেক হতে চললো ‘উদ্বোধনে’ আছেন, তিনি বললেন, “মা, তেল মালিশ করে দেবাে ? দিদির (আমার) তাে শরীর ভাল নয়।”

মা - তা হােক, ও দিতে পারবে। তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করবার পরও বললেন, “না, না, ও তেল দিতে পারবে। তুমি না হয় একটু বাতাস কর।” তিনি বাতাস করতে লাগলেন। একটু বাতাস করার পর মা বললেন, “হয়েছে, ঠাণ্ডা লাগছে, এখন একটু শােওগে। জল খেয়েছ ? মিষ্টি নিয়ে জল খাও না।” মা এমনি করে সকলের মনস্তুষ্টি করে থাকেন। তিনি উঠে মায়ের কথামত জল খেয়ে শুলেন।

মা - (আমাকে) কাল কেমন ঠাকুরের বই পড়া হল, সরলা পড়েছিল। কি সব কথা। তখন কি জানি মা, এত সব হবে। কি মানুষই এসেছিলেন। কত লােক জ্ঞান পেয়ে গেল! কি সদানন্দ পুরুষই ছিলেন। হাসি কথা, গল্প কীর্তন চব্বিশ ঘণ্টা লেগেই থাকত। আমার জ্ঞানে তাে আমি কখন তাঁর অশান্তি দেখি নি। আমাকে এমন কত সব ভাল ভাল কথা বলতেন। আহা! যদি লেখাপড়া জানতুম, তা হলে অমনি করে সেই সব টুকে টুকে রাখতুম। কই গাে, সরলা আজ আবার একটু পড় না। 

সরলাদি কথামৃত পড়তে লাগলেন। রাখাল মহারাজের বাবা এসেছেন, ঐখান থেকে পাঠ আরম্ভ হ'ল। পড়া শুনতে শুনতে মা বলছেন, “ঐ যে রাখালের কথায় তার বাপকে বললেন, ‘যেমন ওল তেমন মুখীটি তো হবে।' সত্যই তিনি অমনি করে রাখালের বাবার মন খুশী রাখতেন। তিনি এলেই যত্ন করে এটি ওটি দেখাতেন, খাওয়াতেন, কত কথা বলতে - মনে ভয় পাছে রাখালটিকে ওখানে না রাখে, নিয়ে যায়। রাখালের সৎমা ছিল। সে যখন দক্ষিণেশ্বরে আসতাে, ঠাকুর রাখালকে বলতেন, “ওরে, ওঁকে ভাল করে দেখাশুনা, যত্ন কর, তা হলে জানবে ছেলে আমাকে ভালবাসে।” পড়তে পড়তে বৃন্দে ঝির লুচির কথা এল, মা বললেন, “হ্যাঁ গো, সে কি কম ছিল ? তার জল খাবারের বরাদ্দের লুচি যদি কোন দিন খরচ হয়ে যেত, তবে বকে অনর্থ করতাে; বলতো - ‘ওমা, কেমন সব ভদ্দর লােকের ছেলে গাে, আমারটি সব খেয়ে বসে থাকে - মিষ্টিটাও পাই না?”

“ঐ সব কথা পাছে ছেলেদের কানে যায়, তাই ঠাকুর আবার ভয় করতেন। একদিন ভােরে উঠে এসেই নবতে আমাকে বলছেন, ‘ওগো, বৃন্দের খাবারটি তাে খরচ হয়ে গেছে, তা তুমি তাকে রুটি লুচি যা হয় ক'রে দিও, নইলে এক্ষণি এসে আবার বকাবকি করবে। দুর্জনকে পরিহার করে চলতে হয়।” 

“আমি তাে বৃন্দে আসতেই তাড়াতাড়ি বললুম, “বন্দে, তােমার খাবার তৈয়ের করে দি, খরচ হয়ে গেছে। তখন সে বললে, “থাক আর তৈয়ের করতে হবে না, এমনি দাও।' তখন যেমন সিধে সাজায়, তেমনি ক'রে ঘি, ময়দা, আলু, পটল সব দিলুম।” 

এক অধ্যায় পাঠ হলে সয়লাদিদি গােলাপ - মার সেবায় গেলেন, তাঁর অসুখ। 

মা আস্তে আস্তে বলছেন, “ঠাকুর ভগবানের বিষয় ছাড়া কোন কথাই বলতেন না। আমাকে বলতেন, “দেখছ তাে মানুষের দেহ কি! - এই আছে, এই নাই, আবার সংসারে এসে কত দুঃখ কত জ্বালা পায়। এ দেহের আবার পয়দা করা কেন? এক ভগবানই নিত্যসত্য, তাঁকে ডাকতে পারলেই ভাল। দেহ ধরলেই নানা উপসর্গ। সে দিন বিলাস এসে বলছে, ‘কত সাবধানে আমাদের থাকতে হয়, মা, পাছে মনেও কিছু উঠে এই ভয়েও সশস্ক থাকতে হয়।’ তাই তাে, ওর হল সাদা কাপড় আর সংসারীর হল কাল কাপড়। কাল কাপড়ে কালি পড়লেও অত ঠাওর হয় না, কিন্তু সাদা কাপড়ে এক বিন্দু পড়লেই সকলের চোখে পড়ে। দেহ ধরলেই বিপদ। সংসার তাে এই কাম- কাঞ্চন নিয়েই আছে। ওদের (সাধুদের) কত ত্যাগ করে চলতে হয়। তাই ঠাকুর বলতেন, ‘সাধু সাবধান’।” 

ইতােমধ্যে হরিহর মহারাজ ঠাকুরের ভােগ দিতে এসেছেন। তাঁকে দেখিয়ে মা বলছেন, “এই দেখ একটি ত্যাগী ছেলে, ঠাকুরের নাম নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। সংসারী লোক খালি গণ্ডায় গণ্ডায় ছেলের জন্ম দিতে থাকে, ঐ যেন কাজ। ঠাকুর বলতেন ‘দু-একটি ছেলে হওয়ার পর সংযত থাকতে।’ ইংরেজেরা নাকি বিষয় বুঝে ছেলের জন্ম দেয় — যে এই (সম্পত্তি) আছে, এতে একটি ছেলে হলে বেশ চলবে এবং তাই হবার পর স্ত্রী পুরুষ দু'জনে বেশ আলাদা আপন আপন কাজ নিয়ে থাকে। আর আমাদের জাতের ?” 

মা হাসতে হাসতে বলছেন, “কাল একটি বৌ এসেছিল, মা। গ্যাঁড়া, গোঁড়া ছােট্রটি, তার কোলে পিঠে ছেলে, ভাল করে সামলে নিতেও পারছে না। তারপর বলে কি, ‘মা, সংসার ভাল লাগে না। আমি বলি, “সে কি গাে, তােমার এই সব কাচ্চাবাচ্চা!' তাতে বললে, ঐ পর্যন্তই, আর হবে না। বললুম, তা পার যদি ভালোই তাে গো।” এই বলে হাসতে লাগলেন। 

আমি - আচ্ছা, মা, সংসারে তো স্ত্রীলোক দের স্বামী একান্ত পূজ্য ও গুরু। তাঁর সেবায় সালোক্য, সাযুজ্য পর্যন্ত মিলে থাকে - শাস্ত্রে বলে। সেই স্বামীর কতকটা মতের বিরুদ্ধে কোন স্ত্রী যদি অনুনয়-বিনয় বা সদালাপ দ্বারা সংযমী হয়ে থাকতে চেষ্টা করে তাতে কি পাপ হয় ? 

মা - ভগবানের জন্য হলে কোন পাপ হয় না, মা। কেন হবে? ইন্দ্রিয় সংযম চাই, এই যে বিধবাদের এত ব্যবস্থা সব ইন্দ্রিয়সংযমের জন্যে। ঠাকুরের কোন বিষয়ই ভগবান ছাড়া ছিল না। আমাকে যে-সব জিনিস দিয়ে ষোড়শী পূজা করেছিলেন সেই সব শাঁখা শাড়ী ইত্যাদি—আমার তাে গুরু-মা ছিলেন না—কি করবাে ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি ভেবে বললেন, ‘তা তােমার গর্ভধারিণী মাকে দিতে পার’ - তখন বাবা বেঁচে ছিলেন  - ‘কিন্তু দেখাে তাঁকে যেন মানুষজ্ঞান করে দিও না, সাক্ষাৎ জগদম্বা ভেবে দেবে।' তাই করলুম । এমনি শিক্ষা তাঁর ছিল। 

শােকহরণ মাসিক যে পাঁচ টাকা দেয়, তা মাকে দিতে দিয়েছিল। দিতেই মা বললেন, “কেন মা, এখন তার কষ্ট, এখন নাই বা দিলে।” 

আমি - কত দিকে কত খরচ হয়ে যাচ্ছে, মা, এ তাে আর বেশী নয়। যে আপনার সেবায় দিতে পারে তারই মনের তৃপ্তি, নইলে -

মা বললেন, “হাঁ, তা বটে। এখানে দিলে সাধুভক্তদের সেবায় লাগে।” 

মালপাে এনেছিলুম, খুলে ঠাকুরের কাছে দিতে বললেন। রাত অনেক হয়েছিল, প্রায় সাড়ে দশটা - ভােগ হয়ে গেছে, মায়ের আহারের পর প্রসাদ নিয়ে বিদায় নিলুম। 
 ১৮ই ভাদ্র ১৩২৫ 

মা জপের আসনে বসে আছেন। আরতি হয়ে গেছে। রাধুর স্বামীর জন্য মাংস রেঁধে এনেছিলুম, রাধুকে ডেকে তেতলায় তার ঘরে রেখে আসতে বললেন। আমি রেখে এসে প্রণাম করে বসলুম। মা কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। একটি আত্মীয়া মেয়ে এসে মাকে বলছেন, “তুমি আমার মনটি ভাল করে দাও, আমার মনে বড় অশান্তি, আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে নেই, যা আছে তােমাকে লিখে পড়ে দিয়ে যাব। আমি মরবার পরে তুমি সেই মতো কাজ কোরো।” 

মা হেসে বললেন, “তা কবে মরবি গাে!” শেষে গম্ভীর হয়ে মা বললেন, “তা হলে আস্তে আস্তে বাড়ি চলে যাও, এ সব জায়গায় যেন একটা বিপদ ক'রে বসাে না। এমন জায়গায় থেকে, আর আমার কাছে থে - (থে বলেই সামলে নিয়ে বললেন) এই সব সাধু-ভক্ত, ঠাকুর এমন স্থানে থেকেও যদি তাের মনের অশান্তি না ঘােচে, তবে তুই কি চাস বল দেখি? কি জীবন তুই পেয়েছিস বল দেখি? কোনও ঝঞ্জাট নেই। এ জন্মটা যে কিনে নিয়ে যেতে পারতিস। এ স্থান যখন চিনলি নি - চিনবি একদিন যখন অভাব হবে, তবে এখন বুঝলি নি। তাের পাপ মন, তাই শান্তি পাস নে। কাজকর্ম না করে বসে থেকে মাথা গরম হয়ে উঠেছে। একটা ভাল চিন্তা কি তাের কিছু করতে নেই ? কি অশুদ্ধ মন গাে!” এই বলেই আবার হেসে উঠে আমার পানে তাকিয়ে বলছেন, “কি ঠাকুরের লীলা মা দেখছ। মায়ের বংশটি আমার কেমন দিয়েছেন। কি কুসংসর্গই করছি দেখ ! এইটি তাে পাগলই, আর একটিও পাগল হবার গতিক হয়েছে। আর ঐ দেখ আর একটি, কাকেই বা মানুষ করেছিলুম, মা, একটুও বুদ্ধি নেই। ঐ বারাণ্ডার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে, কখন স্বামী ফিরবে। মনে ভয়, ঐ যে গানবাজনা যেখানে হচ্ছে, পাছে ঐখানেই ঢুকে পড়ে। দিনরাত সামলে নিয়ে আছে, কি আসক্তি, মা! ওর যে এত আসক্তি হবে তা জানতুম না।” 

আত্মীয়াটি বিষন্ন মুখে উঠে গিয়ে শুলেন।

মা - কত সৌভাগ্যে, মা এই জম্ম, খুব করে ভগবানকে ডেকে যাও। খাটতে হয়, না খাটলে কি কিছু হয় ? সংসারে কাজকর্মের মধ্যেও একটি সময় করে নিতে হয়। আমার কথা কি বলবাে, মা, আমি তখন দক্ষিণেশ্বরে রাত তিনটের সময় উঠে জপে বসতুম। কোন হুশ থাকতো না। একদিন জোছনা রাতে নবতে সিড়ির পাশে * বসে জপ করছি, চারিদিক নিস্তদ্ধ। ঠাকুর যে সেদিন কখন ঝাউতলায় শৌচে গেছেন, কিছুই জানতে পারি নি - অন্যদিন জুতাের শব্দে টের পাই। খুব ধ্যান জমে গেছে। তখন আমার অন্য রকম চেহারা ছিল গয়না পরা, লালপেড়ে শাড়ী। গা থেকে আঁচল খসে বাতাসে উড়ে উড়ে পড়ছে, কোন হুশ নেই। ছেলে যােগেন সেদিন ঠাকুরের গাড় দিতে গিয়ে আমাকে ঐ অবস্থায় দেখেছিল। সে সব কি দিনই গিয়েছে, মা! জোছনা রাতে চাঁদের পানে তাকিয়ে জোড় হাত করে বলেছি, তােমার ঐ জোছনার মতাে আমার অন্তর নির্মল করে দাও।' জপধ্যান করতে করতে দেখবে - (ঠাকুরকে দেখিয়ে) উনি কথা কবেন, মনে যে বাসনাটি হবে তক্ষুণি পূর্ণ করে দেবেন কি শান্তি প্রাণে আসবে ! আহা! তখন কি মনই ছিল আমার ! বৃন্দে (ঝি ) একদিন আমার সামনে একটি কাঁসি গড়িয়ে (ঠেলা মেরে) দিলে, আমার বুকের মধ্যে যেন এসে লাগল (মা নবতে ধ্যানস্থা ছিলেন, তাই শব্দটা যেন বজ্রের মতাে লেগেছিল -- কেঁদে ফেলেছিলেন )। সাধন করতে করতে দেখবে আমার মাঝে যিনি, তােমার মাঝেও তিনি, দুলে বাগদি ডোমের মাঝেও তিনি - তবে তাে মনে দীন ভাব আসবে। ওর (পূর্বোক্ত আত্মীয়ার) কথা কি বলবাে, মা, জয়রাম বাটীতে ডােমেরা বিড়ে পাকিয়ে দিয়েছে, ঘরে দিতে এসেছে। আমি বললুম, ‘ঐখানকে রাখ, তা তারা কত সাবধান হ'য়ে রেখে গেল। ও বলে কি-না ‘ঐ ছোঁয়া গেল, ওসব ফেলে দাও' এই বলে তাদের গালাগাল -- ‘তােরা ডোম হয়ে কোন সাহসে এমন করে রাখতে যাস?’ তারা তাে ভয়ে মরে। আমি তখন বলি, ‘তােদর কিছু হবে না, কোন ভয় নেই। আবার তাদের মুড়ি খেতে পয়সা দিত—এমন মন ওর! রাত তিনটের সময় উঠে আমার ঐ দিকের (উত্তরের) বারাণ্ডায় বসে জপ করুক না, দেখি কেমন মনে শান্তি না আসে। তাতে করবে না, কেবল অশান্তি অশান্তি - কিসের অশান্তি তাের ? আমি তাে, মা, তখন অশান্তি কেমন জানতুম না। এখন ঐ ওদের জন্য, আর কিক্ষণে ছােট বৌ ঘরে এল, আর তার মেয়েকে মানুষ করতে গেলুম, সেই হতে যত জ্বালা। যাক, সব চলে যাক, কাউকে আমি চাই নে। এ কি মেয়ে সব হ’ল গা ! একটা কথা শােনে না। মেয়েলোক এত অবাধ্য !

গােলাপ-মা  - আবার কেমন করে সাজে দেখ না । ভাবে, তবেই বুঝি বর ভালবাসবে।

মা - আহা! তিনি আমার সঙ্গে কি ব্যবহারই করতেন! একদিনও মনে ব্যথা পাবার মতাে কিছু বলেন নি। কখনও ফুলটি দিয়েও ঘা দেন নি। এক দিন দক্ষিণেশ্বরে আমি তাঁর ঘরে খাবার **রাখতে গেছি, লক্ষী রেখে যাচ্ছে মনে করে তিনি বললেন, “দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যাস। আমি বললুম, “আচ্ছা। আমার গলার স্বর শুনে তিনি চমকে উঠে বললেন, ‘কে, তুমি? তুমি এসেছ বুঝতে পারি নি। আমি মনে করেছিলুম লক্ষী; কিছু মনে করো নি। আমি বললুম, তা বললেই বা। কখনাে আমাকে তুমি ছাড়া ‘তুই’ বলেন নি। কিসে ভাল থাকবাে তাই করেছেন। তিনি বলতেন, “কর্ম করতে হয় ; মেয়েলােকের বসে থাকতে নেই, বসে থাকলে নানা রকম বাজে চিন্তা কুচিন্তা সব আসে। একদিন কতকগুলি পাট এনে আমাকে দিয়ে বললেন, “এইগুলি দিয়ে আমাকে শিকে পাকিয়ে দাও, আমি সন্দেশ রাখবে, লুচি রাখবাে ছেলেদের জন্য। আমি শিকে পাকিয়ে দিলুম আর ফেঁসােগুলো দিয়ে থান ফেলে বালিশ করলুম। চটের উপর পটপটে মাদুর পাততুম আর সেই ফেঁসাের বালিশ মাথায় দিতুম। তখনও তাইতে শুয়ে যেমন ঘুম হােত এখন এই সবে ( খাট বিছানা দেখিয়ে) শুয়েও তেমনি ঘুমােই - কোন তফাত বােধ হয় না, মা। তিনি বলতেন, ওরে হৃদু, আমার বড় ভাবনা ছিল যে পাড়া-গেঁয়ে মেয়ে, কে জানে - এখানে কোথায় শৌচে যাবে, আর লােকে নিন্দে করবে তখন লজ্জা পেতে হবে। তা, ও কিন্তু এমন যে কখন কি করে, কেউ টেরই পায় না, বাইরে যেতে আমিও কখনাে দেখলুম না। তাঁর ঐ কথা শুনে আমার এমন ভাবনা হ’ল যে কি বলব। ভাবলুম - ওমা, উনি তাে যা চান তাই মা ওকে দেখিয়ে দেন, এইবার বাইরে গেলেই ওঁর চোখে পড়তে হবে দেখছি। ব্যাকুল হয়ে জগদম্বাকে ডাকতে লাগলুম, “হে মা, আমার লজ্জা রক্ষা কর। তা আমার এমনি মা -টি যেন দুই পাখা দিয়ে আমাকে ঢেকে রাখতেন! এত বছর ছিলুম, একদিনও কারও সামনে পড়ি নি। লােকে আমাকে ভগবতী বলে, আমিও ভাবি—সত্যিই বা তাই হব। নইলে আমার জীবনে অদ্ভুত অদ্ভুত যা সব হয়েছে! এই গােলাপ, যােগীন এরা তার অনেক কথা জানে। আমি যদি ভাবি -- এইটি হােক, কি এইটি খাব, তা ভগবান কোথা হতে সব জুটিয়ে দেন। আহা। দক্ষিণেশ্বরে কি সব দিনই গেছে, মা ! ঠাকুর কীর্তন করতেন, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নহবতের ঝাপড়ির ভিতর দিয়ে *** চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতুম, হাতজোড় করে পেন্নাম করতুম। কি আনন্দই ছিল । দিনরাত লােক আসছে, আর ভগবানের কথা হচ্ছে। আহা! বিষ্ণু বলে একটি ছেলে সংসারের ভয়ে আত্মহত্যাই করলে। তা ভক্তদের মধ্যে কে একজন জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘ও যে আত্মহত্যা করলে, ওর পাপ হ’ল না? তিনি বললেন, “ও ভগবানের জন্যে দেহ দিয়েছে, ওর আবার পাপ কি ? কোন পাপ নেই, তবে এ কথাটি সবাইকে বলো না। সবাই ভাবটি বুঝবে না - তা দেখ এখন বইয়েই ছাপিয়ে দিয়েছে। 

“মন না মত্ত হস্তী, মা। হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছােটে। তাই সদসৎ বিচার করে সব দেখতে হয়, আর খুব খাটতে হয় ভগবানের জন্যে। তখন আমার মন এমন ছিল -- দক্ষিণেশ্বরে রেতে কে বাঁশী বাজাত, শুনতে শুনতে মন ব্যাকুল হয়ে উঠত, মনে হােত সাক্ষাৎ ভগবান, বাঁশী বাজাচ্ছেন - অমনি সমাধি হয়ে যেত। আহা! বেলুড়েও কেমন ছিলুম ! কি শান্ত জায়গাটি, ধ্যান লেগেই থাকত। তাই ওখানে একটি স্থান করতে নরেন ইচ্ছা করেছিল। আর এই বাড়িটি যে হল, এই চার কাঠা জমি কেদার দাস দিয়েছিল। এখন জমির দাম কত ! এখন কি আর হয়ে উঠত? কে জানে সব ঠাকুরের ইচ্ছা।” 

এমন সময়ে মাকু ছেলে কোলে করে এসে তাকে ঘরে ছেড়ে দিয়ে বসলেন, “কি করব, মা, ঘুম নেই।” 

মা বললেন, “ও সত্ত্বগুণী ছেলে, তাই ঘুম নেই।” 

আমবাতের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে মা বললেন, “আঃ, আমবাতের জ্বালায় গেলুম, মা মুখেও আবার বেরিয়েছে। এই দেখ মুখে হাত বুলিয়ে। এ কি যাবে না ? এই দেখ পেটেও উঠেছে, দাও তাে পেটে ঐ তেলটি দিয়ে। ঐটি আমার প্রাণ গাে, দিলেই একটু কমে।” 

তেলমালিশ করতে করতে বললুম, “মা, বাড়িতে একদিন ঠাকুরপুজো করে সংসারের কাজ করতে গেছি, কিছু পরে ঠাকুরঘরে এসে দেখি - ঠাকুরের ছবি বিন্দু, বিন্দু ঘেমেছে। জানালা খােলা ছিল, ছবিতে রােদ লাগছিল। কিন্তু আমি ভাবলুম পুজা করবার সময় হয় তাে জল লেগেছিল। বেশ করে মুছে রেখে গেলুম। রােদে ঘেমেছে কি - না বুঝবার জন্য কিছু পরে আবার এলুম। এবারও এসে দেখি ঠাকুর ঘেমে রয়েছেন। তখন জানালা বন্ধ করে দিলুম।”

মা - হ্যাঁ , মা, তা অমন দেখা যায়। ঠাকুর বলতেন, “ছায়া, কায়া, ঘট, পট সমান।’ 

মা এইবার একটু চুপ করে রইলেন। বাসা হতে লক্ষ্মণ এসেছিল। মা বললেন, “তবে এস, মা, এস।” প্রণাম করে প্রসাদ নিয়ে বাসায় ফিরলুম।

একদিন মা উত্তরের বারাণ্ডায় বসে আছেন, জনৈক গৃহস্থ যুবক-ভক্ত মায়ের সঙ্গে কি কথা বলছেন। তিনি মায়ের পায়ে মাথা রেখে বলছেন, “মা, আমি সংসারে অনেক দাগা পেয়েছি, তুমি আমার গুরু, তুমিই আমার ইষ্ট, আমি আর কিছু জানি না। সত্যই আমি এত সব অন্যায় কাজ করেছি যে, লজ্জায় তােমার কাছেও বলতে পারি না। তবু তােমার দয়াতেই আমি আছি।” 

মা স্নেহভরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলছেন, “মায়ের কাছে ছেলে - ছেলে।” 

তিনি - হ্যাঁ, মা, কিন্তু এত দয়া তোমার কাছে পেয়েছি বলে যেন কখন মনে আসে না যে তােমার দয়া পাওয়া বড় সুলভ। 

* শ্রীশ্রীমা নহবতে নীচের কুঠরিতে থাকতেন। উহার পশ্চিমের বারান্ডায় সিঁড়ির পাশে গঙ্গার দিকে দক্ষিণমুখ হয়ে তিনি ধ্যান করতেন। 

** সেদিন সরুচাকলি পিঠে আর সুজির পায়েস করে অন্য লােক নেই দেখে শ্রীশ্রীমা নিজেই সন্ধ্যার পর ঐ সব ঠাকুরের ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

*** নহবতের রাস্তায় দরমার বেড়া দেওয়া ছিল। 

২ আশ্বিন, ১৩২৫ 

রাত প্রায় সাড়ে আটটা। মায়ের তত্তাপােশের পাশে নীচে মাদুর পাতা হয়েছে। মা শােবার উদ্যোগ করছেন। আমি যেতেই বললেন, “এস, এস, আমার কাছে এসে বস। ওকে একটু মিষ্টি দিয়ে জল খেতে দাও তো, সরলা, সারাদিন খেটে আবার এই ছুটে আসছে। আমি জল খেতে আপত্তি করলুম, কিন্তু তা কানেও তুললেন না; বললেন, “দেহের প্রতি একটু নজর রাখতে হয়, মা; সুমতি তিন ছেলের মা হয়েই যেন বুড়ী হয়ে গেছে।” মা তাঁর আমবাতের কথা তুলে বললেন, “এ কি হ’ল, মা ! লােকের হয়, যায় । আমার যেটি হবে সেটি আর যেতে চায় না। ঠাকুর যে বলতেন, যত লােকে রােগ, শােক, দুঃখ, তাপ নিয়ে কত কি করে এসে ছোঁয়, সেই সব এই দেহে আশ্রয় করে,’ তা ঠিক, মা; আমারও বােধ হয় তাই হবে। ঠাকুরের তখন অসুখ, কে সব ভক্তের ( দক্ষিণেশ্বরের) মায়ের (কালীর ).ওখানে পুজো দেবে বলে জিনিসপত্র এনে ছিল, তা ঠাকুর কাশীপুরে জেনে সেই সব ঠাকুরের কাছেই ভােগ লাগিয়ে প্রসাদ পেলে। ঠাকুর বলতে লাগলেন, “দেখছ, কি অন্যায় করলে। জগদম্বার জন্যে এনে এখানেই সব দিয়ে দিলে*।’ আমি তাে ভয়ে মরি, ভাবি—এই অসুখ, কি জানি কি হবে। একি বাপু কেন ওরা এমন করলে! ঠাকুর তখন বারবার তাই বলতে লাগলেন। কিন্তু পরে যখন রাত অনেক হয়েছে তখন আমাকে বললেন, “দেখ, এর পর ঘর ঘর আমার পুজো হবে। পরে দেখবে - একেই সবাই মানবে, তুমি কোন চিন্তা করাে না। সেই দিনই ‘আমার’ বলতে শুনলুম। কখনও ‘আমার’ বলতেন না। বলতেন, ‘এই খােলটার’ বা আপনার শরীর দেখিয়ে এই ‘এর’। সংসারে কত রকমের লােক সব দেখলুম। ত্রৈলােক্য**  আমাকে সাতটি করে টাকা দিত। ঠাকুর দেহ রাখার পর (দক্ষিণেশ্বরের) দীনু খাজাঞ্চী ও অন্য সকলে লেগে ঐ টাকাটা বন্ধ করলে***। আত্মীয় যারা ছিল তারাও মানুষ - বুদ্ধি করলে ও তাদের সঙ্গে যােগ দিলে। নরেনও কত বলেছিল, ‘মায়ের ও-টাকাটা বন্ধ কোর না।’ তবু করলে। তা দেখ, ঠাকুরের ইচ্ছায় অমন কত সাত গন্ডা এল, গেল। দীনু ফিনু সব কে কোথায় গেছে। আমার তাে এ পর্যন্ত কোন কষ্টই হয় নি। কেনই বা হবে? ঠাকুর আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার চিন্তা যে করে সে কখনও খাওয়ার কষ্ট পায় না।’ 

“ঠাকুরের দেহরক্ষার পর তাঁর সব ভাল জিনিসপত্র - বনাত, আলােয়ান, জামা কারা নেবে এই কথা নিয়ে গােল বাধে। তা ওসব হ’ল ভক্তদের ধন, তারা ওসব চিরকাল যত্ন করে রাখবে। তারাই শেষে ঐ সব গুছিয়ে নিয়ে বাক্সে পুরে বলরামের বৈঠকখানায় এনে রাখলে। কিন্তু মা ঠাকুরের কি ইচ্ছা—সেখান থেকে চাকরদের কে চাবি দিয়ে খুলে তার অনেকগুলি চুরি করে নিয়ে বিক্রি করে ফেললে -- কি কি করলে। তা ওসব কি বৈঠকখানায় রাখতে হয়? বাড়ির ভিতরে নিয়ে রাখলেই পারতো। তাঁর ব্যবহারের জিনিসপত্র আর জামা কাপড় যা বাকি ছিল, তা এখন বেলুড় মঠে আছে।

“আমার যে শ্বশুর ছিলেন, মা, বড় তেজস্বী, নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। তিনি অপরিগ্রাহী ছিলেন। কেহ কোন জিনিস বাড়িতে দিতে এলেও নেবার নিষেধ ছিল। আমার শ্বাশুড়ির কাছে কিন্তু কেউ কিছু লুকিয়ে এনে দিলে তিনি রেঁধেবেড়ে রঘুবীরকে ভােগ দিয়ে সকলকে প্রসাদ দিতেন। শ্বশুর তা জানতে পারলে খুব রাগ করতেন। কিন্তু জ্বলন্ত ভক্তি ছিল তার। মা শীতলা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ফিরতেন। শেষ রাত্রে উঠে ফুল তুলতে যাওয়া তাঁর অভ্যাস ছিল। একদিন লাহাদের বাগানে গিয়েছেন, একটি ন'বছরের মতাে মেয়ে এসে তাঁকে বলছে, বাবা, এদিকে এস। এদিকের ডালে খুব ফুল আছে। আচ্ছা, নুয়ে ধরছি, তুমি তােল। তিনি বললেন, এ সময়ে এখানে তুমি কে, মা?’ ‘আমি গাে, আমি এই হালদার বাড়ির।’ অমন ছিলেন বলেই ভগবান তাঁর ঘরে এসে জন্মেছিলেন, তিনি এসেছিলেন আর তাঁর এই সব সাঙ্গোপাঙ্গরাও এসেছিল -  নরেন, রাখাল, বলরাম, ভবনাথ, মনােমােহন - কত বলব, মা। ছােট নরেন শেষে বড় কামিনী-কাঞ্চনে আসক্ত হয়ে পড়লো, টাকা-পয়সায় জড়িয়ে পড়লো। ঠাকুর এদের যার যার সম্বন্ধে যা যা বলে গেছেন তা বর্ণে বর্ণে সত্য হয়েছে। 

“কামারপুকরের হবিদাসী বলে একটি মেয়ে নবদ্বীপ যাবে বলে এসে ওখানেই রয়ে গেল। আমাকে কত ভালবাসত! তার কি বিশ্বাস ছিল, মা ! ঠাকুরের জন্মস্থানের ধূলো কুড়িয়ে রেখেছিল, বলতো - ‘এই তাে নবদ্বীপ, স্বয়ং গৌরাঙ্গ এইখানেই এসেছিলেন। আবার কি করতে নবদ্বীপ যাব ?’ আহা কি বিশ্বাস ! ঠাকুরের দেহ রাখবার পর একজন উড়ে সাধু এসে কামারপুকুরে ছিলেন। আমি তাঁর চাল ডাল ইত্যাদি যা যা প্রয়ােজন সব দিতুম, আর সকালে বিকালে খবর নিতুম, ‘সাধু বাবা, কেমন আছ গাে।’

“আহা! তার একখানি কুঁড়ে কি করেই যে বেঁধেছিলুম, মা! রােজ আকাশ ভরে মেঘ হােত, এই বৃষ্টি হয় - হয় আর কি। তখন হাতজোড় করে বললুম, ‘ঠাকুর, রাখ গাে, রাখ; ওঁর কুঁড়ােটুকু হয়ে যাক, তারপর যত পার ঢেলাে।’ তা গ্রামের লোকেও কাঠকুটো যা লাগল দিয়ে সাহায্য করলে। রােজ বৃষ্টি আসব আসব করতাে। যা হােক, এমনি করে কুঁড়েখানি তাে হয়ে গেল, কিন্তু তার কিছুদিন পরেই সাধুটি সেই কুঁড়েতে দেহ রাখলেন।” 

মা বলছেন, “চল, এখন ঘরে যাই।” উঠতে উঠতে বললেন, “ঠাকুর বলতেন, ‘এই দেহটি গয়া হ’তে এসেছে। তাঁর মা দেহ রাখবার পর আমাকে বললেন, ‘তুমি গয়ায় পিণ্ডি দিয়ে এস।’ আমি বললাম, “পুত্র বর্তমান ; আমি দেব, সেকি হয় ?’ ঠাকুর বললেন, “তা হবে গাে, আমার কি ওখানে যাবার জো আছে ? গেলে কি আর ফিরবাে?' আমি বললুম, “তবে গিয়ে কাজ নেই।' পরে গয়া করতে আমিই গিয়েছিলুম**** রাত প্রায় নয়টা হয়েছে। প্রণাম করে বিদায় নিলুম। 

* কাশীপুরে এই ঘটনা হয়েছিল। কয়েকটি ভক্ত মাকালীর জন্য একদিন অনেক রকম মিষ্টি খাবারদাবার এনে হলঘরে ঠাকুরের ছবির সামনে ভােগ দিয়েছিলেন। 

** ত্রৈলােক্য বিশ্বাস রানী রাসমণির জামাত্য মথুরবাবর পত্র। ঠাকুর যখন আর পূজা করতে পারলেন না তখন হতে তার মাইনের টাকাটা বন্ধ না করে শ্রীশ্রীমাকে দিতেন। 

***মা তখন বৃন্দাবনে। চিঠি যেতে মা বলেছিলেন, “বন্ধ করেছে করুক। এমন ঠাকুরই চলে গেছেন; টাকা নিয়ে আর আমি কি করবাে।”

**** ঠাকরের দেহ-রক্ষার পর শ্রীশ্রীমা প্রথমবার বৃন্দাবন হ'তে ফিরে কামারপুকুর গিয়েছিলেন। বছর খানেক সেখান থেকে পরে বেলুড়ে গঙ্গাতীরে রাজু গােমস্তার ভাড়াটে বাড়িতে বাস করেন তারপর গয়া যাবার জন্যে মাস্টার মহাশয়ের বাড়ি এসে তথা হ'তে স্বামী অদ্বৈতানদের (বুড়ো গােপাল } সঙ্গে গয় যান। 
 
৩রা আশ্বিন, ১৩২৫ 

আজও মার ওখানে গিয়েছি। মা দেখেই বলছেন, “এসেছ, মা, এস।” নবাসনের বৌকে বললেন, “তেলটি এনেছ? দাও তে, বৌমা পিঠে মালিশ করে।” বৌ আমাকে দিতে বলায় মা বললেন, “আহা! ও এই সারাদিন খেটেখুটে ছুটে আসছে, একে একটু বিশ্রাম করতে দাও। ( আমাকে) ব’স, মা, বস। এই ওরা ভাস্করানন্দের কথা বলছিল। আমিও কাশীতে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলুম। সঙ্গে অনেক মেয়েরা ছিল। তখন মন খুব খারাপ, ঠাকুরের দেহ রাখার পর। সেই বারই বৃন্দাবনে প্রথম গিয়েছিলুম। তা ভাস্করানন্দের ওখানে যখন গেলুম, দেখি নির্বিকার মহাপুরুষ উলঙ্গ হয়ে বসে আছেন। আমরা যেতেই মেয়েদের সব বললেন, ‘শঙ্কা মৎ কর, মায়ী। তােমরা সব জগদম্বা, সরম কেয়া? এই ইন্দ্রিয়টি? এর জন্য? এ তাে হাতের পাঁচটি আঙ্গুল যেমন তেমন একটি। আহা, কি নির্বিকার মহাপুরুষ! শীত-গ্রীষ্মে সমান উলঙ্গ হয়ে বসে আছেন।” 

তেলমালিশ শেষ হবার পর মা বললেন, “চল, এখন ঠাকুরের বই একটু পড়বে। সরলাটি বােডিংএ চলে গেছে, মা, অন্য দিন সে পড়তাে।” পড়তে পড়তে সাধনের কথা, দর্শনাদির কথা উঠল। 

মা — এই গােলাপ, যােগীন, এরা কত ধ্যানজপ করেছে। এসব আলােচনা করা ভাল। পরস্পরেরটা শুনে ওদেরও (ঢাকার বৌ, নবাসনের বৌ প্রভৃতি) এতে মতি হবে। 

দর্শনের কথা উঠলে, মা অনেক কথা চেপে গেলেন, সকলের সামনে সে সব বলবেন না বলে বােধ হয়। 

নলিনী  - পিসীমা, লােকের কত ধ্যানজপ হয়, দর্শন-স্পর্শন হয় শুনি, আমার কিছু হয় না কেন? তোমার সঙ্গে এতদিন যে রইলুম, কই আমার কি হল?

মা - ওদের হবে না কেন? খুব হবে। ওদের কত ভক্তি বিশ্বাস ! বিশ্বাস ভক্তি চাই, তবে হয়। তােদের কি তা আছে ? 

নলিনী - আচ্ছা, পিসীমা, লোকে যে তােমাকে অন্তর্যামী বলে, সত্যিই কি তুমি অন্তর্যামী ? আচ্ছা, আমার মনে কি আছে তুমি বলতে পার ? 

মা একটু হাসলেন। নলিনী আবার শক্ত করে ধরলেন। তখন মা বললেন, “ওরা বলে ভক্তিতে। তারপর বললেন, ‘আমি কি, মা? ঠাকুরই সব। তােমরা ঠাকুরের কাছে এই বল - (হাতজোড় করে ঠাকুরকে প্রণাম করলেন) আমার ‘আমিত্ব’ যেন না আসে।” 

মার ভাব দেখে হাসি এল, ধরাছোঁয়া না দেওয়ার ভান, আর আমরা তাে এক একটি অহঙ্কারে ভরা। এ শিক্ষার মর্ম বুঝবার আমাদের ক্ষমতা কোথায়? 

ঢাকার বৌ বলছেন, “আমার ছেলে বলে--মার কাছে আর কি বলব, মা তাে জগদম্বা, অন্তরের কথা সব জানেন।”

আমি বললুম, “অনেকেই তাে মাকে জগদম্বা বলেন, কিন্তু কার কত বিশ্বাস তা ঠাকুরই জানেন। অবিশ্বাসী আমাদের মুখে এই কথা যেন নিতান্ত মুখস্থ করা কথার মতাে শুনায়।” 

মা হেসে বললেন, “তা ঠিক, মা।” 

আমি - মা যে সাক্ষাৎ ভগবতী, একথা মা যদি নিজে দয়া করে বুঝিয়ে না দেন, তা হলে আমাদের সাধ্য কি বুঝি। তবে মায়ের ঈশ্বরত্ব এখানেই যে, মায়ের ভিতরে আদৌ ‘অহঙ্কার’ নেই। জীবমাত্রই অহং-এ ভরা। এই যে হাজার হাজার লোক মায়ের পায়ের কাছে ‘তুমি লক্ষী, তুমি জগদম্বা’ বলে লুটিয়ে পড়ছে, মানুষ হলে মা অহঙ্কারে ফেঁপে ফুলে উঠতেন। অত মান হজম করা কি মানুষের শক্তি ! 

মা প্রসন্নমুখে একবার আমার দিকে চাইলেন মাত্র। মনে মনে বললুম, “মা, দয়া কর, মা, মুখে বলতে আমার লজ্জা করে, মনে যেন বলতে পারি।” 

যাবার সময় হয়ে এসেছে। মা উঠে প্রসাদ হাতে দিয়ে বললেন, “প্রসাদে ও হরিতে কোন প্রভেদ নেই, ( আমার বুকে হাত দিয়ে) মনে এটি স্থির বিশ্বাস রেখাে।” আজ বিশেষ করে কেন এটি বললেন? আজ তিন মাস হ’ল প্রায় রােজই আসি, যাই। যাবার সময় মা রােজই হাতভরে প্রসাদ দেন। অনেককে দেওয়ার জন্য কোন কোন দিন প্রসাদের অভাব হতেও দেখেছি। মা তাই নিজের তক্তাপােশের নীচে একটি সরায় করে প্রসাদ রেখে দিতেন এবং বলে রাখতেন, “ওরটি রেখে আর সবাইকে দিও গাে।” তাতেও আমার লজ্জা করতো। এই লজ্জা ভেঙ্গে দেবার জন্যই কি আজ বিশেষ করে ও কথাটি বললেন ? 

১১ই আশ্বিন, (নবম্যাদিকল্পারম্ভ দেবীর বােধন)-১৩২৫ 

প্রাতে গিয়েছি। মা ফল কাটছিলেন, দেখেই বললেন, “এসেছ, মা, এস। আজ বােধন ( আমার এই কথা মনেই ছিল না)। ঠাকুরের এই ফুলগুলি বেছে সাজিয়ে রাখ, ফলের থালা এই পাশটিতে রেখে দাও।” আদেশ পালন করলুম। ফল ইত্যাদি কাটা হয়ে গেলে মা পাশের ঘরে এলেন। স্নান করবেন। তেলের ভাঁড়, চিরুণি নিয়ে আমার কোলের কাছে এসে বসলেন। মাথায় হাত দিতে আমি ইতস্তত করছি দেখে মা বললেন, “দাও না গাে মাথাটা আঁচড়ে।” — যেন বালিকাটি। আদেশ পেয়ে আমি আঁচড়ে দিচ্ছি। রাধু নেয়ে এসে বলছে, “চিঁড়ে দিয়ে দই খাবাে।” 

মা সেখানেই একটি বাটিতে চিঁড়ে দই মেখে নিজে একটু মুখে দিয়ে রাধুকে দিলেন। আমি মাথা-আঁচড়ান রেখে তেল মাখিয়ে দিচ্ছি। মা বলছেন, “দেখ, জয়রামবাটীতে ক’টি ছেলে দীক্ষা নিতে গিয়েছিল। তা, তাদের দিলুম না। তখন তারা কাকুতি করে বললে, ‘তবে পায়ের একটু ধূলো দিন, মাদুলি করে রাখব’-এমনি তাদের ভক্তি-বিশ্বাস।” 

মাথা আঁচড়াতে মায়ের অনেকগুলি চুল উঠেছিল। মা বললেন, “এই নাও গাে, রাখ।” বস্তুতঃই আমি ধন্য হয়ে গেলুম -  আমার নেবার ইচ্ছা ছিল। 

মায়ের সঙ্গে গঙ্গায় নাইতে গেলুম। স্নান করে এসে পুজা শেষ হলেই মা প্রসাদবিতরণ করতে লাগলেন। তাতে অনেক সময় কেটে গেল। 

শ্যামাদাস কবিরাজ মশায় রাধুকে দেখতে এলেন। মা রাধুকে ডেকে দিতে বললেন। আমি ডাকতে গেলুম। একটু পরে রাসবিহারী মহারাজ গিয়ে কবিরাজ মহাশয়কে ডেকে নিয়ে এলেন। দেখবার পর মা ( কবিরাজ মশায়কে)  প্রণাম করতে রাধুকে বললেন। রাধু নত হয়ে প্রণাম করলাে। তিনি চলে যেতে, কেউ কেউ বললে, “উনি কি ব্রাহ্মণ ?” 

মা - না, বৈদ্য। 

“তবে যে প্রণাম করতে বললেন ?” 

মা—তা করবে না ? কতবড় বিজ্ঞ ! ওঁরা ব্রাহ্মণতুল্য, ওঁকে প্রণাম করবে তাে কাকে করবে ? কি বল, মা। 

ঠাকুরের ভোগ হয়ে গেল। মায়ের খাওয়া হয়ে যেতে আমরা সকলে প্রসাদ পেতে বসলুম। মা আমাকে বললেন, “কড়াইয়ের ডালটি বেশ হয়েছে, খাও।” নলিনী দিদি বলছেন, “তুমি রােজ এসে চলে যাও, খাও তাে না, আজ বেশী করে মাছ খাও।” এই বলে অনেকগুলি মাছ দেওয়ালেন। মাছের চেয়ে ডালটাই আমার বিশেষ প্রিয় মা ঠিকই ধরেছিলেন। 

মা এইবার বিশ্রাম করবেন। গােলমাল হবে বলে আমরা পাশের ঘরে গেলুম। খানিক পরে এসেছি। মা বলছেন, “দেখছ, সব দরজা বন্ধ করে রেখেছে, গরমে প্রাণ গেল। খুলে দাও তাে।” খুলে দিলুম। একটু পরেই মা উঠে কাপড় কাচতে গেলেন। ঠাকুরের বৈকালী ভােগ দেওয়া হ’ল। মা এসে উত্তরের বারাণ্ডায় আসন পেতে বসলেন। কিছু পরে বৌ, মাকু এরা সব থিয়েটার দেখতে গেলেন। মায়ের কাছে চুপ করে বসে তাকিয়ে দেখি মায়ের মাথার সামনে অনেকগলি পাকা চুল দেখা যাচ্ছে। মনে হল প্রাতে তখন যদি তুলতুম। মাও বলছেন, “এস তাে, মা, আমার পাকা চুল তুলে দাও।” টের তােলা হ’ল, অনেক সময় লাগল। এইবার ভক্তেরা সব প্রণাম করতে আসবেন, আমারও গাড়ি এসেছে, কালীঘাটের বাসায় যেতে হবে। এখন থেকে মায়ের কাছে এমন করে রোজ রোজ যখন তখন আসবার সুবিধা হবে না ভেবে কষ্ট হতে লাগল। প্রণাম করে বিদায় নেবার সময় মা বললেন, “মহাষ্টমীর দিন আসতে পার যদি এস।” 

২৬শে আশ্বিন, রবিবার, ১৩২৫ 

আজ মহাষ্টমী। মা আসতে বলেছিলেন। সকালেই আমরা দু’বোনে এসেছি। এসে দেখি কয়েকটি স্ত্রী-ভক্ত ফুল নিয়ে এলেন। মায়ের শ্রীচরণ পূজা করে তাঁরা গঙ্গায় নাইতে গেলেন। মা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি থাকবে তাে ? আজ মহাষ্টমী।” আমি বললুম, “থাকব।” কিছুক্ষণ পরেই পূজনীয় শরৎ মহারাজ মায়ের চরণে প্রণাম করতে এলেন। আমরা পাশের ঘরে গেলুম। মা তক্তাপােশে বসে আছেন, পা দুটি মেজেই রেখে। আরও অনেক ভক্ত প্রণাম করলেন। 

পরে মাকু প্রভৃতির সঙ্গে গঙ্গাস্নানে গেলুম। মা আজ বাড়িতেই স্নান করলেন। কারণ, মা একদিন অন্তর একদিন গঙ্গাস্নান করতেন। বাতের জন্য রোজ যেতেন না। এসে দেখি বিস্তর মেয়েরা মাকে পুজা করছেন। অনেকেই কাপড় এনেছেন। কালীঘাটে মা কালীর গায়ে যেমন কাপড় জড়িয়ে দেওয়া হয়, পূজান্তে তেমনি করে সকলে মায়ের গায়ে কাপড় জড়িয়ে দিচ্ছেন। মাও এক একখানি করে দেখে নামিয়ে রাখছেন। কাউকে বা বলছেন, “বেশ কাপড় খানি।” একজন ব্রহ্মচারী সংবাদ দিলেন—এখন সব পুরুষ-ভক্তেরা মাকে প্রণাম করতে আসবেন। সে কি সুন্দর দৃশ্য ! হাতে ফুল, প্রস্ফুটিত পাদ্ম,বিল্বদল -- একে একে সকলে পূজা ও প্রণাম করে সরে দাঁড়াচ্ছেন। এইরূপে অনেকক্ষণ গেল। ডাক্তার কাঞ্জিলাল সপরিবারে (প্রথম পক্ষের স্ত্রীসহ) এসেছেন। গােলাপ-মা বলছেন, “যার জিনিস সেই পেলে।” মাও বলছেন, “হ্যাঁ, যার-- তারই হল। মাঝখানে দুদিন কি গােলমাল হয়ে আর একজনের (পরলােকগতা দ্বিতীয়া স্ত্রীর) একটু ভােগ হয়ে গেল। এ জন্ম-জন্মান্তরের যােগ।” বলরাম বাবুর বাড়ির সকলে এসে পুজা করে গেলেন। শেষে আমি গেলুম। পূজা করে কাপড়খানি গায়ে দিতে যেতেই মা বললেন, “ওখানা পরবে। আজ তাে একখানি নূতন কাপড় পরতে হবেই।” এই বলে কাপড়খানা পরলেন। আমার চোখে জল এল। সামান্য কাপড়খানা ! সকলে কত ভাল কাপড় দিয়েছেন। আমি মায়ের গরীব মেয়ে। মায়ের অত স্নেহে আমার লজ্জাও করতে লাগল। মা বলছেন, “বেশ পাড়টি গাে।” 

একটি গেরুয়াবসনধারিণী মেয়ে মাকে পূজা করে দু’টি টাকা পদতলে রাখতে, মা বললেন, “ওকি ! তুমি আবার কেন গো ! গেরুয়া নিয়েছ, হাতে রুদ্রাক্ষের মালা।” 

মা মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কোথায় দীক্ষিত হয়েছ ?” 

মেয়েটি বললে, “দীক্ষা হয় নি।” 

মা বললেন, “দীক্ষা না নিয়ে, কোন বস্তু লাভ না করে এই বেশ ধরেছ, এ তাে ভাল করনি। বেশটি যে বড় - আমারই যে জোড়হাত হয়ে প্রণাম আসছিল; ও করতে নেই, আগে বস্তুলাভ হোক। সকলে যে পায়ে মাথা দিতে আসবে, তা নেবার শক্তি লাভ হওয়া চাই।”

মেয়েটি বললে, “আপনার কাছেই দীক্ষা নেবার ইচ্ছা করেছি।” 

মা বললেন, “সে কি করে হবে ?” তবুও সেই মেয়েটি মিনতি করতে লাগল। গােলাপ-মাও একটু সহায় হলেন। মা অনেকটা সদয় হয়ে এসেছেন দেখলুম। মা বললেন, “দেখা যাবে পরে।” 

গৌরীমা তার আশ্রমের মেয়েদের নিয়ে এসেছেন। সকলেই পূজা করে প্রসাদ নিয়ে বিদায় নিলেন। 

ঠাকুরপূজা শেষ করে বিলাস মহারাজ এসে চুপি চুপি মাকে বলছেন, “আজ ঠাকুর ভােগ নিলেন কি-না কি জানি, মা। একটা প্রসাদী শালপাতা উড়ে এসে নৈবেদ্যের উপর পড়লো। এরূপ কেন হ’ল ? অনেকেই বাড়ি হতে সৰ এনেছে, কি হ’ল কি জানি।” 

মা বললেন, “গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিয়েছ তাে?” 

“তা তাে দিয়েছি” বলে তিনি চলে গেলেন। শুনে মনটা বড় খুঁৎ খুঁৎ করতে লাগল। মহাষ্টমী - মায়ের চরণপূজা সমভাবেই চলতে লাগল। স্তুপাকারের ফুল বেলপাতা বারান্ডায় রেখে আসতে-না-আসতেই আবার তত ফুল পাতা শ্রীচরণতলে জমে উঠতে লাগল। 


ক্রমে মধ্যাহ্ন - ভােগের সময় হ’ল। এমন সময়ে দূর দেশ হতে তিনটি পুরুষ ও তিনজন স্ত্রীলােক মায়ের দর্শনার্থে এলেন। বড়ই দরিদ্র-একবস্ত্রে, ভিক্ষা করে টাকা সংগ্রহ করে পথ খরচ চালিয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ-ভক্ত মায়ের সঙ্গে গােপনে অনেক কথা বলতে লাগলেন। কথা আর ফুরায় না। শ্রীশ্রীঠাকুরের মধ্যাহ্নভােগের বেলা হয়ে যাচ্ছে দেখে (কারণ, মা ভােগ দেবেন) মায়ের ভক্ত ছেলেরা বিরক্ত হয়ে উঠতে লাগলেন। একজন স্পষ্টই বললেন, “আর যা বলবার থাকে নীচে মহারাজদের কারাে কাছে গিয়ে বলুন না।” মা কিন্তু একটু দৃঢ়ভাবেই বললেন, “তা এখন বেলা হলে, কি হবে, ওদের কথাটি তাে শুনতে হবে। এই বলে বেশ ধৈর্যের সহিত তাঁর কথা শুনতে লাগলেন। পরে ধীরে ধীরে কি আদেশ করলেন। তাঁর স্ত্রীকেও ডেকে নিলেন। অনুমানে যতটা বুঝা গেল, স্বপ্নে কোন কিছু পেয়েছেন। পরে জানা গেল স্বপ্নে মন্ত্র পেয়েছিলেন। প্রায় একঘণ্টা পরে তাঁরা প্রসাদ নিয়ে বিদায় নিলেন। মা এসে বললেন, “আহ! বড় গরীব। কত কষ্ট করে এসেছে।” 

পরে ভােগ হয়ে গেলে সকলে প্রসাদ পেলুম। এবার মা একটু বিশ্রাম করবেন। আমরা পাশের ঘরে গেলুম। 

চারটা বেজেছে। মা উঠলেন। ঠাকুরের বৈকালী ভােগ হয়ে গেল। রাসবিহারী মহারাজ এসে বললেন, “একটি মেম তােমাকে দর্শন করতে এসেছেন। নীচে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন।” মা আসতে বললেন। মেমটি এসে মাকে প্রণাম করতেই, মা “এস” বলে তার হাত ধরলেন (হ্যাণ্ড-শেক করার মতাে। মা যে বলেন, ‘যেখানে যেমন সেখানে তেমন, যখন যেমন তখন তেমন’ সেটি প্রত্যক্ষ করা গেল। তারপর মেয়েটির মুখে হাত দিয়ে চুমাে খেলেন। মেমটি বাংলা জানেন, বললেন, “আমি তাে আসিয়া আপনার কোন অসুবিধা করি নাই ? আমি অনেকক্ষণ হইল আসিয়াছি। আমি বড় কাতর আছি। আমার একটি মেয়ে, বড় ভাল মেয়ে, তার কঠিন পীড়া হইয়াছে। তাই, মা, আপনার করুণা ভিক্ষা করিতে আসিয়াছি। আপনি দয়া করিবেন, মেয়েটি যেন ভাল হয়। সে এত ভাল মেয়ে, মা! ভাল বলিতেছি কেন—আমাদের মধ্যে স্ত্রীলােক ভাল বড় একটা নাই। অনেকেই বড় বদমাশ, দুষ্ট—এ আমি সত্য বলিতেছি। এ মেয়েটি সেরুপ নহে—আপনি কৃপা করিবেন।” 

মা বললেন, “আমি প্রার্থনা করব তােমার মেয়ের জন্যে - ভাল হবে। 

মেমটি এ কথায় খুব আশ্বস্তা হলেন ; বললেন, “তবে আর ভাবনা নাই। আপনি যখন বলিতেছেন, ‘ভাল হইবে’ তখন ভাল হইবেই-নিশ্চয়, নিশ্চয়, নিশ্চয়।” কথায় খুব জোর ও বিশ্বাস প্রকাশ পেলাে। মা সদয় হয়ে গােলাপ মাকে বললেন, “ঠাকুরের ফুল একটি একে দাও, একটি পদ্ম আন।” বিল্বপত্রের সঙ্গে একটি পদ্ম এনে গােলাপ-মা মায়ের হাতে দিলে, মা ফুলটি হাতে করে চোখ বুজে একটু রইলেন; পরে ঠাকুরের পানে একদৃষ্টে চেয়ে ফুলটি মেমটির হাতে দিয়ে বললেন, “তােমার মেয়ের মাথায় বুলিয়ে দেবে।” 

মেম হাতজোড় করে ফুল নিয়ে প্রণাম করে বললেন, “তারপর কি করিব ?” 

 গােলাপ-মা বললেন, “কি আর করবে? শুকিয়ে গেলে গঙ্গায় ফেলে দেবে।”

মেমটি বললেন, “না, না, এ ভগবানের জিনিস ফেলিয়া দিব। একটি নতুন কাপড়ের থলে করিয়া রাখিয়া দিব, সেই থলেটি মেয়ের মাথায় গায়ে বােজ বুলাইয়া দিব!” 

মা বললেন, “হ্যাঁ, তাই করো।” 

মেম - ঈশ্বর সত্য বস্তু, তিনি আছেন। আপনাকে একটি কথা বলিতে চাই। কিছুদিন পূর্বে আমার একটি শিশুর খুব জ্বর হয়, আমি খুব ব্যাকুল হইয়া একদিন বসিয়া বলি, “হে ঈশ্বর, তুমি যে আছ ইহা তাে আমি অনুভব করি ; কিন্তু আমাকে প্রত্যক্ষ কিছু দাও।' এই বলিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে একটি রুমাল পাতিয়া রাখি। অনেকক্ষণ পরে দেখি সেই রুমালের ভাঁজের মধ্যে তিনটি কাঠি। আমি অবাক হইয়া সেই কাঠি তিনটি লইয়া উঠিয়া আসিয়া শিশুটির গায়ে ক্রমান্বয়ে তিনবার বুলাইয়া দিলাম, সেইক্ষণে তাহার জ্বর ছাড়িয়া গেল। 

ইহা বলতেই টস টস করে মেমটির চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। তারপর বললেন, “আপনার অনেক সময় নষ্ট করিলাম, আমায় মাফ করিবেন।” 

মা বললেন, “না, না, তােমার সঙ্গে কথা কয়ে আমি ভারি খুশি, তুমি এক দিন মঙ্গলবারে এস।” মেমটি প্রণাম করে বিদায় নিলেন। 

যােগীন-মার পিঠে ফোড়া হয়েছে; অস্ত্র হয়েছে। মা বলছেন “আহা! আজকার দিনে যােগীন পড়ে রইল। কত কি করবে মনে সাধ ছিল। একবার এ ঘরে আসতে পারলে না। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি যােগীনের কাছে যাচ্ছ কি! বােলাে - আমি একটু পরেই আসছি।” যােগীন-মাকে দেখে মায়ের কাছে ফিরে এসে দেখি শ্রীমান প্রিয়নাথ প্রণাম করছে। মা মুখে হাত দিয়ে চুমাে খেলেন। প্রিয়নাথের চোখে ছাতির শিকে ভয়ানক খোঁচা লেগেছে, ব্যাণ্ডেজ করা রয়েছে। তাই দেখে মা ভারি ব্যস্ত হয়েছেন; বারে বারে বলছেন, “আহা ভাগ্যে চোখটি নষ্ট হয়নি গাে।” এইবার আমার রওনা হবার সময় হয়ে এসেছে। একটু পরে প্রণাম করে বিদায় চাইতে মা বললেন, “আবার এস।” 

২রা কার্তিক শনিবার, ৺লক্ষীপূজা—১৩২৫ 

সকালেই আমরা দুবােনে মায়ের শ্রীচরণদর্শন করতে গিয়েছি। সুমতির ছেলেমেয়েরাও সঙ্গে গিয়েছে। মা ঠাকুরঘরে বসে ফল কাটছিলেন; দেখে বললেন, “এই যে সব গাে, বস। কবে এলে?”

আমি বললুম, ‘মহাষ্টমীর দিন রাত্তিরেই চলে গিয়েছিলুম, আবার কাল রাত্তিরে এসেছি।” 

মা - এখন কি থাকা হবে? 

না, মা।” 

মা সুমতিকে বললেন, “বৌমা, ভাল আছ ? ভাসুরঝিটি কেমন আছে ?” 

দুটি মহিলা দীক্ষা নিতে এসেছেন। তাঁরা এসে প্রার্থনা জানাতেই মা বললেন, “হাঁ, আরও দুটি ছেলে আছে।” বলতে বলতে আর একটি মহিলা এসে বললেন, তিনিও দীক্ষা নিতে এসেছেন। মা বললেন, “তবে তাে অনেক গলি হ’ল গাে।”

সুমতি শ্রীশ্রীমাকে চণ্ডীজ্ঞানে পুজা করা ও লালপেড়ে শাড়ী দেওয়া স্বপ্নে দেখেছে। তাই দেবে বলে নিয়ে এসে লজ্জায় মাকে বলতে পারছে না; বলছে, “দিদি, তুমি বল।” আমি ঐকথা মাকে বলতেই, মা হেসে বললেন, “জগদম্বাই স্বপ্ন দিয়েছেন কি বল, মা ? তা দাও, শাড়ীখানি তাে পরতে হবে।” চওড়া লালপেড়ে শাড়ীখানি মা পরলেন; কি চমৎকার দেখাতে লাগল। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলুম-চোখে জল এল। সুমতি বলছে “একটু সিঁদুর দিলে বেশ হতাে।” 

মা সহাস্যে বললেন, “তা দেয় তাে।” কিন্তু সিদুঁর নিয়ে যায়নি বলে দেওয়া হল না। আমরা বাসায় ফিরবাে বলে প্রণাম করছি। মা বললেন, 
“তুমিও যাবে এখুনি?” 

আমি -- হ্যাঁ, মা, যেতে হবে। বাসায় একটু বেশী রান্নার কাজ আছে। 

মা - আবার আসবে? 

আমি - হ্যাঁ, বিকেলে আসব। 

মা অনেকগুলি রসগােল্লা নিয়ে ঠাকুরকে ভােগ দিয়ে ছেলেদের হাতে দিলেন। আমরা বিদায় নিলুম। বিকেলে লক্ষ্মী পূজা বলে নারকেলের খাবার সব নিয়ে গেছি। দেখে মা বলছেন, “কি গো, আজ লক্ষ্মী পূজা, তাই বুঝি এ সব।” ক্রমে ক্রমে অনেক স্ত্রী-ভক্ত নানারূপ মিষ্টদ্রব্য নিয়ে মায়ের শ্রীচরণদর্শন করতে এলেন। কোন বাড়ি থেকে মিষ্টির সঙ্গে ডাব চিঁড়ে এই সবও দিয়েছে। দেখে মা বলছেন, “কোন দিনে কি দিতে হয়, তা ওরা সব বেশ জানে।” সন্ধ্যারতির পর ঠিক সময়ের মধ্যে ভােগ দেওয়া হ’ল। শ্রীশ্রীমা নীচে ভক্তদের জন্য চিঁড়ে নারকেল ইত্যাদি প্রসাদ সব পাঠালেন। উপরে মেয়েরাও সকলে পেলেন। 

একটি স্ত্রীলােক লক্ষ্মী পূজার  তাবৎ উপকরণ নিয়ে এসে মায়ের শ্রীচরণপূজা করলেন। পরে চারি পয়সা পদতলে রেখে প্রণাম করলেন। মা আমাদের বললেন, “আহা! ওর বড় দুঃখ, * মা, বড় গরীব।” মা তাঁকে আশীর্বাদ করলেন। 

মাকে জিজ্ঞাসা করলুম, ‘মঙ্গলবারে সেই মেমটি এসেছিলেন, মা?” 

মা বললেন, হ্যাঁ, মা, এসেছিল।” মেমটির উপর মায়ের বিশেষ কৃপা। তাঁকে দীক্ষা দিয়েছেন, খুব ভালবাসেন। তাঁর মেয়েটিও সেরে উঠেছে। 

রাত হ’ল দেখে প্রণাম করে বিদায় নিলুম। 

* একমাত্র পুত্র বি.এ পাশ করে পাগল হয়েছে এবং তদবধি নিরুদ্দেশ। স্বামীও পুত্রশােকে প্রায় উন্মাদের মতাে হয়েছেন।

১১ই চৈত্র, ১৩২৬ 

শ্রীশ্রীমা দেশে গিয়েছিলেন, প্রায় এক বৎসর পরে ফাগুন মাসে বাগবাজারের বাটীতে শুভাগমন করেছেন। শরীর নিতান্ত অসুস্থ। অনেকদিন যাবৎ মাঝে মাঝে জ্বর হচ্ছে-ম্যালেরিয়া। শ্রীচরণদর্শন করতে গিয়ে দেখি মা কাপড় কাচতে গেছেন। কলঘর হতে বেরিয়ে বললেন, “বস, আমি আসছি।” মিনিট পাঁচ পরেই কাপড় ছেড়ে, সর্ব দক্ষিণের ঘরে মায়ের বিছানা করা ছিল, সেখানে এসে দাঁড়ালেন। শ্রীচরণে প্রণাম করতেই মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। বললেন, “বস, কেমন আছ?” সেবার জন্য কিছু দিলাম-টাকা হাতে করে নিয়ে রাখলেন। মায়ের শরীর দেখে আমার আর কথা বেরুচ্ছে না - শুধু মুখের পানে চেয়ে আছি, আর ভাবছি -- সেই শরীর এমন হয়ে গেছে! সঙ্গে সুমতিদের ঝি গিয়েছিল, সে প্রণাম করবার উদ্যোগ করতেই মা তাকে বললেন, “তুমি ওখান হতেই কর।” সে দরজার গােড়ায় প্রণাম করে চলে গেল। 

মা এত দুর্বল যেন কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হল। নীচেই বসে আছি। ইতােমধ্যে রাসবিহারী মহারাজ এসে মাকে বেশী কথা কইতে নিষেধ করে গেলেন। তবু মা মাঝে মাঝে দু'চারটি কথা জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। যথাসম্ভব সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে বসে আছি, এই সময় রাধারানী ছেলে কোলে করে এলেন, ছেলেটির অসুখ। আমি ছেলেটির হাতে কিছু দিয়ে দেখলুম। রাধু তাে কিছুতেই তা নেবে না। মা বললেন, “সে কি রাধু, দিদি আদর করে দিচ্ছে, আর তুই নিবি নে ?” এই বলে নিজেই তুলে রাখলেন। ছেলেটি শুধু মা ও দিদিমার জন্যই নাইবার খাবার অনিয়মে অসুখে ভুগছে বলে কত আক্ষেপ করলেন। রাধু তো ঢের কটুক্তি করে তার প্রতিবাদ করতে লাগল। “ওকে বলে কোন ফল নেই” বলে মা চুপ করে গেলেন। খানিক পরে সরলা, কৃষ্ণময়ী দিদি প্রভৃতি এলেন। মা শুয়েই তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। সরলা কৃষ্ণময়ীদিদির নাতনির অসুখে শুশ্রুষা করতে গিয়েছিলেন, সেই সব কথা হতে লাগল। 

১৭ই চৈত্র, ১৩২৬ 

পাঁচ-ছদিন পরে গেছি, সন্ধ্যারতি হচ্ছিল। শ্রীশ্রীমা খাটের উপর শুয়ে ছিলেন। নিকটে গিয়ে দাঁড়াতে উঠে বসলেন। প্রণাম করে আদেশমত বসলুম। ঘরে সরলা, নলিনী ও বৌ আছেন ; বৌ ও নলিনী জপ করছেন। কিছু সন্দেশ নিয়ে গিয়েছিলুম। আরতি শেষ হলে মা বিলাস মহারাজকে তা ভােগ দিতে বললেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “পরে দি