শ্রীশ্রীমায়ের কথা (দ্বিতীয় ভাগ)

দ্বিতীয় ভাগ
Shri Shri Mayer Katha ~ 2nd Part
 
============

শ্রীশ্রীমায়ের জীবনী 

শ্রীশ্রীমা বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটী গ্রামে ১২৬০ সালের ৮ই পৌষ বৃহস্পতিবার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম রামচন্দ্র মুখােপাধ্যায়, মাতার নাম শ্যামা দেবী। মা তাঁহার জন্মকথা এইরূপ বলিয়াছেন, “আমার জন্মও তাে ঐ রকমের (ঠাকুরের মতাে)। আমার মা শিওড়ে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন। ফেরবার সময় হঠাৎ শৌচে যাবার ইচ্ছে হওয়ায় দেবালয়ের কাছে এক গাছতলায় যান। শৌচের কিছুই হল না, কিন্তু বােধ করলেন, একটা বায়ু যেন তাঁর উদরমধ্যে ঢোকায়, উদর ভয়ানক ভারী হয়ে উঠল। বসেই আছেন। তখন মা দেখেন যে লাল চেলি পরা একটি পাঁচ-ছ বছরের অতি সুন্দরী মেয়ে গাছ থেকে নেমে তার কাছে এসে কোমল বাহু দুটি দিয়ে পিঠের দিক থেকে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে বলল, আমি তােমার ঘরে এলাম মা। তখন মা অচৈতন্য হয়ে পড়েন। সকলে গিয়ে তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে এল। সেই মেয়েই মায়ের উদরে প্রবেশ করে ; তা থেকেই আমার জন্ম। বাড়িতে ফিরে এসে মা এই ঘটনাটি বলেছিলেন।” 

মায়ের পিতা তখন কার্যোপলক্ষে কলিকাতা গিয়াছিলেন। ফিরিয়া আসিয়া তিনি এই সকল কথা শুনিলেন। তদবধি মা ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত তিনি আর স্ত্রীর অঙ্গ স্পর্শ করেন নাই। শুনিয়াছি, মাকে তাঁহার পিতা দেবতার ন্যায় ভক্তিশ্রদ্ধা করিতেন। মায়ের মা একবার যােগেন-মাকে বলিয়াছিলেন, “গর্ভাবস্থায় আমার এই রূপ। মাথায় চুল আর ধরে না। সেবার সাধে কত লােক যে কাপড় দিয়েছিল তার আর অবধি নেই।” 
মায়ের জন্মস্থান এখন যেখানে মন্দির হইয়াছে সেইখানে ছিল। বসত ঘরখানি উত্তরের জমিতে ছিল। পূর্বদিকের জমিতে একখানি দোচালা ঘর ছিল। মধ্যে দেওয়াল, বহির্ভাগ সদর এবং ভিতরের ভাগ অন্দর। দক্ষিণের জমিতে রান্নাঘর, ঢেঁকিশাল প্রভৃতি ছিল। মা বলিয়াছিলেন, “পুরান (জন্মস্থানের) বাড়িতে বিয়ে হয়। আমার ন বছর বয়সের সময় নূতন বাড়িতে (এখন যেটি বরদা মামার বাড়ি ) আসি। ও বাড়িতে আর ধরে না।" 
মায়ের পিতা দরিদ্র হইলেও অতি নিষ্ঠাবান এবং মাতা বিশেষ ভক্তিমতী ও কর্তব্যপরায়ণা ছিলেন। মা শৈশবে দরিদ্রের সন্তানের মতােই লালিত পালিত হইয়াছিলেন। রম্বনাদি গৃহকার্যে তিনি নিজ মাতাকে সহায়তা করতেন। আমাদের নিকট বলিয়াছিলেন, “ছেলেবেলায় গলা সমান জলে নেমে গুরুর জন্য দলঘাস কেটেছি। ক্ষেতে মুনিষদের জন্য মুড়ি নিয়ে যেতুম। এক বছর পঙ্গপালে সব ধান কেটেছিল; ক্ষেতে ক্ষেতে সেই ধান কুড়িয়েছি।” 
বাল্যকালে ছােট ভাইদের রক্ষণাবেক্ষণ করাই মায়ের প্রধান কাজ ছিল। তিনি বলিয়াছিলেন, “ভাইদের নিয়ে গঙ্গায় নাইতে যেতুম। আমোদর নদীই ছিল যেন আমাদের গঙ্গা। গঙ্গাস্নান করে সেখানে বসে মুড়ি খেয়ে আবার ওদের নিয়ে বাড়ি আসতুম। আমার বরাবরই একটু গঙ্গাবাই ছিল।” 
ছােট ভাইদের সঙ্গে মা কখনও কখনও পাঠশালায় যাইতেন। তাহার ফলে তখন অতি সামান্য লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন। অবশ্য পরে তিনি বেশ পড়িবার অভ্যাস করিয়াছিলেন, এবং বাংলা রামায়ণাদি পড়িতেন কিন্তু পত্রাদি লিখিতে তাঁহাকে কখনও দেখা যাইত না। 

পাঁচ বৎসর বয়সের সময় মায়ের বিবাহ হয়। তিনি বলিয়াছিলেন, “আমার সাত বছর বয়সের সময় ঠাকুর জয়রামবাটী এসেছিলেন। বিয়ের পর জোড়ে যায় না? তখন আমাকে বলেছিলেন, তােমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে, ক’বছরে বিয়ে হয়েছে, তখন পাঁচ বছর ব’লো, সাত বছর ব’লাে না।” জোড়ে যাওয়াকেই মা পাছে বিবাহ মনে করেন, এই জন্য ঠাকুর ঐ কথা বলিয়া থাকিবেন। 
বিবাহের সময় সম্বন্ধে মা বলিতেন, “খেজুরের দিনে আমায় বিয়ে হয়, মাস 'মনে নেই। দশ দিনের মধ্যে যখন কামারপুুকুর গেলুম তখন সেখানে খেজুর কুড়িয়েছি। ধর্মদাস লাহা এসে বললে, 'এই মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে ? সুয্যুর (জ্ঞাতিভাই) বাপ কোলে করে আমাকে কামারপুকুর নিয়ে গিয়েছিল।” 
শ্রীশ্রীঠাকুরের জয়রামবাটী যাওয়া সম্বন্ধে মায়ের এইটুকুই মনে ছিল যে, ভাগিনেয় হৃদয় কতকগুলি পদ্মফুল সংগ্রহ করিয়া তাহাকে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছিল এবং তিনি নিতান্ত সঙ্কুচিত হইলেও তাহার পাদপদ্ম পুজা করিয়াছিল। 
মায়ের সাত বৎসর বয়সেই ঠাকুর দ্বিতীয়বার জয়রামবাটী যান। তখন কেহ বলিয়া দিলেও মা ঠাকুরের পা ধুইয়া দিয়া তাঁহাকে বাতাস করিয়াছিলেন। তাহা দেখিয়া অন্যান্য সকলে হাসিয়াছিল। 
মায়ের ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী রাজ মুখুয্যের ভগিনী অঘােরমণি বলেন, “মা খুব সাদাসিদে ছিলেন। তাঁতে সরলতা যেন মূর্তিমতী ছিল। খেলায় তাঁর সঙ্গে কখনাে কারও ঝগড়া হয়নি। মা প্রায়ই কর্তা বা গিন্নী সাজতেন। পুতুল গড়ে খেলা করতেন বটে, কিন্তু কালী ও লক্ষ্মী গড়ে ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজো করতে ভালবাসতেন। অন্যান্য মেয়েদের মধ্যে মাঝে মাঝে ঝগড়া হলে মা এসে মিটিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে ভাব করিয়ে দিতেন।” 
অঘােরমণি বলিয়াছিলেন, “একবার জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় হলদেপুকুরের রামহৃদয় ঘােষাল উপস্থিত ছিলেন। মাকে জগধাত্রীর সামনে ধ্যান করতে দেখে তিনি অবাক হয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন; কিন্তু কে জগদ্ধাত্রী, কে মা, কিছুই ঠিক করতে পারলেন না। তখন ভয়ে পালিয়ে গেলেন।” 
মায়ের এগার বৎসর বয়সের সময়, ১২৭১ সালে, ওদেশে ভীষণ দুর্ভিক্ষ হয়। মায়ের পিতার কিছু ধান্য সঞ্চিত ছিল। গরীব ব্রাহ্মণ, নিজের পােষ্যবর্গ কি খাইবে সেদিকে লক্ষ্য না রাখিয়া, অন্নসত্র খুলিয়া দিলেন। কড়াইয়ের ডালের খিচুড়ি হাঁড়ি হাঁড়ি রন্ধন করাইয়া কয়েকটি ডাবায় ঢালিয়া রাখিতেন। গরম খিচুড়ি খাইতে লােকের কষ্ট হইত বলিয়া মা দুই হাতে পাখার বাতাস করিয়া তাহা ঠাণ্ডা করিয়া দিতেন। ক্ষুধার্ত লোকদের দুর্দশা মা এই রূপে বর্ণনা করিতেন, “আহা, এই খিদের জ্বালায় সকলে খাবার জন্য বসে আছে। একদিন একটি বাগদী না ডােমের মেয়ে এসেছে। মাথায় চুলগুলাে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া হয়ে গেছে তেলের অভাবে, চোখ উন্মাদের মতাে ছুটে এসে গরুর ডাবায় যে কুঁড়াে ভেজান ছিল তাই খেতে আরম্ভ করেছে। এত যে সকলে ডাকছে, বাড়ির ভিতরে এসে খিচুড়ি খা’—তা আর ধৈর্য মানছে না। খানিকটা কুঁড়াে খেয়ে তবে কথা তার কানে গেল। এমন ভীষণ দুর্ভিক্ষ। সেই বছর দুঃখ পেয়ে তবে লােকে ধান মরাইয়ে রাখতে আরম্ভ করলে।” 
তের বৎসর বয়সের সময় মা মাসখানেকের জন্য কামারপুকুর যান। ঠাকুর তখন দক্ষিণেশ্বরে। পাঁচ-ছয় মাস পরে পুনরায় কামারপুকুরে গিয়া প্রায় দেড় মাস থাকেন। তখনও ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে। তারপর ঠাকুর ব্রাহ্মণীকে লইয়া কামারপুকুরে যান এবং শ্রীশ্রীমাকে তথায় আনাইয়া লন। সেবার মা কামারপরে মাস তিনেক ছিলেন। 
এই সময়ে লৌকিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে ঠাকুর মাকে নানাপ্রকার শিক্ষা দিয়াছিলেন। ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে চলিয়া গেলে মাও জয়রামবাটী ফিরিয়া যান। কিন্তু এই সামান্য তিন মাসের ব্যবহারেই মায়ের মনে ঠাকুরের মহৎ জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা উৎপন্ন হইয়াছিল। 
তারপর মা সর্বদা লােকের মুখে শুনিতে লাগিলেন যে, ঠাকুর পাগল হইয়া গিয়াছেন। এই বিষয়ের সত্যাসত্যতা নির্ণয়ের জন্য তিনি নিজে দক্ষিণেশবরে গিয়া উপস্থিত হন। ইহার সাত-আট মাস পূর্বে মথুরবাবু দেহত্যাগ করিয়াছেন। ঠাকুর মাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং নিজ জননীর সঙ্গে নহবতে তাহার থাকিবার ব্যবস্থা করেন। সেই অবধি ঠাকুরের শেষ অসুখের চিকিৎসার জন্য দক্ষিণেশ্বর ত্যাগ পর্যন্ত মা প্রায়ই দক্ষিণেশ্বরে থাকিতেন। নহবতে নীচের তলায় অতি ক্ষুদ্র ঘরখানিতে বহু কষ্টে বাস করায় মধ্যে মধ্যে তাঁহার অসুখ হইত এবং বাধ্য হইয়া তাহাকে দেশে যাইতে হইত। তখন পল্লীগ্রামে চিকিৎসার বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না। কঠিন অসুখ হইলে লােকে দেবস্থানে হত্যা দিত ও মানত করিত। মাও একবার সিংহবাহিনীর মন্দিরে হত্যা দিয়া কঠিন রোগের হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করেন। ত
মায়ের এই বিষম শারীরিক ক্লেশ সম্বন্ধে ঠাকুর উদাসীন ছিলেন না। অসুখ হইলে চিকিৎসাদির বন্দোবস্ত তাে করিতেনই, এতন্নি তাঁহার শরীর যাহাতে ভাল থাকে তদ্বিষয়ে যথাসাধ্য যত্ন করিতেন। মা বলিয়াছিলেন, তিনি বলতেন, ‘বুনাে পাখী খাঁচায় রাত দিন থাকলে বেতে যায় ; মাঝে মাঝে পাড়ায় বেড়াতে যাবে।' পরে কালীবাড়ীর সকলে খাওয়া দাওয়ার পর যখন বিরাম করত, সেই সময় ঠাকুর পঞ্চবটীর দিকে গিয়ে দেখে আসতেন কোন লােকজন আছে কিনা। যদি দেখতেন কোন লোকজন নেই, তখন বলতেন, এই সময় যাও, কেউ, নেই। তিনি ঘরের কাছে একটু দাঁড়াতেন, আমি খিড়কি ফটক দিয়ে রামলালের বাড়ির দিকে পাঁড়ে গিন্নীদের ওখানে বেড়াতে যেতুম। সমস্ত দিন কথাবার্তা কয়ে, সন্ধ্যার পর যখন আরতি হত, আর সব লােক আরতি-টারতি দেখতে যেত, আমি সেই সময় আসতুম।” গৌর-মা বলেন, এই যে দু’জনের মাত্র পনর-বিশ হাত দুরে থেকেও, কখনও কখনও ছ'মাসেও হয়তাে একদিন দেখা নেই, তবু দুজনের ভাবই ছিল কত ! দেখেছি, একদিন মায়ের মাথা ধরেছে, ঠাকুর তাই শুনে মহা ব্যস্ত হয়ে বার বার রামলাল দাদাকে জিজ্ঞাসা করছেন, ওরে রামলাল, মাথা ধরল কেন রে? আবার একাকী থাকার অবসাদ নিবারণের জন্য যাহাতে মন্দ লােকের সঙ্গে মা না মিশেন, সে বিষয়ে ঠাকুর তাঁহাকে সতর্ক করিয়া দিতেন।” 
মেয়েরা অলঙ্কার পরিতে ভালবাসেন। এই বিষয়েও মায়ের মনে যাহাতে কোন দুঃখ না থাকে সেইজন্য ঠাকুর হৃদয়কে দিয়া অলঙ্কার গড়াইয়া মাকে দিয়াছিলেন। মা বলিতেন, “তখন তার অসুখ, তবুও আমার জন্য অত টাকা দিয়ে তাবিজ গড়িতে দেওয়ালেন। ঠাট্টা করে বলতেন, 'ওরে, আমার সঙ্গে ওর এই সম্বন্ধ। এদিকে নিজে তাে টাকা ছুঁতে পারতেন না। পঞ্চবটীতে সীতাকে দেখেছিলেন—হাতে ডায়মন-কাটা বাল। সীতার সেই বল দৃষ্টে আমাকে সােনার বালা গড়িয়ে দিয়েছিলেন।” 
নহবতে থাকিতে মায়ের বড় কষ্ট হয় জানিয়া শম্ভু বাবু দক্ষিণেশ্বর গ্রামে মায়ের জন্য একখানি কুটির নির্মাণ করিয়া দেন। এখন যেখানে রামলাল দাদার বাড়ি আছে তাহারই পাশের জমিতে মায়ের ঘর ছিল। ঠাকুরের কঠিন আমাশয় হওয়ায় তাহার সেবার জন্য মাকে পুনরায় নহবতে আসিয়া থাকিতে হয় এবং কিছুদিন পরে তাহার নিজের ঐ অসুখ হয়। রোগ কিছুতেই না সারায়, মা পিত্রালয়ে যান। সেখানেও তাঁহাকে দীর্ঘকাল ভুগিতে হইয়াছিল। সুস্থ হইয়া ফিরিয়া আসিলে হৃদয়ের অসদ্ব্যবহারে, যেদিন আসিয়াছিলেন সেইদিনই তিনি দেশে ফিরিয়া যাইতে বাধ্য হন। ইহার এক বৎসর পরে, ঠাকুরের খাওয়া-দাওয়ার বিশেষ অসুবিধা হইতেছে জানিয়া, মা পুনরায় দক্ষিণেশ্বরে আসেন। তখন হৃদয় নির্বুদ্ধিতার জন্য মন্দির হইতে বিতাড়িত হইয়াছে। 
১২৯২-৯৩ সালে ঠাকুরের শেষ অসুখের সময় মা প্রাণপণে তাঁহার সেবা করিয়াছিলেন। কিন্তু মা ও ভক্তগণের শত চেষ্টা সত্ত্বেও রােগের হ্রাস না পাইয়া উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হয় এবং ১২৯৩ সালের ৩১শে শ্রাবণ, রবিবার রাত্রি প্রায় একটার সময় ঠাকুর হঠাৎ মহাসমাধি মগ্ন হন। পরদিন সন্ধ্যায় দেহসংকারের পর শ্রীশ্রীমা যখন অন্যান্য অলঙ্কার খুলিয়া সর্বশেষে হাতের সােনার বালা খুলিতেছেন, তখন ঠাকুর তাঁহাকে দেখা দিয়া নিষেধ করেন। বলরামবাবু মার জন্য সাদা কাপড় আনিয়াছেন। উহা মাকে দিবার জন্য গােলাপ-মাকে বলায় তিনি বলিলেন, “বাপরে, এ সাদা থান কাপড় কে তাঁর হাতে দিতে যাবে?” এদিকে গােলাপ-মা আসিয়া দেখেন, মা নিজের কাপড়গুলির পাড় ছিঁড়িয়া সরু; করিয়া লইয়াছেন। সেই অবধি মা খুব সরু লালপেড়ে কাপড়ই পারিতেন। তৃতীয় দিন মধ্যাহ্নে ঠাকুরের অস্থির কলসের সম্মুখে ভােগ নিবেদন করা হয়। ৬ই ভাদ্র  বৈকালে মাকে বলরামবাবুর বাড়িতে আনয়ন করা হয়। সঙ্গে লক্ষীদিদি। ঠাকুরের অস্থি লইয়া ভক্তগণের মধ্যে বিরােধ উপস্থিত হওয়ায় ত্যাগী শিষ্যগণ কলস হইতে অস্থিগুলি বাছিয়া লইয়া একটি কৌটায় রাখিয়া দিয়াছিলেন। ঐ কৌটাও শ্রীশ্রীমার সঙ্গে আনা হইল। ঠাকুরের অস্থি লইয়া বিরােধের কথা শুনিয়া মা গােলাপ-মাকে বলিয়াছিলেন, “এমন সােনার মানুষই চলে গেলেন; দেখেছ, গােলাপ, ছাই নিয়ে ঝগড়া করছে!” ১৫ই ভাদ্র সন্ধ্যায় মা বৃন্দাবন যাত্রা করিলেন। সঙ্গে গােলাপ-মা, লক্ষীদিদি, মাস্টার মহাশয়ের স্ত্রী, এবং পূজনীয় যােগীন মহারাজ, কালী মহারাজ ও লাটু মহারাজ ছিলেন। 
বৃন্দাবন যাইবার পথে মা কাশীতে তিন দিন অবস্থান করেন। বৃন্দাবনে তিনি এক বৎসরকাল ছিলেন। মধ্যে একবার লক্ষীদিদি, যােগেন-মা ও শ্রীযুক্ত যোগানন্দ স্বামীর সহিত মা হরিদ্বার গিয়া ব্ৰহ্মকুণ্ডে ঠাকুরের নখ ও কেশ দেন এবং জয়পুর হইয়া বৃন্দাবনে ফিরিয়া আসেন। তথায় কালাবাবুর কুঞ্জে থাকিতেন। বৃন্দাবনে মা, যােগেন-মা প্রভৃতি ঠাকুরের অদর্শনে খুব কাঁদিতেন। একদিন ঠাকুর তাঁহাদিগকে দেখা দিয়া বলেন, “তােমরা অত কাঁদছ কেন? গেছি আর কোথায় ? এই এঘর আর ওঘর।” বৃন্দাবনে অনেক সময় শ্রীশ্রীমায়ের দেহে ঠাকুরের আবেশ হইত। কখনও বা তিনি ভাবাবেশে একাকী চড়া অতিক্রম করিয়া যমুনায় চলিয়া যাইতেন। সঙ্গীরা তাঁহাকে দেখিতে না পাইয়া খুঁজিতে খুঁজিতে সেখানে গিয়া তাঁহাকে লইয়া আসিতেন। 
বৃন্দাবনে এক বৎসর বাসের পর মা কলিকাতায় আসেন এবং কয়েকদিন বলরামবাবুর বাড়িতে থাকিয়া কামারপুকুর যান। সেখানেও তিনি প্রায়ই ঠাকুরের দেখা পাইতেন। ঠাকুর তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, “তুমি কামারপুকুরে থাকবে। শাক বুনবে : শাক ভাত খাবে, আর হরিনাম করবে।” মাকে এই সময় সেই ভাবেই জীবনযাপন করিতে হইয়াছিল। অনেক সময়ে বাড়িতে অপর কেহ থাকিত না। এমন দিনও গিয়াছে যে শুধু, দুটি ভাত সিদ্ধ হইয়াছে, কিন্তু লবণ আর জোটে নাই। শ্রীযুত যােগীন মহারাজ, শরৎ মহারাজ প্রভৃতি যাঁহারা পরে মায়ের রক্ষণাবেক্ষণের ভার লইয়াছিলেন, তাহারা তখন ঠাকুরের অদর্শনে তীব্র বৈরাগ্যের প্রেরণায় তীর্থাদি ভ্রমণ করিতেছেন। পূজনীয় শরৎ মহারাজ বলিতেন, “আমাদের এ ধারণাই তখন ছিল না যে, মার নুনটুকুও জোটেনি।” কামারপুকুরে প্রায় এক বৎসর থাকিবার পর মাকে ভক্তেরা বেলুড়ে নীলাম্বরবাবুর ভাড়াটিয়া বাড়িতে প্রায় ছয়মাস কাল আনিয়া রাখেন (১৮৮৮ এীঃ)। পরে কার্তিক মাসে সে বাড়ি ছাড়িয়া দিয়া কলিকাতায় বলরামবাবুর বাড়িতে দুই একদিন থাকিয়া মা পুরী যাত্রা করেন। তখনও রেল হয় নাই। কাজেই চাঁদবালী পর্যন্ত জাহাজে তথা হইতে কটক পর্যন্ত স্টিমারে এবং অবশিষ্ট পথ গােযানে যাইতে হইয়াছিল। পুরীতে মা বলরামবাবুদের ক্ষেত্রবাসীর” বাড়িতে অগ্রহায়ণ হইতে ফাল্গুন পর্যন্ত ছিলেন। বলরামবাবুদের পুরীতে বিশেষ নাম আছে। সেজন্য পাণ্ডা গােবিন্দ শিঙ্গারী শ্রীশ্রীমাকে পালকি করিয়া জগন্নাথ দর্শনে লইয়া যাইবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাহাতে মা বলিয়া ছিলেন, “না, গােবিন্দ, তুমি আগে আগে পথ দেখিয়ে চলবে, আমি দীনহীন কাঙালিনীর মতাে তােমার পেছনে পেছনে জগন্নাথ দর্শনে যাব।” 
পুরী হইতে ফিরিয়া মা কলিকাতায় মাষ্টার মহাশয়ের বাড়িতে তিন চার সপ্তাহ থাকিয়া আঁটপুর ও তথা হইতে তারকেশ্বর হইয়া কামারপুকুর যান। তথায় প্রায় এক বৎসর থাকিয়া মা দোলের পূর্বে কলিকাতায় আসেন ও মাস্টার মহাশয়ের কম্বুলিয়াটোলার বাড়িতে মাসখানেক থাকেন। তারপর বলরামবাবুর শেষ অসুখের সময় তাঁহার দেহত্যাগ পর্যন্ত মা বলরামবাবুর বাড়িতেই ছিলেন। পরে বেলুড়ে শ্মশানের নিকট ঘুসুড়ীর বাড়িতে জ্যৈষ্ঠ হইতে ভাদ্র মাস পর্যন্ত (১৮৯০ খ্রীঃ) ছিলেন। সেখানে রক্ত আমাশয় হওয়ায় বরাহনগরে সৌরীন্দ্রমােহন ঠাকুরের ভাড়াটিয়া বাড়িতে তাহাকে রাখিয়া চিকিৎসা করান হয়। তারপর তিনি বলরামবাবুর বাড়ি আসেন এবং দুর্গাপূজার পর কামারপুকুর হইয়া জয়রামবাটী যান। পর বৎসর (১৮৯৩ খ্রীঃ) আষাঢ় মাসে মা বেলুড়ে নীলাম্বর বাবুর ভাড়াটিয়া বাড়িতে আসেন ও মাঘ কিংবা ফাল্গুনে কৈলােয়ার যাইয়া দুই মাস থাকেন। তথা হইতে তাঁহার মাতা ও ভ্রাতাদের সহিত মা পুনরায় কাশী ও বৃন্দাবন গিয়াছিলেন। সেখান হইতে ফিরিয়া মাস্টার মহাশয়ের কম্বুলিয়াটোলার বাড়িতে প্রায় একমাস থাকিয়া মা দেশে যান। তথা হইতে ফিরিবার পর বাগবাজারে গঙ্গার ধারের গুদামওয়ালা বাড়িতে পাঁচ ছয় মাস ছিলেন। এই বাড়িতে শ্রীযুক্ত নাগ মহাশয় মাকে দর্শন করেন। পুনরায় দেশে যাইয়া প্রায় দেড় বৎসর পরে মা কলিকাতা আসেন এবং বাগবাজারে বিভিন্ন ভাড়াটিয়া বাড়িতে থাকিয়া আবার দেশে যান। ১৯০৪ সন হইতে তিনি প্রায় দেড় বৎসর বাগবাজার স্ট্রীটের একটি ভাড়াটিয়া বাড়িতে (রামকৃষ্ণ লেনের সামনে) ছিলেন। ১৯০৭ সনে গিরিশবাবুর দুর্গাপুজো উপলক্ষে জয়রামবাটী হইতে কলিকাতা আসিয়া মা বলরামবাবুর বাড়িতে থাকেন। পূজার কয়দিন গিরিশবাবু শ্ৰীশ্রীমাকে প্রত্যহ বাটীতে আনিয়া পূজা করেন। অষ্টমীর দিন রাত্রে সন্ধিপূজার সময় মাকে আর সংবাদ দেওয়া হয় নাই। মা কিন্তু ঠিক সেই সময় নিজেই বলরামবাবুর বাড়ি হইতে হাঁটিয়া গিরিশবাবুর বাড়ির পিছনের ফটকে গিয়া বলেন, “দরজা খােল, আমি এসেছি।” সকলে দরজা খুলিয়া দেখিয়া বিস্মিত হন। 
দেশে ম্যালেরিয়ায় ভুগিয়া মা এইবার খুব রােগা হইয়া গিয়াছিলেন। পরে আবার দেশে গিয়া উদ্বোধনের নতুন বাড়ি হইলে মা ১৯০৯ সনে তথায় শুভাগমন করেন। তারপর কোঠার, মান্দ্রাজ, ব্যাঙ্গালাের, রামেশ্বর প্রভৃতি ভ্রমণ করিয়া উদ্বোধনে ফিরিয়া আসেন এবং অল্প কয়েকদিন পরে দেশে গিয়া রাধুর বিবাহ দেন। ইহার প্রায় এক বৎসর পরে উদ্বোধনের বাড়িতে আসেন। পরবর্তী কার্তিক মাসে কাশী গিয়া মা কিরণবাবুদের বাড়িতে তিন মাস থাকেন, এবং কলিকাতা ফিরিয়া অল্প দিন পরেই দেশে যান। পুরাতন বাটীতে (প্রসন্ন মামার বাটীতে) ভক্তদের স্থান সংকুলান হইত না বলিয়া ১৯১৫ সনে জয়রাম বাটীতে মায়ের জন্য পথৃক বাড়ি নির্মিত হয়-মাটির কোঠা, খড়ের চাল। অতঃপর মা যখনই দেশে যাইতেন, এই নতুন বাড়িতেই থাকতেন। 
বেলুড়ে লীলাম্বর বাবুর ভাড়াটিয়া বাড়িতে শ্রীশ্রীমার গভীর নির্বিকল্প সমাধি হয়। বহুক্ষণ পরে একটু হুঁশ হইলেও হস্তপদাদি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জ্ঞান অতি কষ্টে আসিয়াছিল। মা কপিল মহারাজকে বলিয়াছিলেন, “এই সময় লাল জ্যোতি, নীল জ্যোতি, এই সব জ্যোতিতে মন লীন হত। আর দু-চার দিন এ ভাব থাকলে দেহ থাকত না।” এই বাড়িতেই মা একদিন দেখেন যে, ঠাকুর গঙ্গায় গিয়া নামিলেন। অমনি গঙ্গাজলে তাঁহার দেহ গলিয়া গেল। স্বামীজী জয় রামকৃষ্ণ, জয় রামকৃষ্ণ” বলিয়া সেই জল দুই হাতে চারিদিকে অসংখ্য লােকের মাথায় ছিটাইয়া দিতেছেন, আর তাহারা ঐ জলস্পর্শে সদ্য মুক্ত হইয়া চলিয়া যাইতেছে। এত লােক যে কোথাও একটু ফাঁক নাই। এই 
দৃশ্য মায়ের মনে এতই গাঁথিয়া গিয়াছিল যে, কয়েকদিন কিছুতেই গঙ্গায় নামিতে পারেন নাই। বলিতেন, “এ যে ঠাকুরের দেহ; কি করে আমি এতে পা দিই।” প্রতিমা বিসর্জনের পর দেবদেবীর দেহ জলে মিশিয়া গিয়াছে, মনে করিয়াই হিন্দুগণ সেই “শান্তিজল” সকলের মাথায় ছিটাইয়া দিয়া থাকেন। 
মায়ের দৈনন্দিন জীবন বড় অদ্ভুত ছিল। তিনি রাত্রি প্রায় তিনটার সময় নিদ্রা হইতে উঠিতেন এবং সর্বপ্রথমে শ্রীশ্রীঠাকুরের ছবি দেখিতেন। উঠিবার সময় ঠাকুরদের নাম করিতেন। তারপর প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া ঠাকুর তুলিতেন এবং পরে জপে বসিতেন। সেই যে দক্ষিণেশ্বরে থাকিবার সময় শেষরাতে উঠিয়া শৌচশানাদি শেষ করিয়া সকলের অজ্ঞাতসারে ঘরে ঢুকিতেন, সেই অভ্যাস তাঁহার আজীবন ছিল। শরীর খুব খারাপ থাকিলেও যথাসময়ে উঠিয়া মুখ-হাত ধুইয়া বরং পরে আবার একটু শুইতেন। তথাপি ঠিক সময়ে উঠা চাই। মা বলিতেন, “রাত তিনটে বাজলেই যেখানেই থাকি, কানের কাছে যেন বাঁশীর ফু শুনতে পেতুম।” যখন যেটি করিবার সে বিষয়ে তাহার আদৌ আলস্য ছিল না। 
সকালের পূজার জন্য ফুল, বেলপাতা প্রভৃতি গুছান, ফল ছাড়ন ইত্যাদি সব কাজ মা নিজেই করিয়া আটটার সময় আন্দাজ পূজায় বসিতেন। ইদানিং স্ত্রী-ভক্তেরা এই সকল কাজে তাঁহাকে সাহায্য করিলেও মা নিজে যথাসাধ্য প্রায় রােজই করিতেন। তবে শেষ কয়েকবার উদ্বােধনে যখন ছিলেন, সাধুদের কেহ কেহ পূজা করিতেন। মা নিজে যখন পূজা করিতেন, এক ঘণ্টার মধ্যে পূজা শেষ করিয়া প্রসাদ বিতরণের জন্য শালপাতা সাজাইতেন এবং সকলকে প্রসাদ দিতেন। কখনও কখনও কাহারও পূজায় স্তবাদি পাঠের জন্য বিলম্ব হইলে মা বিরক্ত হইতেন। একদিন বলিয়াছিলেন, “আগে পুজা ও ভোগ সেরে নিয়ে পরে যত পারে স্তব পাঠ করুক না। এ কি, লোক সব জল খেতে পায় না, বেলা হয়ে যায়। যথাসময়ে প্রয়ােজনমত এই সকল কাজ শীঘ্র শীঘ্র করাই মা পছন্দ করতেন। 
মধ্যাহ্নভােজনের পর মা একটু বিশ্রাম করিতে শুইতেন বটে, কিন্তু তখন আবার স্ত্রী-ভক্তেরা প্রায়ই আসিতেন, কারণ তাঁহাদের অনেককেই চারটা, সাড়ে চারটার মধ্যে গৃহে ফিরিতে হইত। এই সময়ে মা শুইয়া শুইয়াই তাহাদের সঙ্গে দু-একটি কথা বলতেন, কখনও বা কিছু পরেই উঠিয়া পড়তেন। সাড়ে তিনটা আন্দাজ উঠিয়া-দুপরের খাওয়া শেষ হইতেই দুইটা বাজিত-শৌচাদির পর কাপড় কাচিয়া আসিয়া ঠাকুরের বৈকালের ভােগ দিতেন। ক্রমে অন্যান্য স্ত্রী-ভক্তেরা আসিয়া জুটিতেন। মা জপের মালা লইয়া বসিতেন। ঐ সঙ্গে মাঝে মাঝে তাঁহাদের সহিত কথাবার্তা কহিতেন, বা তাহাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন। যে সকল পুরুষ-ভক্ত বৈকালে আসতেন, তাহাদের সাধারণতঃ প্রায় সাড়ে পাঁচটার সময় ডাক পড়িত। মা চাদরে মাথা অবধি ঢাকিয়া নিজের তক্তাপোশের উপর মেঝেতে পা ঝুলাইয়া বসিয়া থাকিতেন। গ্রীষ্মকাল হইলে ঐ সময়ে আমাদের কেহ, কখনও বা কোন পরিচিত ভক্ত, তাঁহাকে বাতাস করিত। একে একে সকলে প্রণাম করিয়া যাইতেন। স্ত্রী-ভক্তেরা তখন অন্য ঘরে থাকিতেন। এই সময়ে ভক্তদের “কেমন আছেন?” ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তরে মা সাধারণতঃ ঘাড় নাড়িয়া, অথবা আস্তে সামান্য দুই এক কথায় উত্তর দিতেন। আমরা তাহা একটু উচ্চস্বরে বলিতাম। কাহারও বিশেষ কিছু জিজ্ঞাস্য থাকিলে তিনি সর্বশেষে প্রণাম করিতেন। তখন, পরিচিত হইলে মা নিজেই আস্তে আস্তে কথা বলিতেন, আর অপরিচিত বা বেশী বয়সের ভক্ত হইলে মা অনুচ্চস্বরে যাহা বলিতেন, আমরা তাহা একটু স্পষ্ট করিয়া বলিতাম।
মা সন্ধ্যার পর জপ সমাপন করিয়া ভােগের পূর্ব পর্যন্ত মেজেয় বিশ্রাম করিতেন এবং এই সময়ে কেহ তাঁহার পায়ে বাতের তেল বা আমবাতের জন্য মরিচাদি তেল মালিস করিয়া দিত। সাধারণতঃ নবাসনের বৌ দিতেন, কখনও কখনও অপর একটি স্ত্রী-ভক্ত। রাতে ঠাকুরের ভােগ শেষ হইতে দশটা এবং আহারাদি শেষ করিয়া শুইতে এগারটা সাড়ে এগারটা বাজিত। 
মায়ের আহার সম্বন্ধে অনেক বিষয় লক্ষ্য করিবার ছিল। তিনি বেশী মিষ্ট আম অপেক্ষা অম্লমধুতক- “টক টক, মিষ্টি মিষ্টি”-আমই অধিক ভাল বাসিতেন। বোম্বাই হইতে বরেনবাবু আলফনসাে আম পাঠাইতেন ; মা তাহা পছন্দ করতেন। পেয়ারাফুলি ও ছোট ল্যাংড়া আমও তিনি ভালবাসতেন। কিন্তু কেহ ভক্তির সহিত খুব টক আম দিলেও তাহা পরম প্রিয় বােধে আহার করিতেন। উদ্বোধনের বাড়িতে একদিন জনৈক ভক্ত কতকগুলি আম কিনিয়া আনেন। অগ্রভাগ খাইতে নাই বলিয়া, তিনি দোকানদারের কথায় বিশ্বাস করিয়া না চাখিয়াই আমগুলি লইয়া আসেন। মধ্যাহ্ন ভােগের পর যখন সকলকে সেই আম-প্রসাদ দেওয়া হইল, টক বলিয়া কেহই উহা খাইতে পারিলেন না, এবং ভক্তটিকে বােকা বলিয়া মন্তব্য প্রকাশ করিতে লাগিলেন। মা কিন্তু একটি আম খাইয়া বলিলেন, “না, এ বেশ টক টক আম।” সাধারণতঃ মা জানিতেন না, কে কোন বস্তু দিয়াছে; কিন্তু দেখা যাইত, কোন কোন মিষ্টি ইত্যাদি খারাপ হইলেও উহার দুই একটি খাইতেন। শাকের মধ্যে ছােলাশাক, মূলোশাক প্রভৃতি ভালবাসিতেন। একবার দেশ হইতে ম্যালেরিয়ায় ভুগিয়া খুব অরুচি লইয়া আসেন। তখন তাঁহাকে এই ছােলাশাক খাইতে দেওয়া হইত। শীতকালে মুড়ি, ফুটকড়াই এবং উড়িয়ার দোকানের বেগুনি, ফুলুরি, ঝালবড়া, আলুর চপ ইত্যাদি সকালের পূজায় ঠাকুরকে মাঝে মাঝে ভােগ দেওয়া হইত। এই সব তেলে ভাজা জিনিস মা পছন্দ করিতেন। মুগের নাড়ু, ঝুরিভাজা ইত্যাদিও তাঁহার প্রিয় ছিল। তিনি রাতাবি সন্দেশ এবং (রাঙা আলুর) রসপুলি পিঠা প্রভৃতিও ভালবাসিতেন। ইদানিং আমরুল শাক মায়ের প্রিয় ছিল। তাঁহার আমাশয়ের ধাত ছিল বলিয়া কবিরাজ দুর্গাপ্রসাদ সেন এই শাক ব্যবস্থা করেন। তাই মঠ হইতে কেহ উদ্বোধনে যাইলে পূজনীয় বাবুরাম মহারাজ তাহাকে দিয়া মায়ের জন্য এই শাক পাঠাইতেন। সকালে মা একটি মিছিরির পানা খাইতেন। তাঁহার জন্য যে জলখাবার প্রসাদ রাখা হইত, আগত ভক্তদিগকে কিছু কিছু দিতে দিতে তাহা অনেক সময়ই নিঃশেষ হইয়া যাইত। আর যেদিন তিনি নিজ হাতে প্রসাদ ভাগ করিয়া দিতেন সেদিন মিছরির পানা টুকুও অবশিষ্ট থাকিত না, অথবা অতি অল্পমাত্ৰ থাকিত। ডানহাটুর বাতের জন্য মা দই ইত্যাদি নামমাত্র খাইতেন। কলাই-এর পাতলা ডাল ও (হাতায় করিয়া) পােস্তপােড়া তাঁহার খুব প্রিয় ছিল। পেটের অসুখ ও বাতের জন্য শেষাশেষি তিনি একটু করিয়া আফিম খাইতেন; সেইজন্য মধ্যাহ্নে ও রাতে আধসের করিয়া দুধের ব্যবস্থা ছিল। তিনি মধ্যাহ্নে দুধের অর্ধেক আন্দাজ খাইতেন এবং বাকি দুধে ভাত মাখিয়া তাদের জন্য প্রসাদ রাখিয়া দিতেন; কারণ পূজনীয় শরৎ মহারাজ ও অন্যান্য ভক্তগণ প্রত্যহ অন্ন-প্ৰসাদ চাহিতেন। দুই এক দানা প্রায় সকলেই গ্রহণ করতেন। যে-সব ভক্ত বৈকালে আসিতেন, তাহাদের জন্যও এই প্রসাদ রাখা হইত। তিনি নিজে খাইবার জন্য যে ভাত মাখিতেন তাহাতে ডাল, সুক্ত, ঝোল ইত্যাদি অল্প অল্প করিয়া মাখিতেন এবং 'উহাতে নেবুর রস মিশাইয়া লইতেন। সে প্রসাদ আমাদের বেশ ভাল লাগত। কোন কোন দিন তাহাতে বড়ি, চচ্চড়ি ইত্যাদি মিশাইয়া একটি উপাদেয় খাদ্য তৈয়ার করিতেন। পূজনীয় শরৎ মহারাজ উহা খাইয়া প্রশংসা করতেন। বৈকালে পান ও জল ছাড়া বিশেষ কিছু তাঁহাকে খাইতে দেখি নাই। মাত্র  লুচি, তরকারী ও দুধ দেওয়া হইত। লুচি দই-তিনখানার বেশী খাইতেন না, এবং দুধ প্রায় দেড় পােয়া খাইতেন। 
তিনি দাঁতে প্রত্যহ চারিবার করিয়া গুল দিতেন। নারিকেল পাতা ও দোক্তা পোড়াইয়া উহা তৈয়ারি করা হইত। মায়ের দেহ যাইবার কিছুদিন পর, নীরোদ মহারাজের মা স্বপ্ন দেখেন যে, মা তাঁহাকে বলিতেছেন, “বউমা, ওরা আমাকে সবই দেয়, কিন্তু গুলটি দেয় না। তুমি গুল করে ওখানে ( উদ্বোধনের বাড়িতে) শরৎকে পাঠিয়ে দিও।” তিনি তদনুযায়ী গুল তৈয়ারি করিয়া পাঠাইলে সকলে লক্ষ্য করিলেন, বাস্তবিকই মায়ের সেবার এই নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যটি বাদ পড়িয়াছে। 
মা যখন জয়রামবাটীতে পুরাতন বাটীতে থাকিতেন সকালবেলা প্রায় সাতটা হইতে নয়টা পর্যন্ত বারান্দায় বসিয়া তরকারি কুটিতেন। এই সময়ে আমরা গিয়া নানা কথাবার্তা বলিতাম ও শাকসব্জির পাতা বাছিতাম। এমন সস্নেহে সুপ্রসন্ন মূর্তিতে মা এই সময় কথাবার্তা বলিতেন যে, যাঁহারা একদিনও সেই সৌভাগ্য লাভ করিয়াছেন তাঁহারাই জানেন। সেইজন্য মা যখন কলিকাতায় আসিতেন তখন ভক্তেরা পত্রে প্রায়ই জানিতে চাহিতেন, মা কতদিনে দেশে যাইবেন। জয়রামবাটীতে মায়ের সঙ্গে মিশিবার ও কথাবার্তা বলিবার যে সুযােগ ছিল, এমন আর কোথাও মিলিত না। ভক্ত সন্তানদের খাওয়া-দাওয়া, থাকা ইত্যাদির ব্যবস্থা মা নিজেই সযত্নে করিতেন। ভক্তেরাও এখানে আপন মায়ের স্নেহ অনুভব করিতেন। মা নয়টার সময় স্নান করিয়া আসিয়া ঠাকুরপূজা করিতেন, এবং উহা সমাপ্ত হইলে ভক্তদের প্রসাদ দিতেন। সাধারণত মুড়ি, মিষ্টি এবং হালুয়া তৈয়ারি করিয়া দিতেন-কখনও বা ঐ সঙ্গে ফলমূল যাহা ওখানে পাওয়া যাইত বা ভক্তেরা আনিতেন, তাহাও থাকিত। 
রাঁধুনীকে জল খাইতে বসাইয়া মা নিজেই ঐ সময়ে রান্না করিতেন। তাঁহার রান্নার বিশেষত্ব এই ছিল যে, তিনি তরকারিতে নুন, ঝাল ও মশলা সাধারণতঃ একটু কমই দিতেন। 
খাওয়ার সময় ছাড়া অন্য যে সময় ভক্তেরা বাড়ির মধ্যে মাকে দর্শন করিতে যাইতেন, তখনই তিনি তাঁহাদিগকে মিষ্টি, জল ও পান খাইতে দিতেন। পান কাহাকেও খিলির কম দিতেন না। এইসব দ্রব্য অতি সামান্য হইলেও এমন সস্নেহে দিতেন যে, সকলেই এক অপূর্ব আকর্ষণ অনুভব করতেন। আবার কেহ তাঁহার জন্য অতি সামান্য জিনিস লইয়া যাইলেও তিনি কতই না আনন্দিত হইতেন। জয়রামবাটীর নিকটবর্তী শ্যামবাজারে ভাল পান পাওয়া যায়। ঐ অঞ্চলে গরীব ভক্তের কখনও কখনও একগােছ পান লইয়া মাকে দর্শন করিতে আসিতেন। দেখিতাম, মা তাহা পাইয়াই কত খুশী। ভক্তেরা মিষ্টি ইত্যাদি যাহা লইয়া যাইতেন, মা তাহা সযত্নে তাহাদের জন্যই রাখিয়া দিতেন। পূজনীয় শরৎ মহারাজ কলিকাতা হইতে কড়াপাকের সন্দেশ পাঠাইলে মা তাহা ভক্তদের জন্য তুলিয়া রাখিয়া যে ভাবে দুবেলা সকলকে দিতেন, তাহা দেখিয়া মনে হইত যেন উহা ভক্তসেবার জন্যই প্রেরিত হইয়াছে। আবার জয়রামবাটীতে পাড়ার অনেক বৃদ্ধ স্ত্রী-পুরুষে বাড়ির ছোট ছােট ছেলেমেয়েদের লইয়া একবার তাঁহাদের “দিদি ঠাকরুনকে” প্রণাম করিতে প্রায় রোজই আসিত। মাও যেজন্য যে আসিয়া তাহা বুঝিয়া তাহাদের হাত ভরিয়া ফল, মিষ্টি প্রভৃতি যাহা থাকিত প্রসাদ দিতেন। শ্রীমতী কৃষ্ণভাবিনীর প্রেরিত বেদানা এবং পূজনীয় শরৎ মহারাজ যে আম পাঠাইতেন, তাহা ভাগ করিয়া প্রথমে সিংহবাহিনীকে এবং ধর্মঠাকুর ও অন্যান্য দেবতাকে দিতেন। তারপর আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদিগকে দিতেন। একবার কোন পর্বোপলক্ষে পুলিপিঠা হইয়াছে। ছুটি পাইলেই বাঁকুড়া হইতে বিভুতি প্রায়ই জয়রামবাটী আসিয়া থাকে। তাই মা তাহার জন্য পিঠা রাখিয়া দিয়াছেন। দুইদিন গেল, কিন্তু বিভুতি আর আসিতেছে না। তথাপি মা রােজ ঐ পিঠা পুনরায় ভাজিয়া রাখিয়া দিতেছেন। ভাবিতেছেন, “কাল হয়তো আসিতে পারে; যদি আসে, মনে হবে, আহা, খেতে পেলে না।” এইভাবে চারদিন রাখিবার পর বিভুতি গিয়া সেই পিঠা খাইয়াছিল। 
মানুষের অপার স্নেহযত্ন যে পাইয়াছে সেই জানে। জ্ঞান যখন জয়রামবাটী থাকিত তখন তাহার একবার খুব পাঁচড়া হইয়াছিল। নিজ হাতে খাইতে পারিত না। এই সময় মা নিজে ভাত মাখিয়া তাহাকে খাওয়াইয়া দিতেন এবং তাঁহার উচ্ছিষ্ট পাতা পর্যন্ত ফেলিতেন। 
জয়রামবাটীতে মায়ের গৃহনির্মাণের সময় আমি একদিন সকালে কার্যোপলক্ষে পাশের গ্রামে গিয়াছিলাম। জরুরী কাজ থাকায় মধ্যাহ্নে খাইবার সময় আসিয়া পেীঁছিতে পারি নাই। তখন শীতকাল। সুর্যাস্তের ঘণ্টাখানেক পূর্বে ফিরিয়া আসিয়া শুনিলাম, মা তখনও খান নাই, আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। বিস্মিত হইয়া মাকে গিয়া বলিলাম, “মা, তােমার শরীর ভাল নয়, আর তুমি এই সন্ধ্যা পর্যন্ত উপবাসী রয়েছ!” মা বলিলেন, “বাবা, তােমার খাওয়া হয়নি, আমি কি করে খাই?” আমি তাড়াতাড়ি খাইতে বসিলাম। আমার খাওয়া হইলে মা এবং মেয়েদের দুই-একজন যাঁহারা তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন, তাহারা খাইতে বসিলেন। এরুপ ব্যবহার কয়জন জননী নিজের সন্তানের প্রতিই করিয়া থাকেন। তবে মা অন্তরে সকলকেই এইরুপ স্নেহ করিলেও বাহিরে সর্ববিধ ব্যবহারেই গাম্ভীর্য, সঙ্কোচন ও লজ্জাশীলতা রক্ষা করিয়া চলিতেন।
কখনও কখনও মা আমাদিগকে পার্শ্ববর্তী গ্রামে মুদির দোকান হইতে জিনিসপত্র কিনিয়া আনিবার জন্য পাঠাইতেন। আমরা হয়তাে ভক্তদের দুইএকজনকে সঙ্গে লইয়া যাইতাম। দেখিয়াছি, তাহারা মায়ের সেবার জন্য এতটুকুও করিতে পারিলে আপনাদিগকে ধন্য জ্ঞান করিতেন। ভক্তেরা যখন মায়ের সঙ্গে কথা বলিতে ইচ্ছা করিতেন, আমরা মায়ের অনুমতি লইয়া তাহাদিগকে ভিতরে লইয়া যাইতাম। মা বলিতেন, “আহ, লােকে কত কষ্ট করে এখানে আসে! গয়া, কাশী যাওয়া বরং সহজ, এখানে আসা তার চেয়েও কষ্টকর।” তাই দুরদেশাগত ভক্তগণকে মা প্রায়ই দুই-একদিন বিশ্রাম করিতে বলিতেন। আমরা বা আগন্তুক ভক্তেরা নিজেরাই তাঁহার অসুবিধার কথা ভাবিয়া যাইবার জন্য তাড়াতাড়ি করিলেও তিনি ছাড়িতেন না। যাঁহারা মায়ের কৃপালাভের জন্য আসিতেন, শরীর নিতান্ত অসুস্থ না থাকিলে মা তাহাদের কাহাকেও বড় একটা ফিরাইতেন না। ভাল আধার দেখিলে কখনও কখনও নিজেই যাচিয়া দীক্ষা দিয়াছেন, অথবা প্রার্থনামাত্র তৎক্ষণাৎ কৃপা করিয়াছেন।
একবার মা দেশ হইতে ম্যালেরিয়ায় জীর্ণশীর্ণ হইয়া কলিকাতা আসিয়াছেন। চিকিৎসায় জ্বর থামিয়াছে মাত্র, কিন্তু খুব দুর্বল আছেন। ভক্তদের কাহাকেও দর্শন করিতে দেওয়া হইতেছে না। এই সময় বােম্বাই হইতে পার্শী একটি যুবক তাহাকে দর্শন করিতে আসিয়াছে। অতদুর হইতে আসিয়াছে এবং ভিন্নধর্মাবলম্বী, ইহা মনে করিয়াই বােধ হয় পুজনীয় শরৎ মহারাজ তাহাকে দর্শন করিতে অনুমতি দিলেন। যুবকটির ভ্রাতা কার্যোপলক্ষে যখন আফ্রিকায় ছিলেন তখন ‘প্রবুদ্ধ ভারত’-পাঠে আকৃষ্ট হইয়া স্বামীজীর কিছু পুস্তক আনাইয়া পড়েন। তিনি বােম্বাই ফিরিলে সেই সকল পুস্তক উক্ত যুবকটি পড়িয়াছে এবং ক্রমশঃ ঐ বিষয়ে আগ্রহ হওয়ায় কলিকাতা আসিয়া। যুবকটি মাকে প্রণাম করিয়া প্রার্থনা করিল, “মাঈজী, কছ মূলমন্ত্র দীজিয়ে জিসসে খােদা পহচান যায়।” শুনিয়াই মা আমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “দেবো? দিই দিয়ে।” আমি বলিলাম, “সে কি। কাউকে দর্শন পর্যন্ত করতে দেওয়া হয় না, সবে অসুখ হতে উঠেছ ; শরৎ মহারাজ শুনলে কি বলবেন! এখন নয়, এর পরে হবে।” মা বলিলেন, “আচ্ছা, তুমি শরৎকে জিজ্ঞাসা করে এস।” আমি তাড়াতাড়ি গিয়া পূজনীয় শরৎ মহারাজকে সব কথা বলায় তিনি বলিলেন, “আমি আর কি বলব? মার যদি একটা পার্শী চেলা করতে ইচ্ছা হয়ে থাকে, করুন। ব’লে আর কি হবে।” ফিরিয়া গিয়া দেখি, মা ইতােমধ্যেই দীক্ষা দিবার জন্য নিজেই দুইখানি আসন পাতিয়া গঙ্গাজল লইয়া প্রস্তুত হইয়াছেন। দীক্ষা হইলে আমাকে বলিতেছেন, “বেশ ছেলেটি, যা বললাম, ঠিক বুঝে নিলে।” বুঝিলাম, মা কেন বলিতেন, “এসব ঠাকুরই পাঠাচ্ছেন। এই সকল ভিন্ন ভাষাভাষীদের দীক্ষার সময় মা যাহা বলিবার বাংলাতেই বলিয়া যাইতেন, কিন্তু তাহারা বুঝিতে পারিত। যখন দক্ষিণদেশে গিয়াছিলেন, সেখানেও মা বলিতেন, “লােক এসে বলত, 'মন্ত্রম' ‘উপদেশম’ আর কোন কথা তাে বুঝতে পারছি নে।” সেখানেও তিনি ঐরুপে অনেককে দীক্ষা দিয়াছেন। দীক্ষা দিবার সময় তাঁহার মনের অন্তস্তল হইতে যে মন্ত্র উদিত হইত তাহাই দীক্ষাপ্রার্থীর যথার্থ মন্ত্র জানিয়া মা উহাই তাহাকে দিতেন। বলিতেন, ‘কাউকে মন্ত্র দিতে গিয়েই মন থেকে ওঠে, এই দাও, এই দাও। আবার কাউকে মন্ত্র দিতে গিয়ে মনে হয় যেন কিছুই জানিনে, কিছুই মনে আসে না। বসেই আছি, পরে অনেক ভাবতে ভাবতে তবে দেখতে পাই।” ইহার কারণ মা বলিতেন, “যে ভাল আধার তার বেলায় তক্ষণি মন থেকে উঠে।”
অনেক সময় মা অল্প বয়সের ছেলেদেরও দীক্ষা দিয়াছেন। আমার মনে আছে, একবার উদ্বোধনে একটি ছেলে, বছর বার বয়সের, বৈকালে ভক্তদের সঙ্গে প্রণাম করিবার পর কাঁদিতে থাকে। কারণ জিজ্ঞাসা করায় বলিল, “মায়ের কৃপা চাই।” আমি বলিলাম, “কৃপা কিরে! হবে এখন, চল।” তবুও কাঁদে। তখন বুঝা গেল, মন্ত্র চায়। ভাবিলাম, কাহারও কাছে শােনা কথা বলিতেছে ; অত ছােট ছেলে মন্ত্রের কি বুঝে? পরদিন দেখি সেই ছেলেটি বাইরের রোয়াকে বসিয়া আছে। সেখানে ছেলে বুড়াে অনেকেই আসিয়া বসে, তাই কেহ খোঁজখবর নেয় নাই। আমি বাজার হইতে ফিরিবার সময় দেখি, সে হাসিতে হাসিতে চলিয়া যাইতেছে। জিজ্ঞাসা করিলাম, “কি হয়েছে?” সে আনন্দে উত্তর দিল, “আমার দীক্ষা হয়েছে।” শুনিলাম, মা রাধুকে বলেন, “দেখবে নীচে রোয়াকে একটি ছেলে বসে আছে, তাকে নিয়ে এস, এবং তাহার দ্বারা ছেলেটিকে ডাকাইয়া মন্ত্ৰ দিয়াছেন; এখন সে বাজারে শ্রীশ্রীমার জন্য ফলমিষ্টি কিনিতে যাইতেছে। মায়ের সঙ্গে দেখা হইতেই জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, অতটুকু ছেলেকে আবার কি দীক্ষা দিলে ? ও কি বােঝে ?” মা উত্তর দিলেন, “তা যা হােক, বাপু, ছেলেমানুষ-কাল তাে অমন ক'রে পায়ে পড়ে কাঁদলে। কে ভগবানের জন্য কাঁদছে বল দেখি? এ মতি ক'জনের হয়?”
মা নম্রতার প্রতিমুর্তি ছিলেন। এত লােক তাঁহার পদধুলি পাইলে আপনাদিগকে কৃতাৰ্থ বােধ করিত, তথাপি তিনি নিজেকে ঠাকুরের একজন কৃপাপ্রাপ্তা চরণাশ্রিত বলিয়াই মনে করিতেন। দীক্ষাপ্রদানের পর ঠাকুরকে দেখাইয়া বলিতেন, “ঐ উনিই গুরু।” যদিও কখনও কখনও খুব অন্তরঙ্গভাবে কথা বলিতে বলিতে ‘তিনি কে'—এই সব কথা অলক্ষ্যে মুখ দিয়া বাহির হইয়া পড়িত, কিন্তু ঐ ভাবকে তিনি মনেও স্থান দিতেন না। তাঁহার যাহা কিছু সবই ঠাকুর। জনৈকা প্রাচীন স্ত্রীভক্ত একদিন মার শেষ অসুখের সময় তাঁহাকে “তুমি জগদম্বা, তুমিই সব” ইত্যাদি বলিয়া যেমন প্রশংসা করিতেছেন, অমনি মা রুক্ষস্বরে বলিয়া উঠিলেন, “যাও, যাও, জগদম্বা'! তিনি দয়া করে পায়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন বলে বর্তে গেছি। ‘তুমি জগদম্বা। তুমি হেন!' বেরোও এখান থেকে।” যদিও তিনি তাঁহার সম্বন্ধে কোন ভক্তের আন্তরিক বিশ্বাসকে বিচলিত করিতেন না, তথাপি এইরপ প্রশংসাবাদ তাঁহার সহ্য হইত না।
তাঁহার নিজের ইচ্ছা বা ন্যায্য বিবেচনার বিরুদ্ধে কেহ কোন কথা বলিলে তিনি প্রথমে উহা মানিয়া লইতেন। পরে ধীরে ধীরে নিজে যেটি ইচ্ছা করিতেন বা ন্যায্য বিবেচনা করিতেন তাহা বলিয়া প্রশ্নকারীকেই জিজ্ঞাসা করিতেন, “আচ্ছা, এ রকম হলে কেমন হয়?” এইরপে ক্ৰমশঃ তাহাকে স্বমতে আনয়ন করিতেন। কখনও তাহার মুখের উপর “তােমার ওকথা কিছু না” বলিয়া উত্তর দিতেন না। একদিন পুর্ণবাবুর স্ত্রী দীক্ষার কথা উত্থাপন করিয়া মাকে বলিলেন, “মা, আপনি তাে শীঘ্রই দেশে চলে যাচ্ছেন, আর আমরাও সিমা পাহাড়ে যাব। আবার কবে দেখা হবে। মন্ত্র নেবার ইচ্ছা, কিন্তু আমার জাতাশৌচ হয়েছে।” গােলাপ-মা ও যােগেন-মা নিকটে ছিলেন। তাঁহারা বলিলেন, “অশৌচে কি দীক্ষা হয় ? এখন কি করে নেবে?" মাও তাঁহাদের কথায় সায় দিয়া বলিলেন, “তাই তাে, কি করে হবে তাহলে?" সেই সময় বরেনবাবুর পিসীও সেখানে ছিলেন। একদিন তিনি মাকে একা পাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “মা, আপনি কি জাতাশৌচ মানেন ?” মা বলিলেন, ‘কায়াপ্রাণে ন সম্বন্ধ, আবার জাতাশৌচ ! কালীপুজার দিন ওকে গঙ্গাস্নান করিয়ে নিয়ে এসাে।” পরে পূর্ণবাবু নিজেই নির্দিষ্ট দিনে তাহাকে মায়ের নিকট লইয়া যান।
মায়ের গৃহ-প্রতিষ্ঠার সময় ললিতবাবু জয়রামবাটী গিয়াছিলেন। ঐ সময় তিনি তথায় একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করিতে ইচ্ছা করিয়া মাকে একদিন অনেক করিয়া বুঝাইয়া বলিতেছিলেন, “মা, আপনার নামে ভক্তদের কাছে আবেদন বের করলে এই গরীব লােকদের মহা উপকার হবে।” লােক-কল্যাণের জন্য তাহার এই পুনঃপুনঃ অনুরােধে চক্ষুলজ্জায় মা কিছুই বলতে পারিতেছেন না। এই সময় হেমেন্দ্র (৺ব্রহ্মচারী রূপচৈতন্য) উপস্থিত হওয়ায় সে উহাতে ঘাের আপত্তি করিল। মা এতক্ষণে যেন হাফ ছাড়িয়া বাঁচিলেন। ললিতবাবু চলিয়া যাইবার পর আমি বাড়ির মধ্যে যাইলে মা আমাকে হেমেন্দ্রর কথায় বলিতেছেন, “এ দেখছি আমার যােগীনের মতাে আমায় রক্ষা করলে। ছি! ছি! টাকা চাওয়া !”
যদিও তাঁহার ব্যবহার সর্বদা শিষ্টাচারপুর্ণ ছিল এবং তিনি উহাই পছন্দ করিতেন, তথাপি কলিকাতায় তিনি সকল সময়ে নিঃসঙ্কোচে কথাবার্তা বলিতে কুণ্ঠাবােধ করিতেন। একবার আমাকে বলিয়াছিলেন, “এখানে আমাকে সর্বদা হিসাব করে কথাটি বলতে হয়, চলতে হয়। কে কোন কথাটিতে অসন্তুষ্ট হবে। তার চেয়ে দেশে আমি থাকি ভাল। আমি তাদের হড় হড় করে যা মুখে এল দু-কথা বলে গেলুম। তারাও আমাকে যা হোক কথা বলে গেল। তারাও কিছু মনে করলে না, আমিও কিছু মনে করলুম না, বাস। আর এখানকার লােকেরা কথার একটু এদিক ওদিক হলেই ক্ষয় হয়ে গেল।”
মায়ের সরল, স্নেহপুর্ণ অথচ ধীর গম্ভীর ব্যবহারে সকলে তাঁহার নিকট নিঃসঙ্কোচে কিন্তু সসম্ভ্রমে কথা বলিত। জয়রামবাটীর কাছে শিরোমণিপুৱে বহু মুসলমানের বাস। তাহারা পূর্বে তুঁতের (রেশমকীটের) চাষ করিত।
বিদেশী রেশমের প্রতিযােগিতায় তাহাদের ঐ ব্যবসায় ক্রমশঃ নষ্ট হওয়ায় শেষে চুরি ডাকাতিই তাহাদের জীবিকা হইয়া দাঁড়ায়। পাশ্ববর্তী গ্রামের লােকেরা এই তুঁতে ডাকাতদের ভয়ে সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকিত। কোন গ্রামের মধ্য দিয়া একটি তুঁতে কোন দিন চলিয়া গেলে গ্রামবাসীর শীঘ্রই গ্রামে ডাকাতি হইবে মনে করিয়া সশগক থাকিত। মায়ের শেষ জীবনে যখন ভক্তদের যাতায়াত বাড়িতে থাকে, তখন মা মামাদের বাড়িতে থাকিলে ভক্তদের অসুবিধা হয় দেখিয়া পুজনীয় শরৎ মহারাজ শ্রীশ্রীমার ইচ্ছা অনুসারে তাঁহার জন্য নতূন স্থানে বাড়ি নির্মাণ করেন। সে বৎসর ওদেশে ভীষণ দুভিক্ষ হওয়ায় আমরা বহু তুঁতে মজুর নিযুক্ত করিয়াছিলাম। গ্রামবাসীরা প্রথমে উহাতে ভয় পাইলেও শেষে বলিত, ‘মায়ের কৃপায় ডাকাতগুলাে পর্যন্ত ভক্ত হয়ে গেল রে !" একদিন মা একটি তুঁতে মুসলমানকে (যে মায়ের বাড়ির দেওয়াল নির্মাণ করিয়াছিল) বাড়ির ভিতরে তাঁহার নিজের ঘরের বারান্দায় খাইতে দিয়াছেন। তাহার ভাইঝি নলিনী উঠানে দাঁড়াইয়া তাহাকে দুর হইতে ছুঁড়িয়া ছুঁড়িয়া পরিবেশন করিতেছিল। মা তাহা দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন, “অমন করে দিলে মানুষের কি খেয়ে সুখ হয় ? তুই না পারিস আমি দিচ্ছি।” খাওয়ার শেষে মা উচ্ছিষ্ট স্থানটি নিজেই ধুইয়া দিলেন। নলিনী মাকে ঐরূপ করিতে দেখিয়া, “ও পিসিমা, তােমার জাত গেল,” ইত্যাদি বলিয়া বড়ই আপত্তি করিতে লাগিল। মা তাঁহাকে এই বলিয়া ধমক দিলেন, “আমার শরৎ ( স্বামী সারদানন্দ) যেমন ছেলে, এই আমজাদও তেমন ছেলে। তিনি যে জগতের মা। এইরুপ ব্যবহারেই তাে দুর্বল, অধম মানবের প্রাণে বিশ্বাস আসিবে যে, সেও জগন্মাতার আপন সন্তান। 
বাস্তবিকই তিনি মন্দকেও ভাল চক্ষে দেখিয়া সকলকে উন্নত করিতেন। মা বলিতেন, “দোষ তাে মানুষের লেগেই আছে। কি করে যে তাকে ভাল করতে হবে তা জানে কজনে?” একদিন একজন তুঁতে মুসলমান কয়েকটি কলা আনিয়া বলিল, “মা, ঠাকুরের জন্য এইগুলি এনেছি, নেবেন কি?" মা লইবার জন্য হাত পাতিলেন ; বলিলেন, ‘খুব নেব, বাবা দাও। ঠাকুরের জন্য এনেছ, নেব বই কি।” মায়ের সাংসারিক কার্যে সাহায্যার্থ নিকটবর্তী গ্রামের জনৈকা স্ত্রীভক্ত কাছেই ছিলেন। তিনি বলিলেন, “ওরা চোর, আমরা জানি। ওর জিনিস ঠাকুরকে দেওয়া কেন?” মা এ কথার কোন উত্তর না দিয়া মুসলমানটিকে মুড়ি মিষ্টি দিতে বলিলেন। সে চলিয়া যাইলে মা ঐ স্ত্রীভক্তটিকে তিরস্কার করিয়া গভীরভাবে বলিলেন, “কে ভাল, কে মন্দ, আমি জানি।” আমরা দেখিতাম, যাহাকে কেহ দেখিতে পারে না, মা ঠিক তাহাকেই আরও আদর যত্ন করিতেন। কেহ কোন মহা গর্হিত কার্য করিয়াও যদি তাহার নিকট অনুতপ্ত হইয়া যাইত, তিনি তাঁহাকে অভয় দিতেন। একবার একটি যুবতী এইরূপে তাহার শরণাপন্ন হইলে মা তাহাকে কোল দিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, যা করেছ করেছ, আর করাে না এবং তাহার পাপরাশি নিজে গ্রহণ করিয়া তাহাকে মন্ত্রদীক্ষা দিলেন, যাহাতে তাহার সুমতি হয়।
একবার জনৈক যুবক ভক্তের কোন অন্যায় আচরণের জন্য ঠাকুরের কোন বিশিষ্ট অন্তরঙ্গ ভক্ত শ্রীশ্রীমাকে অনুরােধ করিয়াছিলেন, যেন তাহাকে মায়ের নিকট আসিতে না দেওয়া হয়। তাহাতে মা বলিয়াছিলেন, “আমার ছেলে যদি ধুলােকাদা মাখে, আমাকেই তাে ধুলাে ঝেড়ে কোলে নিতে হবে!” এই মাতৃসুলভ স্নেহ ও ক্ষমা দ্বারাই তিনি বিপথগামীকে সুপথে আনিতেন!
মায়ের সহনশীলতার সীমা ছিল না। কত লােক নানাপ্রকার পাপতাপের বােঝা লইয়া তাহার চরণ স্পর্শ করিত; শরীরে ভীষণ জ্বালা অনুভব করিলেও মা উহা নীরবে সহ্য করিতেন। একদিন বৈকালে দর্শনার্থীদের প্রণামের পর দেখি, মা বারান্দায় আসিয়া হাটু অবধি পা কেবল ধুইতেছেন। জিজ্ঞাসা করায় বলিলেন, “আর কাউকে পায়ে মাথা দিয়ে প্রণাম করতে দিও না। যত পাপ এসে ঢোকে, আমার পা জ্বলে যায় ; পা ধুয়ে ফেলতে হয়। এইজন্যই তাে ব্যাধি। দূর থেকে প্রণাম করতে বলবে।" বলিয়াই আবার বলিতেছেন, “এসব কথা শরৎকে বলাে না। তাহলে প্রণাম করা বন্ধ করে দেবে।”
নিজ পছন্দমত কাজ মানুষ যেরুপ প্রীতির সহিত দুই-চারি দিন করিয়া থাকে, মাকে জীবনব্যাপী দৈনিক কার্যগুলিও সেইরূপ প্রীতির সহিত করিতে দেখিতাম। জয়রামবাটীতে নিত্যকার সেই রান্নাবাড়া, খাওয়ান ইত্যাদি একঘেয়ে কাজ, তাহার উপর যখন তখন ভক্তসমাগম, আবার তাঁহার সংসারের এক একজন এক এক রকমের ছিল ; ইহা সত্বেও তিনি এই সকল কাজ আনন্দের সহিত করিয়া যাইতেন। অন্যে সাহায্য করে ভাল, না করিলেও কিছু মনে করিতেন না। যেন তাঁহারই সকল দায়িত্ব, বাড়ির অপর সকলে অভ্যাগত! জয়রামবাটীতে দেখিতাম, সকালবেলা সেই ঘন্টা দুই ধরিয়া শাক তরকারি কুটা, রান্নার জন্য ভাঁড়ার বাহির করিয়া দেওয়া, পুজার সব যােগাড় করিয়া নিজে পুজা করা, আবার দীক্ষাদান, প্রসাদ ও জলখাবার বাঁটিয়া দেওয়া, অন্ততঃ একশ খিলি পান সাজা, ভক্তগণকে ও বাড়ির লােকদিগকে খাওয়ান, বৈকালে নিজহাতে লুচি রুটি তরকারি প্রভৃতি করা, দুধ জাল দেওয়া, লন্ঠন পরিষ্কার করা—সবই যেন নিত্য নতূন প্রীতির সহিত করিয়া যাইতেছেন। ইদানীং স্ত্রীভক্তেরা ও নলিনী প্রভৃতি তাঁহাকে সাহায্য করিতেন বটে, তথাপি অধিকাংশ কাজ তাঁহাকেই করিতে ও দেখিতে হইত। মা বলিতেন, “শরীর এদিকে পড়ে যাচ্ছে, আর কাজও ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছে।”
ছোট ছোট খুঁটিনাটি কাজেও মায়ের আচরণ আদর্শ স্থানীয় ছিল। উদ্বোধনে আমরা স্নানের পর কাপড় শুকাইতে দিতাম। বৈকালে বর্ষা হইলে সেগুলি ভাল করিয়া শুকাইত না, কোনখানি হয়তাে পুনরায় ভিজিত, কোনখানির জলে হয়তাে ভাল করিয়া নিংড়ান হইত না। দেখিতাম, মা আস্তে আস্তে সেই কাপড়গুলি আবার নিংড়াইয়া দোতলার দক্ষিণের ঘরে লম্বা করিয়া দড়িতে বা জানালার গরাদের সহিত বাঁধিয়া শুকাইতে দিতেছেন। একদিন বৃষ্টির পরে তাহাকে ঐরুপ করিতে দেখিয়া আমি বলিলাম, “মা, এত লােক রয়েছে, তুমি আবার কেন জল ঘাঁটছ ? বৃষ্টিতে বারাণ্ডা সব ভিজে গেছে, পায়ে বাত-আর কি লােক নেই ?” মা বলিলেন, “না, বাবা, এই যাচ্ছি, এই সামান্য একটু।” স্বামীজী বলিতেন, ‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনায় মানুষকে চিনতে হয়।
সামান্য সামান্য বিষয়েও মায়ের অদ্ভুত দৃষ্টি ছিল। জয়রামবাটীতে তাঁহার নতূন বাড়ি হওয়ার পর গ্রাম পঞ্চায়েত চার টাকা ট্যাক্স ধার্য করিয়া জ্ঞানানন্দের নিকট হইতে উহা আদায় করে। মা তখন কলিকাতায় ছিলেন। পর বৎসর মা দেশে যাইলে চৌকিদার যখন উহা আদায় করিতে আসিল তখন মা বলিলেন, “এত বেশী কেন? কমাবার চেষ্টা কর। আমি না হয় দিলুম। কিন্তু আমি যখন থাকব না তখন সন্নাসী ব্রহ্মচারী যে থাকবে সে কি করে দেবে? তার খাওয়া পরাই হয়তাে ভিক্ষা করে চালাতে হবে। আর একবার জ্ঞান যখন জয়রামবাটীতে, তখন সে গােয়ালাকে খাঁটি দুধ দিবার জন্য বিশেষ করিয়া বলিত, “টাকায় আট সের দেবে, তবু খাঁটি চাই। এইভাবে সে চড়া দরে দুষ কিনিত। একদিন মা উহা শুনিতে পাইয়া তাহাকে তিরস্কার করিলেন, “ওকি, জ্ঞান, এখানে পয়সায় পােয়া দুধ মেলে, গরীবে খেতে পায়। আর তুমি অমনি করে দর বাড়াচ্ছ! গােয়ালা—সে তাে জল দেবেই। দর বাড়ালে তখন তো পয়সা বেশী পাবে বলে আরও জল মেশাতে চাইবে।
অন্যদিকে কতকগুলি বিষয় মায়ের বড়ই চমৎকার ছিল। কেহ নির্লজ্জ হইয়া নাচুক না কেন, মা সেইস্থান দিয়া চলিয়া যাইলেও তাহার দৃষ্টি আদৌ সেদিকে পড়িবে না। যদি দৈবাৎ কখনও পড়িল, তথাপি তাহার তৎকালীন উদাসীন দৃষ্টি ও মুখের ভাব হইতে স্পষ্ট বােধ হইত, তিনি ইহার কিছুই লক্ষ্য করেন নাই বা উহা বিসদৃশ বলিয়া মনে করেন নাই। যেন বালিকার দৃষ্টি ভালমন্দের বােধই নাই।
লােককে বিশেষ লক্ষ্য করিয়া তাহার দোষগুণ দেখার অভ্যাস মায়ের কখনই ছিল না। একবার চাহিয়া দেখিলেন, এইমাত্র। দৃষ্টিমাত্র লােকের অন্তরবাহির জানিবার শক্তি যাঁহার ছিল, অন্যায় করিয়া তাহার কাছে নিঃসঙ্কোচে দাঁড়াইতাম। জানিতাম যে, তাঁহার দৃষ্টি ঐদিকে পড়িবে না অথবা যতক্ষণ না বলিব, তিনি জানিতে পারিবেন না। আর বলিলে তাে ক্ষমা আছেই। যিনি যত বেশী শক্তি হজম করিতে পারেন, তিনি তততা অধিক শক্তিমান। নিবেদিতা ঠিকই লিখিয়াছেন, “স্ত্রীভক্তেরা মায়ের সঙ্গে বসিয়া যখন কথাবার্তা বলতেন, তাঁহারা কিছুতেই মনে করিতে পারিতেন না যে, ঠাকুরের সঙ্গে মায়ের সব বা তাঁহার উপর মায়ের দাবি তাঁহাদের চেয়ে বেশী ছিল। মনে হইত যেন তিনি তাঁহাদের মতােই ঠাকুরের আশ্রিত ও কৃপাপ্রার্থীদের একজন।”
যদিও তাঁহার নিকট ত্যাগী ও গৃহস্থ সমান আদর পাইয়াছে, তথাপি ত্যাগীরা সমধিক প্রিয় ছিল। তিনি বলিতেন, “বাবা, ত্যাগীদের না হলে কাদের নিয়ে থাকব?” একবার বেলুড় মঠে ঠাকুরের উৎসবে মা গিয়াছেন। মধ্যাহ্নে তাঁহার আহারের পর আমি জাগ হইতে জল ঢালিয়া দিতেছি, মা দাঁড়াইয়া আঁচাইতেছেন। আঁচাইবার পর মা সাধারণতঃ পা ধুইয়া থাকেন। আমি সেইজন্য পায়ে জল ঢালিয়া দিতেছি এবং হাটুর বাতের জন্য মায়ের নীচু হইতে কষ্ট হইবে মনে করিয়া নিজেই হাত দিয়া পায়ের পাতার উপরের জলটা একটু মুছিয়া দিতেছি। অমনি মা মহা সঙ্কুচিত হইয়া বলিলেন, “না, না, বাবা, তুমি। তােমরা দেবের আরাধ্য ধন।” এই বলিয়া নিজেই হাত দিয়া পা মুছিলেন। আমি তাে তখন কাছা দিয়া কাপড় পরি, আর তাঁহার পায়ে জল ঢালিয়া দিবারও যােগ্য নহি।
মঠের সাধু-ব্রক্ষচারীরা আসিলে রাধু প্রভৃতিকে মা প্রায়ই বলতেন, “দাদাদের প্রণাম কর।” একদিন উদ্বোধনের বাড়িতে কোন প্রাচীন স্ত্রীভক্ত জনৈক সাধুর সঙ্গে কোন ব্যাপারে কথা কাটাকাটি হওয়ায় এই বলিয়া রাগ করিয়া চলিয়া যাইতেছিলেন, “ও এখানে থাকিলে আমি কিছুতেই আসব না।" অনেকে তাহাকে অনুনয়-বিনয় করিয়া ফিরাইতে চেষ্টা করিয়াও পারিলেন না। মায়ের কানে সব ঘটনা পেীঁছিতেই মা উত্তেজিত হইয়া বলিলেন, “ও কে ? গৃহস্থ ! যায় এখান থেকে, যাক না। সাধু আমার জন্য সব ত্যাগ করে এখানে রয়েছে।” অথচ যাঁহাকে মা এইরূপ তিরস্কার করিলেন, ঠাকুরের স্ত্রীভক্তদের মধ্যে তাঁহার স্থান অতি উচ্চে। জনৈক ত্যাগী ভক্ত মাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “মা, সন্ন্যাসীই হােক, আর গৃহস্থই হােক, ঠাকুরের যারা আশ্রয় নিয়েছে তারা সবই তাে সমান—কারণ সকলেই মুক্ত হবে ?” মা বলিলেন, “সে কি! ত্যাগী আর গৃহস্থ কি সমান? ওদের কামনা বাসনা কত কি রয়েছে, আর এরা তাঁর জন্য সব ছেড়ে চলে এসেছে। এদের আর তিনি ভিন্ন কি আছে ? সাধুদের সঙ্গে কি ওদের তুলনা হয়?”
যুবক ভক্তেরা অনেক সময় মাকে জিজ্ঞাসা করিত, “বিবাহ করিব কি না?” তিনি মন বুঝিয়া কাহাকেও বলিতেন, “সংসারীদের কত কষ্ট! তােমরা হাঁপ ছেড়ে ঘুমিয়ে বাঁচবে।” কাহাকেও বা বলিতেন, “আমি ও সম্বন্ধে কোন মতামত দিতে পারব না। বিয়ে করে যদি অশান্তি হয়, তখন বলবে, ‘ম, আপনি বিয়ে করতে মত দিয়েছিলেন।” আবার জনৈক ভক্ত যখন বলিল, “মা, আমি বিয়ে করব না, তখন মা হাসিয়া বলিয়াছিলেন, “সে কি গো? সংসারে সবই দুটি দুটি। এই দেখ না, চোখ দুটি, কান দুটি, হাত দুটি, পা দুটি-তেমন পুরুষ ও প্রকৃতি।” বাস্তবিক সে ভক্তটি পরে বিবাহ করিয়াছিল। আবার কেহ হয়তাে লিখিয়াছে, “মা, আমার বিয়ে করতে ইচ্ছা নেই, বাড়িতে বাপ-মা জোর করে বিয়ে দিতে চায়।” মা শুনিয়াই বলিলেন, “দেখ, দেখ, কি অত্যাচার।” একবার একটি ভক্ত মাকে গিয়া বলিল, “মা, আমি এতকাল বিয়ে না করে থাকবার চেষ্টা করেছিলাম। এখন দেখছি পেরে উঠব না” ইত্যাদি। মা তাহাকে অভয় দিয়া বলিলেন, “ভয় কি? ঠাকুরের কত গৃহস্থ ভক্ত ছিলেন। তােমার কোন ভয় নেই - তুমি বিয়ে করবে।” এই বলিয়া তাহাকে খুব আশীর্বাদ করিলেন। সে যে চেষ্টা করিয়াছিল, তাহাতেই মা খুব খুশী হইয়াছিলেন। নিবৃত্তির দিকে যাহাদের একটুও স্পৃহা হইয়াছে, তাহাদের বিবাহ না করাই ভাল—এইরূপ উপদেশ মা প্রায়ই দিতেন। মেয়েদের মধ্যেও যাহাদের বিবাহে তেমন ইচ্ছা নাই, মা তাহাদিগকে নিবৃত্তির উপদেশই দিতেন। একবার জনৈক ভক্তের কন্যা বিবাহে রাজী না হওয়ায় তাহার মাতা শ্রীশ্রীমাকে সব নিবেদন করিলেন যাহাতে তিনি মেয়েটিকে বিবাহের আদেশ দেন। তদুত্তরে মা বলিলেন, “সারাজীবন পরের দাসত্ব করা, পরের মন যােগান, এ কি কম কষ্টের কথা!” তারপর এই মর্মে বলিলেন যে, যদিও অবিবাহিত জীবনে বিপদের সম্ভাবনা আছে, তথাপি যাহার বিবাহে ইচ্ছা নাই তাহাকে বিবাহ দিয়া স্থায়ী ভােগে লিপ্ত করা কিছুতেই উচিত নহে। 
১৩২৬ সালের পৌষ মাসে মা জয়রামবাটীতে ছিলেন। জন্মতিথির দিন বৈকালে তাঁহার সামান্য জন্ম হয়। মাঝে মাঝে ভাল থাকিলেও এই জ্বরে ক্রমশঃ ভুগিতে ভুগিতে মা খুব দুর্বল হইয়া পড়েন। এই অসুস্থতার মধ্যেও অনেক ভক্ত তথায় দীক্ষা লইতে গিয়াছেন এবং তাহার কৃপালাভ করিয়াছেন। হয়তাে একবার জ্বর হইয়া গেল ; জ্বর ছাড়িতেই—অন্নপথ্য পাইবার পূর্বেও মা দীক্ষা দিয়াছেন, কারণ ভক্তেরা কত আশা করিয়া তাহার নিকট যাইতেন। কলিকাতা আসিবার দুই-একদিন পূর্বে মা সিংহবাহিনীকে প্রণাম করিতে গিয়াছিলেন। তিনি তখন এত দুর্বল হইয়াছেন যে, ঐটুকু গিয়া ফিরিয়া আসিতেই অত্যন্ত ক্লান্তিবােধ করেন। বলিয়াছিলেন, “কালঘাম ছটিয়ে দিয়েছিল।” কিন্তু অধিকাংশ স্থলেই নিজের জ্বর বা ঐরুপ অত্যধিক দুর্বলতার কথা প্রকাশ করিতেন না, পাছে ভক্তদের দর্শনাদির ব্যাঘাত হয়, অথবা তাঁহার জন্য অপরে ভাবিত হয়।
তাঁহার এইরুপ অসুখের সংবাদ পাইয়া পুজনীয় শরৎ মহারাজ চিকিৎসার জন্য তাঁহাকে কলিকাতায় আনাইলেন। ফাগুন মাসের মধ্যভাগে মা কলিকাতা পৌঁছিলেন। তখন তাঁহার শরীর অতি শীর্ণ; খুব দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত শ্যামাদাস কবিরাজের চিকিৎসায় কিছুদিন তাঁহার জ্বর বন্ধ থাকে। শরীর তখন অনেকটা ভাল মনে হইতেছিল। একদিন ভক্তেরা অনেকে প্রণামও করেন। 
কবিরাজী ঔষধের মধ্যে একটি তিক্ত পাচন ছিল। সকালে মা তাহা খাইতেন। খুব তিক্ত বলিয়া অনেকক্ষণ ঐজন্য অস্বস্তি বােধ করিতেন, এমন কি দ্বিপ্রহরে আহারের সময়েও যেন মুখে সেই তিক্ত স্বাদ বােধ হইত; তাই ভাত খাইতে পারিতেন না। ঔষধ বদলানর কথায় কবিরাজ বলিলেন যে, ঐ রােগের তিক্ত ছাড়া তাহার ঔষধ নাই। তখন কবিরাজীর পরিবর্তে ডাক্তারী চিকিৎসা আরম্ভ হয় এবং ডাক্তার বিপিন ঘোষকে দেখান হয়। জ্বরও পুনরায় দেখা দিল। বিপিনবাবু প্রায় দেড় মাস চিকিৎসা করেন।
তারপর ডাক্তার প্রাণধন বসুকে দেখান হয়। এই সময় ডাক্তার সুরেশ ভট্টাচার্য ও ডাক্তার নীলরতন সরকারকেও এক দিন আনা হয়। নীলরতনবাবু কালাজ্বর বলিয়া নির্দেশ করেন। প্রাণধনবাবু খুব যত্নের সহিত চিকিৎসা করিয়াছিলেন। দুই-তিন দিন আসিবার পর বলিলেন, “আমাকেও আপনাদের মায়ের একজন সেবক মনে করবেন।” মা তাঁহাকে খুব ভালবাসিতেন; তাঁহার জন্য আম, লিচু প্রভৃতি পাঠাইয়া দিতে বলিতেন। রােগের উপশম না হওয়ায় কবিরাজী চিকিৎসা আরম্ভ হয় এবং শ্ৰীযুত শ্যামাদাস বিশেষ অসুস্থ থাকায় কবিরাজ রাজেন্দ্রনাথ সেন দেখিতে থাকেন। তাঁহার সঙ্গে শ্ৰীযুত কালীভুষণ সেন ও শ্ৰীযুত রাম কবিরাজকেও আনা হইত। 
কিছুতেই কিছু হইল না। রােগ দিন দিন বাড়িতেই লগিল। প্রত্যহ তিন-চারবার করিয়া জ্বর উঠিত। পিত্তপ্রধান জ্বর, শরীরে অসহ্য জ্বালা হইত। মা বলিতেন, “পানাপুকুরের জলে গা ডুবিয়ে থাকব।” বরফে হাত রাখিয়া আমরা সেই হাত মায়ের শরীরে বুলাইয়া দিতাম। জ্বরবৃদ্ধির সময় প্রায়ই হুশ থাকিত না। তখন গ্রীষ্মকাল। একদিন দ্বিপ্রহরে বহুদূর গিয়া তবে বরফ পাওয়া গেল। আসিয়া দেখিলাম অসহ্য গাত্রদাহ। বরফ কাপড় দিয়া ঢাকিয়া তাহার উপর মায়ের হাত রাখিয়া দিতেই মা আরাম পাইয়া চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “ও রাসবেহারী, তুমি এ কোথায় পেলে।" গাত্রদাহের জন্য, যাহাদের গা ঠাণ্ডা তাহারা কাছে গেলেই মা তাহাদের গায়ে হাত রাখিতেন। ভুগিয়া ভূগিয়া তিনি যেন ছেলেমানুষের মতাে হইয়া গিয়াছিলেন। একদিন সকালবেলা আমাকে ডাকাইলেন। আমি যাইবামাত্র বলিলেন, “আমাকে কোলে করে বস।” এই দীর্ঘকাল শুইয়া থাকিতে থাকিতে রােগের যন্ত্রণা শরীরে যেন আর সহ্য হইতেছে না। সরলা কাছে ছিলেন। তাঁহাকে বলিলাম, “মাকে একটু কোলে করে বস। তােমরা মেয়েছেলে।” তিনি চুপ করিয়া থাকায় শেষে বালিশ উচু করিয়া তাহাই ঠেশান দিয়া মাকে বসাইয়া গায়ে ও মুখে একটু হাত বুলাইয়া সান্ত্বনা করিলাম।
এইরপে অসুখের মধ্যেও সকালবেলা কবিরাজের নিকট যাইবার পূর্বে রােগের বিবরণ লইতে যখন মায়ের কাছে যাইতাম, তিনি বলিতে ভুলিতেন না, “খেয়ে যাও, বেলা হবে।” কবিরাজেরা দেখিয়া যাইবার পর প্রায়ই বলিতেন, “বুড়াের ( ৺দুর্গাপ্রসাদ সেনের) নাতিকে (কবিরাজ কালীভুষণকে) জল খেতে দাও, সন্দেশ দাও, আম দাও। রাম কবিরাজকে দাও, বড়াে কবিরাজকে (শ্ৰীযুত রাজেন্দ্রনাথ সেনকে) দাও।” ডাক্তার কাঞ্জিলাল, দুর্গাপদ, শ্যামাপদ প্রভৃতি যে কেহ আসিতেন, মা সকলেরই কুশল জিজ্ঞাসা করিতেন। একদিন আরামবাগ হইতে প্রভাকরবাবু ও মণীন্দ্রবাবু আসিয়াছেন। খুব ক্ষীণস্বরে থামিয়া থামিয়া মা তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, “ভাল আছ, বাবা? বাঁচব কি ? কিছু খেতে পারি না, বড় দুর্বল। বরদা ( শ্রীশ্রীমার ভাই) মারা গিয়েছে।” দেশেরও খবর লইতেছেন, “জল হয়েছে কি ?” মণীন্দ্রবাবু বলিলেন, “না, মা।” মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “এখানে প্রসাদ পাবে তাে?" মণীন্দ্রবাবু বলিলেন, “আজ্ঞে হাঁ।” রমণী নামক একটি স্ত্রীলােক দ্বারা তিনি শ্রীশ্রীমায়ের জন্য কচি তাল পাঠাইয়াছিলেন। এই স্ত্রীলােকটি মণীন্দ্রবাবুর প্রেরিত জিনিসপত্র লইয়া কয়েকবার জয়রামবাটীও গিয়াছিল। মা তাহার কথায় বলিলেন, “রমণী কখন এসেছিল জানি না; জ্বরে হুঁশ ছিল না। তাকে বলো, সে যেন মনে দুঃখ না করে।” কাশী হইতে শান্তানন্দ স্বামী প্রভৃতি যিনি যখন আসিয়াছেন সকলকেই জিজ্ঞাসা করিতেন, “লাটু কেমন আছে ?” মা অসুখে পড়িয়া শুনিয়াছিলেন, পুজনীয় লাটু মহারাজের খুব অসুখ। কাশী হইতে ইহার যখন আসেন তখন লাটু মহারাজের শরীর গিয়াছে। এ দুঃসংবাদ তাঁহাকে শুনান হয় নাই। বােধ হয় মা অন্তরে জানিতে পারিয়াছিলেন, তাই বারংবার তাঁহার কথা জিজ্ঞাসা করিতেন।
নবাসনের বউ এবং সরলা মার খুব সেবা করিয়াছিলেন। যতক্ষণ কিছুমাত্র সামর্থ্য ছিল, মা কাহাকেও সেবা করিতে দিতে এতই সঙ্কুচিত হইতেন যে, তাঁহার সেবা করার সুযােগই হইত না। এই শেষ অসুখের সময় একদিন বেলা প্রায় এগারটার সময় মায়ের পথ্য হইয়া গিয়াছে, তক্তপােশের উপর আড়ভাবে শুইয়া আছেন। একটু ঘুম পাড়াইবার জন্য হাওয়া করিতেছিলাম। চার-পাঁচ মিনিট পরেই বলিলেন, “আর না, তােমার হাত ব্যথা করছে। আমি বলিলাম, “না মা, এ হাতপাখা, আমার একটুও হাত ব্যথা করছে না। করলে আমি আপনিই থামব।” একটু চক্ষ বুজিয়া থাকিয়াই আবার বলিলেন, “না, বাবা, তােমার হাত ব্যথা করবে। থাক, আমি অমনি ঘুমচ্ছি।” একটু চুপ করিয়াই আবার বলিলেন, “বাবা, তােমার হাত ব্যথা করবে ভেবে আমার ঘুম আসছে না। তুমি পাখা বন্ধ কর, তা হলে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুই।” অগত্যা আমি পাখা বন্ধ করিলাম। মাও চুপ করিয়া শুইয়া রহিলেন। বােধ হয় দশ মিনিটও হাওয়া করা হইল না।
ক্রমশঃ অসুখ খুব বাড়িতে লাগিল। ঘরের তক্তপােশ সরাইয়া দিয়া মেঝেতেই বিছানা করা হইল। এ রােগ যে সারিবে না, মা তাহা জানিতেন বলিয়াই মনে হয়। পুনর্বারের অসুখের পর বলিয়াছিলেন, “আবার তাে সেই রকম ভুগতে হবে।” জীবের কল্যাণের জন্য যে রাধুর মায়া অবলম্বন করিয়া তিনি ঠাকুরের অদর্শনের পরও এই দীর্ঘকাল বর্তমান ছিলেন, সেই রাধুর সম্পর্কও তিনি ছিন্ন করিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন, “কুটোছেঁড়া করে দিয়েছি।” একদিন অনেক অনুনয় করিয়া বলিয়াছিলাম, “মা, তুমি তাে ইচ্ছা করলেই থাকতে পার।” তাহাতে শুধু, বলিলেন, “মরতে কার সাধ ?” তাঁহার নিজের ইচ্ছা বলিয়া কিছু ছিল না। বলিতেন, “ঠাকুর যখন নিয়ে যাবেন, যাব।” 
ক্রমে রক্তহীনতায় হাত-পায়ে শােথ দেখা দিল। উঠিবার শক্তি না থাকায় বিছানাতেই শৌচাদি করান হইত। শ্রীমতী সুধীরা ও নিবেদিতা স্কুলের মেয়েরা পালা করিয়া থাকিয়া সব সময়ে পরিচর্যা করিতেছিলেন। ভাল ব্রাহ্মণের দ্বারা যথাবিহিত শান্তি-স্বস্ত্যয়নাদিও করান হইয়াছিল। কিন্তু কিছুতেই ফল হইল না। কবিরাজ রাজেন্দ্রনাথ সেন দুই মাস পূর্ব হইতেই বলিয়াছিলেন, “আপনাদের ভক্তদের মধ্যে যাঁহারা দেখিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহাদিগকে সংবাদ দিতে পারেন, কারণ এ রােগে আর আশা নাই।” দেহ যাইবার পাঁচদিন মাত্র বাকী আছে। জনৈক স্ত্রী-ভক্ত (অন্নপূর্ণার মা) দেখিতে আসিয়াছেন। ভিতরে যাইতে নিষেধ বলিয়া তিনি ঠাকুরঘরের দুয়ারেই বসিয়াছিলেন। হঠাৎ পাশ ফেরায় মা তাঁহাকে দেখিতে পাইয়া হাতে ইশারা করিয়া কাছে ডাকিলেন। তিনি প্রণাম করিয়া কাঁদিয়া বলিলেন, “মা, আমাদের কি হবে ?” চিরকরুণাময়ী অভয় দিয়া ধীরে ধীরে ক্ষীণকণ্ঠে বলিলেন, “ভয় কি? তুমি ঠাকুরকে দেখেছ, তােমার আবার ভয় কি?" একটু পরে আবার ক্ষীণকণ্ঠে থামিয়া থামিয়া বলিলেন, “তবে একটি কথা বলি-যদি শান্তি চাও, মা, কারাে দোষ দেখাে না। দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখ, কেউ পর নয়, মা; জগৎ তােমার।”
যাহাদের দুঃখে কাতর হইয়া মা স্বয়ং তাহাদের পাপভার গ্রহণপূর্বক এই দুঃসহ রােগযাতনা ভােগ করিতেন, তাহাদের প্রতি ইহাই তাঁহার শেষ বাণী। ১৩২৭ সালের ৪ঠা শ্রাবণ, মঙ্গলবার, রাত্রি দেড়টার সময় ভক্তসন্তানগণকে কাঁদাইয়া তিনি মহাসমাধিযােগে শ্রীশ্রীঠাকুরের সহিত মিলিত হইলেন। পরদিন বেলুড় মঠে তাঁহার দিব্যদেহের যথারীতি সৎকার করা হইল। শ্রীশ্রীমায়ের স্থূলদেহ লােকচক্ষুর অন্তরাল হইলেও সুক্ষ্মশরীরে তিনি প্রতি ভক্তের হৃদয়মন্দিরে চিরবিরাজমানা রহিয়াছেন।
~স্বামী অরুপানন্দ।

শ্রীশ্রীমার কোষ্ঠী 

(শ্ৰীযুক্ত নারায়ণচন্দ্র জ্যোতির্ভূষণ-কৃত)
শ্রীশ্রীমার কোষ্ঠী


স্বামী অরুপানন্দ

জয়রামবাটীতে প্রথম দর্শন। ১লা ফেব্রুয়ারি, ১৯০৭। 

শিবচতুর্দশীর পূর্ব তৃতীয়া, সকাল প্রায় সাড়ে আটটা।

বরদা মামা আসিয়া সংবাদ দিলেন, “মা ডাকছেন।”
বাড়ির মধ্যে গিয়ে দেখি মা তাহার ঘরের ভিতরে দুয়ারে দাঁড়াইয়া অপেক্ষা করিতেছেন। প্রণাম করিতেই জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথা থেকে এসেছ ?”
আমি জেলার নাম বলিলাম। 
মা—এখন বুঝি ঠাকুরের কথাটথা নিয়েই আছ ?
আমি ঐকথার কোন উত্তর দিলাম না। যেন পূর্বপরিচিতের মতাে কথাবার্তা । সেই সস্নেহ দৃষ্টি আমার এখনও মনে পড়িতেছে।
মা—তুমি কায়স্থ ? (আমার সব শরীর কিন্তু শীতকাল বলিয়া র‍্যাপারে ঢাকা।)
আমি - হাঁ। 
মা - তােমরা কটি ভাই ? 
আমি - চার ভাই। 
মা - বস, জল খাও।
এই বলিয়া নিজেই বারান্দায় আসন পাতিয়া দিয়া রাত্রের প্রসাদী লুচি ও গুড় একটা বাটিতে করিয়া আনিয়া দিলেন।
পূর্বদিন তারকেশ্বর হইতে হাঁটিয়া গিয়াছি। সন্ধ্যায় দেশড়া (জয়রামবাটীর উত্তর পাশের গ্রাম) পেীঁছি। সঙ্গে দেশড়ার একটি ছেলে (গােবিন্দ রায়ের বড় ছেলে)। তাহার সঙ্গে হরিপাল স্টেশনে আলাপ হয়। রাত্রিতে তাহাদের বাড়িতে ছিলাম। 
মা এই সব শুনিলেন এবং আমার খাওয়ার পর বলিলেন, “স্নান করাে না। অনেক পথ হেঁটে এসেছ।” পান দিলেন।
মধ্যাহ্নে ঠাকুরের ভােগ হইতেই আমাকে ডাকাইলেন এবং প্রথমেই খাইতে দিলেন। নিজেই শালপাতায় ভাত-তরকারি সব বাড়িয়া দিয়া গেলেন। আমি মায়ের ঘরের বারান্দায় বসিয়া খাইতেছি। খাওয়ার সময় মা বলিলেন, “পেট ভরে খেও, জান?” খাওয়ার পর পান দিলেন।
বৈকালে তিন-চারিটার সময় বাড়ির মধ্যে গিয়া দেখি মা ময়দা মাখিতেছেন। তাঁহার ঘরের বারান্দার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পূর্বমুখে পা মেলিয়া বসিয়াছেন। পাশেই ছােট উনুন, বৈকালে লুচি, তরকারি ইত্যাদি সেখানেই রান্না হয়। আমাকে দেখিয়া মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি চাও?”
আমি - তােমার সঙ্গে কথা আছে। 
মা - কি কথা? বস। 
এই বলিয়া বসিতে আসন দিলেন। 
আমি — মা, এই যে ঠাকুরকে সকলে পূর্ণব্রহ্ম সনাতন বলে, তুমি কি বল ? 
মা - হাঁ, তিনি আমার পূর্ণব্রহ্ম সনাতন।
‘আমার’ বলায় আমি বলিলাম, “তা প্রত্যেক স্ত্রীলােকেরই স্বামী পূর্ণব্রহ্ম সনাতন। আমি সেভাবে জিজ্ঞাসা করছি না।”
মা - হাঁ, তিনি পূর্ণব্রহ্ম সনাতন-স্বামিভাবেও, এমনি ভাবেও।
তখন আমার মনে হইল, তিনি পূর্ণব্রহ্ম হইলে মা জগদম্বা স্বয়ং - যেমন সীতা-রাম, রাধা-কৃষ্ণ পরষ্পর অভিন্ন। আমিও এই বিশ্বাস লইয়াই মাকে দেখিতে গিয়াছিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, “তবে যে তােমাকে এই দেখছি যেন সাধারণ স্ত্রীলােকের মতাে বসে রুটি বেলছ, এসব কি ? মায়া, না কি!” 
মা - মায়া বইকি। মায়া না হলে আমার এ দশা কেন? আমি বৈকুণ্ঠে নারায়ণের পাশে লক্ষী হয়ে থাকতুম। বলিয়াই আবার বলিতেছেন, “ভগবান, নরলীলা করতে ভালবাসেন কি-না। শ্রীকৃষ্ণ গােয়ালার ছেলে ছিলেন। রাম দশরথের বেটা।”
আমি -  তােমার কি আপনার স্বরুপ মনে পড়ে না ?
মা—হাঁ, এক একবার মনে পড়ে। তখন ভাবি, এ কি করছি, এ কি করছি। আবার এইসব বাড়িঘর, ছেলে-পিলে (হাত চিৎ করিয়া সামনের সব দেখাইয়া) মনে আসে ও ভুলে যাই। 
আমি প্রায় রােজই সন্ধ্যার পর মায়ের ঘরে গিয়া বসিতাম, মা খাটে শুইয়া থাকিয়া কথাবার্তা বলিতেন। রাধু (মায়ের ভাইঝি। মায়ের পাশে ঘুমাইয়া থাকিত। ঘরে পিলসুজের উপর প্রদীপ মিটমিট করিয়া জ্বলিত। কোন কোন দিন ঝিকে মায়ের পায়ের বাতের তেল মালিশ করিতে দেখিতাম। 
কথাপ্রসঙ্গে মা বলিতেছেন, “যখন আমার কোন ভক্তকে মনে পড়ে, আমার প্রাণ ব্যাকুল হয় তখন হয়, সে নিজে আসে, নয় তার চিঠিপত্র আসে।”
“এই যে এখানে এসেছ, একটা কিছু ভাব নিয়ে এসেছ। হয়তাে জগন্মাতা* ভেবে এসেছ।”
আমি — তুমি কি সকলেরই মা? 
মা —  হাঁ। 
আমি — এই সব ইতর জীবজন্তুরও? 
মা — হাঁ, ওদেরও। 
আমি — তবে ওরা এত কষ্ট পাচ্ছে কেন?
মা — ওদের এসব জন্ম এই-ই (অর্থাৎ ইতর জীবজন্তুর এই সকল জন্মে এই প্রকারই হইয়া থাকে)।
মাকু (মায়ের আর এক ভাইঝি) ও রাধু পাঠশালে যাইত। সন্ধ্যার পূর্বে তাহারা আসিলে মা আগে তাহাদের খাওয়াইতেন। আমি বলিলাম, “কি হচ্ছে ?” —তখন একটু একটু পশ্চিমবঙ্গের কথা বলিতে শিখিয়াছি। 
মা হাসিয়া আমার ‘হচ্ছে' কথাটির উচ্চারণ নকল করিয়া বলিলেন ‘বালিকা ভােজন হচ্ছে।”
* শ্রীশ্রীমা নিজের সম্বন্ধে কদাচিৎ এই ভাবের কথা বলিতেন। পরে শিবুদাদার মুখে শুনিয়াছি, ঠাকুরের দেহত্যাগের পর একবার মা কামারপুকুর হইতে জয়রামবাটী আসিতেছিলেন। সঙ্গে শিবুদাদা (তখন ছেলেমানুষ) কাপড়ের পুঁটলি লইয়া। জয়রামবাটীর প্রায় কাছে মাঠের মধ্যে আসিয়া শিবুদাদার হঠাৎ কিরূপ মনে হওয়ায় দাঁড়াইয়া পলে। মা কিছুদূর আসিয়া পিছনে কাহারও পায়ের শব্দ শুনিতে না পাইয়া ফিরিয়া দেখেন, শিবুদা দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন। মা বলিলেন, “ও কিরে, শিবু, এগিয়ে আয়।” শিবুদাদা বলিলেন, “একটি কথা বলতে পার, তাহলে আসতে পারি। মা–“কি কথা?” শিবুদাদা —“তুমি কে, বলতে পার ?" মা - “আমি কে? আমি তাের খুড়ী। শিবুদাদা—“তবে যাও, এই তাে বাড়ির কাছে এসেছ। আমি আর যাব না। (এদিকে বেলা শেষ হইয়াছে।) মা--“দেখ দেখি, আমি আবার কে রে? আমি মানুষ, তাের খুড়ী।" শিবুদাদা-“বেশ তাে, তুমি যাও না।" শিবুদাদাকে না খাইতে দেখিয়া মা শেষে বলিলেন, “লােকে বলে কালী।” শি্বুদাদা - ”কালী তাে? ঠিক?" মা - “হা।" শিবুদাদা —“তবে চল।” বলিয়া সঙ্গে সঙ্গে জয়রামবাটী যাইলেন।
সন্ধ্যার পর মায়ের ঘরে কথাবার্তা হইতেছে। 
মা—এই যে তোমরা এসেছ ; আপনার না হলে আসবে কেন? 
আমি—আমি কি তােমার আপনার ?
মা—হাঁ, আপনার বই কি, ‘যে যার সে তার, যুগে যুগে অবতার’ (যে যাহার আপনার জন, সে তাহার সহিত যুগে যুগে আসে)।
কিছুক্ষণ কথার পর বলিতেছেন, “আবার সুক্ষ্ম শরীরে দেখা হবে।” বুঝিলাম দেহান্তে আমাদের আবার সাক্ষাৎ হইবে।
আমি—মা, আমি গত আশ্বিন মাসে এখানে আসব বলে হাওড়া স্টেশনে এক রাত্রি শুয়েই কাটালাম। পর দিনও বেলা ১১টা পর্যন্ত স্টেশনে। টিকিট আর কাটতে পারছি না। স্বদেশী আন্দোলনের জন্য ধর্মঘট করায় কেরানীর আসে নাই, কাজকর্ম বন্ধ। মিনিট কয়েক থাকতে একটি মেম কেরানী এল। তখন টিকিটের জন্য লাঠালাঠি। পুজার সময় কি না। টিকিট কিনতে না পেরে বাসায় ফিরে যাই। শেষে বাড়ির চিঠি পাই, এক ভাইয়ের খুব অসুখ। তাই বাড়ি ফিরে গেলাম, সেবার আসা হল না।
মা—একটা যােগাযােগ হওয়া চাই, তবে দেখা হয়।
আমি—সকলে তােমায় ‘আপনি’ বলেন, আমি কিন্তু বলতে পারলাম না, আমার মুখে এল না।
মা—তা ভাল। এ খুব আপনা-আপনি ভাব।
আমি কথায় কথায় বলিলাম, “মা, তুমি যাদের মন্ত্র দিয়েছ তাদের ভার তাে তুমি নিয়েছ। তবে আমাদের কথা বললে ঠাকুরের কাছে বলব’ একথা বল কেন ? আমাদের ভার তুমি নিতে পার না? (আমার তখনও মন্ত্রের আবশ্যকতা বােধ হয় নাই, তাই ঐরুপ প্রশ্ন করিয়াছিলাম)।
মা—তােমার তাে ভার নিয়েছি।
আমি—মা, আশীর্বাদ কর যেন শুদ্ধ মন আর অনুরাগ হয়। মা, আমি একটি ছেলের সঙ্গে পড়েছি, তাকে যা ভালবাসতাম, তার সিকি ভালবাসাও যদি ঠাকুরের প্রতি হত, তা হলেও সন্তুষ্ট হতাম।
মা—আহা, তাই তো ; আচ্ছা, ঠাকুরের কাছে বলব।
আমি—কেবল ‘ঠাকুরের কাছে বলব’ বলছ কেন? তুমি আর ঠাকুর কি ভিন্ন ? তুমি আশীর্বাদ করলেই হবে।
মা—বাবা, তােমার পূর্ণজ্ঞান আমার আশীর্বাদে যদি হয়, আমি হাড় ভেঙে আশীর্বাদ করব।
—মানুষের কি সাধ্য যে আপনি এ মায়ার হাত থেকে তরতে পারে? তাই তাে ঠাকুর এত সাধনা করলেন, সব ফল জীবোদ্ধারে দিয়ে গেলেন।
আমি—তাঁকে না দেখলে কি করে ভালবাসা যায় ? 
মা—তাই তাে, হাওয়ার সঙ্গে কে ভাব করতে পারে ? 
আমি—মা, কবে ঠাকুরের দেখা পাব ? 
মা—পাবে পাবে, সময় হলেই ঠাকুরের দেখা পাবে।
অন্য একদিন সন্ধ্যার পর মা শুইয়া আছেন। কামিনী ঝি মায়ের পায়ে ( হাঁটুতে) বাতের তেল মালিশ করিতেছে।
মা বললেন, “দেহ একটি, দেহী একটি ! দেহী সব শরীর জুড়ে রয়েছেন, তাই পায়ে ব্যথা। যদি এখান (হাঁটু) থেকে মন তুলে নিই, তা হলে আর বেদনা নেই।”
আমি মন্ত্রদীক্ষার কথা তুলিয়া বলিলাম, “আচ্ছা মা, মন্ত্র নেবার কি দরকার ? মন্ত্রজপ না করে কেউ যদি ‘মা কালী, মা কালী' বলে ডাকে, তাতে হয় না?"
মা—মন্ত্রের দ্বারা দেহশুদ্ধি হয়। ভগবানের মন্ত্র জপ করে মানুষ পবিত্র হয়। ইহা বলিয়া একটি গল্প বলিলেন
নারদ বৈকুণ্ঠে গিছলেন। বসে ঠাকুরের সঙ্গে অনেক কথা কইলেন। নারদ যখন চলে গেলেন, ঠাকুর লক্ষ্মীকে বললেন, 'ওখানে গােবর দাও।' লক্ষ্মী জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন, ঠাকুর? নারদ যে পরম ভক্ত, তবে কেন এরুপ বলছ। ঠাকুর বললেন, ‘নারদের এখনও মন্ত্র নেওয়া হয় নি। মন্ত্র না নিলে দেহ শুদ্ধ হয় না।'
অন্ততঃ দেহশুদ্ধির জন্যও মন্ত্র দরকার। বৈষ্ণবেরা মন্ত্র দিয়ে বলে, “এখন মন তাের।” তাই তো—
‘মানুষ গুরু মন্ত্র দেন কানে।
জগদগুরু মন্ত্র দেন প্রাণে ।” 
মনেতেই সব। মন শুদ্ধ না হলে কিছুই হয় না।
“গুরু, কৃষ্ণ, বৈষ্ণব, এ তিনের দয়া হল। 
একের দয়া বিনে জীব ছারেখারে গেল।”
একের কিনা মনের। নিজ মনের কৃপা হওয়া চাই।
আমি—মা, আমার কিন্তু জপতপে প্রবৃত্তি নেই। 
মা—হয়তাে তােমার পুর্বজন্মে ও সব করা আছে।
বাংলায় তখন খুব স্বদেশী আন্দোলন চলিতেছে। তাই জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, এ দেশের দুঃখ-দুর্দশা কি দুর হবে না?”
মা—ঠাকুর তাে এসেছিলেনই তার জন্যে।
মায়ের মাতার কথা উঠিল। মা বলিতেছেন, “মা ছিলেন—কোন ভক্ত এলে “নাতিন এসেছে, নাতিন এসেছে বলে কত খুশী হতেন, কত যত্ন করতেন। এ—সংসারটি ছিল যেন তাঁর গায়ের রক্ত। কত করে এটি ঠিকঠাক রাখতেন। আমার মায়ের নাম ছিল শ্যামা।” (দিদিমা পূর্ব বৎসর—১৯০৬ সনের গোড়ায় দেহত্যাগ করিয়াছেন)। | ঠাকুরকে দর্শনের কথা বলিলেন—
“যখন ঠাকুর চলে গেলেন, আমারও ইচ্ছা হল আমিও চলে যাই। তিনি দেখা দিয়ে বললেন, ‘না, তুমি থাক। অনেক কাজ বাকী আছে। শেষে দেখলুম, তাই তাে অনেক কাজ বাকী।”
“তিনি বলতেন, ‘কলকাতার লােকগুলাে যেন অন্ধকারে পােকার মতাে কিলবিল করছে। তুমি তাদের দেখবে।” 
“তিনি শতবৎসর সুক্ষ্মশরীরে ভক্তহৃদয়ে বাস করবেন বলেছেন। আর তাঁর অনেক শ্বেতকায় ভক্ত আসবে।” 
‘যখন ঠাকুর চলে গেলেন, প্রথম প্রথম ভয় হত। পরনে লাল কাপড় (সরু লালপেড়ে কাপড়), হাতে বালা-লােকে কি বলবে। তখন কামারপুকুরে রয়েছি। তারপর ঠাকুরের দেখা পেতে লাগলুম। তখন সে-সব ভয় ক্রমে দূর হল। একদিন ঠাকুর এসে বললেন, “খিচুড়ি খাওয়াও।’ খিচুড়ি রেঁধে রঘুবীরকে ভােগ দিলুম। মারােয়াড়ী (অর্থাৎ হিন্দুস্থানী) কিনা তাই খিচুড়ি। তারপর বসে ভাবে ঠাকুরকে খাওয়াতে লাগলুম।”
“হরিশ এই সময় কামারপুকুরে এসে কিছুদিন ছিল। একদিন আমি পাশের বাড়ি থেকে আসছি। এসে বাড়ির ভিতর যেই ঢুকেছি, অমনি হরিশ আমার পিছুপিছু ছুটছে। হরিশ তখন ক্ষেপা। পরিবার পাগল করে দিয়েছিল। তখন বাড়িতে আর কেউ নেই। আমি কোথায় যাই। তাড়াতাড়ি ধানের হামারের (তখন ঠাকুরের জন্মস্থানের উপর ধানের গােলা ছিল।) চারদিকে ঘুরতে লাগলাম। ও আর কিছুতেই ছাড়ে না। সাতবার ঘুরে আমি আর পারলাম না। তখন নিজ মূর্তি এসে পড়ল। আমি নিজ মূর্তি ধরে দাঁড়ালাম। তারপর ওর বুকে হাঁটু দিয়ে জিভ টেনে ধরে গালে এমন চড় মারতে লাগলুম যে, ও হে হে করে হাঁপাতে লাগল। আমার হাতের আঙুল লাল হয়ে গিছল। তারপর নিরঞ্জন এলে তাকে বললাম, ‘ওকে পাঠিয়ে দাও’।” 
যােগীন মহারাজের কথা উঠিল। মা বলিলেন, “যােগীনের মত আমাকে কেউ ভালবাসত না। আমার যােগীনকে কেউ যদি আট আনা পয়সা দিত, সে রেখে দিত; বলত, “মা তীর্থে টীর্থে যাবেন, তখন খরচ করবেন।’ সর্বক্ষণ আমার কাছে থাকত, মেয়েদের কাছে থাকত বলে ওরা (ছেলেরা) সকলে তাকে ঠাট্টা করত। 
যােগীন আমাকে বলত, “মা, তুমি আমাকে যােগা, যােগা বলে ডাকবে। যােগীন যখন দেহ রাখলে, সে বললে, “মা, আমায় নিতে এসেছিলেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব ঠাকুর।”
আমি মাকে বললাম, কোন কোন ভক্ত কে কে, আমাকে বলতে হবে। 
মা—কাউকে না বলতে পার? 
আমি—তা, তুমি দেখবে যাতে কাউকে না বলি।
বলিয়াই ভাবিলাম, হয়তাে কাহাকেও বলিয়া ফেলিব, কথা রক্ষা হইবে না। তাই তখনই বলিলাম, “তবে থাক।” 
মা—যােগীনকে অর্জুন বলতেন। নরেনকে সপ্তর্ষি থেকে এনেছিলেন। ঈশ্বরকোটীর পূর্ণ। শরৎ আর যােগীন এ দুটি আমার অন্তরঙ্গ।
এইরূপ দুই-এক জনের কথা আপনা হইতেই বলিলেন।
নিজের কথা বলিতেছেন—“বলরামবাবু বলতেন, ‘ক্ষমারূপা তপস্বিনী'।” বলিয়াই আবার বলিলেন, “দয়া যার শরীরে নেই, সে কি মানুষ? সে তাে পশু। আমি কখনও কখনও দয়ায় আত্মহারা হয়ে যাই, ভুলে যাই যে আমি কে।”
কথাবার্তার শেষে মা বলিলেন, “বাবা, তোমার সঙ্গে আমার যেমন খােলাখুলি কথা হয়েছে এমন আর কারও সঙ্গে হয়নি।” পরে মা বলিলেন, “আমি যখন কলকাতায় যাব তখন তুমি আসবে, আমার কাছে থাকবে।” 
যদিও আমার ভিতরে ভিতরে সাধু হইবার খুব ইচ্ছা, তথাপি আমি তখন বাড়িতে থাকি। মনে ভাবিলাম, হয়তাে ভবিষ্যতে মায়ের ইচ্ছায় আমার তাঁহার কাছে থাকা এবং সাধু হওয়া সম্ভব হইবে।
মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আশুকে চেন? কাঞ্জিলাল, কৃষ্ণলাল ?” 
আমি বলিলাম, “না, আমি চিনি না।”
আমি যখন জয়রামবাটী যাই তখন ছােট মামী (রাধুর মা) পাগল হইয়াছেন। রাধুর গহনাগুলি লইয়া তিনি বাপের বাড়ি গিয়াছিলেন ; তাঁহার বাপ গহনাগুলি কাড়িয়া লইযাছেন; তজ্জন্য আরও ক্ষেপিয়াছেন। পাগলী মামী সিংহবাহিনীর মন্দিরে “মা, গয়না দাও, মা, গয়না দাও” বলিয়া কাঁদিতেছেন। তখন সন্ধ্যা অতীত হইয়াছে। ঘরে মা আর আমি। কথাবার্তা হইতেছে। হঠাৎ মা বলিলেন, “যাই, যাই, বাবা, ওর আমি ছাড়া কেউ নেই। পাগলী সিংহবাহিনীর কাছে গহনার জন্য কাঁদছে।” এই বলিয়া মা চলিয়া গেলেন। আমি কিন্তু কান্না আদৌ শুনিতে পাই নাই এবং অত দূর হইতে শােনাও সম্ভব নয়। কিন্তু তাহার কানে পৌঁছিয়াছে। সিংহবাহিনীর মন্দিরে গিয়া ক্ষেপীকে লইয়া আসিলেন। 
পাগলী বলিতেছেন, “ঠাকুরঝি, তুমিই আমার গয়না আটক করে রেখেছ। তুমিই দিচ্ছ না।” মা বলিলেন, “আমার হলে আমি কাকবিষ্ঠাবৎ এই দণ্ডে ফেলে দিতুম।” ক্ষেপীর কথায় আমাকে হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “গিরিশবাবু, বলতেন, এটা মায়ের সঙ্গের পাগলী।” 
আমার প্রথম প্রথম ‘মা’ বলতে একটু লজ্জা বােধ হইত, কারণ গর্ভধারিণী মা অল্প বয়সেই চলিয়া গিয়াছেন। একদিন সকালবেলা আমাকে দিয়া এক জ্ঞাতি-ভাইকে সংবাদ পাঠাইতেছেন। যাইবার সময় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি বলবে বল দেখি?” আমি বলিলাম, “তিনি আপনাকে এই এই বলতে বললেন।” শুনিয়া মা বলিলেন, “বলবে মা বললেন।” ‘মা’ শব্দটি জোর দিয়া উচ্চারণ করিলেন।
একদিন বেলা আটটা নয়টার সময় মা তাঁহার ঘর হইতে বাহিরে আসিতেছিলেন। উঠানে একটি ছেলে দাঁড়াইয়া অনন্যদৃষ্টিতে মাকে দেখিতেছিল। মা আসিতে আসিতে হঠাৎ ছেলেটির দিকে ফিরিয়া আসিয়া সস্নেহে তাহার চিবুকে হাত দিয়া সহাস্যে আমাকে বলিলেন, “এটি আমার গণেশ।” বোধ হইল, ছেলেটি কোন ভক্ত বা আত্মীয় হইবে।
একদিন সকালে মায়ের ঘরের বারান্দায় ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণপুঁথি’ পাঠ হইতেছিল। আমি পড়িতেছিলাম এবং মা ও আরও দুই একজন শুনিতেছিলেন। বিবাহের অংশটি পড়া হইতেছিল। সেখানে মাকে ‘জগন্মাতা' বলিয়া উল্লেখ করিয়া খুব প্রশংসা ছিল ; মা উহার খানিকটা শুনিয়াই উঠিয়া গেলেন। ইহারই অল্পক্ষণ পূর্বে তাহাকে মাঘ মাসের ‘উদ্বোধন’ হইতে পড়িয়া শুনাইতেছিলাম। মা একমনে শুনিতেছিলেন। ইহাতে মাস্টার মহাশয়ের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতের’ কিয়দংশ বাহির হইয়াছে। আর কেহ তথায় ছিল না। একস্থানে পড়িতেছিলাম
“গিরিশ—একটি সাধ। 
ঠাকুর—কি ? 
গিরিশ—অহেতুকী ভক্তি। 
ঠাকুর—অহেতুক ভক্তি ঈশ্বরকোটীর হয়, জীবকোটীর হয় না।”
আমি মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা জীবকোটীর হয় না, ঈশ্বরকোটীর হয়, এর মানে কি ?”
মা—ঈশ্বরকোটী পূর্ণকাম কিনা, তাই অহেতুক। কামনা থাকতে অহেতুক ভক্তি হয় না।
আমি—মা, তােমার এইসব বিশেষ ভক্তরা ও ভাইরা—এরা কি সমান ?
আমার মনের ভাব এই যে, ভাই হইয়া যখন জন্মিয়াছেন, তখন ইহারাও উচ্চ আধার ও অন্তরঙ্গ হইবেন, যেমন মঠের মহারাজরা। 
মা তদুত্তরে ওষ্ঠ কুঞ্চিত করিয়া এরুপ ভাব প্রকাশ করিলেন যেন কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা। শুধু ভাই হইলে কি হইবে? অন্তরঙ্গ পৃথক বস্তু।
একদিন সকালে ধানভানা হইতেছিল ; মা উহাতে সাহায্য করিতেছিলেন। প্রায় রােজই ঐরুপ করিতেন। আমি তাঁহাকে বলিলাম, “মা, তােমার এত খাটুনি কেন?” মা বলিলেন, “বাবা, আদর্শ হিসাবে যা করতে হয় তার ঢের বাড়া (বেশী) করেছি।” 
একদিন রাত্রে সকলে ঘুমাইতেছেন। নলিনীর (মায়ের আর একটি ভাইঝি ) স্বামী গরুর গাড়ি লইয়া উপস্থিত ; নলিনীকে লইয়া যাইবে। সে বশরেবাড়ি হইতে চলিয়া আসিয়াছে এবং ফিরিয়া যাইতে চাহে না ; স্বামীর আগমন-সংবাদ পাইয়াই ঘরের দরজা বন্ধ করিয়াছে। আত্মহত্যা করিতে চাহে। অনেক সাধাসাধির পর, তাহাকে এবার ‘শ্বশুরবাড়ি যাইতে হইবে না, মা এইরুপ কথা দেওয়ায় সে দরজা খুলিল। এইরূপ গােলমালে রাত্রি কাটিল। মা নলিনীর ঘরের বারান্দায় বসিয়াছিলেন। প্রভাত হইলে তিনি তাঁহার সম্মুখের লণ্ঠনটি নিবাইলেন; বলিতে লাগিলেন, “গঙ্গা, গীতা, গায়ত্রী, ভাগবত, ভক্ত, ভগবান, শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীরামকৃষ্ণ।”
পরে নলিনীর কথায় মা আমাকে বলিলেন, “ওর পিসীর (শ্রীশ্রীমার) বাতাস লেগেছে, বাবা, তাই যেতে চায় না।”
একদিন সকালে মা আমাকে বাড়ির একজন পুরাতন চাকর সঙ্গে দিয়া পাগলীর বাপকে বুঝাইয়া লইয়া আসিতে, কিংবা গহনা ফিরাইয়া দিতে রাজী হইলে উহা আনিতে, তাহার নিকট পাঠাইলেন। আমরা গিয়া অনেক অনুনয় করায় তিনি পরদিন আসিলেন, কিন্তু গহনা আনেন নাই। মা তাঁহাকে অনেক অনুনয়-বিনয় করিলেন, পায়ে হাত দিয়া পর্যন্ত অনুরােধ করিলেন, যাহাতে তিনি গহনাগুলি ফেরত দেন এবং বলিলেন, “আপনি আমাকে এই বিপদ হইতে উদ্ধার করুন।” কিন্তু তথাপি সেই লােভী ব্রাহ্মণের মন গলিল না, তিনি নানা বাজে ওজর করিতে লাগিলেন। শিবরাত্রির পূর্ব দিবস আমি রওয়ানা হইব স্থির করিলাম। কারণ মঠে ঠাকুরের উৎসব দেখিবার বিশেষ ইচ্ছা ছিল। মাকেও তাহাই বলিয়াছিলাম। মধ্যাহ্নে ভােজনের পর মাকে প্রণাম করিতে গেলাম-রওয়ানা হইব। মা বলিলেন, “এই শশীর সঙ্গে যাবে।” শশী স্ত্রীলােক, ইহা দেখিয়া আমি একটু ভাবিতেছি। তখন মা বলিলেন, “ও যে আমাদের শশী গাে। আমার সঙ্গে থাকত দক্ষিণেশ্বরে।” শশীকে বলিলেন, “একে আমাদের ঘরে (যে ঘরে মা ও ঠাকুর কামারপুকুরে থাকিতেন) থাকতে দেবে। রামলালের মাসীকে বলে দেবে।” তখন আর কেহ ঠাকুরের বাটীতে ছিলেন না।
আমাকে বলিলেন, “কামারপুকুরে এক-আধ দিন থেকে শেষে মঠে যাবে। ঠাকুরের জন্মস্থান হয়ে যেতে হয়।” আমার কিন্তু কামারপুকুরে যাইবার কল্পনা ছিল না। আমি শুধু, মাকে দেখিতেই গিয়াছিলাম। তাঁহার জন্যই ব্যাকুল হইয়া বাড়ি হইতে ছুটিয়াছিলাম ; সঙ্গে কাপড়, ছাতাটি পর্যন্ত আনিতে ভুল হইয়াছিল। কিছু দূরে আসিয়া মনে পড়িলেও আর ফিরি নাই, পাছে কোন বিঘ্ন ঘটে। 
আমার সঙ্গে কাপড় ছিল না। মা একখানি কাপড় পরিতে দিয়াছিলেন। বলিলেন, “ওখানা সঙ্গে নিয়ে যাও।” জিজ্ঞাসা করিলেন, “সঙ্গে টাকা আছে ? গাড়ি-ভাড়া এসব লাগবে, টাকা নিয়ে যাও।” আমি বললাম, “আমার কাছে টাকা আছে, নিতে হবে না।” বলিলেন, “গিয়ে পত্র লিখবে।”
মা বলিতেছেন, “আমার ছেলেটিকে কিছুই খাওয়াতে পারলাম না, মাছ ধরাতে পারিনি।” কারণ তখন পাগলী ও নলিনীকে লইয়া বড় অশান্তি চলিতেছিল। আমি মাকে প্রণাম করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বাহির হইলাম। মা সঙ্গে সঙ্গে অনেক দূর পর্যন্ত আসিলেন; পরে যতক্ষণ দেখা গেল চাহিয়া রহিলেন। মনের আবেগে কামারপুকুর পর্যন্ত সম্পূর্ণ পথ আমার আর চোখের জল থামিল না।
কামারপুকুরে পেীঁছিলাম। শশী মাসীমাকে আমার পরিচয় দিল। মায়ের ঘরে মায়ের ছবি দেখিয়া প্রাণ আরও ব্যাকুল হইল। যেন বিশ্বহিতধ্যানে মগ্না মাতৃমূর্তি!
রাত্রে মায়ের ঘরে শুইলাম। মাসীমা লেপ বিছানাদি দিলেন। পরদিন (শিবরাত্রির দিন) কামারপুকুরের বুড়ো শিব দর্শন করিলাম। বৈকালে মাষ্টার মহাশয় ও প্রবােধবাবু কামারপুকুরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলাম, মাস্টার মহাশয়ের (তখন চিনিতাম না) ঠাকুরের বাড়ি দেখিয়াই চক্ষে জল। গাড়ি বাড়ির দরজায় থামিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আপনার কি নাম?” তিনি বলিলেন, “আমার নাম মাস্টার।” মাস্টার বলাতেই চিনিলাম। ‘কথামৃত’ পড়া ছিল। মাস্টার মহাশয় মায়ের জন্য মিঠাই আনিয়াছিলেন। উহা বাহিরবাড়ির ঘরে রাখা হইল। মাস্টার মহাশয় আমাকে বলিলেন, “দেখুন তো বাড়ির মধ্যে গঙ্গাজল আছে কিনা।” আমি গঙ্গাজল আনিয়া দিলাম। তিনি কাপড় কম্বল প্রভৃতিতে গঙ্গাজলের ছিটা দিলেন। মায়ের জন্য খাবার লইয়া যাইতেছেন, তাই। 
তাঁহারা কামারপুকুরে রঘুবীরের প্রসাদ গ্রহণ করিয়া জয়রামবাটী রওয়ানা হইলেন। আমি তাঁহাদিগকে ভুতির খালের ওপারে মানিক রাজার আমবাগান পর্যন্ত আগাইয়া দিয়া আসিলাম। তাঁহাদের সঙ্গে দুইজন ভারী। তখনও আমার ইচ্ছা, শীঘ্র মঠে যাইয়া উৎসব দেখিব। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে ললিতবাবু সামলা মাথায়, পেল্টুলুন-চাপকান-পরা কামারপুকুরে পেীঁছিলেন। আমি তখন খাইতেছিলাম। তাড়াতাড়ি খাওয়া সারিলাম। সধ্যা হইল। শশী বলিল, “তুমি ললিতবাবুর সঙ্গে যাও। ওঁদের সঙ্গেই মঠে যাবে। একা কোথা যাবে? সঙ্গে তেমন টাকা-পয়সা নেই, পথও চেন না।” আমি সম্মত হইলাম। ললিতবাবু গ্রামের দুইজন চৌকিদার ডাকাইয়া সঙ্গে লইলেন। জয়রামবাটী যাইতে মাঠে রাস্তা ভুল হইল। চৌকিদারেরা তখন রাস্তা ঠিক করিবার জন্য ‘অশ্বিকে’ ( জয়রামবাটীর চৌকিদারের নাম) বলিয়া একসঙ্গে হাঁক মারিল। জয়রামবাটীর একজন লােক কামারপুকুরের দিকে গিয়াছিল, তখনও ফিরে নাই। তাই জয়রামবাটীর লােকেরা মাঠে তাহার উপর ডাকাত পড়িয়াছে মনে করিয়া লাঠি-ঠেঙ্গা লইয়া চৌকিদার সমেত মাঠের দিকে দৌড়িয়া আসিল। তাহাদের সহিত আমরা জয়রামবাটী পেীঁছিলাম। বাড়ির মধ্যে গিয়া মাকে বলিলাম, “মা, এসেছি।” মা খুব খুশী হইয়া বলিলেন, “বেশ করেছ, এদের সঙ্গে যাবে।”
শিবচতুর্দশী উপলক্ষে ঘাটালের উকিল শ্ৰীযুক্ত রামচন্দ্র মুখােপাধ্যায় আসিয়াছেন। ভক্তদের কেহ কেহ উপবাস করিয়াছেন। পরদিন মধ্যাহ্নে তাহারা মায়ের প্রসাদ চাহিলে মা রাধুকে দিয়া একটি শালপাতায় করিয়া প্রসাদ পাঠাইলেন। সকলে খাইতেছেন দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ কি খাচ্ছেন?” তাহারা বলিলেন, “মায়ের প্রসাদ।” তখন আমিও একটু খাইলাম। মাকে গিয়া। বলিলাম, “মা, এরা সব তোমার প্রসাদ খাচ্ছেন, তা আমাকে এত দিন দাও নাই কেন?” মা বলিলেন, “বাবা, তুমি তাে চাওনি, আমি কি করে বলি ?” কি নিরহঙ্কার ভাব।
পর দিবস মধ্যাহ্নে পালকি চড়িয়া ললিতবাবু রাধুর গহনা আনিতে গেলেন। তিনি কলিকাতা পুলিশের একজন খুব বড় কর্মচারীর চিঠি লইয়া সরকারী লােক সাজিয়া গিয়াছিলেন। মা মাষ্টার মহাশয়কে সঙ্গে পাঠাইলেন, ললিতবাবুর ছােকরা বয়স, ব্রাহ্মণ গহনা না দিলে পাছে তাহার কোন অপমান করেন। কিছু বেলা থাকিতে তাহারা গহনা সমেত ছােট মামীর বাপকেই লইয়া উপস্থিত হইলেন।
রাত্রি প্রায় দুইটার সময় বাড়ির ভিতর হইতে সংবাদ আসিল, মায়ের সমস্ত রাত্রি নিদ্রা হয় নাই, মাথা ঘুরিতেছে। তৎক্ষণাৎ মাস্টার মহাশয় ও আমরা কেহ কেহ বাড়ির মধ্যে গেলাম। সকলে ঔষধ খুজিতে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময় আমি গিয়া মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, এমন কেন হল?” মা এতক্ষণ কাহাকেও কারণ বলেন নাই। জিজ্ঞাসা করায় বলিলেন, 'ওরা তাে সব চলে গেল গহনা আনতে। আমি সমস্ত দিন ভেবে ভেবে অস্থির, পাছে ব্রাহ্মণের কোনরুপ অপমান হয়। এই ভাবনায় বায়ু প্রবল হয়ে এমন হয়েছে।" আমি আর কাহাকেও কিছু না বলিয়া মাস্টার মহাশয়কে সব কথা বলিলাম। ভাবিলাম, যে, ব্রাহ্মণ এত ঝঞ্জাট ঘটাইল, কত কষ্ট দিল, তাহার জন্য ভাবনা।
তৃতীয় দিন বৈকালে আমরা রওয়ানা হইলাম। মা ললিতবাবুকে বলিয়া দিয়াছিলেন, “ছেলেটি খুব ভক্ত। একে সঙ্গে করে নিও।” আমরা একে একে মাকে প্রণাম করিলাম। মায়ের চক্ষু দিয়া জল পড়িতেছিল-কাঁদিতেছেন। সামনের ফটকের দুয়ার পর্যন্ত আসিয়া দাঁড়াইলেন। আমরা দেশড়া হইয়া বিষ্ণুপুরের রাস্তায় আসিলাম। বিষ্ণুপুরে মাস্টার মহাশয়, প্রবােধবাবু, প্রভৃতি লালবাঁধে মৃন্ময়ী দেবী দেখিতে গেলেন। আমি ও ললিতবাবু ট্রেনে উঠিয়াছি। দেখি মাস্টার মহাশয় প্রবােধবাবুকে পাঠাইয়াছেন। তিনি বলিলেন, “মাস্টার মহাশয় বলছেন, মৃন্ময়ী দেখে যাবেন।” আমরা চিন্ময়ী দেখিয়া আসিয়াছি, আর মৃন্ময়ী-দর্শনে সাধ হইল না। মঠে আসিয়া উৎসবাদি দর্শন করিয়া দেশে ফিরিলাম।
১৯০৭ সালে দুর্গাপূজার পর মাকে দর্শন করিতে কলিকাতায় আসি। একটি ভক্তের পত্রের উত্তরে মা জানাইয়াছিলেন, আমি পুজা উপলক্ষে গিরিশবাবুর বাড়িতে আসিয়া এখন বলরামবাবুর বাড়িতে আছি ইত্যাদি। আমি সকালবেলা বলরামবাবুর বাড়ি গিয়া উপস্থিত। পূজনীয় বাবুরাম মহারাজকে দেখিয়া প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা কোথায় ?” তিনি মস্তকে হাত দিয়া দেখাইলেন, মা মাথায়। যাহা হউক, আমি কিছুক্ষণ একা হলবরে বসিয়া থাকিয়া ভগবানকে (শান্তিরামবাবুর পুত্র) আমার নাম বলিয়া দিয়া মাকে সংবাদ পাঠাইলাম। মা তাহাকে বলিলেন, “নিয়ে এস।” আমি বাড়ির ভিতরে গিয়া প্রণাম করিয়া বসিলাম। মা দেশে ম্যালেরিয়ায় খুব ভুগিয়া আসিয়াছেন। চেহারা শীর্ণ ও মলিন। পুর্বে জয়রামবাটীতে যেরুপ দেখিয়াছিলাম তদপেক্ষা অনেক রুগ্ন। মা বড় মামীর দেহত্যাগের কথা বলিলেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর বলিলেন, “কাল শরৎ চক্রবর্তী এসেছিল। এখানে এসে আমাকে গান শুনালে। আহা, তার কি ভাব! কি গান। তুমি আসলে না?” আমি যে সেই বেলাই কলিকাতায় আসিয়াছি তখনও বুঝিতে পারেন নাই। একটু পরে গৌরবাবু আসিয়া বলিলেন, “গাড়ি এসেছে।” মা গঙ্গাস্নান করিতে যাইবেন। আমি বাহিরে আসিলাম। মধ্যাহ্নে ওখানেই প্রসাদ পাইলাম। আমার একটু জ্বরভাব হওয়ায় বৈকালেই বরিশালে ফিরিব স্থির করিলাম। পুজনীয় শরৎ মহারাজ তখন এই বাড়িতে থাকেন। তিনি কুইনাইনের বড়ি দিলেন। সন্ধ্যার সময় মাকে প্রণাম করিয়া বলিলাম, “মা, আমি আজকেই যাব। রাত্রে গাড়ি, শরীর ভাল নয়।” কলিকাতায় আমার থাকিবারও কোন সুবিধা ছিল না। মা বলিতে লাগিলেন, “আহা, আজই চলে যাবে ? আজ এলে, আবার আজকেই যেতে হবে?”
যাইবার সময় মাকে বলিলাম, “মা, যা ভাল হয় করো।”
ইহার পরের বারে মাকে বাগবাজারে তাহার নূতন বাটীতে দর্শন করি। পূর্বে কলিকাতায় আসিলে মা ভাড়াটিয়া বাড়িতে থাকিতেন। উহ। সকল সময় পছন্দমত মিলিত না বলিয়া মার যখন ইচ্ছা আসিতে এবং থাকিতে অসুবিধা হইত। তাই এই নূতন বাড়ি পূজনীয় শরৎ মহারাজের বহু চেষ্টায় নির্মিত হয়। আমি কলিকাতা পৌঁছিয়া সেই দিনই বৈকালে অনেক খোঁজ করিয়া এই বাড়িতে আসি এবং দেখি কাঞ্জিলাল ডাক্তার রােয়াকে বসিয়া খবরের কাগজ পড়িতেছেন। মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করায় বলিলেন, “মায়ের বসন্ত হয়েছিল, এখনও আরোগ্য স্নান হয়নি। সম্প্রতি ভাল আছেন। পনের দিন পরে দেখা হতে পারে।” আমি এ সংবাদ জানিতাম না। শেষে পুজনীয় শরৎ মহারাজের সঙ্গে দেখা হইলে তিনি বলিলেন, “কাল সকালে এসে দেখা করো এবং এখানে প্রসাদ পেও।”
পরদিন সকালে আসিয়া দেখা করিলাম। মা তাঁহার হাতের ও মুখের বসন্তের দাগগুলি দেখাইতে লাগিলেন। অসুখের কথা সব বলিয়া বলিলেন, “বসন্তের দাগগুলি এখন আর তেমন নাই।” মায়ের গায়ে বসন্তের দাগ পরে। মােটেই ছিল না।
এইবারেই পুজনীয় শরৎ মহারাজের কথায় এবং শ্রীশ্রীমায়ের আশীর্বাদে আমার মঠে থাকা হয়। মাকে বলায় বলিলেন, “আরে, এর সাধুর হাওয়া লেগেছে। আচ্ছা বেশ, মঠে থাকগে, ঠাকুরে ভক্তি হ’ক, আমি খুব আশীর্বাদ করছি।”
মঠ হইতে মাঝে মাঝে দুধ লইয়া যাইতাম এবং মাকে দেখিতে আসিতাম। এক সময় কিছুদিন না যাওয়ায়, মা একজনকে (তিনিও দুধ লইয়া যাইতেন) আমার কথা অনেকবার জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “কই, সে অনেক দিন আসে না কেন?”
ইহার পর একদিন দুধ লইয়া গিয়াছি। মাকে প্রণাম করিতে গিয়া দেখি, মা পাশের ঘরে পান সাজিতেছেন। কাছে নলিনী, সেও পান সাজিতেছিল। আমি যাওয়াতে নলিনী সরিয়া যাইতেছিল। মা তাহাকে বাধা দিয়া বলিলেন, “যেও না, যেও না, ও ছেলেমানুষ, তুমি এইখানেই বস” এবং আমাকে বললেন, “বস।” কথায় কথায় মাকুর “শ্বশুরবাড়ির কথা উঠিল। মা বলিলেন, “তাদের খুব আদর-যত্ন না করলে একটুতেই ফোঁস করে। তােমরা আমার ছেলে, তােমাদের আমি যা দিই, যা বলি, তাতে কিছু হয় না, এটি হলেও তােমরা কিছু মনে করবে না, কিন্তু তাদের ভাল জিনিস, ভাল সব না দিলে, একটু এটি হলে অমনি অসন্তুষ্ট হবে। কিছুক্ষণ পরে আমি বলিলাম, “শুদ্ধ মন আর অনুরাগ কিসে হয়?”
মা—হবে, হবে; যখন ঠাকুরের শরণাগত হয়েছ, সব হবে। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করবে।
আমি—না, সে তুমি তাঁকে বলবে? 
মা—আমি তাে বলছি, ঠাকুর, আমার এর মনটি ভাল করে দাও, শুদ্ধ করে দাও।
আমি—হাঁ, তুমি বলবে, তা হলেই আমার হবে।
ইহার কয়েক মাস পরে ঘাটালে বন্যাক্লিষ্টদের সেবাকার্য হইতে তিনদিনের ছুটি লইয়া ৺জগদ্ধাত্রীপুজার সময় জয়রামবাটী যাই। মা তাহার কিছু পূর্বে দেশে আসিয়াছেন। আমার সঙ্গে অতুল। সে এইবার শ্রীশ্রীমাকে প্রথম দর্শন করে। আমরা কামারপুকুর হইয়া এবং রঘুবীরের প্রসাদ পাইয়া গিয়াছিলাম। যাইতেই আশু মহারাজ বলিলেন, “এসেছ, বেশ করেছ ; মা কেবল বলছেন, ‘ভক্তেরা কেউ এল না; চল, প্রসাদ পেতে বস।” আমরা গিয়া মাকে প্রণাম করিলাম। মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথা থেকে এলে?” বলিলাম, 'ঘটাল থেকে।” মা বলিলেন, “বস, প্রসাদ পাও।” সকলে তখন প্রসাদ পাইতে বসিতেছেন। খাইবার সময় মা আমাদিগকে খুব করিয়া মাছ দেওয়াইলেন।
পরদিন সকাল আটটা-নয়টার সময় মায়ের উঠানে তরকারি কোটা হইতেছিল। কুসুম প্রভৃতি ভক্ত-মেয়েরা তরকারি কুটিতেছিলেন। ভানু পিসী নিকটেই দাঁড়াইয়া ছিলেন। আমি বাড়ির মধ্যে গিয়া শুনিলাম, ভানু পিসী বলিতেছেন, “কুসুম দিদি তােমরা তাে ভর্তি হয়ে আছি, তাই মুখে কথাটি নেই।” কুসুম বললেন, “কুসুম অত শত জানে না।” মা পাশ দিয়া যাইতেছিলেন, শুনিয়া বলিলেন, “ভর্তি হলে কি হবে ? ভর্তি হলে তাে উপচে পড়বে। স্বভাব বদলালে তাে হয়।”
তার পরদিন সকালেই আমরা রওয়ানা হইব। ভােরে বাড়ির মধ্যে গিয়া দেখি মা ভিজা কাপড়ে উঠানে দাঁড়াইয়া আছেন। কাপড় ছাড়িলে মাকে প্রণাম করিয়া আমি বিদায় লইলাম। বলিলাম, “আবার আসব।” অতুল স্কুলের ছেলের মতাে বলিল, “মনে রাখবেন।”
ঘাটালের সেবাকার্য শেষ করিয়া ১লা পৌষ আমি পুনরায় জয়রামবাটী রওয়ানা হইলাম। অতুল বহুদূর অবধি সঙ্গে আসিয়া পথ দেখাইয়া দিয়া গেল। সন্ধ্যার কিছু পুর্বে পেীঁছিয়া দেখি মা তাহার ঘরের বারান্দায় পা মেলিয়া হাঁটুতে (বাতের জন্য) ঔষধ দিতেছেন। আমি প্রণাম করিয়া বসিলাম এবং জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ আবার কি ওষুধ দিচ্ছ?” মা বলিলেন, “এ একজন বলেছিল এই পাতা বেটে দিতে। সমস্ত দিন খাওনি?” চেহারা দেখিয়া বুঝিয়াছিলেন। আমি ‘না’ বলায় বলিলেন, “পথে মিস্টি-টিষ্টি কিছু খেলে না কেন ? রামজীবনপুরে দোকান আছে।”
উপেন মহারাজ ঘাটাল হইতে মঠে যাইবার খরচ বাবত একটাকা দিয়াছিলেন। সেই টাকাটি মঠে ফিরিবার সময় প্রয়ােজন হইবে ভাবিয়া ব্যয় করি নাই। কিন্তু মাকে আর এই কথা বললাম না। মা বলিলেন, “বস, আমি ভাত দিই, গরম ভাত হয়েছে। আবার বলিতেছেন, “যার জগৎ সে দেখবে, তােমাদের ওসবে দরকার নেই।” (আমার খাওয়া হয় নাই দেখিয়া দুঃখ হইয়াছিল।) মা তাড়াতাড়ি ভাত, ডাল, তরকারি এবং আরও কি কি নিজেই আনিয়া দিলেন। খাওয়ার পর পান দিলেন। সন্ধ্যা হইয়া আসিল। মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা হইতেছে।
মা তােমাকে দিয়ে ঠাকুর অনেক কাজ করিয়ে নেবেন। এই তাে ঘাটালে তােমরা এসেছিলে, কত লােককে দিলে, কত লােকের উপকার হল। কাজ শেষ হলে সময়ে আপনার ধন তিনি আপনার কোলে টেনে নেবেন।
আমি—কেন ঠাকুরের দেখা পাই না ?
মা—পাবে, পাবে, সময় হলেই পাবে। ললিত (চাটুয্যে) আমার এমন কথা কখনও বলত না, “কেন ঠাকুরের দেখা পাই না ? তার ভাব—তিনি আপনার জন, যখন হােক, দেখা পাবই।
আমি—মা, দেখাে আমার যাতে ভাল হয়। যেন শুদ্ধ ভক্তি হয়। 
মা—হবে, হবে। শুধা ভক্তি হবে।
একখানি কম্বল দিয়া বলিলেন, “এই কম্বল নাও, রাত্রে গায়ে দেবার জন্য।” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম “এ কার কম্বল ?” মা বলিলেন, “আমারই, আমি ব্যবহার করি।”

৩রা পৌষ, জয়রামপুর

মা তাঁহার ঘরের বারান্দায় দ্বারের সম্মুখে বসিয়া পান সাজিতেছিলেন। বেলা প্রায় নয়টা। আমাকে মুড়ি খাইতে দিয়াছেন। খাইবার পর কথা হইতেছে।
আমি—মা, এবার আমাকে বেশী দিন রেখাে না।
মা—থাকতে ইচ্ছা না হয় আমার সঙ্গে যাবে। সময় হলে (দেহান্তে) সকলে (সব ভক্তরা) যাবে।
আমি – ঠিক মনে যেন থাকে। 
মা—সে তাে বললুম, তােমাকে এসে সঙ্গে করে নিয়ে যাব।
আমি—এবার আমাকে নিয়ে যাও, পরবারে ঠাকুর যখন আসবেন তখন সঙ্গে আসব।
মা হাসিয়া বলিলেন, “আমি তাে আর আসছি না।”
আমি—তুমি আস আর না আস, আমি আসব, আমার আসতে ইচ্ছা আছে।
মা—তুমি তখন হয়তাে আর আসতে চাইবে না। এ জগতে কি আর আছে ? কোন জিনিসটা ভাল, বল না? তাই ঠাকুর সজনে খাড়া (ডাঁটা), পলতা শাক, এই সব ছাড়া আর কিছু খেলেন না। মুখে সন্দেশ দিতে যেতুম, বলতেন “ওতে কি আর আছে ? সন্দেশও যা, মাটিও তা।”
আমি—তা তুমি ঠাকুরের কথা কেন বলছ? তার কি তুলনা?
মা—তাই তাে, অমন আর একটি কি আর আছে? থাকলে তাে হত।
এই সময় বরদা মামা মাকে চিঠি পড়িয়া শুনাইতে আসিলেন। এই চিঠির মধ্যে আমার সেজ ভাই-এর এক চিঠি ছিল। তাহাতে আমাকে বাড়ি পাঠাইতে মাকে অনুরােধ করিয়াছেন। চিঠিখানি সংক্ষিপ্ত হইলেও ভাষা ও ভাব বেশ ছিল। শুনিয়া মা বলিলেন, “আহা, কেমন লিখেছে।” আমাকে বলিতেছেন, “কেন, সংসারে থাকবে, ঘরকন্না করবে, টাকা করবে।” আমাকে পরীক্ষা করিতেছিলেন। আমি বলিলাম, “মা, ওগুলাে আর বলো না।” 
মা—তা এত লোেক সংসার করছে, তুমি নয় না করলে।
আমি তখন কাঁদিতেছি। দেখিয়াই সকরুণ হইয়া বলিতে লাগিলেন, “কেঁদো না, কেঁদো না, বাছা, তােমরাই ভগবান। ভগবানের জন্য কে সব ত্যাগ করতে পেরেছে। ঈশ্বরের শরণাগত হলে বিধির বিধি খণ্ডন হয়ে যায়। তাঁর নিজের কলম নিজ হাতে কাটতে হয়। ভগবান লাভ হলে কি আর হয়? দুটো কি শিং বেরােয় ? না, সদসৎ-বিচার আসে, জ্ঞানচৈতন্য হয়, জম্মমত্যু তরে যায়। ভাবে লাভ-এ ছাড়া কে ভগবান দেখেছে, কার সঙ্গে ভগবান কথা কয়েছেন? ভাবে দর্শন, ভাবে কথাবার্তা, সব ভাবে হয়।”
আমি—না, মা, এছাড়াও কিছু আছে—প্রত্যক্ষ লাভ। 
মা—সে এক নরেন পেয়েছিল ; তাঁর ( ঠাকুরের) হাতে মুক্তির চাবি ছিল।
“আর কি, জপ ধ্যান করা, আর ঠাকুরকে ডাকা, এই তাে?” বলিয়াই আবার সহাস্যে বলিতেছেন, “আর ঠাকুর ঠাকুরেই বা আছে কি? তিনি তাে চিরদিনই আপন জন।”
আমি—মা, দেখাে যেন আমার ঠিক ঠিক হয়। অমনটি, 'আপনার’। 
মা—তা কি আর বারবার বলতে আছে ? ( দৃঢ়তার সহিত) হবে হবে।

৪ঠা পৌষ, জয়রামবাটী 

রাত্রে মায়ের ঘরে কথা হইতেছে। মা তক্তাপােশে শুইয়া আছেন। বেদান্তের কথা উঠিয়াছে। আমি বলিলাম, “নামরুপ ছাড়া আর কিছুই নেই। জড় পদার্থ বলে কিছুই প্রমাণ করা যায় না। তাই শেষে বলে, ঈশ্বর-টীশ্বর কিছুই নেই।” (আমার মনের ভাব-ঠাকুর, মা, এসবও মিথ্যা।)
মা শুনিয়াই আমার কথার ভাব বুঝিতে পারিয়াছেন। অমনি বলিতেছেন, “নরেন বলেছিল, ‘মা, যে জ্ঞানে গুরু পাদপদ্ম উড়িয়ে দেয় সে তাে অজ্ঞান। গুরু পাদপদ্ম উড়িয়ে দিলে জ্ঞান দাঁড়ায় কোথায় ? তুমি জ্ঞানচচ্চড়ি ছেড়ে দাও। তাঁকে কে জানতে পেরেছে? শুক, ব্যাস, শিব হন্দ ডেও পিঁপড়ে।”
আমি—না, জানবার ইচ্ছা আছে, কিছু কিছু বুঝতেও পারি। কি করে বিচার বন্ধ হবে ?
মা—ঠিক ঠিক পূর্ণজ্ঞান না হলে বিচার যায় না। 
আবার সৃষ্টির কথা উঠিল।
আমি–আচ্ছা, এই যে সব অসংখ্য প্রাণী—ছােট, বড়, সব কি এক সময়ে সৃষ্টি হয়েছে না কি?
মা—চিত্রকর যেমন তুলি দিয়ে চোখটি, মুখটি, নাকটি—এমনি একটু একটু করে পুতুলটি তয়ের করে, ভগবান কি অমনি একটি একটি করে সৃষ্টি করেছেন?
না, তাঁর একটা শক্তি আছে। তাঁর হাতে জগতের সব হচ্ছে, ‘না’তে লােপ পাচ্ছে। যা হয়েছে সব এককালে হয়েছে। একটি একটি করে হয়নি।
মায়ের ঘরে ডেও পিঁপড়ে খাবারের গন্ধে আশেপাশে ঘুরিতেছিল। হঠাৎ তাহার একটি চক্ষে পড়ায় অঙ্গুলি-নির্দেশ করিয়া বলিলাম, “তবে এই পিঁপড়েটা এত পাছে পড়ল কেন? ওর তাে মানুষ হতেই অনেক দেরি।” মা বলিলেন, “হাঁ, অনেক দেরি।” পরে এই সৃষ্টি-প্রসঙ্গেই বলিলেন, “কম্পান্তে সব যেন ঘুম থেকে ওঠে।”
ইহার পরে আমি জপতপের কথা জিজ্ঞাসা করিলাম। মা বলিলেন, “জপতপের দ্বারা কর্মপাশ কেটে যায়। কিন্তু ভগবানকে প্রেমভক্তি ছাড়া পাওয়া যায় না। জপ-টপ কি জান? ওর দ্বারা ইন্দ্রিয়-টিন্দ্রিয়গুলাের প্রভাব কেটে যায়।”
ললিতবাবুর (চাটুজ্যে) কথা উঠিল। কয়েক মাস যাবৎ তাঁহার খুব ব্যারাম সঙ্কটাপন্ন অবস্থা। মা তাঁহাকে খুব ভালবাসেন এবং তাঁহার জন্য বিশেষ চিন্তিত আছেন। বলিতেছেন, “ললিত আমাকে কত টাকা দিত। তার গাড়িতে করে বেড়াতে নিয়ে যেত। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের সেবায় ও (কামারপুকুরে) রঘুবীরের সেবায় অনেক টাকা দেয়। আমার ললিতের লাখ টাকার প্রাণ। অনেকে টাকা থেকেও কৃপণ।” পরে বলিলেন, ‘যার আছে সে মাপো, যার নেই সে জপাে।”(যার অর্থাদি আছে সে ভক্ত-ভগবানের সেবা করুক। আর যার নেই সে ভগবানের নামজপ করুক। এই উভয় উপায়েই ভগবানের কৃপা লাভ করা যায়।)
আবার কথায় কথায় প্রেমভক্তির কথা উঠিল। 
মা— বৃন্দাবনে রাখালরা কি কৃষ্ণকে জপধ্যান করে পেয়েছিল? না, তারা ‘আয় রে, খা রে, নে রে’-এই করে কৃষ্ণকে পেয়েছিল।
আমি— তাঁর ভালবাসা না পেলে তাঁর জন্য প্রাণ কেন ব্যাকুল হবে? 
মা—তাই তাে, সেটি তাঁর কৃপা।

১৫ই পৌষ, জয়রামবাটী 

সকালে আটটা-নয়টার সময় আমি গিয়া দেখি মা ঘরে বসিয়া পান সাজিতেছেন। আমি কাছে বসিয়া কথা কহিতে লাগিলাম।
আমি—মা, এত দেখি শুনি, তবু আপনার মা বলে জানতে পারলাম না।
মা—বাবা, আপনার না হলে এত আসবে কেন? যে যার সে তার, যুগে যুগে অবতার। আপন মা, সময়ে চিনবে।
কিছুক্ষণ পরে আমি আমার মা-বাপ ও ভাইদের কথায় বলিলাম, “বাপ-মা মানুষ করেছেন, এখন (দেহান্তে) তারা কোথায় কি ভাবে আছেন জানি না। মা, ভাইদের যাতে সুমতি হয়, তাই আশীর্বাদ কর।” মা বলিলেন, “সবাই কি তাঁকে চায়? এই বাড়িতেই এত লােক আছে, সবাই কি (আমাকে) চায়?” একটু পরে আমাকে বলিতেছেন, “বিয়ে করাে না, সংসার করাে না। বিয়ে না করলে আর কি? যেখানে থাক সেইখানেই স্বাধীন। বিয়ে করাই হচ্ছে মহাপাপ।”
আমি—মা, আমার ভয় হয়। 
মা—না, কোন ভয় নেই, ঠাকুরের ইচ্ছা।
আমি—মন নিয়ে কথা। মন ভাল থাকলে যেখানেই থাকি না কেন। মা, তুমি দেখাে, আমার মন যেন ভাল থাকে। 
মা—তাই হবে।

১৮ই পৌষ 

আজ মায়ের জন্মতিথি। প্রবােধবাবু কয়েক দিন হইল আসিয়াছেন। গতকল্য তিনি মায়ের জন্মতিথি উপলক্ষে ঠাকুরকে ভােগ দিবার জন্য মামাদের পাঁচটি টাকা দিয়াছেন। মা আমাকে বলিলেন, “তােমরা তাে আর বিশেষ কিছু করছ না। আমি একখানা নুতন কাপড় পরব, ঠাকুরকে একটু মিষ্টান্নাদি করে ভােগ দেওয়া হবে, আমি প্রসাদ পাব। এই আর কি?” 
পূজার পর মা তাঁহার ঘরে চৌকির উপর দক্ষিণ পাশে দুয়ারের নিকট পা ঝুলাইয়া বসিয়াছেন। একখানি নূতন কাপড় পরিয়াছেন। প্রবােধবাবু গিয়া মায়ের পায়ে ফুল দিলেন। আমি দুয়ােরের পাশে বারান্দায় দাঁড়াইয়া আছি। মা আমাকে বলিলেন, “কই, তুমি দেবে না ? নাও, এই ফুল নাও।” আমি ফুল লইয়া পায়ে দিলাম। মধ্যাহ্নে খুব প্রসাদ পাওয়া গেল। প্রবােধবাবুর অফিস, তাই তিনি কলিকাতা রওনা হইলেন। আমার আমাশয় হওয়াতে যাওয়া হইল না।

২১শে পৌষ 

কথাপ্রসঙ্গে মা বলিলেন-“ভগবানকে কে বাধঁতে পেরেছে বল না। তিনি নিজে ধরা দিয়েছিলেন বলে তাে যশােদা তাঁকে বাঁধতে পেরেছিল, গােপগােপীরা তাঁকে পেয়েছিল।
“বাসনা থাকতে জীবের যাতায়াত ফুরায় না, বাসনাতেই দেহ হতে দেহান্তর হয়। একটু সন্দেশ খাবার বাসনা থাকলেও পুনর্জন্ম হয়। তাই তাে মঠে এত জিনিস আসে। বাসনাটি সূক্ষ্ম বীজ—যেমন বিন্দুপরিমাণ বটবীজ হতে কালে প্রকাণ্ড বৃক্ষ হয়, তেমনই। বাসনা থাকলে পুনর্জন্ম হবেই, যেন এক খােল থেকে নিয়ে আর এক খােলে ঢুকিয়ে দিলে। একেবারে বাসনাশূন্য হয় দু-একটি। তবে বাসনায় দেহান্তর হলেও পূর্বজন্মের সুকৃতি থাকলে চৈতন্য একেবারে হারায় না।
“বৃন্দাবনের গােবিন্দের এক কামদার (পূজারী) ঠাকুরের ভোগ নিয়ে তার উপপত্নীকে খাওয়াত। এই পাপে দেহান্তে তার প্রেতযােনি হয়। কিন্তু সে ঠাকুরের সেবা করেছিল, এই সুকৃতির ফলে একদিন সে সশরীরে সকলকে দেখা দেয়। সুকৃতিটুকু ছিল বলে দেখা দিতে পারল এবং সবাইকে তার অধােগতির কারণ বললে। তাদের বললে, তােমরা আমার উদ্ধারের জন্য ঠাকুরের মহােৎসব-কীৰ্তনাদি কর। তাহলেই আমার উদ্ধার হবে।”
আমি—মহােৎসব-কীর্তনে কি উদ্ধার হয় ? 
মা—হাঁ, বৈষ্ণবদের ওতেই হয়। তাদের শ্রাদ্ধাদি করে না।
“যখন পুরীতে জগন্নাথদর্শন করি, এত লােকে জগন্নাথদর্শন করছে দেখে আনন্দে কাঁদলুম, ভাবলুম-আহা, বেশ, এত লােক মুক্ত হবে। শেষে দেখি যে না, যার বাসনাশূন্য সেই এক-আধটিই মুক্ত হবে। যােগেনকে বলায় সেও তাই বললে, “না মা, যারা বাসনাশূন্য তারাই মুক্ত হবে।”
একদিন সকালবেলা মায়ের বারান্দায় মুড়ি খাইতে খাইতে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, মঠে থাকলে কি সন্ন্যাস নিতে হবে ?মা বললেন, “তা হবে।”
আমি—মা, বড় অভিমান আসে সন্ন্যাসে।
মা—হাঁ, বড় অভিমান—আমায় প্রণাম করলে না, মান্য করলে না, হেন করলে না। তার চেয়ে বরং(নিজের সাদা কাপড় লক্ষ্য করিয়া) এই আছি বেশ (অর্থাৎ অন্তরে ত্যাগ) । বন্দাবনে গৌর শিরােমণি বুড়ো বয়সে সন্ন্যাস নিলেন, যখন ইন্দ্রিয়-টিন্দ্রিয়গুলাের প্রভাব কমে গেছে। রুপের অভিমান, গুণের অভিমান, বিদ্যার অভিমান, সাধুর অভিমান কি যায়, বাছা।
আমাকে ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হইতে বলিতেছেন, “বাড়ি গিয়ে ওদের (ভাইদের) একবার বলে আসবে চাকরি-বাকরি আমি করতে পারব না। মা তো নেই যে দাসত্ব করব। আমি ওসব পারব না। তােমরা ঘরকন্না কর, বেশ থাক।”
সাধুজীবনের খাওয়া-দাওয়া কঠোরতার কথা উঠিল। মা বলিলেন, “মঠে ছেলেরা সব কষ্ট করছে-না খাওয়া, না দাওয়া, না কিছু। ওসব আমারভাল লাগে না। যােগীনের (যােগানন্দ স্বামী) কঠোর করে করে শেষটা অত ভুগে ভুগে দেহ গেল।”

১.যােগেন-মা বলেন, “একদিন জগন্নাথের মন্দিরের ভিতর লক্ষীর মন্দিরে মা ও আমি পাশাপাশি বসে ধ্যান করছি। আমি মনে মনে ভাবছি, আহা এত সব লােক রথে জগন্নাথ দেখছে, সব তাে মুক্ত হবে। তখন শুনি কে যেন বলছে, “না, যারা বাসনাশূন্য, তারাই মুক্ত হবে। আমি মাকে যখন এই কথা বললুম, মা বললেন, “ও যােগেন, আমার মনেও তখন এই চিন্তা উঠেছিল, আর আমিও এই উত্তর শুনতে পেলুম।”
২.একজন শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব সাধু। ইনি কালাবাবুর কুঞ্জে শ্রীশ্রীমাকে দর্শন করেন।

রাত্রে মায়ের সঙ্গে কথা হইতেছে। আমি বলিলাম, “মা, ভগবানের কৃপা হলে যখন তখন হয়, সময়ের অপেক্ষা রাখে না।” উত্তরে মা বলিলেন, “তা বটে। কিন্তু জ্যৈষ্ঠ মাসে যে আমটি হয় তা যেমন মিষ্টি, অন্য মাসে কি তেমনটি হয়? মানুষ অকালে ফলাবার চেষ্টা করছে। দেখ না এখন আশ্বিন মাসে কাঁঠাল হয়, আম হয়। কিন্তু কালের মতাে কি (মিষ্টি) হয় ? ঈশ্বরলাভের পথেও অমনি। এজন্মে হয়তাে জপতপ করলে, পরজন্মে হয়তাে ভাব একটু ঘনীভূত হ’ল, তার পর জম্মে হয়তাে আর একটু হ’ল—এই ভাবে আর কি।”
হঠাৎ কিছু করিয়া দেওয়া সম্বন্ধে বলিলেন, “ভগবান বালকস্বভাব। কেউ চায় না, তাকে দেবে ; আবার কেউ চায়, তাকে দেবে না—সব খেয়াল।"
আর একদিন সকালবেলা মা বারান্দায় পান সাজিতেছেন। আমি বলিলাম, “কালে তোমার জন্য লােকে কত সাধন করবে।'
মা হাসিয়া বলিলেন, “বল কি ! সকলে বলবে আমার মায়ের এমনি বাত ছিল, এমনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটত।”
আমি—তা তুমি বলগে।
মা—উটি ভাল। তাই তাে ঠাকুর বলতেন-তখন কাশীপুরে ব্যারাম-“যারা লাভের আশায় এসেছিল, তারা সব চলে গেল, বললে, “উনি অবতার, ওর আবার ব্যারাম কি ? ও সব মায়া। কিন্তু যারা আমার আপনার জন তাদের আমার এ কষ্ট দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে। আমার জ্বর হয়েছে, বিকারে প্রলাপ বকছি। কুসুম গিয়ে বললে, “গােলাপ দিদি, দেখ এসে, মা প্রলাপ বকছেন।” গােলাপ বললে, “মা ওরকম বলে থাকেন।” ‘না, দেখ এসে, সত্য সত্যই।” “না, ও কিছু না।” শেষে কুসুম গিয়ে আশুকে ডাকলে। সকলে এসে দেখে সত্যই বিকার।
মন্ত্র লইবার পূর্বদিন গিয়া মাকে বলিলাম, “মা, আমি মন্ত্র নেব।” মা বলিলেন, “তুমি মন্ত্র নাওনি এখনও?” আমি ‘না’ বলায় বলিলেন, “আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি মন্ত্র নিয়েছ।” দীক্ষার পর বলিলেন, “ভগবানের মন্ত্রজপ করে দেহ-মন শুদ্ধ হােক।”
আমি—আঙুলে মন্ত্রজপ করবার কি দরকার? এমনি জপ করলেই তাে হয়।
মা—ভগবান আঙুল দিয়েছেন, মন্তজপ করে এর সার্থকতা করবে।

২৫-৯-১০, উদ্বোধন, ঠাকুরঘর 

সকালবেলা মায়ের সহিত কথা হইতেছে।
আমি—মা, যদি ঈশ্বর বলে কেউ থাকেন তবে জগতে এত দুঃখকষ্ট কেন ? তিনি কি দেখছেন না? তাঁর কি এসব দুর করবার শক্তি নেই ?
মা—সৃষ্টিই সুখদুঃখময়। দুঃখ না থাকলে সুখ কি বােঝা যায় ? আর সকলের সুখ হওয়া সম্ভব কি করে? সীতা বলেছিলেন রামকে, তুমি সকলের দুঃখকষ্ট দূর করে দাও না কেন ? রাজ্যে যত প্রজা লােজন আছে সকলকে সুখে রাখ। তুমি তাে ইচ্ছা করলেই পার।' রাম বললেন, “সকলের সুখ একসঙ্গে কি হয়?
‘না, তুমি ইচ্ছা করলেই হয়, যার যা অভাব হয় রাজভাণ্ডার হতে দিয়ে দাও।'
‘আচ্ছা, তােমার কথামতই হবে।'
“তখন লক্ষণকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘যাও, রাজ্যমধ্যে সকলকে জানাও, যার যা অভাব থাকে চাইলেই রাজকোষ হতে পাবে।’ সকলে সংবাদ পেয়ে এসে দুঃখ জানালে। রাজকোষ অবারিত। বেশ সকলে সুখে দিন কাটাতে লাগল। রামের এমনি মায়া যে শীঘ্র যে দালানে রাম-সীতা থাকতেন তার ছাদ ফেটে জল পড়তে আরম্ভ হল। মেরামতির চেষ্টায় লােকজন ডাকতে পাঠালেন। কোথায় লােকজন? কুলীমজুর কি আর আছে ? রাজ্যমধ্যে কুলী-মজুরের অভাবে প্রজাদের ঘরদরজা, কাজকর্ম সব নষ্ট হতে চলেছে—প্রজারা জানালে। তখন নিরুপায় হয়ে সীতা রামকে বললেন, ‘আর ভিজে ভিজে কষ্ট সহ্য হয় না । যেমনটি ছিল তুমি তেমনটি করে দাও, তাহলে কুলী-মজুর সব মিলবে। সকলের একসঙ্গে সুখ হওয়া সম্ভব নয়।' রাম বললেন, “তথাস্তু। তখন দেখতে দেখতে সব পূর্বের মতাে হল। কুলী-মজুর মিস্ত্রী সব মিলল। সীতা বললেন, ‘ঠাকুর, এ সৃষ্টি তোমারই অদ্ভুত খেলা। 
“চিরদিন কেউ সুখী থাকবে না, সব জম্ম কারও দুঃখে যাবে না। যেমন কর্ম তেমন ফল, তেমন যােগাযােগ হয়।”
আমি—সবই কর্ম থেকে হয় ? 
মা—কর্ম না তাে কি ? দেখছ না, এই যে মেথর বিষ্ঠার ভার বইছে।
আমি — এ ভালমন্দ কর্মপ্রবন্তুি প্রথম কোথা থেকে আসে? এ জন্মে বলবে তার পূর্বজন্ম থেকে, সে জন্মে আবার তার পূর্বজন্ম থেকে ; আদি কোথা?
মা—ঈশ্বরেচ্ছা ছাড়া কিছুই হবার সাধ্য নেই, তৃণটিও নড়ে না। যখন জীবের সুসময় আসে, তখন ধ্যানচিন্তা আসে; কুসময়ে কুপ্রবৃত্তি কুযােগাযােগ হয়। তাঁর যেমন ইচ্ছা তেমনি কালে সব আসে, তিনিই তার ভেতর দিয়ে কার্য করেন। নরেনের কি সাধ্য ? তিনি তার ভেতর দিয়ে সব করলেন বলে তাে নরেন সব করতে পেরেছিল ?
“ঠাকুর যেটি করবেন তাঁর তা ঠিক করা আছে। তবে ঠিক ঠিক যদি কেউ ওঁর উপর ভার দেয়, উনি তা ঠিক করে দেবেন।”
“সব সয়ে যেতে হয়। কারণ কর্মানুসারে সব যােগাযােগ হয়। আবার কর্মের দ্বারা কর্মের খণ্ডন হয়।” 
আমি—কর্মের দ্বারা কর্মের খণ্ডন হয়।
মা—তা হবে না? তুমি একটি সৎকার্য করলে, তাতে তােমার পাপটুকু কেটে গেল। ধ্যান, জপ ঈশ্বরচিন্তায় পাপ কাটে।
মির্জাপুর স্ট্রীটে একটি ছেলের উপর নাকি মৃতাত্মাদের আবেশ হয়। ‘উদ্বােধনের’ কেহ কেহ পূর্বদিন উহা দেখিতে গিয়াছিলেন। সেই কথা উঠিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আচ্ছা, প্রেতদেহে কতদিন থাকতে হয় ?”
মা—উন্নত পুরুষ ছাড়া আর সকলকে একবছর প্রেতযযানিতে থাকতে হয়। তারপর গয়ায় পিণ্ডদান, মহােৎসব—তাদের উদ্দেশে এ সব করলে প্রেতযোনি মুক্ত হয়ে ভগবানের কাছে যায়। অথবা অন্যান্য লােকে গিয়ে সুখটুক ভােগ করে। আবার কালে বাসনা অনুসারে জন্ম হয়। কারও বা সেখান থেকেই মুক্তি হয়। তবে ইহজম্মের কিছু সুকৃতি থাকলে প্রেতদেহেও চৈতন্য একেবারে হারায় না।
মা বৃন্দাবনের সেই বৈষ্ণব ভুতের ( গােবিন্দজীর পূজারীর) কথা বলিলেন।
আমি—গয়ায় পিণ্ড দিলেই কি ভগবানের কাছে যায় ?
মা—হাঁ যায়। 
আমি—তবে আর ভজন-সাধনের কি দরকার?
মা—তাঁর কাছ থেকে যে আবার বাসনা কর্মানুসারে পৃথিবীতে এসে জন্মায়। এখান থেকে কেউ বা মুক্তিলাভ করে, কেউ বা নীচ যােনি সব ভােগ করে। চক্রের মতাে সৃষ্টি চলছে। যে জন্মে মন বাসনাশূন্য হয়, সেইটি শেষ জন্ম।
আমি—এই যে ভগবানের কাছে যায় বললে, কেউ কি এসে নিয়ে যায়, না আপনিই যায় ?
মা—না, আপনিই যায়, সুক্ষ্ম শরীর হাওয়ার শরীর কি না? 
আমি—যাদের গয়ায় পিণ্ডাদি না হয়, তাদের কি গতি হয়? 
মা—যতদিন না বংশে কোন ভাগ্যবান জন্মে গয়ায় পিণ্ড দেয়, কি ঔর্ধ্বদেহিক ক্রিয়াদি করে, ততকাল প্রেতদেহে থাকতে হয়।
আমি—এই যে ভুত প্রেত, এসব কি শিবের চেলা ভুত ? না যারা মরে গেছে তারা। মা—না, মৃত যারা তারা ; শিবের চেলা ভুত, সে সব আছে আলাদা।
‘ভারী সাবধানে চলতে হয়। প্রত্যেক কর্মের ফল ফলে। কাউকে কষ্ট দেওয়া, কটু বলা ভাল নয়।”
আমি—মা, নিমগাছেও আম ফলে না, আর আম গাছেও নিম ফলে না। যার যেমনটি হবার, তার তেমনটি হয়।

১.এই প্রসঙ্গে আমার একটি ঘটনা মনে পড়িতেছে। ১৯৯২ সালে মা যখন কাশীতে যান, ফিরিবার সময় আমি গয়ায় পিতৃপুরুষদের পিণ্ড দিবার জন্য তাহার দুই-এক দিন পূর্বে রওনা হই। যাত্রা করিবার সময় মাকে বলিয়াছিলাম, “দেখাে যেন তাদের সদগতি হয়।” আমি যেদিন গয়ায় পিণ্ড দিই, সেদিন রাত্রে ভূদেব (মায়ের ভাইপাে, সঙ্গে কাশী গিয়াছিল) স্বপ্ন দেখে যে, মা পঞ্চপাএ লইয়া জপ করিতে বসিয়াছেন, আর অনেক লােক আসিয়া বলিতেছে, “আমাকে উদ্ধার করুন, আমাকে উদ্ধার করুন।" মা তাহাদের গায়ে শান্তি জল (পঞ্চপাত্র হইতে) ছিটাইয়া দিতেছেন আর বলিতেছেন, “যা উদ্ধার হয়ে যা।” তাহারা সকলে আনন্দে চলিয়া যাইতেছে। শেষে একটা লােক আসিয়াছে। মা বলিলেন, “আমি আর পারব না।" অনেক মিনতি করাতে তাহাকেও কৃপা করিলেন। পরদিন ভূদেব মার কাছে এই স্বপ্নবৃত্তান্ত বলিয়াছিল। মা শুনিয়া বলিয়াছিলেন,”এই রা—গয়ায় পিন্ড দিতে গেছে, তাই এত লােক উদ্ধার হয়েছে।” বাস্তবিকই, গয়ায় পিতুপুরুষদের পিণ্ড দিবার পর মনের আবেগে যাঁহার নাম মনে পড়িয়াছে, তাঁহারই নামে পিণ্ড দিয়াছিলাম সকলেই উদ্ধায় হউক।
মা—ঠিক বলেছ, বাবা, কালে ঈশ্বর-টীশ্বর কিছু থাকে না। জ্ঞান হলে মানুষ দেখে ঠাকুর-ঠুকুর সবই মায়া - কালে আসছে, যাচ্ছে।

উদ্বােধন ঠাকুর ঘর 

সকালবেলা মায়ের সঙ্গে কথা হইতেছে।
মা—যখন ঠাকুর চলে গেলেন, একা একা বসে ভাবতুম—তখন কামারপুকুরে রয়েছি—ছেলে নেই, কিছ; নেই, কি হবে? একদিন ঠাকুর দেখা দিয়ে বললেন, ‘ভাবছ কেন? তুমি একটি ছেলে চাচ্ছ—আমি তােমাকে এই সব রত্ন ছেলে দিয়ে গেলুম। কালে কত লােকে তােমাকে ‘মা, মা' বলে ডাকবে।
‘বৃন্দাবন যখন যাই, পথে রেলে যেতে যেতে দেখি কি ঠাকুর জানলা ( রেলগাড়ির) দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলছেন, ‘কবচটি যে সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে, দেখাে যেন না হারায়।”
“তাঁর ইষ্টকবচটি আমার হাতে ছিল। আমি পুজা করতুম। তারপর উটি মঠে দিলুম। এখন মঠে পূজা হয়।” 
আমি— ও কবচটি এবার ঠাকুরের তিথিপূজার দিন হারিয়েছিল। ফুল বেলপাতার সঙ্গে গঙ্গায় ফেলে দেয়। কারও খেয়াল ছিল না। ভাটায় গঙ্গার জল কমে গেলে রামবাবুর ছেলে ঋষি ওখানে খেলতে খেলতে গিয়ে ওটি পেয়ে কুড়িয়ে নিয়ে আসে।
মা—তাঁর ইষ্টকবচ, সাবধানে রাখতে হয়। 
বেলুড় মঠের কথা উঠিল। 
মা—আমি কিন্তু বরাবরই দেখতুম, ঠাকুর যেন গঙ্গার ওপার ঐ জায়গাটিতে —যেখানে এখন মঠ, কলাবাগান-টাগান—তার মধ্যে ঘর, সেখানে বাস করছেন। (তখন মঠ হয় নাই।) মঠের নূতন জমি কেনা হলে পর নরেন একদিন আমাকে নিয়ে জমির চতুঃসীমা ঘুরে ঘুরে দেখালে, বললে, “মা, তুমি আপনার জায়গায় আপন মনে হাঁপ ছেড়ে বেড়াও।'
“বােধগয়ায় মঠ, তাদের অত সব জিনিসপত্র, কোন অর্থের অভাব নেই, কষ্ট নেই—দেখে কাঁদতুম, আর ঠাকুরকে বলতুম, ঠাকুর, আমার ছেলেরা থাকতে পায় না, খেতে পায় না, দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের যদি অমন একটি থাকবার জায়গা হত। তা ঠাকুরের ইচ্ছায় মঠটি হ’ল।
“একদিন নরেন এসে বললে, “মা, এই ১০৮ বিল্বপত্র ঠাকুরকে আহুতি দিয়ে এলুম, যাতে মঠের জমি হয়। তা কর্ম কখনও বিফলে যাবে না। ও হবেই একদিন'।”
রাত্রে খাইবার পর উপরে পান আনিতে গিয়া শুনি, মা বলিতেছেন, “নরেন বলছিল, “মা, আমার আজকাল সব উড়ে যাচ্ছে। সব দেখছি উড়ে যায়। আমি বললুম (হাসিয়া বলিতেছেন), “দেখাে দেখাে, আমাকে কিন্তু উড়িয়ে দিও না।' নরেন বললে, “মা, তােমাকে উড়িয়ে দিলে থাকি কোথায় ? যে জ্ঞানে গুরুপাদপদ্ম উড়িয়ে দেয় সে তাে অজ্ঞান। গুরুপাদপদ্ম উড়িয়ে দিলে দাঁড়ায় কোথায়?”
ইহা বলিয়াই আবার বলিতেছেন, “জ্ঞান হলে ঈশ্বর-টীশ্বর সব উড়ে যায়। ‘মা, মা শেষে দেখে, মা আমার জগৎ জুড়ে! সব এক হয়ে দাঁড়ায়। এই তাে সােজা কথাটা !”
উদ্বোধন, ঠাকুরঘর 

মা পুজার জন্য ফুল বেলপাতা বাছিতেছিলেন। তাঁহার একখানি ফটো নুতন ছাপা হইয়া আসিয়াছে, তাহাই মাকে দেখাইতেছিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা এ ফটো কি ঠিক?”
মা—হাঁ, এটি ঠিক। তবে পূর্বে আরও মােটা ছিলুম। যখন ছবি উঠায় তখন যােগীনের (যােগানন্দ স্বামীর ) খুব অসুখ। তার জন্য ভেবে ভেবে শরীর শুকিয়ে গিছল। মন ভাল নয়, যােগীনের অসুখ বাড়ছে তাে, কাঁদছি, আবার যােগীন ভাল থাকছে তাে ভাল থাকছি। সারা মেম ( Sara Buil) এসে এইটি উঠালে। আমি কিছুতেই দেব না। সে অনেক করে বললে, “মা, আমি আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে পুজা করব।' তাই শেষে এই ছবি উঠায়।
আমি—মা, তােমার কাছে এই যে ঠাকুরের ফটো রয়েছে এখানি বেশ। দেখলে বুঝা যায়। আচ্ছা, এখনি কি ঠিক ? 
মা—এটি খুব ঠিক ঠিক। ওখানি এক ব্রাহ্মণের ছিল। প্রথম কখানি যেমন উঠান হয়। একখানি সে ব্রাহ্মণটি নিয়েছিল। আগে এখানি খুব কাল (deep) ছিল—ঠিক যেন কালীমূর্তিটি, তাই ঐ ব্রাহ্মণকে দিয়েছিল। সে ব্রাহ্মণ দক্ষিণেশ্বর থেকে কোথায় যাবার সময় ওখানি আমার কাছে রেখে যায়। আমি এখানি অন্যান্য ঠাকুর-দেবতার ছবির সঙ্গে রেখে দিয়েছিলাম—পূজা করতুম। নহবতের নিচের ঘরে থাকতুম। একদিন ঠাকুর গিয়েছেন। ছবি দেখে বলছেন, ওগাে, তােমাদের আবার এসব কি ? আমরা (বােধ হয় মা ও লক্ষী দিদি) ও পাশে সিঁড়ির নীচে রাঁধছি। তারপর দেখলুম, বিল্বপত্র আর কি কি যা পুজার জন্য ছিল, একবার না দুবার ঐ ছবিতে দিলেন—পূজা করলেন। সেই ছবিই এই। সে ব্রাহ্মণ আর ফিরে এল না। এখানি আমারই রইল।
আমি—মা, ঠাকুরের সমাধি-অবস্থায় ঠাকুরের মুখে কখন স্মান দেখেছ কি ? | মা—কই, আমি তাে কখন দেখিনি। সমাধির অবস্থায় মুখে হাসিই দেখেছি।
আমি—ভাবসমাধিতে মুখে হাসি থাকতে পারে। কিন্তু বসা ছবির সবধে ঠাকুরও বলেছেন, ‘এ অতি উচ্চ অবস্থার ছবি’। এতেও কি হাসি থাকে ?
মা— আমি তাে সব সমাধির অবস্থায়ই হাসিমুখ দেখেছি। 
আমি—রং কি রকম ছিল ?
মা—তাঁর গায়ের রং যেন হরিতালের মতাে ছিল—সােনার ইষ্ট-কবচের সঙ্গে গায়ের রং মিশে যেত। যখন তেল মাখিয়ে দিতুম, দেখতুম সব গা থেকে যেন জ্যোতিঃ বেরচ্ছে। কালীবাড়ীতে দক্ষিণেশ্বরের একজনদের জামাই এসেছিল খুব গৌরবর্ণ। ঠাকুর আমায় বলছেন, আমরা দুজনে পাশাপাশি পঞ্চবটীতে বেড়াব, তুমি দেখবে কার রং ফরসা। তাঁরা বেড়াতে লাগলেন, দেখলাম ঠাকুরের চেয়ে তার রং একটু ফরসা—উনিশ-বিশ হবে।
“যখনই কালীবাড়িতে বার হতেন, সব লােক দাঁড়িয়ে দেখতাে, বলতাে ঐ তিনি যাচ্ছেন। বেশ মােটাসােটা ছিলেন। মথুরবাবু একখানা বড় পিঁড়ে দিয়েছিলেন, বেশ বড় পিঁড়ে। যখন খেতে বসতেন তখন তাতেও বসতে কুলাতা না। ছােট তেলধুতিটি পরে যখন থস থস করে গঙ্গায় নাইতে যেতেন, লােকে অবাক হয়ে দেখতে।
“কামারপুকুরে যখন যেতেন, ঘরের বার হলেই মেয়েমন্দ হাঁ করে চেয়ে থাকত। একদিন ভুতির খালের দিকে বেরিয়েছেন, চারদিকে মেয়েগুলো -যারা জল আনতে গেছে-হাঁ করে দেখছে আর বলছে, ‘ঐ ঠাকুর যাচ্ছেন’।
“ঠাকুর হৃদয়কে বলছেন, ‘ও হৃদু, আমায় ঘোমটা দিয়ে দে, আমায় ঘােমটা দিয়ে দে—দে, দে, নইলে আমি এখুনি ন্যাংটা হব। হৃদয় বললে, 'না, মামা, এখানে ন্যাংটা হয়াে না, লােকে কি বলবে? ন্যাংটা হলে মেয়েগুলাে পালাবে কিনা। হৃদয় তাড়াতাড়ি গায়ের চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে দিলে।
“তাঁকে কখনও নিরানন্দ দেখিনি। পাঁচ বছরের ছেলের সঙ্গেই বা কি, আর বুড়াের সঙ্গেই বা কি, সকলের সঙ্গে মিশেই আনন্দে আছেন। কখনও বাপু নিরানন্দ দেখিনি। আহা! কামারপুকুরে সকালে উঠেই বলতেন, 'আজ এই শাক খাব, এইটি রেখাে। শুনতে পেয়ে আমরা (মা ও লক্ষীদিদির মা) সব যােগাড় করে রাখতুম। কয়েক দিন পরে বলছেন, ‘আঃ, আমার একি হল? সকাল থেকে উঠেই কি খাব, কি খাব! রাম রাম ! আমাকে বলছেন, আর আমার কিছু খাবার সাধ নেই, তোমরা যা রাঁধ, যা দেবে, তাই খাব।' শরীর। সারতে দেশে যেতেন। দক্ষিণেশ্বরে থাকতে খুব পেটের অসুখে ভুগতেন কিনা। বলতেন, ‘রাম রাম ! পেটটা কেবল মলেই ভর্তি, কেবল মলই বেরুচ্ছে।' এই সবে তারপর শরীরে ঘেন্না ধরে গেল, আর শরীরের যত্ন করতেন না। “একদিন ভূতির খালের দিক থেকে আসছেন, বৃষ্টি হয়ে গেছে। একটা মাগুর মাছ পুকুর থেকে রাস্তায় উঠেছে, ঠাকুরের পায়ে ঠেকেছে। ঠাকুর সেটাকে পায়ে করে ঠেলে ঠেলে এনে পুকুরে ছেড়ে দিলেন বললেন, ‘পালা, পালা, হৃদে দেখতে পেলে এখনি তােকে মেরে ফেলবে।' এসে হৃদয়কে বলছেন,’ হৃদু, এই এত বড় একটা মাগুর মাছ, হলদে রং, রাস্তায় উঠেছিল, পুকুরে ছেড়ে দিলাম। হৃদয় বললে, ‘ও মামা, তুমি করলে কি গো, ও মামা, তুমি করলে কি গাে! আঃ, এত বড় মাছটা ছেড়ে দিলে। আনলে বেশ ঝােল হত।
“এখন তাে কত ভক্ত, চারিদিকে হই হই। তাঁর অসুখের সময় একজন ভেগে গেল বিশ টাকার জন্য—চাঁদা ধরেছিল। এখন তাে আর ঠাকুরের সেবা কঠিন নয়, ঠাকুরকে ভােগ দিয়ে নিজেরাই খায়। ঠাকুরকে বসিয়ে রাখ, বসেই আছেন । শুইয়ে রাখ, শয়েই আছেন-ছবি তাে!
“বলরামবাবুকে দেখেছিলেন, মা কালীর পাশে হাতজোড় করে রয়েছেন, মাথায় পাগড়ি। বলরাম সেই বরাবরই হাতজোড় করে ছিল, কখনও পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করত না। ঠাকুর তার মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন, 'ও বলরাম, এই পা-টা চুলকাচ্ছে, একটু হাত বুলিয়ে দাও না। বলরাম অমনি নরেন, কি রাখাল-টাখাল যে কেউ কাছে থাকত তাকেই টেনে এনে বলত, ‘এই ঠাকুরের পা-টায় একটু হাত বুলিয়ে দাও তাে, চুলকাচ্ছে’।”
আমি—মহারাজকে আমি ঠাকুরের রংএর কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তিনি বলেন, “এই আমাদের গায়ের রংএর মতই ছিল।'
মা—সে তারা যখন দেখেছে। তখন তার সে শরীরও ছিল না, সে রংও ছিল না। এই আমারই দেখ না, এখন কেমন রং হয়েছে –কেমন শরীর হয়েছে। আগে আমার কি এইরকম ছিল ? আগে খুব সুন্দর ছিলাম। আমি প্রথমে বেশী মােটা ছিলাম না। শেষে ( ঠাকুরের শরীরত্যাগের পর) মােটা হয়েছিলুম। দক্ষিণেশ্বরে যখন ছিলাম তখন তাে বার হতুম না। খাজাঞ্চী বলতেন, “তিনি আছেন শুনেছি, কিন্তু কখনও দেখতে পাইনি।'
‘কখনও কখনও দুমাসেও হয়তাে একদিন ঠাকুরের দেখা পেতুম না। মনকে বােঝাতুম, ‘মন, তুই এমন কি ভাগ্য করেছিস যে রােজ রােজ ওর দর্শন পাবি ! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে (দরমার বেড়ার ফাঁক দিয়ে) কীর্তনের আখর শুনতুম—পায়ে বাত ধরে গেল। তিনি বলতেন, বুনাে পাখী খাঁচায় রাতদিন রাখলে বেতে যায়; মাঝে মাঝে পাড়ায় বেড়াতে যাবে। রাত চারটেয় নাইতুম। দিনের বেলায় বৈকালে সিঁড়িতে একটু রােদ পড়ত, তাইতে চুল শকাতুম। তখন মাথায় অনেক চুল ছিল। ( নহবতের) নীচের একটুখানি ঘর, তা আবার জিনিসপতে ভরা। উপরে সব শিকে ঝুলছে। রাত্রে শুয়েছি, মাথার উপর হাড়ি কলকল করছে-ঠাকুরের জন্য শিঙ্গি মাছের ঝােল হত কিনা! তবু আর কোন কষ্ট জানিনি, কেবল যা শৌচে যাবার কষ্ট। দিনের বেলায় দরকার হলে রাতে যেতে পারতুম গঙ্গার ধারে, অন্ধকারে। কেবল বলতুম, ‘হরি হরি, একবার শৌচে যেতে পারতুম !’ ( মা একটু পেটরােগা ছিলেন)। 
“তখন কত কীর্তন, কত ভাব! এই যে গৌরদাসী, এরই বা কত ভাব হত। কেবল ‘নিত্যগােপাল, নিত্যগােপাল’ করত ! ‘নিত্য কোথায়? নিত্য কোথায়?’ আমি বলতুম, কে জানে তাের নিত্য কোথায় ? দেখগে গঙ্গার ধারে টারে ভাব হয়ে রয়েছে।”
পূজার সময় হইয়াছে, মা পুজা করিতে বসিবেন। আমি নীচে আসিলাম। পুজা হইয়া যাইবার পর উপরে প্রসাদ আনিতে গিয়াছি। মা ঠাকুরঘরে দক্ষিণমুখে পা ছড়াইয়া বসিয়া শালপাতায় প্রসাদ ভাগ করিয়া রাখিতেছেন। দক্ষিণধারের বারান্দায় বসিয়া আমি দেখাইয়া দেখাইয়া বলিতেছি, “আমাকে এটা দাও, ঐটা দাও।” তারপর আর একটা জিনিস চাহিয়াছি। সেটি মায়ের হাতের কাছে ছিল না। পায়ের বাতের জন্য তাহার উঠিয়া আসিতে কষ্ট হইবে ভাবিয়া আমি নিজেই উহা হাত বাড়াইয়া লইতে গেলাম। সেই সময় মায়ের পায়ে আমার হাতের কনুইয়ের উপরের অংশটা ঠেকিয়া গেল। মা অমনি “আহা” বলিয়া হাতজোড় করিয়া নমস্কার করিলেন। আমি বলিলাম, “সে কি, কি আর হয়েছে।” মা শুধু, নমস্কারে তৃপ্ত না হইয়া বলিলেন, “এস, এস, একটা চুমু খাই।” অগত্যা আমি মুখ বাড়াইয়া দিলাম। তিনি হস্ত দ্বারা চিবুক স্পর্শ করিয়া চুম খাইলেন, তবে তাঁহার মন শান্ত হইল।
এমনই ভাবে তিনি ভক্তগণকে ভক্ত-ভগবান-জ্ঞানে নমস্কার, আবার আপন সন্তানজ্ঞানে স্নেহ করিতেন।

২৯-১০-১০, উছােধন, ঠাকুরঘর 

সকালে মায়ের তত্ত্বাপােশের দক্ষিণপাশে বসিয়া কথা হইতেছে। ঠাকুরের কথা উঠিয়াছে। মা বলিতেছেন, “পুরীতে প্রথম দিন গিয়েই সকালবেলা একটা ঘিয়ের টিনে ঠেসান দিয়ে ঠাকুরের ছবি রেখে পূজা করে তাড়াতাড়ি জগন্নাথ দেখতে গিয়েছিলাম। ঘর দোর সব বন্ধ। এসে দেখি ঠাকুরের ছবি টিনের নীচে। সবাই এসে দেখলে। সকলে মনে করলে চোর ঢুকেছে। কিন্তু ঘরের কোথাও জিনিসপত্রের একটুও নড়চড় হয়নি। শেষে দেখি বড় লাল পিপড়ে ধরেছে টিনে-ঘিয়ের টিন কিনা—সেই পিঁপড়ে ঠাকুরের ছবিতে ধরেছিল, তাই ঠাকুর নেমে বসেছেন।”
আমি—ছবিতে কি ঠাকুর আছেন ? 
মা—আছেন না? ছায়া কায়া সমান। ছবি তাে তাঁর ছায়া।
আমি—সব ছবিতে তিনি আছেন ?

১. এইজন্যই বােধ হয় বলে, গুরুজনদের ছায়া ডিঙাইতে নাই। জয়রামবাটীতে একদিন স্নান করিয়া আসিতেছি। মাও বাঁড়ুয্যে পুকুর হইতে স্নান করিয়া আসিতেছেন। রৌদ্রে মায়ের মা যে পাশে পড়িয়াছে, আমি সেই পাশ দিয়া মায়ের সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছি দেখিয়া মা থামিয়া আমাকে বলিতেছেন, “ওপাশ দিয়ে এগিয়ে যাও।” আমি প্রথমটা বুঝিতে পারি নাই। মাকে বার দুই থামিতে দেখিয়া তখন খেয়াল হইল।

মা—হাঁ, ডাকতে ডাকতে ছবিতে তার আবির্ভাব হয়। স্থানটি একটি পীঠ হয়। যেমন এই জায়গায় (উদ্বোধনের উত্তরদিকে মাঠ দেখাইয়া) কেউ তাঁর পুজা দিলে। ঐটি তার একটি স্থান হল। 
আমি—তা, ও সব স্থানের সঙ্গে ঐ সব ভাল স্মৃতি জড়িত আছে বলে অমন মনে হয়।
মা—তা নয়, ও স্থানটিতে তাঁর দৃষ্টি থাকে। 
আমি–আচ্ছা, ঠাকুরকে যে-সব ভােগ দাও তা কি ঠাকুর খান ? 
মা—হাঁ খান। 
আমি— কই, কোন চিহ্ন দেখি না কেন?
মা—তাঁর চোখ থেকে একটি জ্যোতিঃ বার হয়ে সব জিনিস চুষে দেখে। তাঁর অমৃত-স্পর্শে সেটি আবার পরিপূর্ণ হয়, তাই কমে না।
“ভগবান বৈকুণ্ঠ থেকে নেমে আসেন যেথায় ভক্ত ডাকে। কোজাগর পূর্ণিমার দিন লক্ষী বৈকুণ্ঠ থেকে পৃথিবীতে আসেন। যেখানে যেখানে তার দৃষ্টি থাকে, যান, পূজা গ্রহণ করেন। আমার শাশুড়ী কামারপুকুরে দেখেছিলেন, চৌদ্দ-পনর বছরের মেয়ে, গৌরবর্ণ, কানে শঙ্খের কুণ্ডল, হাতে হীরার বালা (ডায়মনকাটা বালা)। বকুলতলায় (ঠাকুরের বাড়ির সামনে) দাঁড়িয়ে তাঁর সঙ্গে কথা কয়েছিলেন। শাশুড়ী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হ্যাগা, কে তুমি ? লক্ষী বললেন, “এই আমি এইখানেই আসছি। শাশুড়ী বললেন, “আমার ছেলেকে (শ্ৰীযুত রামকুমারকে ) দেখেছ? পুজো করতে গেছে, রাত হয়েছে, এখনও এল না। লক্ষী বললেন, 'হাঁ গো, সে আসছে, চালকলা বেঁধেছে, এই যে আমিও সেইখান থেকেই তোমাদের বাড়ি আসছি। আমার শাশুড়ি বললেন, 'না মা, বাড়িতে কেউ নেই, এখন এস না।’ এইরুপে বারবার প্রত্যাখ্যান করায় ‘আচ্ছা, আমার অমনিই দৃষ্টি থাকবে’ বলে দেবী অন্তর্ধান হলেন। দেখছ না ওদের অবস্থা কখনও তেমন ভাল হ’ল না, মােটা ভাত কাপড় চলে যাচ্ছে।
“আমার শাশুড়ী দেখেছিলেন, লক্ষী লাহাদের বাড়ির দিক থেকে তাদের ধানের মরাইগুলির ওখান ঘুরে এসেছিলেন। আমার ভাসুর এসে সব শুনে বললেন, “মা তুমি বুঝতে পারনি, স্বয়ং লক্ষী এসেছিলেন কোজাগর পূর্ণিমা কিনা আজ।' তিনি গণনা জানতেন, খড়ি পেতে দেখেছিলেন।
“তার খাবার কি দরকার? তিনি ভক্তের সন্তোষের জন্য আসেন, খান। প্রসাদ খেলে চিত্তশুদ্ধি হয়। এমনি অন্ন খেলে চিত্ত মলিন হয়।'* 
আমি—সত্যই কি ঠাকুর খান!
মা—হাঁ, আমি কি দেখি না যে ঠাকুর খেলেন কি না? ঠাকুর খেতে বসেন, খান।
আমি—তুমি দেখ ?
মা—হাঁ, কারুরটা দেখি তিনি খেলেন, কারুরটা হয়তাে দুষ্টিমাত্র করলেন। তা তােমারও কি সব জিনিস সব সময় খেতে ভাল লাগে, না সকলের জিনিস খেতে পার ? অমনি। যার যেমন ভাব ভক্তি। ভক্তিটিই প্রধান।
আমি—ভক্তি কি করে হবে? আপন ছেলেও যদি অনো পালন করে তাে মাকে মা বলে জানে না।
মা—হাঁ, তাইতাে তাঁর কৃপা চাই। কৃপার পাত্র হওয়া চাই। 
আমি—কৃপার আবার পাত্রপাত্র কি? কৃপা সকলের উপর সমান। 
মা—নদীর কুলে বসে ডাকতে হয়, সময়ে তিনি পার করবেন। 
আমি—সময়ে তাে সবই হয় ; তাতে তাঁর কৃপা কি ? 
মা—তা মাছটি ধরতে হলে ছিপটি ফেলে বসতে হয় না ?
আমি—তিনি আপনার জন হলে আবার বসে থাকা কেন ? 
মা—তা বটে। তা অসময়েও হয়। আজকাল লােকে অসময়েও আম কাঁটাল ফলাচ্ছে। ভাদ্র মাসেও কত আম হচ্ছে।
আমি—আমাদের কি দৌড় ঐ পর্যন্ত, যে যা চায়, তাকে তাই দিয়ে তিনি বিদায় করে দিলেন? না এ ছাড়া আপনার মতাে করে তাঁকে পাওয়া যায় ? তিনি আমার আপনার কি না?
মা—হাঁ, তিনি আপনার। চিরসম্বদ্ধ। তিনি সকলের আপনার, যেমন ভাব তেমনি লাভ।
আমি—ভাব তাে স্বপ্নবৎ, যেমন ভাবতে ভাবতে শেষে তাই স্বপ্ন দেখছে। 

*জনৈক ভক্তমার নিকট হইতে গৈরিক বস্ত্র লইয়াছিল। সে কয়েক বৎসর অসুখে ভোগে। ঐ সময় পরিবর্তনের অন্য নানাস্থানে ছিল। পরে ফিরিয়া আসিয়া তাহাদের আশ্রমের পরিবর্তে বাড়িতে গিয়া থাকে এবং একদিন জয়রামবাটী গিয়া মাকে গৈরিক বস্ত্র ফিরাইয়া দেয়। এই উপলক্ষে মা বলিয়াছিলেন, “আহা। এর বিষয়ীর অন্ন খেয়ে বুদ্ধি মলিন হয়ে গেছে।”

মা—স্বপ্ন বইকি। জগৎই স্বপ্লবৎ। এটাও (এই জাগ্ৰৎ অবস্থা) একটা স্বপ্ন ।
আমি—না, এতটা স্বপ্ন নয়। তা হলে পলকে ভাঙত। এ যে অনেক জন্ম ধরে রয়েছে!
মা—তা হােক। স্বপ্ন বই আর কিছু নয়। এই যে রাত্রে স্বপ্ন দেখেছ, এখন তা নেই। (বাস্তবিকই গত রাত্রে আমি একটা আশ্চর্য স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম।) চাষা স্বপ্ন দেখেছিল—রাজা হয়েছে, আট ছেলের বাপ হয়েছে। স্বপ্ন ভেঙে গেলে বলেছিল, ‘সেই আট ছেলের জন্য কাঁদব, না এই এক ছেলের জন্য কাঁদব?
এইরুপ তর্কের পর শেষে বলিলাম, “মা, ওসব যা বলি, ওর জন্য আমি মাথা ঘামাই না। আমি জানতে চাই আমার কেউ আপনার আছে কি না ?”
মা—আছে বৈকি, নিশ্চয় আছে। 
আমি–ঠিক ? 
মা—হাঁ।
আমি—আপনার জন হলে তার দেখা পেতে ডাকতে হবে কেন? আপনার জন যে, সে না ডাকলেও দেখা দেয়। বাপ মা যেমন করেন, তিনি কি তেমন করছেন ?
মা–করছেন বইকি, বাছা, তিনিই বাপ-মা হয়েছেন। তিনিই বাপ-মাপে পালন করছেন। তিনিই দেখছেন। নইলে কোথা ছিলে, কোথা এলে। তারা প্রতিপালন করলে, শেষে দেখলে এ আমাদের নয়। যেমন কাকের বাসায় কোকিল পালে না?
আমি–ঠিক ঠিক আপনার জন পাব কি না?
মা—পাবে, পাবে, তুমি সব পাবে। যা ভাব সব পাবে। স্বামীজী পেয়েছিলেন না ? স্বামীজী যেমন পেয়েছিলেন তেমন পাবে।
আমি—মা, যাতে আমার ভয়-সঙ্কোচ না থাকে (মায়ের প্রতি)। 
মা—না, সঙ্কোচ কি! আমি তাে রুই গেঁথেছি। 
আমি—বেশ তাে, আমরা খাব। 
মা—হাঁ, তাইতাে। একজনে ছাঁচ করলে তা থেকে অনেক গড়ন হয়। 
আমি—তুমি করলেই আমাদের হবে। তুমি আর ছাড়িয়ে যেতে পারছ না।
মা—হাঁ, বাবা, আমি করলেই তােমাদের হবে।

২৬-১১-১০, উদ্বোধন, সকাল ৭টা 

পূর্বদিনে মা গুপ্ত-মহারাজের অসুখ দেখিতে গিয়াছিলেন। বশী ও টাবু গুপ্ত-মহারাজের খুব সেবা করিতেছে। মা সেই কথার উল্লেখ করিয়া তাহাদিগকে প্রশংসা করিতেছেন-“ওরাই সাধ, ওরাই ধন্য। আর সাধু কি ?”
“যােগীন চাটুজ্যেকেও (নিত্যানন্দ স্বামীকে) তার ছেলেরা (শিষ্যেরা) খুব সেবা করছে। পূর্ববঙ্গের তারা সব। কাশীপুরে ঠাকুরের সেবা ছেলেরা সব করত। তিনি তাদের নানা কথায় আনন্দে রাখতেন। বলতেন, “একটু আনন্দ না পেলে ওরা কেমন করে পারবে। তিনি সদ্বায়ের মন বুঝে চলতেন। সেবার তেমন দরকার হত না। হয়ত দশ-বার দিন অন্তর একটু বাহ্যে হত। তবে রাত জাগতে হত। খাওয়া তাে বড় ছিল না—একটু সুজি, তাও ছেঁকে দিতে হত। মাংসের যুষ হত। দুটো মরা কুকুর তার ছিবড়ে খেয়ে এই মােটা হ’ল। একদিন-তখন অকাল-আমলকী খেতে চাইলেন। দুর্গাচরণ (নাগ মহাশয়) তিনদিন পরে গােটা দুই-তিন আমলকী নিয়ে উপস্থিত হ'ল। বেশ বড় আমলকী। তিন দিন তার খাওয়া-দাওয়া নেই। ঠাকুরের আমলকী হাতে করে কান্না। বললেন, আমি ভেবেছিলাম তুমি বুঝি ঢাকা-টাকা চলে গেছ।” আমাকে বললেন, ‘ঝাল দিয়ে একটা চচ্চড়ি রেঁধে দাও। ওরা পূর্ববঙ্গের লােক, ঝাল বেশী খায়। আর আর সব রাঁধা ছিল। বললেন, ‘একখানা থালায় সব বেড়ে দাও। ও প্রসাদ না হলে খাবে না।' ঠাকুর তা প্রসাদ করে দিতে বসলেন। সে সব দিয়ে ভাত প্রায় এত কটা খেলেন। তবে দুর্গাচরণ প্রসাদ পেল। তখন বাগানে খুব খরচ হয়। তিনটা রান্না-ঠাকুরের একটা, নরেনদের একটা, অপর সবার একটা। চাঁদা করলে টাকার জন্য। তাই চাঁদার ভয়ে একজন আবার ভেগে গেল। 
“পাপগ্রহণ করে তার শরীরে ব্যাধি। বলতেন, “গিরিশের পাপ। ও কষ্ট ভােগ করতে পারবে না। তার ইচ্ছামত্যু ছিল। সমাধিতে অনায়াসে দেহ ছাড়তে পারতেন। বলতেন, আহা, ওদের (ছেলেদের) একটা ঐক্য করে বেঁধে দিতে পারতুম। এতদিন তাে এ বলছে, ‘নরেনবাবু কেমন আছেন ?’ ও বলছে, ‘রাখালবাবু কেমন আছেন?’—এইরকম ছিল। তাই অত কষ্টেও দেহ ছাড়েননি।”

১৪-৪-১১, উদ্বোধন, ঠাকুরঘর, সকালবেলা। 

রােজ ঠাকুরপূজার জন্য যে ফুল আসে তাহা লইয়া উপরে গিয়াছি। বেলা অধিক হইয়াছে, তাই মা বলিলেন, “ফুলটি যখন আসে দিয়ে যাবে।” মা নিজেই পুজার সব যােগাড় করিতেন এবং পূজা করিতেন। হাত ইসারা করিয়া আমাকে কাছে ডাকিলেন। মা তক্তাপােশের উপর বসিয়া আছেন। জনৈক ভক্তের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন।
মা—ও নীচে আছে ? 
আমি— হাঁ। 
মা—কি করে ? পড়ে উড়ে ? 
আমি—মধ্যে মধ্যে হয়তাে পড়ে। 
মা–মঠে বুঝি যাবে না? 
আমি—না, তার যেতে ইচ্ছা নেই। 
মা—তােমরা বুঝিয়ে বলবে।
আমি—আমি ঢের বলেছি, তুমি বল যাতে গিয়ে অন্ততঃ দু-চারদিন থাকেন।
মা—বাবা, আমিও ঢের বলেছি, আমি বললেও শুনবে না। মঠে গেলে পাঁচজনে হাসিঠাট্টা করবে, তাই সে কিছুতেই যেতে চায় না। শরৎ কত করে আমাকে বললে, মহারাজের কথা, আমাদের কথা কি মােটেই শুনতে নেই ? মঠে গিয়ে অন্ততঃ দুদিন থেকে মহারাজের কথাটা মান্য করে আসুক না। তাই তাে, রাখালের সঙ্গে গিয়ে কিছুদিন পুরীতে থাকুক না। একা একা কোথায় যাবে ? কোথায় খাওয়াটি জুটবে?
আমি—খাওয়ার জন্য কিছু নয়, ভিক্ষা করে খাবে। তবে মহারাজ এবং অন্যান্য গুরুজন বলছেন, এঁদের কথা মান্য করবার জন্যও তাে একবার যাওয়া উচিত।
মা—হ্যাঁ, তাই তাে, গুরুজনের কথা। ওর কাজ করতেই ইচ্ছে নেই। কাজ না করলে কি মন ভাল থাকে। চব্বিশ ঘণ্টা কি ধ্যান চিন্তা করা যায় ? তাই কাজ নিয়ে থাকতে হয়, ওতে মন ভাল থাকে। তােমাদের এখানে কাজকর্ম কেমন চলছে?
আমি —একরকম চলে যাচ্ছে।
মা—তুমি রামেশ্বর যাবার কথা লিখেছিলে। তা যাওনি, বাবা, বেশ করেছ, পথে যা ওঠানামা।
আমি—শরৎ মহারাজ চেষ্টা করেছিলেন। তা অত টাকা কোথায় জুটবে ? গেলে শশী মহারাজের উপরই খরচ পড়ত।
মা—হাঁ, হাজার টাকা খরচ হয়েছে শশীর।
পরদিন মা ঠাকুরঘরের দক্ষিণপাশের ঘরে পান সাজিতেছিলেন। বেলা এগারটা হইবে। উপরে গিয়াছি। মা পূর্বোক্ত ভক্তটির কথা জিজ্ঞাসা করিলেন, “ও চলে গেল ?”
আমি—হাঁ, কাঞ্জিলালের বাড়িতে আজ থাকবে, হয়তাে কালও থাকতে পারে। শরৎ মহারাজ বলিলেন, ‘যদি অভিমান অহঙ্কার করে গিয়ে থাকে তাে দিন দিন আরও খারাপ হবে। আর যদি লজ্জায় কি করে মুখ দেখাবে এই ভাব থেকে গিয়ে থাকে তবে ঠাকুরের ইচ্ছায় হয়তাে মােড় ফিরে ভালও হতে পারে।' 
মা— কিই বা হয়েছে ? বেটাছেলে, মেয়ে তাে নয় ?ভাঙতে সব্বাই পারে, গড়তে পারে ক’জনে? নিন্দা ঠাট্টা করতে পারে সবাই, কিন্তু তাকে ভাল করতে পারে কজনে? দুর্বলতা তাে মানুষের আছেই।
আমি—শরৎ মহারাজ বললেন, “একা থাকা উন্নত মন হলে সম্ভব, নতুবা যার দোষী মন, তার আরও অধােগতি হয় ওতে।”
মা—কি ভয় ? ঠাকুর রক্ষা করবেন। কত সাধু একা থাকে না? 
আমি—হৃদয় মুখুজ্যেও শেষটায় ঠাকুরের সঙ্গছাড়া হয়েছিল। 
মা—তা ভাল জিনিসটি কি কেউ চিরদিন ভােগ করতে পায় ? 
আমি—তিনি ঠাকুরকে অনেক কষ্টও নাকি দিতেন, গালমন্দ করতেন। 
মা—যে অত সেবা করে পালন করেছে, সে একটু মন্দ বলবে না? যে যত্ন করে সে অমন বলে থাকে।
আমি—ইনিও তােমার এত সেবা করলেন, শেষে এই হ’ল 
মা—তা শাসন না থাকলে চলবে কেন? ভাল হবে কি করে।

জয়রামবাটী 

একবার আশ্বিন মাসে ৺দুর্গাপুজার সপ্তমীর দিন দুইটি যুবক ভক্ত শ্রীশ্রীমার নিকট জয়রামবাটীতে উপস্থিত হইল। অষ্টমীর দিন তাহারা পদ্মফুল সংগ্রহ করিয়া মায়ের পায়ে অঞ্জলি দিল। তারপর একজন বলিল, “মা আমায় সন্ন্যাস দাও।” অপরটিও তাহাতে যােগ দিল। মা একটু হাসিয়া বলিলেন (দৃষ্টি একটু অস্বাভাবিক), “সব হবে, বাবা, চিন্তা কি ?” ভক্তটি জেদ করিয়া আবার বলিল, “তা সন্ন্যাস দিতেই হবে মা; আমাদের গেরুয়া দাও।” এবার মা একটু গম্ভীরভাবেই বলিলেন, “গেরুয়ায় কি হবে, বাবা? গেরুয়াতে কি আছে? তােমরা তাে বে করনি, সন্ন্যাসী তাে আছই। আর যা যা দরকার সব ক্রমে হবে।” ভক্তটি আবার বলিল, “মা, আমার ইচ্ছা হয় পৈতা-কাপড়-চোপড় ফেলে দিয়ে তৈলঙ্গ স্বামীর মতাে সর্বদা ভগবৎ-চিন্তায় বিভাের হয়ে থাকি।” মা হাসিয়া বলিলেন, “হবে বাবা, হবে।” এবার ভক্তটি একটু অস্থিরভাবেই বলিতে লাগিল, “মা, দিই ফেলে, পৈতে-কাপড় ফেলে দিই।” কেবল কথায় নহে, কাজেও তাহাই করিতে যাইতেছে। মা তাহাতে একটু ব্যস্ত হইয়াই বলিলেন, “থাক না, থাক না-সময় হলে আপনি খসে যাবে।” 
তথাপি তাহার আবদার ফুরায় না। বলিতেছে, “মা, ঠাকুরের পাগলামির একটু ছিটেফোঁটা আমায় দাও, আমায় পাগল করে দাও।” আবার বলিল, “মা, ভক্তি-টক্তি কিছুই দিচ্ছ না, ঠাকুরকে দেখাবে না?” মা বলিলেন, “হবে, বাবা, সব হবে।” উভয়ে প্রণাম করিয়া বাহিরে গেল।
মধ্যাহ্নে সকলে প্ৰসাদ পাইতেছেন। পায়েস খাইয়া ভক্তটি বলিয়া উঠিল, “মা, এ কি পায়েস রেঁধেছ ? একটুও ভাল হয়নি।” মা হাসিয়া বলিলেন, “কি করব, বাবা, এখানে দুধ তেমন পাওয়া যায় না।” কেদারের মা নিকটে ছিলেন। তিনি বলিলেন, “বেশ তাে বাবা, তােমার সব ছেলে আছ, খুব ক'রে জিনিসপত্র এনে দিও, মা ভাল করে খাওয়াবেন।” একথা তাহার কানেও গেল না; বলিল, “মা, এবার কিন্তু খেয়ে পেট ভরল না। আবার এসে পেট ভরে খেয়ে যাব, আর ‘উদ্বোধনে’ আমায় আর একবার দেখা দিও।” মা এ কথায় সম্মতি জানাইলেন।
পূর্বাহে শিলং হইতে একটি ভক্ত আসিয়াছেন। শ্রীশ্রীমায়ের অবতারত্বে নিঃসন্দেহ হইবার জন্য ইনি পণ করেন, সাতবার মাকে স্বপ্নে দর্শন না পাইলে দর্শনে যাইবেন না। মায়ের কৃপায় সাতবার পূর্ণ হইয়াছে। তাই এবার আসিয়াছেন। তিনি অপরাহ্নে বিদায় লইবেন। মাকে প্রণাম করিয়া বলিলেন, “মা, আসি তবে। আর কি কোন দরকার আছে?”
মা—হাঁ, বাবা, আছে বইকি। দীক্ষাটা নিয়েই যেও। 
ভক্ত—তা বাগবাজারেই হবে। 
মা—না, বাবা, ওটা হয়েই যাক, আজই না হয় হবে। 
ভক্ত—প্রসাদ পেলুম যে? 
মা—ওতে দোষ হবে না। 
তারপর দীক্ষাগ্রহণ করিয়া তিনি বিদায় লইলেন।
জয়রামবাটী হইতে বাড়ি আসিয়া পূর্বোক্ত ক্ষেপা ভক্তটির মনােভাবে ক্ৰমশঃ খুব পরিবর্তন হইতে চলিয়াছে। ঠাকুরের দর্শনের জন্য সে অস্থির। শ্রীশ্রীমা ইচ্ছা করিলেই ঠাকুরকে দর্শন করাইতে পারেন, অথচ দেখাইতেছেন না—এই বিশ্বাসে তাঁহার মনে বড় অভিমান হইয়াছে। অত্যন্ত বিরক্তিভাবেই সে পুনরায় জয়রামবাটী গিয়া মাকে বলিল, “মা, ঠাকুরকে দেখাবে না?” মা স্নেহমাখা স্বরে বলিলেন, “হবে, বাবা, কেন ব্যস্ত হচ্ছ?” 
তাহার আর সহ্য হইল না। ক্রুদ্ধ হইয়া বলিল, “কেবল ফাঁকি দিচ্ছ ? এই নাও তােমার জপের মালা, আমি আর কিছু চাই নে’ এবং জপের মালা মায়ের দিকে ছুড়িয়া দিল। মা বলিলেন, “আচ্ছা, থাক, ঠাকুরের ছেলে হয়ে থাক।” সে কিন্তু আর অপেক্ষা করিল না, চলিয়া গেল। কোয়ালপাড়া মঠে তাহার মালা গচ্ছিত রহিল। 
ইহার পর ভক্তটি রীতিমত পাগল হয়। সব মহারাজাদিগকে গালাগালি দিয়া পত্রাদি লিখিত। শ্রীশ্রীমাকেও কটুক্তিপূর্ণ পত্র লিখিত। তাহার নানা উৎপাতের জন্য সে মারও খাইয়াছিল।
এই ভক্তটির সম্বন্ধেই আমি মাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, “মা, সে কি মন্ত্রও ফেরত দিয়াছিল ? মালা তাে ছুড়ে মারল। মন্ত্র কি কখনও ফেরত দিতে পারে ?” 
মা—তা কি কখনও হয়? এ সজীব মন্ত্র। ও কি ফেরত হয় ? যে মন্ত্র একবার পেয়েছে—মহামন্ত্র। যাঁর (যে গুরুর) উপর একবার ভালবাসা হয়েছে, তা কি কখনও যায়? ও একদিন না একদিন, যখন প্রকৃতিস্থ হবে তখন এদের সবার পায়ে ধরবে।
আমি—মা, কেন এমন হয় ? 
মা—তা হয়ে থাকে। এক গুরুই কতজনকে মন্ত্র দেন, সবাই কি সমান হয় ? যে যেমন আধার তাতে তেমনি বিকাশ হয়। ও জয়রামবাটীতে বললে, ‘মা,আমায় পাগল করে দাও।' আমি বললাম, পাগল হবে কেন ? অনেক পাপ না হলে কি পাগল হয় ? বলে, ‘আমার ছােট ভাই ঠাকুরকে দর্শন করেছে, আমায়ও দেখিয়ে দাও।’ আমি বললাম, সাদা চোখে কে কবে দেখছে ? তবে চোখ বুজে দেখতে পারে। চোখ বুজলেও ছবি মনে পড়ে না ? ছেলেমানুষ, হয়তাে তাই দেখে ভাবছে ঠাকুর দেখছি। বললুম, তা তুমিও সাধনভজন কর, তাঁকে প্রার্থনা কর, তােমারও দর্শন হবে। মানুষ আপন মনে জানতে পারে সে কতদূর এগিয়েছে, কতদূর জ্ঞানচৈতন্য হয়েছে। অন্তরে অন্তরে বুঝতে পারে যে কতদূর তার ঈশ্বরলাভ হয়েছে। নতুবা সাদা চোখে কে দেখছে ?
‘উদ্বোধনে’ ধমক খাইয়া ভক্তটি বাগবাজারে গঙ্গার ধারে পড়িয়া থাকিত। কখনও বা উদ্বোধনের রোয়াকে বসিয়া থাকিত। আসিলে দুপুরে রোয়াকে বসিয়াই দুটি খাইয়া যাইত। এইভাবে কিছুদিন গত হইলে একদিন তাহাকে নানাপ্রকারে বুঝাইয়া রাজী করাইয়া শ্ৰীশ্রীমায়ের অনুমতিক্রমে ( উদ্বোধনে) তাঁহার নিকট লইয়া যাওয়া হইল। মা তাহাকে বুঝাইতে লাগিলেন, “ঠাকুর বলতেন, যারা আমাকে ডাকবে তাদের জন্য আমাকে অন্তিমে দাঁড়াতে হবে। এটি তাঁর নিজ মুখের কথা। তুমি আমার ছেলে, তােমার ভয় কি? তুমি কেন অমন পাগল হয়ে চলবে ? এতে যে তাঁর দুর্নাম হবে ! লােকে বলবে, তার ভক্ত পাগল হয়েছে। তােমার কি এমন করা উচিত, যাতে তার দুর্নাম হয় ? যাও, বাড়ি যাও, দশজনে যেমন আছে, বেশ খাও-দাও, থাক। যখন তােমার দেহ যাবে তখন তিনি দেখা দিয়ে নিয়ে যাবেন। কে তাঁকে প্রত্যক্ষ দেখছে বল না? এক নরেন দেখেছিল। সেও যখন তার খুব ব্যাকুলতা—ঐ সব দেশে (আমেরিকায়)। তখন তিনি (ঠাকুর) তার হাত ধরে রয়েছেন, বােধ করত। তাও কিছুদিনের জন্য। বেশ, যাও, বাড়ি গিয়ে থাক। সংসারীদের কত কষ্ট । এই সেদিন রামের ছেলে মারা গেল। তােমরা ঘুমিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচ।” তারপর বলিলেন, “সেদিন আমি পূজা করছিলাম। পূজা করতে করতে দেখি এর মুখটি-ঝাঁকড়াঝাঁকড়া চুল, গােপালটির মতাে। সেইদিনেই খানিক পরে এসে উপস্থিত।”
মায়ের এই সকল উপদেশ ও সান্ত্বনায় ভক্তটিকে অনেকটা শান্ত দেখা গেল। সেদিন দুপুরে প্রসাদ পাইয়া সে দেশে চলিয়া গেল। বাড়ি গিয়া ক্রমশঃ প্রকৃতিস্থ হইয়াছিল।

১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৮, জয়রামবাটী 

শ্রীশ্রীমা ৺রামেশ্বরদর্শনের পর কলিকাতায় কয়েকদিন অবস্থান করিয়া ৫ই জ্যৈষ্ঠ জয়রামবাটী পৌঁছিয়াছেন। পুরাতন বাড়িতে মায়ের ঘরের বারান্দায় সন্ধ্যার সময় কথা হইতেছে। মা জনৈক ভক্তের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন। 
মা—সে কি বললে?
আমি—তাঁর প্রাণটা তােমার জন্য কেমন ব্যাকুল হয়েছে তিন-চার মাস ধরে। 
মা—সে কি ? সাধু সব মায়া কাটাবে। সােনার শিকলও বন্ধন, লােহার শিকলও বন্ধন। সাধুর মায়ায় জড়াতে নেই। কি কেবল ‘মাতৃস্নেহ’ ‘মাতৃস্নেহ’ করে মায়ের ভালবাসা পেলুম না। ওসব কি ? বেটাছেলে সর্বক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে ফেরা-আমি ওসব ভালবাসি না। মানুষের আকৃতিটা তাে ? ভগবান তাে পরের কথা। আমাকে কুলের ঝি বউ নিয়ে থাকতে হয়। আশু, উপরে আনাগােনা করত, চন্দন ঘষা, এটি সেটি। আমি ধমকে দিলুম।
আমি—বেদান্তবাদী সাধু যারা, তারা সব কি নিবার্ণে যাবে ? 
মা—তা বইকি। মায়া কাটিয়ে কাটিয়ে নির্বাণ হবে-ভগবানে মিশে যাবে। বাসনা হতেই তাে দেহ। একটু বাসনা না থাকলে দেহ থাকে না। একেবারে নির্বাসনা হ’ল তাে সব ফুরাল।
“কোন ছেলে এল, খেলে দেলে, চলে গেল। মায়া কি? হাজরা ঠাকুরকে বলেছিল, ‘আপনি নরেন-টরেন ওদের জন্য অত ভাবেন কেন? তারা আপনার মনে খাচ্ছে দাচ্ছে, আছে। আপনি ভগবানের চিন্তায় মন স্থির করুন। আপনার আবার মায়া কেন ? ঠাকুর তার কথামত সব মায়া কাটিয়ে ভগবানে মন লীন করলেন। দাড়ির চুল, মাথার চুল এমনি (দেখাইয়া) সােজা হয়ে কাঁটা দিলে, কদমফুলের মতাে। একবার ভাব দেখি, সে লােকটি কি ছিলেন। ঠাকুর তখন বাহ্যে গিয়েছিলেন। রামলাল আর শৌচ করাতে পারলে না। কাকে শৌচ করাবে? সব শরীর জড়, কাঠ-শক্ত! তখন রামলাল বলতে লাগল, ‘যেমনটি ছিলে তেমনটি হও, যেমনটি ছিলে তেমনটি হও।' বলতে বলতে শেষে দেহে মন এল। দয়ায় মনকে নামিয়ে রাখতেন।
“যােগীন যখন দেহ রাখলে, নির্বাণ চাইলে। গিরিশবাবু বললেন, ‘দ্যাথ যােগীন, নির্বাণ নিসনি নিসনি। ঠাকুর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে, চন্দ্র সূর্ষে তাঁর চক্ষু-এত বড় ভাবিসনি। যেমন ঠাকুরটি ছিলেন, তেমনটি ভেবে ভেবে তাঁর কাছে চলে যা।
“দেবতা বল, যা বল—সব এসে পৃথিবীতে জন্মাচ্ছে। সুক্ষ্মদেহে তাে আর খাওয়া-পরা, কথাবার্তা কিছু নেই, তাই বেশী দিন থাকতে পারে না।”
আমি—খাওয়া-পরা কথাবার্তা নেই, তবে কি নিয়ে সময় কাটায় ?
মা—কাঠের পুতুলটির মতাে যুগযুগান্তর ধরে যেখানে আছে সেখানেই থাকে। রামেশ্বরে যেমন দেখলুম, রাজাদের সব পাথরের মূর্তি পােশাক পরা রয়েছে। আবার ভগবানের দরকার হয় তাে তিনি নিয়ে আসেন সেখান থেকে। বিভিন্ন দেবলােক সব আছে কিনা—জনলোক, সত্যলােক, ধ্রুবলােক। স্বামীজীকে সপ্তর্ষি থেকে এনেছিলেন, ঠাকুর বলেছেন। তাঁর কথা বেদবাক্য তাে, মিথ্যা হবার জো নেই। 
আমি—তবে আমাদেরও কি কাঠ-মাটির পুতুলের মতাে হয়ে থাকতে হবে ?
মা—না, তােমরা তাঁর সেবা করবে। দুটি থাক আছে। একটি এখানকার মতাে ভগবানের সেবাদি নিয়ে থাকে। অপরটি ঐ রকম পুতুলের মতাে যুগযুগান্তর ধরে ধ্যানমগ্ন।
আমি—মা, ঠাকুর বলতেন যে ঈশ্বরকোটি নির্বাণের (নির্বিকল্প সমাধির ) পরও ফেরে, আর কেউ পারে না, এর মানে কি ?
মা—ঈশ্বরকোটি নির্বাণের পরও মনটি গুছিয়ে আনতে পারে।
আমি—যে মন লীন হয়ে গেল, সে মন কি করে ফিরে আসে? একটি জল পুকুরে ফেলে দিলে কি করে সেই জলটুকুই বেছে আনবে ?
মা—সব্বাই পারে না। যাঁরা পরমহংস তাঁরা পারেন। হাঁস, জল দুধ একত্র করে দাও, দুধটুকু বেছে খাবে।
আমি—সবাই কি নির্বাসনা হতে পারে ? 
মা—তা পারলে তাে সৃষ্টি ফুরিয়ে যেত। পারে না বলেই তাে সৃষ্টি চলছে পুনঃপুনঃ জন্মাচ্ছে। 
আমি—যদি গঙ্গায় দেহত্যাগ হয় ?
মা—বাসনা ফুরুলেই হয়, নইলে কিছুতেই কিছু নয়। বাসনা না ফুরুলে শেষ জন্ম হলেই বা কি হবে?
আমি—মা, এই অনন্ত সৃষ্টিতে কোথায় কি হচ্ছে কে জানে ? এই যে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র, ওতে কোন জীবের বাস আছে কি না কে বলবে? 
মা—মায়ার রাজ্যে সর্বজ্ঞ হওয়া একমাত্র ঈশ্বরেই সম্ভবে। ওসব গ্রহ-নক্ষত্রে কোন জীবের বাস নেই।
এই বৎসর বর্ষাকালে একদিন পুজনীয় শরৎ মহারাজ, যােগেন-মাও কয়েকজন ভক্ত জয়রামবাটী হইতে কামারপুকুর গিয়াছেন। সেখানে আছাড় খাওয়ায় যােগেন মার শরীরের কয়েক স্থান হইতে রক্ত পড়িয়াছে। আমি পূর্বেই ফিরিয়া মাকে যােগেনমার কথা বলাতে মা দুঃখ করিয়া বলিলেন, “গােলাপ বলেছিল, ‘যােগেন যে যায়, দেখি কটা আছাড় খায়।’ তার এই কথাটির মানরক্ষার জন্য যােগেন এই আছাড়টি খেলে। সাধুবাক্য তাে? জপ তপ করে কিনা, না ফলে যায় না। তাই সাধুদের কাউকে কিছু বলতে নেই।”

১৬-১-১২ (২রা মাঘ, ১৩১৮)
উদ্বোধন মায়ের ঘর, সকালবেলা 

আমি বলিলাম, “মা, চৈতন্যদেব নারায়ণীকে আশীর্বাদ করলেন, ‘নারায়ণি, তােমার কৃষ্ণে ভক্তি হােক’। তিন-চার বছরের মেয়ে অমনি ‘হা কৃষ্ণ' বলে ধুলােয় গড়াগড়ি দিতে লাগল। একটি গল্প আছে যে নারদের সিদ্ধিলাভের পর একটা পিঁপড়ে দেখে হঠাৎ কি রকম দয়া এল। ভাবলেন, “আমার কত জম্ম তপস্যার পর তবে সিদ্ধিলাভ হল, আর এর মানুষ হতেই তাে কত দেরি।' দয়ায় পিঁপড়ে টাকে আশীর্বাদ করলেন, ‘মুক্ত হয়ে যাও, মুক্ত হয়ে যাও।' অমনি পিঁপেড়টা পক্ষী, পশু, ইত্যাদি ইতর জীব-দেহ ধারণ করে ক্রমে মানুষ হ’ল। মানুষদেহে অনেক জন্ম ভােগ ক'রে ক'রে ক্রমে তপস্যায় মন এল এবং ভগবানকে আরাধনা করে মুক্ত হল। এ সব অসংখ্য জন্মের খেলা নারদের চোখের সামনে যেন মুহূর্তমধ্যে হয়ে গেল। তা মহাপুরুষের কৃপা হলে তাে যখন তখন হয়।” 
মা—তা হয়।
আমি—তবে শুনেছি, অপরের পাপের বােঝা নিয়ে শরীর থাকে না। যে শরীর দ্বারা অনেকের উদ্ধার হত, সেই শরীর হয়তাে একজনের জন্যই ক্ষয় হয়। 
মা—হাঁ, তার শক্তিও কমে যায়। যে সাধন-তপস্যায় শক্তির দ্বারা অনেকের উদ্ধার হত তা একজনের জন্যই ক্ষয় হয়ে যায়। ঠাকুর বলতেন, “গিরিশের পাপ নিয়ে আমার শরীরে এই ব্যাধি।’ তা গিরিশও এখন ভুগছে।
আমি—মা, আমি একদিন স্বপ্ন দেখি যে একটা লােক, মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, এসে তােমাকে খুব ধরে বসেছে, তুমি যাতে তাকে সদ্য সদ্যই কিছু করে দাও। সে তােমার কাছ থেকে পূর্বে মন্ত্র নিয়েছে। কিন্তু নিজে কোন সাধনভজন করবে না। তুমি বলছ, ‘একে যদি আমি এখন কিছু করে দিই, তা হলে আর আমি বাঁচব না, আমার দেহ থাকবে না। আমি দুহাতে তােমাকে নিষেধ করছি আর বলছি, ‘ওকে কেন করে দেওয়া? ও নিজে করতে পারবে, সাধন করুক।’ সে ঐরকম বারবার বলাতে তুমি যেন ত্যক্ত হয়ে তার বুক ও ঘাড় স্পর্শ করে কি করে দিচ্ছ এবং খানিক করতেই কেবল ঐ বলছ, ‘একে যদি আমি এখনি কিছু করে দি, তা হলে আমি আর বাঁচব না, আমার দেহ থাকবে না।' তখন স্বপন ভেঙে গেল। আচ্ছা, দেহধারণ করলে কি শক্তি সীমাবদ্ধ হয় ?
মা—হাঁ, তা হয়। এক একটা লোকের জ্বালায় ত্যক্ত হয়ে অনেক সময় মনে হয়, আর এ দেহ তাে যাবেই, তা যাক না এক্ষণি, দিয়ে দিই। এই যে রাধী রাধী করি, এ তাে একটা মোহ নিয়ে আছি। আমার পাগলা-টাগলাকে ভয় করে। আবার সেইটে আসে, না কি করে। তুমি (মঠে) চলে যাচ্ছ, ভয় হয়।
আমি—মা, ভগবান-দর্শন মানে কি জ্ঞানচৈতন্যলাভ? না আর কিছু? মা—জ্ঞানচৈতন্যলাভ না তো আর কি? নতুবা কি দুটো শিং বেরোয় ? 
আমি—এদের ( এখানকার অনেক ভক্তদের) ভগবান-দর্শন মানে অন্য রকম—তাঁকে চোখে দেখা, কথা বলা।
মা—’বাবাকে দেখিয়ে দাও, বাবাকে দেখিয়ে দাও’ বলছে। তিনি এত কারুর বাবা নন। ‘গুরু, কর্তা, বাবা’—এই তিনে তাঁর গায়ে কাঁটা বিঁধত। কত মুনি ঋষি যুগ-যুগান্তর তপস্যা করে পেলে না; তা সাধন নেই, তপস্যা নেই, এখনই দেখিয়ে দাও। আমি এত পারব না। তিনি কাকে দেখিয়ে দিয়েছেন বল না? 
আমি—আচ্ছা, মা, কেউ চাচ্ছে কিন্তু পাচ্ছে না। আবার কেউ চাচ্ছে মা, তাকে দিচ্ছেন—এ কথার মানে কি? 
মা—ঈশ্বর বালকস্বভাব কি না। কেউ চাচ্ছে, তাকে দিচ্ছেন না। আবার কেউ চায় না, তাকে সেধে দিচ্ছেন। হয়তাে তার পূর্বজন্মে অনেক এগুনো ছিল। তাই তার উপর কৃপা হয়ে গেল।
আমি—তা হলে কৃপাতেও বিচার আছে? 
মা—তা আছে বইকি। যার যেমন কর্ম করা থাকে। কর্ম শেষ হলেই ভগবান-দর্শন হয়। সেটি শেষ জন্ম।
আমি—মা, জ্ঞানচৈতন্যলাভ করতে হলে সাধন, কর্ম-ক্ষয়, সময়, এসব দরকার মানলুম। কিন্তু তিনি যদি আপন জন হন, তবে কি তিনি ইচ্ছা করলেই দেখা দিতে পারেন না?
মা—ঠিক কথা, তবে এ সুক্ষ্মটি তুমি যেমন ধরে বসেছ তেমনটি আর কে ধরে বসেছে ? সবাই ওটা একটা করতে হয় তাই করে যাচ্ছে; ঈশ্বরকে চায় ক'জনে? 
আমি—আমি তােমাকে আগে একদিন বলেছিলাম যে আপন মায়েরও যদি যত্ন স্নেহ না পায় তবে ছেলে মাকেও মা বলে জানে না।
মা—তা তাে ঠিক কথাই। দেখা না পেলে কোথা থেকে ভালবাসা হয় ? এই তােমার সঙ্গে দেখাটি হয়েছে—আমি তােমার মা, তুমি আমার ছেলে।

১২-১২, উদ্বোধন 

আজ রাত প্রায় সাড়ে নয়টার সময় মায়ের নিকট গিয়াছি। সমস্ত দিন যাই নাই দেখিয়া মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি আজ কোথায় ছিলে?”
আমি—নীচে হিসাব নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।
মা—প্রকাশ তাই বলছিল। যে ত্যাগ করেছে তার কি আর ওসব ভাল লাগে? ঠাকুরের মাইনে নিয়ে হিসাবে কি গোল ছিল, কম দিয়েছিল। আমি খাজাঞ্চীকে বলতে বলায় বললেন, “ছি ছি! হিসাব করব?
“ঠাকুর এইটি আমাকে বলেছিলেন, “যে তাঁর নাম নেয়, তার কোন দুঃখ থাকে না; তা আবার তােমার (শ্রীশ্রীমার) কথা? এটি তাঁর নিজ মুখের কথা। তাঁর ত্যাগই ছিল ভূষণ।”

৮-২-১২, উদ্বোধন 

ঠাকুরঘরের পাশের ঘরটির উত্তরধারে মাদুর কিংবা কম্বল পাতিয়া দেওয়া হইত। মা সকালবেলা ঐখানটিতে অনেক সময় বসিতেন। কখনও একটু জপ করিতেন-পূর্ব মুখ হইয়া বসিয়া। আমরা যখন এই ঘরে মার সঙ্গে কথাবার্তা বলিতাম, তখন প্রায়ই এইখানে বসিতাম। আজও মা এই স্থানে বসিয়া আছেন।
আমি—মা, তুমি দক্ষিণেশ্বরে কত দিন ছিলে? 
মা—তা অনেকদিন ছিলাম। যােল বছরের সময় এসেছি। তদবধি বরাবর ছিলুম। মধ্যে মধ্যে বাড়ি যেতুম। রামলালের বিয়ের সময় গিছছুল। দু-তিন বছর অন্তর যেতুম।
আমি—একা থাকতে ? 
মা—কখনও কখনও একা ছিলাম। আমার শাশুড়ী থাকতেন। মধ্যে মধ্যে গােলাপ, গৌরদাসী এর সব থাকত। ঐটুকু ঘর, ওরই মধ্যে রান্না, থাকা, খাওয়া সব। ঠাকুরের রান্না হত—প্রায়ই পেটের অসুখ ছিল কি না, কালীর ভােগ সহ্য হত না। অপর সব ভক্তদের রান্না হত। লাটু ছিল ; রামদত্তের সঙ্গে রাগারাগি করে এল। ঠাকুর বললেন, এ ছেলেটি বেশ, ও তােমার ময়দা ঠেসে দেবে। দিনরাত রান্নাই হচ্ছে। এই হয়তাে রামদত্ত এল। গাড়ি থেকে নেমেই বলছে, আজ ছােলার ডাল আর রুটি খাব।' আমি শুনতে পেয়েই এখানে রান্না চাপিয়ে দিতুম। তিন-চার সের ময়দার রুটি হতাে। রাখাল থাকত; তার জন্য প্রায়ই খিচুড়ি হতাে। সুরেন মিত্তির মাসে মাসে ভক্তসেবায় দশ টাকা করে দিত। বুড়ো গােপাল বাজার করত। নাচ, গান, কীর্তন, ভাব, সমাধি দিনরাতই চলছে। সামনে বাঁশের চেটাইয়ের বেড়া দেওয়া ছিল। তাই ফুটোফুটো করে দাঁড়িয়ে দেখতুম। তাই তাে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পায়ে হাত ধরে গেল। 
 “যদুর মা বলে একটি ঝি কিছুদিন ছিল। এক বুড়ি আসত, পূর্বে অসৎ ছিল। এখন বুড়াে হয়েছে, হরিনাম করে। একাটি একাটি; তবু ও আসছে ওর সঙ্গে কথা কইতুম। একদিন ঠাকুর দেখে বললেন, ওটাকে এখানে কেন?” আমি বললুম ‘ও এখন ভাল কথাই তাে কয়, হরিকথা কয় ; তাতে দোষ কি? মানুষের তাে আর মনে সব সময় পূর্বভাব থাকে না। তিনি বললেন, “ছি ছি। বেশ্যা ওর সঙ্গে কি কথা? শত হােক, রাম রাম!' পাছে কুবুদ্ধি শিখায় এই ভয়ে তিনি ওসব লােকেদের সঙ্গে কথাটি পর্যন্ত কইতে নিষেধ করতেন। এত করে আমাকে রক্ষা করতেন।
“কামারপুকুরে একজন তাঁকে দেখতে এসেছিল। লােকটা ভাল নয়। সে চলে যাবার পর ঠাকুর বললেন, ‘ওরে, দে, দে, ওখানটার এক ঝোড়া মাটি ফেলে দে।’ কেউ ফেলতে না যাওয়ায় নিজেই কোদালটা নিয়ে ঠনঠন করে খানিকটা মাটি ফেলে দিয়ে তবে ছাড়লেন। বললেন, ‘ওরা, যেখানে বসে, মাটিসুখ অশুদ্ধ হয়।’
“বাঙাল-দেশীয় দুর্গাচরণ আসত। তার কি গুরুভক্তিই ছিল! ঠাকুরের অসুখের সময় তার জন্য তিন দিন খুঁজে খুঁজে আমলকী এনে দিলে। তিন দিন আহার-নিদ্রা নেই। একবার শালপাতে প্রসাদ দিলুম (বাগবাজারের গঙ্গার ধারের গুদামওয়ালা বাড়িতে)। পাতাসুদ্ধ খেয়ে ফেললে ! কাল, শুকনাে চেহারা - কেবল চোখ দুটি বড় আর উজ্জ্বল ছিল। প্রেমের চক্ষু, সর্বক্ষণ প্রেমাশ্রুতে ভেজা থাকত।
“তখনকার কত সব কেমন ভক্ত ছিল। এখন যারা আসছে, কেবল বলছে, ঠাকুর দেখিয়ে দাও।' সাধন নেই, ভজন নেই, জপ-তপ নেই, কত জন্মে কত কি করেছে—কত গােহত্যা, ব্রহ্মহত্যা, ভ্রুণহত্যা করেছে ! সে সব ক্রমে ক্রমে কাটবে, তবে তাে ? আকাশে চাঁদটি মেঘে ঢেকেছে। ক্রমে ক্রমে হাওয়ায় মেঘটি 'সরে যাবে, তবে তাে চাঁদটি দেখতে পাবে। ফস করে কি যায় ? এও তাে তেমনি।
“ধীরে ধীরে কমক্ষয় হয়। ভগবানলাভ হলে ভেতরে ভেতরে তিনি জ্ঞানচৈতন্য দেন—নিজে জানতে পারে।”

৯-২-১২, উদ্বোধন 

গতরাতে গিরিশবাবু, দেহত্যাগ করিয়াছেন, সেই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, যারা মত্যুর পূর্বে অজ্ঞান হয়ে দেহত্যাগ করে, তাদের কি করে সদগতি হয়?
মা—অজ্ঞান হবার পূর্বে যে চিন্তাটি ছিল, যে চিন্তাটি নিয়ে অজ্ঞান হয়েছে, সেই চিন্তাটি অনুসারে গতি হয়।
আমি—হাঁ, গিরিশবাবুও সন্ধ্যা ছটার একটু পরে যে ‘জয় রামকৃষ্ণ, চল’ বলে -শুলেন, তারপর আর তেমন চৈতন্য হয় নাই। এর খানিকক্ষণ আগে কেবল ‘চল চল’ করছিলেন। ‘একটু, ধর না রে, বাপ’-এই সব। আমি বললুম, “কি আপনি কেবল ‘চল চল’ কচ্ছেন? আপনি এখন ঠাকুরের নাম করুন, যাতে ভাল হবেন।’ বার দুই আমি এই কথা বলাতে তিনি বললেন, ‘তা কি আর আমি জানি না?’ আমি ভাবলুম, বাবা, বুঝি ভেতরে ভেতরে হুশ রয়েছে।
মা—যে চিন্তাটি নিয়ে অজ্ঞান হ’ল, যেন ঐ চিন্তাটিতে ডুবে রইল। সব তাঁর কাছ থেকে এসেছে, তাঁর কাছে চলে যাবে। কেউ তাঁর বাহু হতে, কেউ পা হতে, কেউ লােম হতে হয়েছে—সব তাঁর অঙ্গ, অংশ।
গৌরমা উপস্থিত ছিলেন। তিনি কথাপ্রসঙ্গে বলিলেন, “ঠাকুর আর দুবার আসবেন বলেছেন। একবার বাউল সেজে।” 
মা—হাঁ, ঠাকুর বলেছিলেন, তােমার হুঁকোকলকে হাতে থাকবে। ভাঙা একটু পাথরের বাসন ঠাকুরের হাতে থাকবে। হয়তাে ভাঙা কড়ায় রান্না হবে। যাচ্ছেন তাে যাচ্ছেন—কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
“লক্ষী বলেছিল, ‘আমাকে তামাককাটা করলেও আর আসছি না।' তিনি হেসে বললেন, ‘আমি যদি আসি তাে থাকবে কোথা ? প্রাণ টিকবে না। কলমীর দল, এক জায়গায় বসে টানলেই সব আসবে।
‘বৃন্দাবনে রেল থেকে নামছি। ছেলেরা আগে নেমেছে। গােলাপ গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে দিচ্ছে। লাটুর হুকোকলকেগুলাে পড়ে ছিল, আমার হাতে দিয়েছে। লক্ষী বলছে, ‘এই তােমার হুকোকলকে ধরা হয়ে গেল।’ আমিও ‘ঠাকুর, ঠাকুর, এই আমার হুকোকলকে ধরা হয়ে গেল’ বলে ধূপ করে মাটিতে ফেলে দিয়েছি।”

২১-২-১২, উদ্বোধন, মায়ের ঘর 

মা চৌকির পার্শ্বে নীচে বসিয়া—সকাল সাতটা। স্বামী নির্ভয়ানন্দ দ্বারকাধাম গিয়াছেন। তিনি শ্রীশ্রীমাকে পত্র লিখিয়াছেন এবং গীর্ণারের দত্তাত্রেয়ের চাউল-প্ৰসাদ উহার মধ্যে পাঠাইয়াছেন। মাকে দিলে মা বলিতেছেন, “দত্তাত্রেয় কে?”
* গিরিশবাবুর গঙ্গায় যাইবার খুব ইচ্ছা হইয়াছিল। তাই ঐরুপ করিতেছিলেন। তাঁহার ভাতা অতুলবাবু বলিয়াছিলেন, “আমার ভাইকে আবার গঙ্গাযাত্রা।” আমি গিরিশবাবুর ইচ্ছা তখন বুঝিতে পারি নাই।
আমি—জড়ভরত, দত্তাত্রেয়—সেই ব্ৰক্ষর্ষি, ঈশ্বরকোটি।
মা—যেমন ঠাকুরের ছেলেরা? এরা সব ঈশ্বরকোটি না ? যােগীনকে অর্জুন বলতেন। স্বামীজীকে সপ্তর্ষি থেকে এনেছিলেন। বাবুরামকে নৈকষ্যকুলীন বলতেন। নিরঞ্জন, পূর্ণ, রাখাল।
আমি—বেলঘরিয়ার তারকবাবু ?
মা—হাঁ, ভবনাথ। ভবনাথকে নরেন্দ্রের প্রকৃতি বলতেন। শরৎকে কিছু বলতেন ?
আমি—জানি নে। বল না আর কে কি ? 
মা—কি জানি, আর জানি নে। শরৎকে ঈশ্বরকোটি বলেননি।
আমি—তুমি তো বলেছিলে, ‘শরৎ আর যােগীন (যােগানন্দ স্বামী) এ দুটি আমার অন্তরঙ্গ। আচ্ছা, ঈশ্বরকোটি কেউ কেউ সংসারে এমন হয়ে রয়েছে কেন ? স্ত্রী-পুত্র নিয়ে? 
মা—হাঁ, পচে মরছে ; পূর্ণকে জোর করে বিয়ে দিলে। বললে, ঠাকুরের ওখানে গেলে ইট পাটকেল মেরে তার গাড়ি ভেঙে দেব যখন কলকাতায় আসবেন।
আমি—বিয়েই নয় করলে। নাগ মহাশয়ও তাে বিয়ে করেছিলেন। এদের সব ছেলেপুলে, সংসার।
মা—হয়তাে বাসনা ছিল। কি জান? এ সৃষ্টির মধ্যে কত গােলমেলে (ব্যাপার)—ঠাকুর এটাকে দিয়ে সেটা করেন, হাড়ীর মাকে নিয়ে তাড়ীর মা, এটাকে দিয়ে সেটা কত কি!
পরে বলিতেছেন, “তা সংসার করলেও ঈশ্বরকোটি হতে পারে, তাতে দোষ কি?”
রাধুর অসুখ করিয়াছে—জর ও বেদনা। মা সেজন্য বড় চিন্তিত। বলিতেছেন, “আমি থাকতেই এর ভাল হ’ল না, তা এর পর কে আর ওকে দেখবে? তা হলে ও আর বাঁচবে কি?”
আমি—আর, যে ভক্তের ভিড় সমস্ত দিন! তোমার আর একটুও বিশ্রাম নেই।
মা—আমি তাে ঠাকুরকে দিনরাতই বলি, “ঠাকুর, এ সব কমিয়ে দাও, একটু বিশ্রাম পেতে দাও। তা হয় কই ? যে কদিন আছি এমনি হবে। এখন সব চারদিকে প্রচার হয়ে পড়েছে কিনা, তাই এত লােক। ব্যাঙ্গালােরে-বাপরে কত লােক। পথে রেল থেকে নামতে সব পুস্প বৃষ্টি হতে লাগল। এত উঁচু হয়ে গেল রাস্তা। ঠাকুরেরও শেষটায় কত লােক। আমি তাে এত বলি, ‘কুলগুরুর কাছে মন্ত্র নাও, তারা প্রত্যাশা করে। আমার তাে কিছু প্রত্যাশা নেই।' তা ছাড়ে না, কাঁদে। দেখে দয়া হয়। আর আমারও শেষ হয়ে এল। এখন যে কদিন আছি, এমনি হবেই।
আমি—না, না, তুমি এমন কথা কেন বলছ ? তােমার শরীর ভাল আছে। বিশেষ কোন কষ্ট তাে নেই। তবে কেন যেতে চাও? ও কথা বলে না।
এই সময়ে মায়ের মন কিছুদিন যাবৎ বড়ই উদাস ও বিষয় ছিল। 
নীচে গােলাপ-মা কাহারাে সহিত তর্ক করিতেছিলেন। 
মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “ওখানে কি তর্ক হচ্ছে আবার ?” 
আমি—গােলাপ-মা কি বকছেন।
মা—কথায় মত্ত হওয়া ভাল নয়। মন্দটাই ভেবে ভেবে দুঃখ পেতে হয়। গােলাপের সত্য কথা বলতে বলতে চক্ষুলজ্জা ভেঙে গেছে। আমি তাে চক্ষু লজ্জা কিছুতেই ছাড়তে পারি না। “অপ্রিয় বচন সত্য কদাপি না কয়।”
আর একদিনও গােলাপ-মা এইরূপ একজনকে অপ্রিয় সত্য বলিয়াছিলেন। তাহাতে মা বলিলেন, “ও কি গােলাপ, এ তােমার কি রকম স্বভাব হচ্ছে ?”
দুপুরে একটা মাথা-পাগলা লোক মার কাছে আসিয়া ভারী গােলমাল করিয়াছিল। সেই কথায় মা বলিতেছেন, “তিনি (ঠাকুর) কাউকে জানতেও দেননি—কত সাবধানে রেখেছিলেন। এখন আবার তেমনি বাজারে ঢাক পিটিয়ে দিয়েছে। মাস্টারই এরুপ করলে, যত কথা ‘কথামৃতে’ ছাপিয়ে দিয়ে মাথা বিগড়ে দিয়েছে। গিরিশবাবু ঠাকুরের উপর ঐ রকম জোর, গালমন্দ করেছে কি না, তাই ওরাও অমন করতে চাচ্ছে। 
“আর, কি কেবল এখানেই মন্ত্র নেওয়া ! মঠে সব ছেলেরা আছে। তাদের কাছে মন্ত্র নিতে পারে না? তাদের কি শক্তি নেই ? সবাই আমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমি এমন কথা পর্যন্ত বলেছি যে কুলগুরত্যাগে মহাপাপ হয়। তবু ফিরবে না।”
আমি—তুমি যে মন্ত্ৰ দাও, সে তাে ইচ্ছা করেই দাও।
মা—দয়ায় মন্ত্র দিই। ছাড়ে না, কাঁদে, দেখে দয়া হয়। কৃপায় মন্ত্ৰ দিই। নতুবা আমার কি লাভ? মন্ত্র দিলে তার পাপগ্রহণ করতে হয়। ভাবি, শরীরট তাে যাবেই, তবু এদের হােক।

২৪-৪-১২, উদ্বােধন, মায়ের ঘর 

দেড়টা বাজিয়াছে। দুপুরে খাওয়ার পর উপরে পান আনিতে গিয়াছি। শুনিলাম কাহারও সম্বন্ধে মা বলিতেছেন—
“স্বভাব ছাড়িতে নারে জীবের দায়, দায়। 
স্বভাব ছাড়িয়ে ভজে, ভক্তি তার পায়।” 
আমি—মা, এর মানে কি?
মা—মানুষ স্বভাব ছাড়তে পারে না। চৈতন্যদেব বলেছিলেন, ( পূর্ব) স্বভাব ছেড়ে যে আমার ভজনা করে, তাকে আমি ভজনা করি।
আমি—তুমি জয়রামবাটীতে সেই যে বলেছিলে, ‘স্বভাব বদলালে তাে হয়। আর একদিন বললে, কার কার প্রকৃতিটি এমন যে দেখলে ভালবাসতে ইচ্ছা করে, আবার কাউকে দেখলে কি রকম মনে হয়।’
মা–ঠিক বলেছ, বাবা। তাই তাে, স্বভাবই তাে সব। আর কি আছে ?
আমি—শরৎ মহারাজ গােলাপ-মার কথায় বলেছিলেন, “একটা ডাব দেবে তাে বাড়িসুদ্ধ চেঁচিয়ে বলবে। 
মা—হাঁ, এদের কি স্বভাব হয়েছে এখন। একটুতেই চেঁচিয়ে মেচিয়ে অস্থির করে। যােগেন আগে এমন ছিল, ধীর স্থির। এখন তা নেই। বাবা সহ্যগুণ বড় গুণ-এর চেয়ে আর গুণ নেই।
আমার বড় মাথা ধরিয়াছে। বৈকালে চারিটার সময় উপরে গিয়াছি। মাকে বলিলাম, “মা, বড় মাথা ধরেছে।” মা সব শুনিয়া বলিলেন, “বােধ হয় গরমে হয়েছে।” এই বলিয়া নিজে তাড়াতাড়ি গিয়া একটা পাতায় করিয়া খানিকটা ঘি ও কর্পুর জলে মিশাইয়া হাত দিয়া মাড়িতে মাড়িতে আনিয়া আমার সমস্ত কপালে মালিশ করিতে লাগিলেন। বলিলেন, “এ ওষুধ ঠাকুর লাগাতেন—তার যখন মাথা ধরত।” কয়েক মিনিট মালিশ করিবার পর আমারও একটু ভাল বােধ হইল! আমি নীচে আসিলাম। খানিক পরেই মাথাধরা ছাড়িয়া গেল। মাকে গিয়া বলিলাম, “মা, মাথাধরা থেমেছে।”
পােল্যান্ডের একটি মেম বেদান্তশিক্ষার জন্য ভারতবর্ষে আসিয়াছেন। কলিকাতায় শ্রীশ্রীমায়ের সংবাদ পাইয়া তাঁহাকে দর্শন করিতে আসিয়াছেন। মেমটি মায়ের সঙ্গে কিছু কথাবার্তা কহিলেন। তিনি ‘বাহাই’-সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করিয়া বলিলেন, উহাও শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষার অনুরুপ-সর্বধর্ম-সমম্বয়। কথায় মনে হইল মেমটি ঐ সম্প্রদায়ভুক্ত। 
মেমটি চলিয়া গেলে মাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “এই যে মেম এসেছিল, কেমন দেখলে ? 
মা—বেশ সব।
আমি—এরা কতদুর থেকে এসেছে। পােল্যাণ্ড রুশের রাজ্য। রুশজাপানে যুদ্ধ হয়েছিল না? সেই রুশের দেশ। 
মা—রুশিয়াদেশের লােক? ভয়ানক যােদ্ধার জাত! ধর্মশিক্ষার জন্য এদেশে এসেছে। লঙ্কায় তিন-চার মাস ছিল। 
আমি—এখন সব চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কোথায় পােল্যান্ড, আর কোথায় ‘উদ্বোধন’ আফিস ! তোমার তাে মা ধারণাও নেই।
মা—ঠাকুর ভাবাবস্থায় বলেছিলেন, ‘এর পর ঘরে ঘরে আমার পূজা হবে। আমার যে কত লোক তার কুলকিনারা নেই।’ নিবেদিতা বলেছিল, 'মা, আমরাও বাঙালী। কর্মবিপাকে ওদেশে জম্মেছি। তা দেখবে আমরাও এমন বাঙালী হয়ে যাব যে ঠিক ঠিক।’ ওদের (নিবেদিতা প্রভৃতির) এই শেষ জন্ম।

১৯শে বৈশাখ, ১৩১৯, উদ্বোধন, ঠাকুরঘর, সকাল সাতটা 

শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্র চক্রবর্তী কয়েকদিন পূর্বে সস্ত্রীক শ্রীশ্রীমাকে দর্শন করিতে আসিয়াছিলেন। পরে একদিন তিনি একা আসিয়াছেন। মাকে প্রণাম করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “সেদিন ওটিকে (স্ত্রীকে) কেমন দেখলেন ?” মা বলিলেন, “বেশ ভাল।”
সুরেনবাবু—আমার কিন্তু ভাল লাগে না। 
মা—তােমাদের এখন ঐ এক ভাব হয়েছে। 
সুরেনবাবু—মা, আমরাই কেবল ঠাকুরের দর্শন পেলুম না।
মা—পাবে বইকি। তােমাদের এই শেষ জন্ম। নিবেদিতা বলেছিল, 'মা, আমরাও বাঙালী, কর্মের ফেরে প্রীষ্টান হয়ে জন্মেছি।’ ওদেরও এই শেষ জন্ম।
মা এইরুপ মাঝে মাঝে অনেকের শেষ জন্ম বলিতেন। তাই মনে করিয়া আজ তাঁহাকে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, ‘শেষ জন্ম' কথাটার মানে কি? ঠাকুর অনেকের শেষ জন্ম বলেছেন, তুমিও বলছ।” 
মা—শেষ জন্ম মানে—তার আর যাতায়াত হবে না, এই জন্মেই শেষ হয়ে গেল। আমি—এদের তাে অনেকের বাসনা আছে দেখা যায়-সংসার, ছেলেপুলে, পরিবার। বাসনা না গেলে কি করে যাতায়াত ফুরুবে ? 
মা—তা তিনি (ঠাকুর) যাকে যা বলেছেন সব সত্য তাে। মিথ্যা তাে হবার জা নেই। এখন বাসনা থাকুক, আর যাই করুক, তিনি দেখেছেন শেষে তা থাকবে না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।
আমি—তা হলে শেষ জন্ম মানে কি নির্বাণ ? 
মা—তা বইকি। হয়তাে দেহ যাবার সময় মন নির্ব্বাসনা হবে।
আমি—মা, ঠাকুর অনেককে আপনার জন বলেছেন, এর মানে কি ? 
মা—ঠাকুর বলতেন, তারা কেউ শরীর থেকে, কেউ লােমকুপ থেকে, কেউ হাত-পা থেকে বেরিয়েছে। তারা সব সঙ্গের সঙ্গী।’ যেমন যখন রাজা কোথাও যায়, সব সঙ্গের লােকজন তথায় যায়। আমি যদি জয়রামবাটী যাই, আমার সঙ্গের যারা তারা সব যাবে না। তেমনি যারা আপনার, তারা সব যুগে যুগে সঙ্গী। ঠাকুর বলতেন, যারা অন্তরঙ্গ তারা ব্যথার ব্যথী।’ এই সব ছেলেদের দেখিয়ে বলতেন, “এরা আমার সুখে সুখী, দুঃখে দুখী, ব্যথার ব্যথী।' তিনি যখন আসেন, তখন সব হাজির। নরেনকে সপ্তর্ষি থেকে এনেছিলেন তাও সবটা আসেনি। শম্ভু মল্লিককে মা কালীর পেছনে দেখেছিলেন-দক্ষিণেশ্বরে কালীঘরে ধ্যান করবার সময়। বলরামবাবুকে যেমন চেহারা অমনি দেখেছিলেন। প্রথম দেখাতেই বলেছিলেন, 'ঠিক অমনি দেখেছি, মাথায় পাগড়ি, গৌরবর্ণ।’ আর সুরেন মিত্তির। বলতেন, এই তিনজন রসদদার।’ একদিন ঠাকুর বললেন, ‘ওর মা কালীকে ভােগ নিবেদন না করে ছবিকে ( ঠাকুরের ছবিকে) কেন দিলে?* আমরা অকল্যাণ হবে বলে মনে মনে ভয় পেলুম। ঠাকুর বললেন,ওগাে, তােমরা কিছু ভেবাে না-এর পর ঘরে ঘরে আমার পূজা হবে। মাইরি বলছি-বাপান্ত দিব্যি।’

* একবার কতকগুলি ভক্ত মিষ্টান্নাদি লইয়া দক্ষিণেশ্বরে যায়। গিয়া দেখে ঠাকুর সেখানে নাই। তখন তিনি চিকিৎসা কাশীপুরে আছেন। ভক্তেরা সেই সব দ্রব্য ঠাকুরের ছবির সামনেই দিয়া প্রসাদ গ্রহণ করে।

“এত করে বলা আবার কার জন্য? না আমার আর লক্ষীর জন্য। আমাদের তখন অল্প বয়স। অত কি বুঝি?
“এখনকার লােক সব সেয়ানা—ছবিটি তুলে নিয়েছে। এই যে মাস্টার মশায়—এরা কি কম লােক গা? যত কথা সব লিখে নিয়েছে। কোন অৰতারের ছবি আছে, বা কথাবার্তা এই রকম করে লেখা আছে?” 
আমি—'কথামৃত’ সম্বন্ধে মাষ্টার মশায় বলেছিলেন যে দশ-বার খণ্ড বেরুলে তবে সব কথা বের হতে পারে। তা এত কথা আর কবে বের হবে ?
মা—হাঁ, বয়েস হয়েছে, হয়তাে পূর্বেই বা সরে পড়লে।
আমি—মা, তুমি যে আমাকে জয়রামবাটীতে বলেছিলে, ঠাকুর শ্বেতকায় ভক্তদের ভেতর আসবেন। না কি ?
মা—না, তাঁর অনেক শ্বেতকায় ভক্ত আসবে, তাই বলেছি। যেমন এখন সব খ্রীষ্টানরা আসছে না? ঠাকুর বলেছিলেন যে একশো বছর পর আবার আসবেন। এই একশ বছর ভক্ত হৃদয়ে থাকবেন। গােল বারান্দা হতে বালি, উত্তরপাড়ার দিকে দেখিয়ে বলছিলেন। আমি বললুম, ‘আমি আর আসতে পারব না।' লক্ষী বলেছিল, ‘আমাকে তামাককাটা করলেও আর আসব না।' ঠাকুর হেসে বললেন, ‘যাবে কোথা ? কলমীর দল, এক জায়গায় বসে টানলেই সব এসে পড়বে।'
“আর এত কথারই বা দরকার কি? ঠাকুর বলতেন, “আম খেতে এসেছ, আম খেয়ে যাও। অত পাতা ডাল গুণে কি হবে?” 
আমি—কিন্তু মা, কিছু প্রত্যক্ষ না দেখলে কি করে কি হবে? একবার এক মুসলমান ফকিরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘পুকুরে কি নদীতেই লােকে মাছের আশায় ছিপ ফেলে বসে, গােপদের জলে তাে মাছ ধরবার জন্য ছিপ ফেলে বসে না ! কিছু টের পেয়েছেন কি, যার আশায় ফকির হয়েছেন? 
মা—সে কি বললে? 
আমি—কি আর বলবে?
এই কথা শুনিয়া মা ঐ বিষয়ে একটু চিন্তা করিয়া বলিলেন, “ঠিক কথা, তাই তাে। কিন্তু উপলদ্ধি না হলে কি করে কি হবে? তবে বিশ্বাস করে যেতে হয়।”
আমি—শরং মহারাজ সেদিন বললেন এবং স্বামীজীও বলেছিলেন, ‘মনে কর পাশের ঘরে একতাল সােনা রয়েছে। একটা চোর এ পাশের ঘর থেকে তা জানতে পেরেছে। মাঝে দেয়াল, তাই নিতে পারছে না। সে লােকটার কি আর ঘুম আসবে? সব সময় ঐ ভাববে—কি করে সােনার তালটা নিতে পারবে। তেমনি এহেন ঈশ্বর বলে কেউ আছেন, এ যদি মানুষ ঠিক ঠিক বুঝতে পারত, তাহলে কি আর এই সব সংসার-ফংসার করতে পারত? 
মা—সে তাে ঠিক কথাই।। 
আমি—যাই বল মা, ত্যাগ-বৈরাগ্যই প্রধান। আমাদের কি হবে না ?
মা—হবে বই কি। ঠাকুরের শরণাগত হলে সব হয়। তাঁর ত্যাগই ছিল ঐশ্বর্য। তিনি ত্যাগ করেছিলেন বলে এখন আমরা সব তাঁর নামে খাচ্ছি দাচ্ছি। লােকে ভাবে, তিনি এত বড় ত্যাগী ছিলেন, তার ভক্ত এরা না জানি কত বড় হবে। 
“আহা, একদিন খেয়ে নবতের ঘরে গেছেন। বেটুয়ায় মসলা ছিল না। দুটি যােয়ান মৌরি খেতে দিলুম, আর দুটি কাগজে মুড়ে হাতে দিলুম, বললুম, নিয়ে যাও।' তিনি নহবতের ঘর থেকে ঘরে যাচ্ছেন। কিন্তু ঘরে না গিয়ে সােজা দক্ষিণদিকের নহবতের কাছের গঙ্গার ধারের পােস্তায় চলে গেছেন—পথ দেখতে পান নি, হুশও নেই। বলছেন, ‘মা’, ডুবি ? মা, ডুবি?' আমি এদিকে ছটফট করছি -ভরতি গঙ্গা। বউ মানুষ, বেরুই না, কোথাও কাউকে দেখিও না। কাকে পাঠাই ? শেষে মা কালীর একটি বামুন এদিকে এল। তাকে দিয়ে হৃদয়কে ডাকালাম। হৃদয় খেতে বসেছিল, তাড়াতাড়ি এঁটো হাতেই দৌড়ে একেবারে ধরে তুলে নিয়ে এল। আর একটু হলেই গঙ্গায় পড়ে যেতেন।”
আমি—দক্ষিণমুখাে কেন গেলেন?
মা—হাতে দুটি যােয়ান দিয়েছিলুম কিনা। সাধুর সঞ্চয় করতে নেই, তাই পথ দেখতে পান নি। তাঁর যে যােল আনা ত্যাগ।
“পঞ্চবটীতে এক বৈষ্ণব সাধু এসেছিল। প্রথমটায় তার বেশ ত্যাগ ছিল। আহা, শেষে ইদুরের মতাে টেনে হিঁচড়ে ক্রমে ঘটিটি, বাটিটি, হাঁড়ি, কলসী, চাল, ডাল, এসব গােছাতে লাগল। ঠাকুর একদিন তাই দেখে বললেন, যাঃ রে, এবার মারা পড়বে।'—কিনা মায়ায় বন্ধ হতে চলল। ঠাকুর তাকে খুব ত্যাগের উপদেশ দিলেন, আর সে স্থান ছেড়ে যেতে বললেন। তবে সে পালাল।”
জনৈক ভক্ত প্রণাম করিতে আসিয়াছিলেন। প্রণাম করিয়া যাইবার পর মা বলিতেছেন, “আমি একবার ঠকেছি কি না সেই হরিশকে আদর কয়ে। তাই এখন আর যত্ন স্নেহ কাউকে দেখাই না।”

১৫-১২, বৈশাখী পূর্ণিমা, উদ্বোধন 

সকালবেলা মায়ের চিঠি পড়িয়া শুনাইতে গিয়াছি। মা তাঁহার ঘরের দক্ষিণপাশের ঘরে উত্তরদিকে দরজার নিকট বসিয়া। আমি ঠাকুরঘর হইতে পড়িয়া মাকে কি একটা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। মা বলিলেন, “এদিকে এসে বসে কথা বল।” আমি গিয়া বসিলাম। 
আমি—এক ভক্তের মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে চিঠি লিখেছে আসবে বলে। প্রণাম জানিয়েছে। সে যে চিঠি লিখেছে এ কথা যেন তার শ্বশুরবাড়িতে না জানে। 
মা—থাক, তবে আর জবাব দিয়ে কাজ নেই। আবার বাড়িতে জানবে না। আমি অত লুকোচুরি জানি নে। জয়রামবাটীতে যােগেন্দ্র (পিয়ন) চিঠির জবাব লিখে দিত। অনেকে বলত, “পিয়ন চিঠি পড়ে?'—কিনা যাকে তাকে দিয়ে চিঠি পড়ান। কেন? আমার কাছে কোন কপট কিছু, তাে নেই? আমার চিঠি যে ইচ্ছা সে দেখবে। এক ভক্ত লিখিয়াছে, মা কবে জয়রামবাটী যাইবেন। আমি মাকে বলিলাম, “লিখে দিই, অগ্রহায়ণ মাসে যাবেন—জগদ্ধাত্রী পূজার সময়।”
মা—না, না, ওসব কি ঠিক বলা যায় ? কখন কোথায় থাকি ; সব তাঁর হাত। মানুষ এই আছে, এই নাই। 
আমি—না, তুমি অমন কেন বলছ ? তুমি আছ বলে এত লােক আসছে, শান্তি পাচ্ছে।
মা—তাই তাে। 
আমি—তুমি আমাদের জন্য থাক।
মা করুণস্বরে ভক্তদের জন্য কাঁদ কাঁদ হইয়া বলিতেছেন, চক্ষে জল,-“আহা, এরা আমাকে যত ভালবাসে আমিও এদের তত ভালবাসি।” আমি হাওয়া করিতেছিলাম। করুণকণ্ঠে বলিলেন, “আশীর্বাদ করি বাবা, বেঁচে থাক, ভক্তি হােক, শান্তিতে থাক—শান্তিই প্রধান, শান্তিই চাই।”
আমি—মা, এইটিই কেবল আমার মনে জাগে-ঠাকুরের কেন দেখা পাই না? তিনি যখন আপনার জন, আর ইচ্ছা করলেই দেখা দিতে পারেন, তখন কেন তিনি দেখা দেন না ?
মা—তাই তাে, এত দুঃখকষ্টেও যে কেন তিনি দেখা দেন না, কে জানে ? রামের মার (বলরামবাবুর স্ত্রীর) অসুখ হয়েছিল। ঠাকুর আমায় বললেন, ‘যাও, দেখে এসগে।’ আমি বললুম, ‘যাব কিসে? গাড়ি টাড়ি নেই।' ঠাকুর বললেন, “আমার বলরামের সংসার ভেসে যাচ্ছে আর তুমি যাবে না? হেঁটে যাবে। হেঁটে যাও।' শেষে পালকি পাওয়া গেল। দক্ষিণেশ্বর থেকে আসলুম। দুবার এসেছিলুম। আর একবার—তখন আমি শ্যামপুকুরে রাত্রে হেঁটে রামের মার অসুখ দেখতে আসলুম। দেখ, সেই বলরামের পৌত্র কি সময়ে (নিতাইবাবুর মার শ্রাদ্ধদিনে) মারা গেল। একদিনও কি আগ পাছ হতে নেই ? তিনি যদি এ বিপদে না দেখবেন, না দেখা দেবেন, তবে মানুষ যাবে কোথা? 
আমি—দুঃখকষ্ট শরীরধারণ করলে আছেই। তাকে দুঃখ দূর করতেও বলি না। কিন্তু তিনি কি দুঃখকষ্টে  দেখা দিয়ে প্রবােধ দিতেও পারেন না।
মা—আহা, তাই তাে। এই রামের মা, রামের বউ, এরা আসল। ভাবলে যাই, মায়ের কাছে যাই। এখানে এসে তবু খানিকটা শান্তি পেলে। তাই তাে ঠাকুরকে বলতুম। তিনি বলতেন, “আমার লাখ লাখ আছে। আমার তা ( জিনিস) আমি পেছন দিকে কাটব, ন্যাজে কাটব, মারব।’
আমি—আমরা যে কষ্ট পাই তা তিনি দেখবেন না ?
মা—তা তােমার মত কত আছে তাঁর। তিনি বলতেন, “চিদানন্দসিন্ধু’ এমন কত উঠছে, কত ডুবছে, কুলকিনারা নেই।
আমি—মা, যারা এমনিভাবে এই ডালগােলার লোকগুলির মতাে আছে (তখন ‘উদ্বোধনের’ সামনে ডালগােলা ছিল।) তারা বেশ আছে। কিন্তু মা, যাদের খানিক হুশ হয়েছে, যারা তাঁকে চায়, তারা যদি দেখা না পায় তাদের যে কি কষ্ট, তারাই জানে।

১. রামবাবুর এই একমাত্র পুত্র মারা যাইবার পর তাঁহারা সান্ত্বনা পাইয়া চলিয়া গেলে মা আমাকে বলিলেন, “পেটের ছেলে, রক্তমাংসের শরীর থেকে বেরােয়, তাই এত মায়া। মাগুলােয় যত কষ্ট। মায়া কি করে যাবে?"

মা—হাঁ, তাই তাে। ওরা বেশ আছে। খাচ্চে দাচ্চে, আছে। ভক্তদেরই যত কষ্ট।
আমি—তােমার কি এদের ( ভক্তদের) দুঃখকষ্ট দেখে কষ্ট হয় না? 
মা—আমার কি কষ্ট ? যাঁর জগৎ তিনিই দেখছেন। 
আমি—ভক্তদের জন্য তােমার আসতে ইচ্ছা হয় না? 
মা—দেহধারণে যা কষ্ট! আর না, আর না—আর যেন আসতে না হয়। ঠাকুরের অসুখের সময় দুর্গাচরণ, তিন দিন খাওয়া নেই, দাওয়া নেই, খুঁজে খুঁজে আমলকী আনলে। ঠাকুর খেতে চেয়েছিলেন। ঠাকুর তাকে প্ৰসাদ করে দিতে গিয়ে ভাত বেশ এত কটা খেলেন। বললুম, এই তাে বেশ খাচ্ছ, তবে আর সুজি খাওয়া কেন? ভাত দুটি দুটি খাবে।' ঠাকুর বললেন, “না, না, শেষ অবস্থায় এই আহারই ভাল।’ এক একদিন নাক দিয়ে, গলা দিয়ে সুজি বেরিয়ে পড়ত—অসহ্য কষ্ট হত। আহা, তারকেশ্বরে বাবার কাছে হত্যা দিতে গেলুম, তাতেও কিছু হ’ল না। একদিন যায়, দুদিন যায়, পড়েই আছি। রাতে একটা শব্দ পেয়ে চমকে উঠলাম—যেমন অনেকগুলো হাড়ি সাজান থাকলে তার উপর ঘা মেরে যদি কেউ একটা হাঁড়ি ভেঙে দেয়, সেই রকম শব্দ। জেগেই হঠাৎ আমার মনে এমন ভাব এল, ‘এ জগতে কে কার স্বামী? এ সংসারে কে কার? কার জন্য আমি এখানে প্রাণহত্যা করতে বসেছি ?’—একবারে সব মায়া কাটিয়ে এমনি বৈরাগ্য এনে দিলে ! আমি উঠে গিয়ে অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে মন্দিরের পিছনে কুণ্ড থেকে স্নানজল নিয়ে চোখে মুখে দিলাম, খানিকটা খেলুম—পিপাসায় গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, না খেয়ে পড়েছিলুম কিনা। তবে প্রাণ একটু সুস্থ হ'ল। তার পরদিনই চলে আসি। আসতেই ঠাকুর বললেন, “কিগো, কিছু হ’ল?—কিছুই না!' ঠাকুরও স্বপ্নে দেখেন ওষুধ আনতে হাতী গেল। হাতী মাটি খুঁড়ছে ওষুধের জন্য। এমন সময় গােপাল এসে স্বপ্ন ভেঙে দিলে। আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, ‘তুমি স্বপ্নটপ্ন দেখ ?
“দেখলুম, মা কালী ঘাড় কাত করে রয়েছেন। বললুম, ‘মা, তুমি কেন এমন করে আছ?' মা কালী বললেন, 'এর ঐটের জন্য (ঠাকুরের গলার বা দেখিয়ে), আমারও হয়েছে।' ঠাকুর বললেন, ‘যা ভোগ আমার উপর দিয়েই হয়ে গেল। তােমাদের আর কারুকে কষ্ট ভােগ করতে হবে না। জগতের সকলের জন্য আমি ভােগ করে গেলুম।’ গিরিশের পাপ নিয়ে এই ব্যাধি। তা গিরিশও শেষটায় ভুগলে।
“যত ভােগ, সব এখানেই তাে (পৃথিবীতে) হচ্ছে। আর কোথায় কি ? ভুগে ভুগে, ঢাক ঢােল সব বাজিয়ে শেষে ধুনুরীর হাতে পড়ে তবে তুঁহু, তুঁহু ডাক ছাড়ে।”
আমি—তা এর পর কি আর তােমার আমাদের মনে থাকবে?
মা—সেখানের আনন্দ পেলে হয়তাে এ মনে থাকবে না। বাবা, কালই প্রধান। কালবেশে কি হবে কে জানে?
আমি—কালবশেও হচ্ছে, আবার কালজয়ীও তাে আছে? 
মা—হাঁ, তাও আছে। 
আমি—মা, তুমি সুস্থ থাক, তবেই তাে হয়।
আটটা বাজিয়াছে। মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আটটা কি বেজেছে ? বােধ হয় বেজেছে। যাই, বাবা, পুজো করতে যাই।”
এই বলিয়া উঠিতেছেন ও বলিতেছেন, “আর, বাবা, আশীর্বাদ কর, যাতে সুস্থ থাকি।” 
পূজা হইয়া গেলে মায়ের চিঠি পড়িয়া শুনাইতে গিয়াছি। তাঁহার কৃপাপ্রাপ্ত জনৈক ভক্তের কাশীলাভ হইয়াছে। শুনিয়া মা বলিলেন, “মরতে তাে হবেই একদিন। কোথায় কোন পুকুরপাড়ে ডোবায় মরত—তা না হয়ে কাশীলাভ হল।”
মামাদের পত্রে অর্থের আকাক্ষা ও ঝগড়া-বিরােধের কথা আছে। আমি বলিলাম, “তাদের খুব ক'রে টাকা দাও। ঠাকুরকে বল। বেশ ভােগ করুক, যাতে নিবৃত্তি হয়।”
মা—ওদের কি আর নিবৃত্তি আছে ? ওদের কিছুতেই নিবৃত্তি হবে না। শত দিলেও না। সংসারী লােকদের কি আর নিবৃত্তি হয় ? 
“ওদের ওখানে কেবল দুঃখের কাহিনী। কেলেটাই কেবল টাকা টাকা করে। আবার ওর দেখাদেখি প্রসন্নও এখন করছে। বরদা কখনও চায় না, বলে-দিদি কোথায় টাকা পাবে?
আমি—পাগলীও না। 
মা—তাকে দিলেও নেয় না।
আমি—ওঁদের ওখানে কেন জন্ম নিলে ?
মা—কেন? আমার বাপ মা বড় ভাল ছিলেন। বাবা বড় রামভক্ত ছিলেন। নৈষ্ঠিক, অন্য বর্ণের গ্রহণ করতেন না। মায়ের কত দয়া ছিল। লােকদের কত খাওয়াতেন, যত্ন করতেন, কত সরল। বাবা তামাক খেতে খুব ভালবাসতেন। তা এমন সরল অমায়িক ছিলেন যে, যে কেউ বাড়ির কাছ দিয়ে যেত, ডেকে বসাতেন, আর বলতেন, ‘বস ভাই, তামাক খাও।' এই বলে নিজেই ছিলিম ছিলিম তামাক সেজে খাওয়াতেন। বাপ মায়ের তপস্যা না থাকলে কি (ভগবান) জন্ম নেয় ?

২৫-৬-১২, উদ্বোধন 

ঠাকুরঘরের পাশের ঘরে মায়ের তত্ত্বাপোশের নিকটেই বসিয়া সকালবেলা কথা হইতেছে।
আমি—মা, এই যে কেউ কেউ বলেন, মঠের সেবাশ্রম, হাসপাতাল, বইবেচা, হিসাব-নিকাশ প্রভৃতি সাধুরা যে করছে, এ ভাল নয়। ঠাকুর কি এসব কিছু করেছিলেন। নুতন নূতন যারা ব্যাকুলতা নিয়ে মঠে ঢুকছে, তাদের ঘাড়ে এই সব কর্ম চাপিয়ে দিচ্ছে। কর্ম করতে হয়তাে পূজা, জপ, ধ্যান, কীর্তন-এই সব করবে। অন্য সব কর্ম বাসনা জড়িয়ে ঈশ্বর থেকে বিমুখ করে।
মা—তােমরা ওদের কথা শুনো না। কাজ করবে না তো দিনরাত কি নিয়ে থাকবে? চব্বিশ ঘণ্টা কি ধ্যানজপ করা যায় ? ঠাকুরের কথা বলছে—তাঁর আলাদা। আর তাঁর মাছের ঝােল, ঘিয়ের বাটি মথুর যােগাত। এখানে একটি কাজ নিয়ে আছ বলে খাওয়াটি জুটছে। নইলে দুয়ারে দুয়ারে কোথায় একমুঠোর জন্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে। শরীরে অসুখ হয়ে পড়বে। আর কেই বা এখন সাধুদের এত ভিক্ষা দিচ্ছে ? তােমরা ওসব কথা কিছু শুনাে না। ঠাকুর যেমন চালাচ্ছেন তেমনি চলবে। মঠ এমনিভাবেই চলবে। এতে যারা পারবে না তারা চলে যাবে।
“মণি মল্লিক সাধু, দেখে এসে ঠাকুরকে বললে। ঠাকুর বললেন, “কি গাে, কেমন সব সাধু দেখলে ? সে বললে, ‘হাঁ, দেখলুম তাে, তবে।' ঠাকুর বললেন, “তবে কি ?' মণি মল্লিক বললে, ‘সব্বাই পয়সা চায়।' ঠাকুর বললেন, “কি আর পয়সা চায়? হয়তাে একটা পয়সা, গাজা কি তামাক খাবে—এই পর্যন্ত। তােমার বিয়ের বাটি, দুধের বাটি, গদি—এ সব চাই। আর তার একটা আধটা পয়সা মাত্র—হয়তাে একটু তামাক কি গাঁজা খাবে। এও চাই নে ? সব ভােগ তােমারই করবে? আর তারা এক পয়সার তামাকও খাবে না?
আমি—বাসনা থেকেই ভােগ। চৌতলা বাড়িতে বাস করলেও যার বাসনা নেই তার কিছুই না। আর গাছতলায় বাস করেও বাসনা থাকলে ঐ থেকেই সব ভােগ এসে পড়ে। ঠাকুর বলতেন, ‘মহামায়ার এমনি খেলা যে, যার তিন কুলে কেউ নেই তাকে দিয়েও একটা বেরাল পুষিয়ে সংসার করাবে।’
মা—তাই তো; বাসনা থেকেই সব। বাসনা না থাকলে কিসের কি ? এই যে আমি এসব নিয়ে আছি, কই, আমার তাে কোন বাসনা হয় না—কিছুই না। 
আমি—তা তােমার আবার বাসনা কি ? মা, আমাদের ভেতরে কত কি তুচ্ছ বাসনা উঠছে, এসব কি করে যাবে ? 
মা—তােমাদের ওসব কোন বাসনা নয়। ও কিছু নয়। মনের খেয়ালে অমনি উঠছে, যাচ্ছে। ওসব যত বেরিয়ে যায় তত ভাল।”*
আমি—কাল বসে বসে ভাবছিলুম যে ঈশ্বর যদি রক্ষা না করেন তাে কাঁহাতক মনের সঙ্গে লড়াই করা যায়? এক বাসনা যাচ্ছে তাে অন্য বাসনা উঠছে।
মা—যতক্ষণ ‘আমি’ রয়েছে ততক্ষণ বাসনা তাে থাকবেই। ওসব বাসনায় তােমাদের কিছু হবে না। তিনিই রক্ষা করবেন। যে তাঁর শরণাগত, যে সব ছেড়ে তাঁর আশ্রয় নিয়েছে, যে ভাল হতে চায়, তাকে তিনি যদি রক্ষা না করেন, সে তাে তাঁরই মহাপাপ। তাঁর উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। তিনি ভাল করতে হয় করুন, ডােবাতে হয় ডােবান। তবে ভাল কাজটি করে যেতে হয় আর তাও তিনি যেমন শক্তি দেন।
আমি—আমার কি সেই নির্ভর আছে ? হয়তাে খানিকটা নির্ভর আসে, আবার তা চলে যায়। তিনি যদি নিজে রক্ষা না করেন তাে উপায় কি ? মনে ভাবি, এখন মা, তুমি আছ, আপদ হােক, বিপদ হােক, এসে তােমার কাছে বলি,তােমার মুখ চেয়ে শান্তি পাই। এর পর কে রক্ষা করবে ? তুমি যদি ফিরে চাও, তবে তাে হয় ?

*জনৈক ত্যাগী ভক্ত একবার মাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, 'মা, সাধন-ভজন তাে করা যাচ্ছে, চেষ্টাও কম করছি না, কিন্তু মনের আবর্জনা যেন কমছে না।” মা বলিলেন, 'নাটাইতে সুতে যেভাবে গুটিয়েছে- লাল সুতো,কাল, সাদা - খোলবার সময় তেমনি করে করে খুলবে তো?”

মা—ডয় কি বাবা ? তােমার কোন ভয় নেই। তােমাদের সংসার, পরিবার, ছেলেপুলে—এসব তাে কিছু হবে না, তােমাদের ভয় কি ? আর এর মধ্যে, আমি থাকতেই তােমরা তৈরী হয়ে যাবে।
আমি—ভাবি, ঈশ্বর যদি ফিরে না চান তাে জপতপেই বা কি হবে ? তিনি যদি রক্ষা করেন, তবেই রক্ষা।
মা—না, তোমার কোন ভয় নেই। তিনি রক্ষা করবেন। তুমি কিছু, ভেবাে না।

৭-৭-১২, উদ্বােধন 

আমি—মা, তুমি রথযাত্রার সময় জগন্নাথ যাবে, কথা ছিল না?
মা—এখন এত লােকের ভিড়ের মধ্যে যেতে আছে ? কলেরা টলেরা হবে। লক্ষীকান্ত (পাণ্ডা) বললে, এখনই ঘর সব ভাড়া হয়ে গেছে, স্থান নেই। ছােট ছােট ঘরগুলি পর্যন্ত দশ টাকা। শীতকালে যাবেন।’
আমি—জগন্নাথ কি মূর্তি ? 
মা—আমি কিন্তু স্বপনে দেখেছিলুম শিবমূর্তি। 
আমি—তখন তুমি সেখানে এই জগন্নাথ-মূর্তি দেখনি?
মা—না, শুধু, শিবমূর্তি—শিবলিঙ্গ। লক্ষ শালগ্রামের বেদী, তার উপর জগন্নাথ শিব। একটা কিছু না থাকলে কি আর এত লোক হয় ? বিমলা দেবী আছেন। তাঁর বলি হয় মহাষ্টমীর রাত্রে। বিমলা দুর্গা তাে? কাজেই শিব থাকবেন না?
আমি—কেউ কেউ বলে বৌদ্ধমন্দির, বুদ্ধমূর্তি। তারপর শঙ্করাচার্য যখন বৌদ্ধদের তাড়ালেন, তখন ঐ মূর্তিকেই আবার শিবমূর্তি করে তুললে। পরে আবার বৈষ্ণবধর্ম-প্রচারের সঙ্গে শিবকে জগন্নাথ-বিষ্ণু করে দিলে।
মা—কি জানি, আমি কিন্তু শিব দেখেছিলাম।
আমি—মুসলমানেরা কত মন্দির, কত দেবদেবী ভেঙেছে, কারও নাক কেটেছে, কারও কান কেটেছে।
মা—মুসলমানের ভয়ে বৃন্দাবনের গােবিন্দজী জয়পুরে পালালেন। পাণ্ডারা ধন্না দিলে। শেষে দৈববাণী হ’লে, ‘মূর্তি গিয়েছে, আমি যাইনি। তােমরা আবার মূর্তি কর, সেই মূর্তিতেই আমি থাকব।'
আমি—গুজরাটে সােমনাথের মন্দির, গঙ্গোত্রীর জলে রােজ স্নান হত। মানুষের মাথায় মাথায় রােজ নূতন জল আসত। সুলতান মামুদ ভেঙে চুরমার করে দিলে। মন্দিরের চন্দনকাঠের দরজা নিয়ে গেল। এমন কেন হয় ?
মা—দুষ্টলোকের ভয়ে তিনি পালান। তাই বা কেন? তিনি ইচ্ছা করলে তাে সবই পারেন। তবে এ-ও তার এক লীলা। 
আমি—মা, কর্মের ফল কি খণ্ডন হয়? শাস্ত্রে বলে জ্ঞান হলে খণ্ডন হয়। তাও প্রারন্ধ ভােগ করতে হয় ।
মা–কর্ম হতেই সুখ দুঃখ সব। তাঁকেও কর্মফল ভােগ করতে হয়েছিল। ঠাকুরের বড় ভাই বিকারের সময় জল খাচ্ছিলেন। একটুখানি খেতেই ঠাকুর হাত থেকে গ্লাসটি টেনে নিলেন। তিনি তাতে অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘তুই আমাকে জল খেতে দিলিনি, তুইও এমনি কষ্ট পাবি, তােরও গলায় এমনি যাতনা হবে।' ঠাকুর বললেন, “দাদা, আমি তাে তোমার মন্দ করিনি। তােমার অসুখ, জল খেলে অনিষ্ট হবে, তাই দিইনি। তবে কেন তুমি আমায় এমন শাপ দিলে ?” তিনি কেঁদে বললেন, “কি জানি, ভাই, আমার মুখ থেকে ওকথা বেরিয়ে পড়ল। এ তাে অন্যথা হবে না।' ঠাকুরের অসুখের সময় আমাকে বললেন, “এই তার শাপে গলার ঘা। তা তােমাদের আর কার কিছু হবে না; যা ভোগ আমারই হ'ল। আমি বললুম, ‘এমন হলে মানুষ কি করে থাকবে, যখন তােমারই এরূপ হ’ল?' তিনি বললেন, ‘তার সে সিদ্ধ-বাক্য ছিল, ভাল লােক। এমনি যে-সে। বললে কি হয় ?
“কর্মফল ভুগতে হবেই। তবে ঈশ্বরের নাম করলে যেখানে ফাল সেঁধুত, সেখানে ছুঁচ ফুটবে। জপ তপ করলে কর্ম অনেকটা খন্ডন হয়। যেমন সুরথ রাজা লক্ষ বলি দিয়ে দেবীর আরাধনা করেছিল বলে লক্ষ পাঠায় মিলে তাঁকে এক কোপে কাটলে। তার আর পৃথক লক্ষ বার জন্ম নিতে হ’ল না। দেবীর আরাধনা করেছিল কিনা। ভগবানের নামে কমে যায়।” 
আমি—তাহলে কর্মের প্রাধান্যেই তাে জগৎ চলছে। তবে আর ভগবান মানা কেন ? বৌদ্ধেরাও কর্ম মানে, ঈষর মানে না।
মা—তবে কি কালী, কৃষ্ণ, দূর্গা, এসব নেই বলতে চাও?
আমি—জপতপের দ্বারা খণ্ডন হয় ?
মা—তা হবে না? ভাল কাজটি করা ভাল। ভালটি করলে ভাল থাকে, মন্দটি করলে কষ্ট পেতে হয়।
আমি—আচ্ছা মা, তুমি জয়রামবাটীতে বলেছিলে, সব এক সময়ে সৃষ্টি হয়েছে। যা হয়েছে সব এক কালে হয়েছে, একটি একটি করে হয়নি। 
মা—তিনি কি আর একটি একটি করে সৃষ্টি করেছেন? এ যেন তাঁর একটা কল চলছে—এই যেমন ময়দার কল। কলওয়ালা দেখছে, কলটি যাতে নষ্ট না হয়। সে কি কোথায় একটি একটি করে গম গূঁড়ো হচ্ছে দেখছে ? তেমনি তাঁর কলটি তিনি ঠিক রাখছেন। কোথায় কে কি খুঁটিনাটি করছে তা কি তিনি অত দেখছেন? তাঁর অনন্ত সৃষ্টি, তাঁকে সর্বক্ষণ দেখতে হচ্ছে। অত খুঁটিনাটি দেখলে কি চলে?

উদ্বোধন—সকালবেলা 

আমি—মা, তােমাকে কখন কখন রামায়ণ পড়তে দেখি। পড়তে কবে শিখলে ?
মা—ছেলেবেলায় প্রসন্ন, রামনাথ ওরা সব পাঠশালায় যেত। ওদের সঙ্গে কখন কখন যেতুম। তাতেই একটু শিখেছিলাম। পরে কামারপুকুরে লক্ষী আর আমি ‘বর্ণ-পরিচয়’ একটু একটু পড়তুম। ভাগনে (হৃদয়) বই কেড়ে নিলে। বললে, “মেয়েমানুষের লেখা-পড়া শিখতে নেই, শেষে কি নাটক নভেল পড়বে?” লক্ষী তার বই ছাড়লে না। ঝিয়ারী মানুষ কিনা, জোর করে রাখলে। আমি আবার গােপনে আর একখানি এক আনা দিয়ে কিনে আনালুম। লক্ষী গিয়ে পাঠশালায় পড়ে আসত। সে এসে আবার আমায় পড়াত। ভাল করে শেখা হয় দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর তখন চিকিৎসার জন্য শ্যামপুকুরে। একাটি একাটি আছি। ভব মুখুজ্জ্যেদের একটি মেয়ে আসত নাইতে। সে মধ্যে মধ্যে অনেকক্ষণ আমার কাছে থাকত। সে রােজ নাইবার সময় পাঠ দিত ও নিত। আমি তাকে শাকপাতা, বাগান হতে যা আমার এখানে দিত, তাই খুব করে দিতুম।
আমি—মা, ঠাকুর জয়রামবাটী কি অনেকবার গিয়েছিলেন, না এক আধ বার।
মা—অনেক বার গেছেন। এক একবার গিয়ে দশ বার দিন থাকতেন। যখন দেশে যেতেন, তখন জয়রামবাটী, শিওড়, এসব হয়ে আসতেন। শিওড়ে রাখাল বালকদের খাওয়ালেন।
আমি—এ কোন সময়? সাধনার সময় না তারপর ? 
মা—সাধনার পর। সাধনার সময় তাে উন্মাদ। তখন ‘শ্বশুরবাড়ি গেলে তাে লােকে পাগল বলবে। শিব শ্বশুরবাড়ি গেলেন। সবাই বলতে লাগল, ‘ওমা উমা, তাের এই ছিল কপালে! শেষে ভাঙ্গড়ের হাতে গেলে। সেই তখন (বিবাহের পর) ঠাকুরকে কত কি সবাই বলত—’পাগলা জামাই, কি হবে গাে?'
আমি—কাল যে মণীন্দ্র গুপ্ত এসেছিলেন, এঁকে তাে আর কখনও দেখিনি।
মা—এ আর একবার এসেছিল। ঠাকুরের কাছে যেত, তখন খুব ছােটটি। 
আমি—ছােট নরেনকে এখানে একবারও দেখিনি।
মা—সে আসে না। ঠাকুরের কাছে যেত। কাল ছিপছিপে, মুখে বসন্তের দাগ। ঠাকুর তাকে খুব ভালবাসতেন। তার জন্য ভাবতেন; “এই ছােট নরেনকে মনে পড়েছে, এই ছােট নরেন এল,”—ভাবে দেখতেন।
আমি—পলটুবাবু একদিন মাত্র এখানে এসেছিলেন। তারকবাবু (বেলঘরিয়া) মধ্যে মধ্যে আসেন।
মা—পতুও মাঝে মাঝে আসে। আমাকে মাস মাস একটি করে টাকা দেয়। বড় গরীব। আমি যখন জয়রামবাটীতে থাকি তখন সেখানে পাঠায়। পতু আর মণীন্দ্র এরা দুটিতে যখন ঠাকুরের কাছে যেত তখন ছেলেমানুষ, দশ-এগার বছরের। দোলের দিন সব বাইরে চলে গেছে, আবীর দিচ্ছে, কাশীপুর বাগানে। এরা দুটি গেল না। ঠাকুরকে হাওয়া করতে লাগল—এই এ হাতে, এই সে হাতে। ছেলেমানুষ কি না, হাতে পায় না। এই পা টিপছে। ঠাকুরের তখন কাশি ছিল, তাই মাথায় জ্বালা করত। হাওয়া দরকার হত। ঠাকুর বলছেন, যা যা, তােরা নীচে যা, আবীর খেলগে না, সব্বাই গেছে।” পতু বলছে, ‘না, মশাই, আমরা যাব না। আমরা এইখানে আছি। আপনি রয়েছেন, আমরা কি ফেলে যেতে পারি?’
“ওরা কিছুতেই গেল না। ঠাকুর কেঁদে বললেন, “আরে, এরাই আমার সেই রামলালা, আমাকে সেবা করতে এসেছে। ছেলেমানুষ, তবু আমাকে ফেলে আমােদের দিকে ফিরে চাইলে না', বলতে বলতে তাঁর চোখ দিয়ে জল পড়ল
আমি—ঠাকুরের কাছে কত ভক্ত যেত, তারা সব এখন কোথায় ? কেউ তাে আসে না। 
মা—তার সব আপন মনে আনন্দে আছে।
আমি—যে আনন্দে আছে ! 
মা—তা তাে বটেই। সংসারে মাগ ছেলে নিয়ে কি আর সুখ আছে ? কামিনী আর কাঞ্চন, ওতেই ভুলে রয়েছে। সংসারে সবই ভােগের।
আমি—তাতে আবার বহির্মুখ মন।
মা—জগদম্বা কালী। তিনিই সকলের মা, তা থেকেই ভালমন্দ সব হয়েছে। তিনি সব প্রসব করেছেন। স্বতঃসিদ্ধ, সাধনসিদ্ধ, কৃপাসিন্ধ, হঠাৎসিদ্ধ—এই রকম সব আছে ?
আমি—হঠাৎসিদ্ধ কি ? 
মা—যেমন পরের ধন পেয়ে হঠাৎ বড়মানুষ হয়ে গেল।
এই সময় নলিনী স্নান করিয়া আসিল। উপরের পায়খানা একটু অপরিষ্কার ছিল, তাহাতে দুই-এক ঘটি জল ঢালিয়া দিয়া ধুইয়াছিল। সেইজন্য গঙ্গাস্নান করিয়া আসিয়াছে। মা দেখিয়া বলিলেন, “নলিনী, গঙ্গা নেয়ে এলি নাকি?” নলিনী কারণ বলিল। 
আমি—কলে নাইলেই তাে হত।
মা—তাই তাে, কলে নেয়ে গঙ্গাজল স্পর্শ করলেই তাে হত। (নলিনীর শরীর ভাল ছিল না)।
নলিনী—তা কি হয়, পায়খানা। 
মা—তাতে কি! বিষ্ঠা তাে আর ছুঁসনি। আর ছুঁলেই বা কি ? পেটের মধ্যেও তাে রয়েছে। ঠাকুর বলতেন, একটা গামলায় ডাল, ভাত, তরকারি, ছানা, মাখন রেখে দাও, দুদিন পরে পচে দুর্গন্ধ হবে। বিষ্ঠাও তো তাই। তিনি দক্ষিণেশ্বরে নিজের মল মুখে দিলেন। ন্যাংটা (তোতাপুরী) বললে, ‘ও তাে আপনার মল।’ তখন ঠাকুর কোথা গিয়ে চাখলেন।
 “আমিও তাে দেশে কত শুকনাে বিষ্ঠা মাড়িয়ে চলেছি। দুবার ‘গােবিন্দ গােবিন্দ বললুম, বস, শুদ্ধ হয়ে গেল। মনেতেই সব, মনেই শুদ্ধ, মনেই অশুদ্ধ। মানুষ নিজের মনটি আগে দোষী করে নিয়ে তবে পরের দোষ দেখে। পরের দোষ দেখলে তাদের কি হয় ?—নিজেরই ক্ষতি। আমার এইটি ছেলেবেলা থেকেই স্বভাব যে আমি কারও দোষ দেখতে পারতুম না। আমার জন্য যে এত টুকু করে আমি তাকে তাই দিয়ে মনে রাখতে চেষ্টা করি। তা আবার মানুষের দোষ দেখা ? মানুষের কি দোষ দেখতে আছে! ওটি শিখিনি। ক্ষমারূপ তপস্যা।”
আমি—স্বামীজী বলতেন, ‘ঘরে চোর ঢুকে কিছু নিয়ে গেল, তােমার মনে উঠবে—চোর, চোর। কিন্তু শিশুর মনে চোর-বুদ্ধি নেই; সে চোর বলে কিছুই দেখলে না।’
মা—তা তাে বটেই। যার শুদ্ধ মন, সে সব শুদ্ধ দেখে। এই গােলাপের (তখন গােলাপ মা কিজন্য আসিয়াছেন) মনটি শুদ্ধ। বৃন্দাবনে মাধবজীর মন্দিরে কাদের ছেলেমেয়ে বাহ্যে করে গেছে। সব্বাই বলছে, ‘বিষ্ঠা, বিষ্ঠা’, কিন্তু কেউ ফেলবার চেষ্টা করছে না। গােলাপ তাই দেখে অমনি নিজের ধুতি —নূতন মলমলের ধুতি—ছিঁড়ে পুঁছে ফেলে দিলে। স্ত্রীলােকগুলাে দেখে বলছে, ‘এ যখন ফেলেছে, তখন এরই ছেলে বাহ্যে করেছে।’ আমি মনে মনে বলছি, “দেখ মাধব, কি বলছে।’ কেউ বা বলছে, এরা সাধুলােক (যােগীন স্বামী প্রভৃতি ছিলেন), এদের আবার ছেলেপিলে কি ? এঁরা ফেলছেন সকলের দর্শনের অসুবিধা হচ্ছে, মন্দিরে বিষ্ঠা রয়েছে, এ জন্য।'
“এই গঙ্গার ঘাটে যদি কোন ময়লা থাকে তাে গােলাপ হেথা সেথা থেকে ন্যাকড়া কুড়িয়ে এনে পরিষ্কার করে ঘটি ঘটি জল ঢেলে ধুয়ে দিলে। এতে দশজনের সুবিধা হ’ল। তারা যে শান্তি পেলে, ওতে গােলাপের মঙ্গল হবে, তাদের শান্তিতে এরও শান্তি হবে।
“অনেক সাধন তপস্যা করলে, পুর্বজন্মের অনেক তপস্যা থাকলে, তবে এ জন্মে মনটি শুদ্ধ হয়।”
কিছু পরে আমি বলিলাম, “মা, আমার তাে জপ করতে মন লাগে না।” 
মা হাসিয়া বলিলেন, “কেন, মােটেই না?”
আমি—ঐ একটু আধটু, কোনমতে বেগারশােধ। একটু করেই ভাবি, বিড়বিড় করে কি হবে? ঈশ্বর যদি থাকেন তাে আছেনই। বরং ধ্যান করতে চেষ্টা করি। 
মা—ধ্যান হয় ?
আমি—না, হয় কই ? সব তাে বুঝি, তবে শক্তি কোথা ? দক্ষিণেশ্বরে কোন রাস্তায় যেতে হবে, তা তাে জান, কিন্তু হেঁটে যেতে পার কি ?
মা—ও জপ বিড়বিড় করা মেয়েদের কর্ম, তােমাদের জ্ঞান আছে।
বৈকালে ললিতবাবু, প্রণাম করিতে আসিয়াছেন। তাঁহার সহিত কথা হইতেছিল। আমিও মাঝে মাঝে বলিতেছিলাম।
মা বলিতেছেন, “ঠাকুর বলতেন, 'ক্ষুরের ধারের ন্যায় পথ বড় কঠিন রাস্তা।” বলিয়াই একটু পরে আবার বলিতেছেন, “তা তিনিই কোলে করে রয়েছেন, তিনিই দেখছেন।”
আমি—কই, কিছু জানতে দিচ্ছেন না যে ! 
মা—সেই তাে দুঃখ ( তােমাদের)। 
আমি —হাঁ।
ললিতবাবু—মরলে পর ঠাকুর কোলে করে নেবেন, সে আর বেশী কি? যদি এই দেহেই নিতেন!
মা—এই দেহেই কোলে করে রয়েছেন। মাথার উপরে তিনি আছেন, ঠিক ধরে রয়েছেন।
আমি–ঠিক আমাদের ধরে রয়েছেন? 
মা—হাঁ, ঠিক ধরে রয়েছেন। 
আমি —সত্যি বলছ ? 
মা—হাঁ, সত্যি বলছি, ঠিক ধরে রয়েছেন। 
আমি –ঠিক? 
মা—(দৃঢ়তার সহিত) হাঁ, ঠিক।
সকালের পূজা শেষ করিয়া মা শালপাতায় করিয়া ভক্তগণকে প্রসাদবিতরণ করিলেন। তারপর ঘরঝাঁট দিয়া ও চলাগুলি হাতে তুলিয়া লইবার সময় হঠাৎ একটা আলপিন তাহার অঙ্গুষ্ঠে ফুটিয়া গেল। উহাতে রক্ত বাহির হইল এবং খুব যাতনা হইতে লাগিল। আমি নীচে সংবাদ পাইয়াই ছুটিয়া আসিয়া দেখি, খুব যাতনা হইতেছে। আসিবার সময় কে যেন বলিলেন, “চুন গরম করে দাও।” আমি তাড়াতাড়ি চুন গরম করিয়া উপরে লইয়া গেলাম এবং আঙুলে লাগাইয়া দিলাম। দিতেই যাতনার অনেকটা উপশম হইল। মা বললেন, “বাবা, তােমরাই আমার আপনার লােক, তােমরাই আমার আপনার।”

১৬-৮-১২ (৩১শে শ্রাবণ), বৈকাল ৫টা 

মা–তের বছরের সময় কামারপুকুরে যাত্রার দিন হয়, কামারপুকুর যাই। তখন ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে। আমি কামারপুকুরে মাস খানেক থেকে জয়রামবাটী আসি। আবার পাঁচ ছয় মাস পরে গিয়ে কামারপুকুরে প্রায় দেড় মাস থাকি - তখনও ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে। কামারপুকুরে আমার ভাসুর, জা, এরা সব ছিলেন। ঠাকুর তারপর যখন ব্রাহ্মণীকে নিয়ে দেশে এলেন (ইং ১৮৬৭), তখন আমাকে খবর দিলেন, ‘ব্রাহ্মণী এসেছেন, তুমি এস।’ আমি খবর পেয়ে কামারপুকুর গেলাম। সেবার প্রায় মাস তিনেক ছিলাম। বামুন ঠাকরুন জয়রামবাটী, শিওড়, এসব ঘুরে দেখলেন। একদিন চিনু শাঁখারীর এঁটো নেয়া নিয়ে হৃদয়ের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া হয়।
আমি—চিনু তখন বেঁচে আছেন। 
মা—হাঁ, বেঁচে আছে, বুড়াে অথর্ব।
আমি—কেউ কেউ বইয়ে ঠাকুরের ছেলেবেলাতেই যেন চিনু মারা গেছেন, এই ভাব দিয়েছেন।
মা—সে তার অনেক পরে মারা গেছে। ওখানে তার সমাজ আছে, শীতল দেয়।
“বামুন ঠাকরুন বললেন, “চিনু ভক্ত লােক, তার এঁটো নেবাে তাতে কি?” হৃদয় বললে, “তুমি শাঁখারীর এঁটো নেবে, থাকবে কোথা ? কোথা শােবে ? বামুন ঠাকরুন বললেন, “কেন? শীতলার ঘরে মনসা শােবে।'
“হৃদয় বললে, “দেখি কেমন শীতলার ঘরে মনসা শােয়।' ঐসব নিয়ে হৃদয়ের সঙ্গে ঝগড়া মারামারি হয়। হৃদয় তাঁকে কি একটা ছুড়ে মারলে, তাঁর কানে লেগে রক্ত পড়তে লাগল। বামুন ঠাকরুন কাঁদতে লাগলেন। ঠাকুর বললেন, ‘ওরে হৃদু , তুই কেন এমন করলি ? এ সৎলােক, ভক্তিমতী। ওরে, এমন হলে যে সব লোক জড় হবে, কেলেঙ্কারি হবে।'
“তারপর একদিন ঠাকুর তাঁকে (ব্রাহ্মণীকে) কি রকম ভয় দেখিয়ে দিলেন। কি রকম ভাবাবস্থা দেখে ভয় পেলেন যেন হরিণীর মতাে। ভয়ে সর্বক্ষণ এইরকম (উপরের দিকে চাহিয়া) করতে লাগলেন। বললেন, “ওরে প্রসণ্ণ (লাহাদের প্রসন্নময়ী), কোথা যাব ? ওরে কি করব? জগন্নাথ যাব, না বৃন্দাবন যাব? তারপর একদিন কোথায় যে কখন চলে গেলেন কেউ টের পেলে না। তদবধি আর আসেননি। পাছে হৃদয়ের সঙ্গে আবার ঝগড়া হয়—লাহাদের বাড়ি কাছে—এই সব জন্য ঠাকুর তাঁকে ঐ রকম ভয় দেখিয়েছিলেন।
“একদিন আবার বামুন ঠাকরুন ঠাকুরকে মালাটালা দিয়ে গৌরাঙ্গের মতাে সাজালেন। তখন ঠাকুরের কি রকম ভাব হয়েছে। বামুন ঠাকরুন আমাকে ডেকে নিলেন। যেতেই ঠাকুর বললেন, “কেমন হয়েছে ? আমি বেশ হয়েছে’ বলে, কোনমতে যা হয় একটা বলে, প্রণাম করেই চলে এলুম। ভাবাবেশ দেখে আমার ভয় হয়েছিল।
“এর পর আবার জয়রামবাটী এলুম। নানা লােকের কাছে শুনতুম তিনি পাগল, উন্মাদ হয়েছেন, উলঙ্গ হয়ে বেড়ান। কেউ তাে আর তখন তার ভাব বুঝত না। আমি মনে ভাবলুম, সবাই এমন বলছে, আমি গিয়ে একবার দেখে আসি কি রকম আছেন। তখন কি যােগ উপলক্ষে আমাদের দেশ থেকে মেয়েরা গঙ্গাস্নানে আসছিল। ফাগুন-চৈত্র মাস (১২৭৮ সন) আমি একজনকে বললুম, “আমি দক্ষিণেশ্বরে তাঁকে দেখতে যাব কেমন আছেন। সে বাবাকে সব বলে দিলে। আমি তাে আর বাবাকে কিছু বলতে পারিনি লজ্জায়, ভয়ে।
“বাবা বললেন, ‘যাবে বেশ তাে।' তিনি আমাদের সঙ্গে এলেন। পথে জ্বর হ’ল। খুব জ্বর, কোন জ্ঞান নেই। রাতে স্বপ্নে দেখি কি একটি কাল কুচকুচে মেয়ে আমার বিছানার পাশে বসে আমার মাথায় হাত বুলাচ্ছে। বললে, ‘দক্ষিণেশ্বর থেকে আসছি। আমি বললুম, আমিও তাঁর ওখানে যাব। তুমি আমাদের কে হও ? সে বললে, “আমি তােমার বােন। ভয় কি ? সেরে যাবে।”
“পরদিন জ্বল ছেড়ে গেল। বাবা শেষে পালকি করলেন। রাত প্রায় নটার সময় দক্ষিণেশ্বরে পেীঁছলুম। আমি একেবারেই ঠাকুরের ঘরে গিয়ে উপস্থিত। এরা সব নহবতের ঘরেটরে গিয়েছেন (যেখানে ঠাকুরের মা আছেন)। ঠাকুর দেখে বললেন, “তুমি এসেছ? বেশ করেছ।' বললেন, ‘মাদুর পেতে দেবে। ঘরেই মাদুর পেতে দিলে। ঠাকুর বললেন, এখন কি আর আমার সেজবাবু আছেন ? আমার ডান হাত ভেঙে গেছে।’ তখন কয়েক মাস হয় মথুরবাবু মারা গেছেন। অক্ষয় (ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র) তারও কয়েকমাস আগে মারা গেছে।”
আমি—মথুরবাবু, তখন নেই ?
মা—না, কয়েক মাস, সাত-আট মাস আগে মারা গেছেন। মথুরবাবু, থাকলে কি আর আমাকে ঐ কুঁড়েঘরে (নবতে) বাস করতে হয়? শৌচের যা কষ্ট। তিনি অট্টালিকায় রাখতেন। আমরা নবতের ঘরে যেতে চাইলুম। ঠাকুর বললেন, ‘না না, ওখানে ডাক্তার দেখাতে অসুবিধা হবে। এ ঘরেই থাক।” আমরা তার ঘরেই শুলুম। একটি সঙ্গী মেয়ে আমার কাছেই শুল। হৃদয় দু, ধামা না তিন ধামা মুড়ি আনলে। তখন সকলের খাওয়া হয়ে গেছে কিনা।
“পরদিন ডাক্তার দেখালেন। কয়েকদিন পরে জ্বর সারতে নবতের ঘরে গেলুম। তখন আমার শাশুড়ী কুঠিঘর ছেড়ে নবতের ঘরে এসে রয়েছেন। কুঠিঘরের একটি কোঠা তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। অক্ষয় তাঁর ঐ কুঠিতেই মারা যায়। সে মারা যেতে মা ঠাকরুন কুঠিঘর ছেড়ে এলেন। বললেন, ‘আর আমি ওখানে থাকব না। আমি এই নবতের ঘরেই থাকব, গঙ্গাপানে মুখ করে রইব, কুঠিতে আর আমার দরকার নেই।’
‘দক্ষিণেশ্বরে মাস দেড়েক থাকবার পরেই যােড়শীপজা করলেন (১২৭৯, জ্যৈষ্ঠ)। আমি তখন যােল বছরে পড়েছি। (সম্ভবতঃ ফলহারিণী কালীপূজার) রাত্রে প্রায় নটায় আমাকে তাঁর ঘরে আনালেন। পুজোর সব যােগাড়। ভাগনে সব যােগাড় করে দিয়েছে। আমাকে বসতে বললেন। আমি তাঁর চৌকির উত্তর পাশে (গঙ্গাজলের) জালার পানে মুখ করে (পশ্চিম মুখে) বসলুম। ঠাকুর পূর্বমুখ হয়ে পশ্চিমদিকের দরজার কাছে বসেছেন। দরজা সব বন্ধ। আমার ডান পাশে সব পুজার জিনিস।”
আমি—পূজার সময় কি করলেন ? 
মা—আমি একটু পরেই বেহুশ হয়ে গেলুম। পূজার মধ্যে কি হয়েছে জানতে পারিনি।

১.শ্ৰীশ্ৰীমার জন্ম ৮ই পৌষ, ১২৬০ সাল। কোষ্ঠীর হিসাবে ১৯ বছরে পড়িলে। মার কিন্তু ধারণা ছিল তিনি তখন ষােল বছরে পড়িয়াছেন। অন্যত্রও যােল বছর বলিয়াছেন। ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণপুথি'তেও এই ভুল আছে।
২.লক্ষী দিদির মুখে শুনিয়াছি তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, “পুজার প্রথমে পায়ে আলতা পরিয়ে দিলেন, সিঁদুর দিলেন, কাপড় পরিয়ে দিলেন। পান, মিষ্টি খাওয়ালেন।" লক্ষী দিদি হাসিতে হাসিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি তাে অত লজ্জা কর-কাপড় কি করে পরালেন গাে? মা বলিলেন, “আমি তখন কি রকম যেন। অর্ধবাহ্যদশা ? হয়ে গিছলুম।”

আমি—হুশ হতে তুমি কি করলে? 
মা—আমি মনে মনে প্রণাম করলুম। পরে চলে এলুম। 
আমি—কালীপুজোর রাত, এত লােক, কেউ এ পূজা টের পায়নি?
মা—দরজা যে বন্ধ। কালীবাড়িতে গানবাজনা, হই রই। সবাই তা নিয়ে ব্যস্ত। আর তাঁর সঙ্গে তাঁদের অন্য সম্পর্কই বা কি?—একমাত্র দর্শন-স্পর্শন, আর তাে কিছু না।
আমি—পূজোর সময় আর কেউ ছিল?
মা—দীনু বলে একটি ছেলে, আমার ভাসুরপাে হয়, মুকুন্দপুরের জ্ঞাতির ছেলে, ঠাকুরের কাছে থাকত। তিনি খুব ভালবাসতেন। সে সব ফুল বেলপাতা যােগাড় করে এনে দিতে লাগল। হৃদয় সব ঠিকঠাক করে দিলে। পূজার সময় আর কেউ ছিল না, একা তিনি ছিলেন। পূজার শেষাশেষি হৃদয় এসেছিল। 
“রামবাবু বইয়ে লিখেছেন জয়রামবাটীতে ঘােড়শী পুজা হয়েছে। আমাদের দেশে এমনিই রক্ষা নেই। এতেই ‘কাকে মেয়ে দিলে-উন্মাদ, পাগল!' বলত, তা আবার মেয়েমানুষকে পূজা করা ! তা হলে তাে হয়েছে !
“এরপর দক্ষিণেশ্বরে প্রায় এক বছর ছিলাম। শেষটায় অসুখ হতে দেশে যাই ।* শম্ভুবাবু ডাক্তার প্রসাদবাবুকে দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছিলেন (দক্ষিণেশ্বরে)।” 
আমি—ঠাকুরের মার শরীর যাবার সময় (১২৬২, ১৬ই ফাগুন) দক্ষিণেশ্বরে ছিলে কি?
মা—না, জয়রামবাটীতে ছিলাম। তখন আমার অসুখ। দক্ষিণেশ্বরে এক বছর ভুগে দেশে গেছি। বদনগঞ্জে বাজারের শিবমন্দিরে পীলের দাগ নিলাম।** 

মা জানানন্দকেও এই ঘটনা বলিয়াছিলেন। সে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “মা, ঠাকুর যখন আপনার পায়ে ফুল দিতে গিয়ে হাত দিলেন, মিষ্টি খাওয়ালেন, তখন আপনার সঙ্কোচ বােধ হল না ?" মা বলিলেন, “না, আমি তখন সব দেখছি বটে, কিন্তু কিছু বলতে কইতে ইচ্ছা ছিল না।”

*রামলাল দাদা বলিতেন, তাঁহার পিতার ( ঠাকুরের মধ্যমাগ্রজ শ্ৰীযুত রামেশ্বরের) মৃত্যুকালে (১২৮০, ২৭শে অগ্রহায়ণ ) শ্রীশ্রীমা জয়রামবাটীতে ছিলেন ।
**বদনগঞ্জ জয়রামবাটী হতে প্রায় ৪ মাইল। এই দাগ দেওয়া সেকালের এক অত্যন্ত কষ্টকর ব্যাপার। স্নানের পর রােগীকে শােয়াইয়া তিন-চারি জন লােক তাহার হাত-পা চাপিয়া ধরিত, যাহাতে সে যন্ত্রণায় উঠিয়া না পালায়। তারপর একব্যক্তি একটা জ্বলন্ত কুলকাঠ দিয়া পেটের উপরকার কতকটা স্থান ঘষিত। সে সময় চামড়া পুড়িয়া যাওয়ায় রােগী চিৎকার করিত। শ্রীশ্রীমা

“দু-তিনবার আসবার পর একবার কাপ্তেন (বিশ্বনাথ উপাধ্যায়) বাহাদুরী কাঠ দিলেন। এখন যেখানে রামলালের বাড়ি তার পাশে আমার জন্য ঘর হ’ল। শম্ভুবাবু করালেন। একখানা গুঁড়িকাঠ জোয়ারে ভেসে গেল। হৃদয় এসে “তােমার ভাগ্য মন্দ।'—এই সব বলে আমাকে বলে। কাপ্তেন শুনে বললেন, ‘যা কাঠ লাগে আমি দেব। ঘরে কিছুদিন রইলাম। একদিন বর্ষাকালে ঠাকুর গেছেন। শেষে এমন বৃষ্টি যে ঠাকুর আর সে রাত্রে ফিরে আসতে পারলেন না। সেখানেই খেয়ে দেয়ে শুয়ে রইলেন। আমাকে ঠাট্টা করে বললেন, ‘কালীর বামুনরা রাত্রে বাড়ি যায়, না? এ যেন আমি এসেছি।'
“পরে কাশীর একটি প্রাচীন মেয়ে আমাকে বলে ওবাড়ি থেকে নহবতের ঘরে আনালে। তখন ঠাকুরের অসুখ, সেবার কষ্ট হচ্ছে। বাহ্যে গিয়ে গিয়ে মলদ্বার হেজে গেছে। আমি এসে সেবা করতে লাগলাম।”
“কাশীতে গিয়ে এই মেয়েটির অনেক খোঁজ করেছিলুম, দেখা পাইনি।* তার পরের বার (চতুর্থ বার) তাে আমি, মা, লক্ষী, আরও কে কে দক্ষিণেশ্বরে আসি। তারকেশ্বরে গত অসুখের মানসিক নখ চুল দিয়ে এলুম। প্রসন্ন সঙ্গে থাকায় প্রথমে কলিকাতায় তার বাসায়। (গিরিশ বিদ্যারত্নের বাসায় ) উঠি। ফাগুন-চৈত্র মাস হবে (১২৮৭)। পরদিন সকলে দক্ষিণেশ্বরে যাই। যেতেই হৃদয় কি ভেবে বলতে থাকে, কেন এসেছে ? কি জন্য এসেছে ? এখানে কি?'—এই সব বলে তাদের অশ্রদ্ধা করে। আমার মা সে কথায় কোন জবাব দেন নি। হৃদয় শিওড়ের লােক, আমার মাও শিওড়ের মেয়ে। কাজেই হৃদয় মাকে আদৌ মান্য করলে না। মা বললেন, 'চল, ফিরে দেশে যাই ।এখানে কার কাছে মেয়ে রেখে যাব? ঠাকুর হৃদয়ের ভয়ে আগাগােড়া ‘হাঁ, না কিছুই বলেননি। আমরা সকলে সেই দিনই চলে গেলুম। রামলাল পারের নৌকা এনে দিলে। আমি মনে মনে মা কালীকে বললুম, “মা, যদি কোন দিন আনাও তাে আসব।' তারপর হৃদয় ওখান হতে চলে গেল, ত্রৈলােক্যবাবুর মেয়ের পায়ে ফুল দিয়ে (১২৮৮, জ্যৈষ্ঠ)। রামলাল কালীঘরের (স্থায়ী) পুজারী, হল। পুজারী হয়ে ভাবলে, “আর কি, এবার মা-কালীর পুজারী হয়েছি। সে ঠাকুরের অত খোঁজ-খবর নিত না। উনি ভাব-টাব হয়ে হয়তাে পড়ে থাকতেন। এদিকে মা কালীর প্রসাদ শুকনা হয়ে থাকত। ঠাকুরের খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট হতে লাগল। তখন অন্য কেউ নেই। ঠাকুর পুনঃপুনঃ আমাকে আসবার জন্য খবর দিতে লাগলেন। ওদেশের যে আসত তাকে দিয়েই বলে পাঠাতেন আসবার জন্য। কামারপুকুরের লক্ষ্মণ পানকে দিয়ে বলে পাঠালেন, এখানে আমার কষ্ট হচ্ছে, রামলাল মা-কালীর পুজারী হয়ে বামুনের দলে মিশেছে, এখন আমাকে আর অত খোঁজ করে না। তুমি অবশ্য আসবে, ডুলি করে হােক, পালকি করে হােক, দশ টাকা লাগুক, বিশ টাকা লাগুক, আমি দেব।' ঠাকুরের এই সব সংবাদ পেয়ে আমি শেষে আসলুম (১২৮৮, মাঘ বা ফাগুন)। এক বছর আসিনি।**
আমি—রাসমণি যখন দেহত্যাগ করেন তখন ঠাকুর কোথায় ?
মা—তখন ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে। তার মুখে ও আরও লােকজনের মুখে, শুনেছিলাম, রাসমণির দেহত্যাগের সময় কালীঘাটের মা-কালীর মন্দিরের সব আলাে একটা দমকা হাওয়া এসে নিবে যায়। তখন মা রাসমণিকে দেখা দেন। ওদের সকলেই কালীঘাটে মারা যায়। কেবল মথুরবাবু জানবাজারে মারা যান।
স্নান করিয়া আসিবার পর যখন দাগ দিবার জন্য সকলে তাঁহাকে ধরিবার উপক্ৰম করিতেছিল, তখন তিনি বলিলেন, “না কাউকে ধরতে হবে না, নিজেই চুপ করে শুয়ে পড়ে থাকব।” বাস্তবিকই তিনি ঐ অসহ্য যন্ত্রণা স্থিরভাবে সহ্য করিলেন। দেশের লােকদের বিশ্বাস ছিল যে উহাতে ম্যালেরিয়া জ্বর সারে। শ্রীশ্রীঠাকুরও উহা লইয়াছিলেন।

* যােগেনমার নিকট শুনিয়াছি, মা পূর্বে ঠাকুরকে খুব সঙ্কোচ করিতেন; মুখের ঘোমটা লিতেন না। ঐ কাশীয় মেয়েটিই এই সঙ্কোচ ভাঙিয়া দেয়। একদিন রাত্রে সে মাকে লইয়া ঠাকুরের ঘরে গেল এবং মায়ের মুখের ঘােমটা সরাইয়া দিল। ঠাকুরও মাকে কত ভগবৎ কথা শুনাইতে লাগিলেন। মা এবং ঐ মেয়েটি যেন বাহ্যজ্ঞান শূন্য হইয়া কথা শুনিতে লাগিলেন। এত সময় হইয়াছেন যে ঐদিকে যে সূর্যোদয় হইয়াছে সে বিষয়ে কাহারও আর হল নাই।

** ইহার পরের বার মা দেশে গিয়া ৭/৮ মাস পরেই (১২৯০ সনের মাঘ মাসে) দক্ষিণেশ্বরে আসেন। আসিয়া ঠাকুরের ঘরে কাপড়ের পটুলিটি রাখিয়া প্রণাম করিতেই ঠাকুর জিজ্ঞাসা করিলেন, “কবে রওনা হয়েছে?” তখন শ্রীশ্রীমায়ের উত্তরে ঠাকুর জানিলেন যে তিনি বৃহস্পতিবারের বারবেলায় রওয়ানা হইয়াছেন। অমনি বলিলেন, “এই তুমি বৃহস্পতিবার বারবেলায় রওনা হয়ে এসেছ বলে আমার হাত ভেঙেছে। যাও, যাও, যাত্রা বদলে এসগে।” শ্রীশ্রীমা সেইদিনই ফিরিয়া যাইতেছিলেন। ঠাকুর বলিলেন, “আজ থাক কাল যেও।” পরদিনই মা যাত্রা বদলাইতে দেশে ফিরিয়া যান।

১৬-১০-১২, বুধবার, বেলুড় মঠ। 

মঠে দুর্গাপূজা। আজ দেবীর বােধন। শ্ৰীশ্ৰীমা আজ বৈকালে মঠে আসিবেন। সন্ধ্যা সমাগত। মায়ের আসিতে বিলম্ব দেখিয়া পুজনীয় বাবুরাম মহারাজ ছুটাছুটি করিতেছেন। মঠের প্রবেশদ্বারে মঙ্গলঘট ও কলাগাছ-স্থাপন হয় নাই দেখিয়া তিনি বলিয়া উঠিলেন, “এসব এখনও হয়নি, মা আসবেন কি?” দেবীর বােধন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীশ্রীমায়ের গাড়ি মঠে পৌঁছিল। গােলাপমা মাকে হাত ধরিয়া গাড়ি হইতে নামাইতেছেন। নামিবার পরই সমস্ত দেখিয়া মা বলিতেছেন, “সব ফিটফাট, আমরা যেন সেজেগুজে মা-দুর্গা-ঠাকরুন এলুম।”
অষ্টমীর দিন অনেক লােক শ্ৰীশ্রীমাকে প্রণাম করিল, তিন শতের উপর হইবে। উত্তর পাশের বাড়িতে মা ও স্ত্রী-ভক্তদের থাকিবার স্থান হইয়াছিল। দক্ষিণ দিকের ঘরটিতে মা থাকিতেন। তক্তপােশের উপর পশ্চিমমুখে পা ঝুলাইয়া বসিয়া সব ভক্তদের প্রণাম গ্রহণ করিলেন। তিন-চারি জন মন্ত্র লইলেন।
বৈকালে ন-দিদির (গিরিশবাবুর ভগিনীর) মৃত্যুপ্রসঙ্গ হইতেছিল। বােধনের দিন রাতে হঠাৎ তাঁর মৃত্যু হইয়াছে। মা বলিলেন, “আর মানুষ, এই আছে, এই নাই। কিছুই সঙ্গে যাবে না। একমাত্র ধর্মাধর্মই সঙ্গে যাবে। পাপপুণ্য মৃত্যুর পরও সঙ্গে যায়।” 
একটি ছেলে স্বপ্নে মন্ত্র পাইয়াছিল। ঠাকুর তাহাকে কোলে করিয়া মন্ত্র দিয়াছেন। সে মায়ের নিকট হইতে সব জানিয়া লইল। মা সেই কথায় বলিলেন, “এই তাে সেই বামুনের ছেলেটিকে ঠাকুর মন্ত্র দিয়েছেন, কোলে করে।” 
আমি—তুমি তাকে ফের মন্ত্র দিলে?
মা—না; আমি বললুম, তুমি কৃপাসিদ্ধ। তুমি এই মন্ত্র জপ করেই সিদ্ধ হবে। আমি তার মন্ত্র কেন শুনতে যাব? আমি তাকে জপ দেখিয়ে দিলুম।
বিজয়ার দিন ডাক্তার কাঞ্জিলাল যে নৌকাতে প্রতিমা গঙ্গায় ভাসান হইতেছিল উহাতে দেবীর সামনে নানাপ্রকার মুখভঙ্গী রঙ্গব্যঙ্গ করিতেছিলেন এবং অনেকেই সেই সব দেখিয়া হাসিয়া অধীর হইতেছিল। একজন ব্রক্ষচারী কিছু মার্জিত-রুচি ছিল। সে উহাতে খুবই চটিতেছিল। মঠের উত্তর পাশের বাগানে থাকিয়া মাও নৌকার এই সব ব্যাপার দেখিতেছিলেন এবং আনন্দিত হইতেছিলেন। আমি মাকে বলিলাম, “মা, দেবীর সামনে ওরূপ করার জন্য কাঞ্জিলাল ডাক্তারকে গাল দিচ্ছে।” মা বলিলেন, “না, না, এসব ঠিক। গানবাজনা, রঙ্গব্যঙ্গ, এ সব দিয়ে সকল রকমে দেবীকে আনন্দ দিতে হয়।
পূজার কয়দিন থাকিয়া বিজয়ার পরদিন মা কলিকাতায় প্রত্যাগমন করেন এবং কয়েকদিন মাত্র তথায় থাকিয়া কাশীধামে গমন করেন।

কাশীধাম, ২০ শে কার্তিক, ১৩১৯ 
(৫ই নভেম্বর, ১৯১২), মঙ্গলবার, একাদশী

বেলা প্রায় একটার সময় শ্রীশ্রীমা কাশী অদ্বৈতাশ্রমে শুভাগমন করেন। তথায় কিছুক্ষণ থাকিয়া পরে কিরণবাবুদের নূতন বাড়িতে (লক্ষীনিবাস) গমন করেন। বাড়িটি একেবারে নূতন, আশ্রমের নিকটেই। বেশ প্রশস্ত বারান্দা, দেখিয়া মা প্রশংসা করিয়া বলিলেন, “ভাগ্যবান না হলে এমন হয় না। ক্ষুদ্র জায়গায় থাকলে মনও ক্ষুদ্র হয়, খােলা জায়গায় দিলও খােলা হয়।”
মা এই বাড়িতে দোতলায় উঠিয়াই প্রথম ঘরটিতে ছিলেন। গােলাপ-মা, মাস্টার মহাশয়ের স্ত্রী ও আরও অনেক স্ত্রী-ভক্তেরা সঙ্গে ছিলেন। নীচে প্রজ্ঞানন্দ স্বামী ও আমরা থাকিতাম।
পরদিনই সকালবেলা পালকি করিয়া মা বিশ্বনাথ ও অন্নপূর্ণা দর্শন করিতে যান। ২৪শে কার্তিক, শ্যামাপূজোর পরদিন সকালে মা পুনরায় অদ্বৈতাশ্রমে আসেন এবং সেবাশ্রম দর্শন করেন। পূজ্যপাদ মহারাজ, হরি মহারাজ, চারবাবু, ডাক্তার কাঞ্জিলাল প্রভৃতি অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। কেদার বাবা শ্রীমার পালকির সঙ্গে সঙ্গে আসিয়া সমস্ত ওয়ার্ড দেখাইলেন ও প্রত্যেকটির পরিচয় দিলেন। অন্যান্য সমস্ত দেখিয়া মা দক্ষিণের বারান্দায় চেয়ারে আসন গ্রহণ করিলেন এবং কেদার বাবার সঙ্গে কথা কহিতে কহিতে সেবাশ্রমের বাড়ি, বাগান ও ব্যবস্থা সম্বন্ধে অতিশয় প্রীতি প্রকাশ করিলেন। বলিলেন, “এখানে ঠাকুর নিজে বিরাজ করছেন, আর মা লক্ষী পূর্ণ হয়ে আছেন। আচ্ছা এটি প্রথমে কি করে আরম্ভ হ'ল? এ ভাবটি কার মাথায় প্রথমে ঢুকেছিল?” কেদার বাবা চারবাবু প্রভৃতি যত্ন ও অধ্যবসায়ের উল্লেখ করিয়া বলিলেন, “বাড়ি-তৈরীর সময় বড়ো বাবা দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করিয়েছিলেন।” মহারাজ কেদার বাবার যত্ন, উদ্যম ও পরিশ্রমের কথা বলিলেন। মা আনন্দিত হইয়া বলিতেছেন, “স্থানটি এত সুন্দর যে আমার ইচ্ছা হচ্ছে কাশীতে থেকে যাই।” মা বাসায় ফিরিবার কিয়ৎক্ষণ পরেই একজন ভক্ত আসিয়া অধ্যক্ষকে বলিলেন, “শ্রীশ্রীমার সেবাশ্রমে দান এই দশটাকা জমা করে নেবেন।”
২৮শে অগ্রহায়ণ, শুক্রবার, শ্রীশ্রীমা পালকিতে প্রথমে কালভৈরব, বেণীমাধব, ত্রৈলঙ্গস্বামী, নাগপুররাজার মন্দির, গােয়ালিয়ররাজার মন্দির, সংকটা, বীরেশবর ও মণিকর্ণিকা প্রভৃতি দর্শন করিয়া সন্ধ্যায় বাসস্থানে ফিরিয়া আসেন। গোলাপ-মা ও মায়ের স্ত্রী-ভক্তেরা গাড়িতে এবং খগেন মহারাজ পালকির সঙ্গে সঙ্গে হাটিয়া গিয়াছিলেন। অন্য আর একদিন বৈদ্যনাথ ও তিলভাণ্ডেশ্বর দর্শন করিয়া মা বলিলেন, “এ স্বয়ম্ভুলিঙ্গ।” পরে একদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে কেদারনাথ দর্শন করিতে গেলেন। কিছুক্ষণ গঙ্গাদর্শন করিয়া সন্ধ্যারতি দর্শন করিলেন। বলিলেন, “এ কেদার ও সেই কেদার ( হিমালয়ের) এক-যোগ আছে। একে দর্শন করলেই তাঁকে দর্শন করা হয়, বড় জাগ্রত।”
একদিন মা সারনাথ দেখিতে যান। কয়েকজন সাহেবও দেখিতে গিয়াছিলেন। তাঁহারা সকলে অবাক হইয়া সারনাথের পুরাতন কীর্তি দেখিতেছেন। মা বলিলেন, “যারা করেছিল, তারাই আবার এসেছে। আর দেখে অবাক হয়ে বলছে, কি আশ্চর্য সব করে গেছে।” সারনাথ হইতে ফিরিবার সময় মহারাজ নিজের গাড়িতে মাকে পাঠাইলেন। প্রথমে মা কিছুতেই রাজী হন না, বলেন, “না, না, ও গাড়িতে রাখাল এসেছে, রাখাল ওরা যাবে। আমার এ গাড়িতে কষ্ট হবে না।” মায়ের গাড়ি রওয়ানা হইয়া দৃষ্টির বাহিরে যাইতেই মহারাজ যে গাড়িতে উঠিয়াছিলেন উহার ঘোড়া ক্ষেপিয়া গিয়া গাড়িসমেত রাস্তার পাশে খানায় পড়িল। মহারাজের শরীর বহু স্থানে ছড়িয়া গিয়া রক্তারক্তি হইয়াছিল।
মা এই ঘটনায় বলিয়াছিলেন, “এ বিপদ আমারই অদৃষ্টে ছিল। রাখাল জোর করে নিজের ঘাড়ে টেনে নিলে। না হলে ছেলেপিলে (রাধু, ভুদেব প্রভৃতি) গাড়িতে, কি যে হত।”
মা একবার কাশীতে দুইজন সাধুকে দর্শন করেন। গঙ্গাতীরে এক নানকপন্থী সাধু; এবং চামেলী পুরী। চামেলী পুরীকে যখন দর্শন করেন, গােলাপ-মা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কে খেতে দেয়।” বৃদ্ধ তদুত্তরে খুব তেজ ও বিশ্বাসের সহিত বলিয়াছিলেন, “এক দুগা মাঈ দেতী হ্যায়, ঔর কোন দেতা ?” উত্তরটি শুনিয়া মা খুব খুশী হইয়াছিলেন। বাড়িতে ফিরিয়া সন্ধ্যার পর আমাদিগকে বলিতেছেন, “আহা, বুড়াের মুখটি মনে পড়ছে। যেন ছেলেমানুষটির মতাে।” পরদিন তাহার জন্য কমলালেবু, সন্দেশ ও একখানি কম্বল পাঠাইয়া দেন। পরে একদিন আমি অন্যান্য সাধু দেখিবার কথা বলতে মা বলিলেন, “আবার সাধু কি দেখব? ঐ তাে সাধু, দেখেছি, আবার সাধু কোথা ?”
একদিন কাশীর কয়েকটি স্ত্রীলােক শ্রীশ্রীমাকে দর্শন করিতে আসিয়া দেখেন, মা রাধু ভুদেব প্রভৃতি ছেলেমেয়েদের লইয়া খুব ব্যস্ত, আবার নিজের পরিধেয় বস্ত্রখানি ছিড়িয়া যাওয়ায় একটু সেলাই করিয়া দিতে গােলাপ-মাকে বলিতেছেন। ঐ সবল দেখিয়া তাহাদের একজন বলিয়া উঠিলেন, ‘মা, আপনি দেখছি মায়ায় ঘোর বন্ধ।" অস্ফুট-স্বরে মা বলিলেন, “কি করব, মা, নিজেই মায়া।” 
আর একদিন বৈকালে তিন-চারিটার সময় কয়েকটি স্ত্রীলােক শ্ৰীশ্রীমায়ের নাম শুনিয়া দর্শন করিতে আসিলেন। মা বারান্দায় বসিয়া আছেন। গােলাপ মা প্রভৃতি এক পাশে বসিয়া। একটি স্ত্রীলােক গােলাপ-মাকে প্রাচীন এবং ভব্যআকৃতি-বিশিষ্টা দেখিয়া তাহাকেই মাতাঠাকুরানী মনে করিয়া প্রণাম করিয়া কথা বলিতে যাওয়ায় গােলাপ-মা বুঝিতে পারিয়া বলিলেন, ঐ উনিই মা-ঠাকরুন।” মায়ের সাদাসিধা চেহারা দেখিয়া তিনি ভাবিলেন, মাতাঠাকুরানী বুঝি রহস্য করিতেছেন। গোলাপ-মা আবার বলায় তিনি যেমন মাকে প্রণাম করিত গেলেন, অমনি মাও হাসিয়া বলিলেন, “না, না, ঐ উনিই মা ঠাকরুন।” তখন স্ত্রীলােকটি মহা সমস্যায় পড়িলেন। গোলাপ-মা এবং মা বারবার পরস্পরকে দেখাইয়া বলিতেছেন, “ঐ উনিই মা-ঠাকরুন।” আমরা দেখিয়া হাসিতেছি। শেষে যখন তিনি গােলাপ-মাকেই মাতাঠাকুরানী সাব্যস্ত করিয়া তাহার দিকে ফিরিতে গেলেন, তখন গােলাপ-মা তাহাকে ধমক দিয়া বলিলেন, “তােমার কি বুদ্ধি-বিবেচনা নেই ? দেখছ না, মানুষের মুখ, কি দেবতার মুখ। মানুষের চেহারা কি অমন হয়?”
বাস্তবিকই মায়ের সরল, প্রসন্ন দৃষ্টিতে এমন একটি বিশেষত্ব ছিল যাহাতে ঘতই তাহাকে একটু অসাধারণ বলিয়া ধারণা হইত।

কিরণবাবুর বাড়ি, কাশীধাম, প্রাতঃকাল 

আমি—বিশ্বনাথকে রােজ সব লােকে ছোঁয়, সেজন্য সন্ধ্যার পর অভিষেক হয়ে তবে আরতি ও ভােগ হয়। (তখন দিনের বেলায় ভােগ হইত না।)
মা—পাড়াগুলাে টাকার জন্য ওরূপ ছুঁতে দেয়। কেন হতে দেওয়া ? দুর থেকে দর্শন করলেই তাে হয়। যত লােকের পাপ এসে লাগে। কত অসচ্চরিত্র নানারকমের লোক সব ছোঁয়।
“এক একটা লোক এমন আছে যে ছুলে সব শরীর গরম হয়, জ্বালা করে। তাই হাত পা ধুয়ে ফেলতে হয়। এখানে তবু লোকের ভিড় কলকাতার চেয়ে কম।
আমি—এখানে যে মহারাজদের অনুমতি নিয়ে এলে তবে দর্শন হয়—ভিড় কম:বার জন্য এই ব্যবস্থা করেছেন।
মা—হাঁ, কে এত সাত জায়গায় দরবার দিয়ে আসতে চায় ?
পাগলী মামী এখানেও মাকে জ্বালাতন করিতেছেন। সেই কথার উল্লেখ করিয়া মা বলিলেন, “হয়তাে কাটাসুদ্ধ বেলপাতা শিবের মাথায় দিয়েছি, তাই আমার এই কণ্টক হয়েছে।”
আমি—সে কি ? না জেনে দিলে দোষ কি ?
মা—না, না ; শিবপূজা বড় কঠিন। ওতেও বড় দোষ হয়। কি জান, যাদের শেষ জন্ম তাদের কর্মগুলাে সেই জন্মেই ভােগ হয়ে যায় ।*
“আমি তাে জন্মাবধি কোন পাপ করেছি বলে মনে পড়ে না। পাঁচ বছরের সময় তাঁকে ছুঁয়েছি। আমি না হয় তখন না বুঝি, তিনিও তাে ছুঁয়েছেন। আমার কেন এত জ্বালা? তাকে ছুঁয়ে অন্য সকলে মায়ামুক্ত হচ্ছে, আর আমারই কি এত মায়া ? আমার যে মন রাত দিন উঁচুতে উঠে থাকতে চায়, জোর করে তা আমি নীচে নামিয়ে রাখি—দয়ায়, এদের জন্য, আর আমার এত জ্বালাতন ?” 
আমি— মা, যতই করুক না কেন, সহ্য করে যাবে। মানুষ হুঁশে থাকলে রাগে না।
মা—ঠিক কথা, বাবা! সহ্যর চেয়ে কিছুই নাই। তবে কি জান। রক্তমাংসের শরীর, হয়তাে রেগেমেগে কিছু বলে ফেললুম।
আপন মনে বলিতেছেন, “যে সময়ে বলে সে বান্ধব। অসময়ে ‘আহা' করলে কি হয় ?”

*জনৈক ত্যাগী ও জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “মা, আমাদের এত রােগ-ভােগ কেন ?” মা তদুত্তরে বলেন, “তােমাদের এই শেষ জন্ম, তাই বাকী সব  জন্মের কর্মফল এ  জন্মে ভােগ হয়ে যাচ্ছে।

১১ই ডিসেম্বর, ১৯১২ 

মায়ের ওখানে কাশীখণ্ড-পাঠ হইত। সন্ধ্যায় পাঠের পর কথাবার্তা হইতেছে।
আমি—কাশীতে ম'লে কি সবারই মুক্তি হয় ? 
মা—শাস্ত্রে বলছে ‘হয়। 
আমি—তুমি কি দেখলে? ঠাকুর তাে দেখেছিলেন শিব তারকব্রহ্ম-মন্ত্র দেন। 
মা—কি জানি বাপু, আমি তাে কিছু দেখিনি। 
আমি—তােমার মুখে না শুনলে বিশ্বাস করি নে। 
মা—ঠাকুরকে বলব, ‘ঠাকুর, এ বিশ্বাস করতে চায় না, আমাকে কিছু দেখিয়ে দাও।’
ইহার পর আমি মুসলমানরাজত্বে ভারতের নানাস্থানে মন্দির ধ্বংসের উল্লেখ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম “এই যে এত অত্যাচার, তার তিনি কি করলেন?” 
মা—তাঁর অনন্ত ধৈর্য। এই যে তাঁর মাথায় ঘটি ঘটি জল ঢালছে দিনরাত, তাতেই বা তার কি? আর শুকনাে কাপড় দিয়ে ঢেকে পুজা কর, তাতেই বা তাঁর কি? তাঁর অসীম ধৈর্য। 
পরদিন সকালে খগেন মহারাজ মাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “শ্রীশ্রীঠাকুর কাশীতে এত সব দর্শন করেছিলেন, আপনি কি দেখলেন ?" উত্তরে মা বলিলেন, “রাতে বিছানায় শুয়ে জেগে আছি, হঠাৎ দেখি যে বৃন্দাবনের শেঠের বাড়ি নারায়ণমূর্তি পাশে দাঁড়িয়ে। মুর্তির গলার ফুলের মালা পা পর্যন্ত, ঝুলছে।
ঠাকুর ঐ মূর্তির সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে। আমি মনে ভাবছি, ঠাকুর এখানে কি করে এলেন?' বললুম, ও বিশ্বাস করতে চায় না। ঠাকুর বললেন ‘বিশ্বাস করবে বইকি, সব সত্য। (অর্থাৎ কাশীতে মরিলে মুক্তি হয়।)
“সেই নারায়ণ মূর্তি আমাকে দুটি কথা বললেন। তার একটি এই‘ঈশ্বরতত্ব না করলে কি তত্বজ্ঞানের উদয় হয় ?’ অপরটি মনে করতে পারছি না।”
খগেন মহারাজ—ঠাকুর নারায়ণমূর্তির সামনে হাতজোড় করে কেন? 
মা—ও তাঁর ওরকম ভাব ছিল—সকলের সামনে দীনতা।
সকালে পূজার পর যখন প্রসাদ আনিতে গিয়াছি, পূর্বদিনের কথা মনে করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “বল, কাশীতে মলে মুক্তি হয় কি না, কি দেখলে ?”
মা—শাস্ত্রাদিতে আছে, আর এত লোক আসছে মুক্তি হয়। তার শরণাগত যে তার মুক্তি হবে না তাে হবে কি ?
আমি—শরণাগত যে তার তাে মুক্তি হবেই। যে শরণাগত নয়, ভক্ত নয়, বিধর্মী—এদের মুক্তি হবে কি না?
মা—তাদেরও হবে। কাশী চৈতন্যময় স্থান। এখানে সব জীব চৈতন্যময় --পােকাটা মাকড়টা পর্যন্ত। ভক্তাভক্ত, বিধর্মী, যে এখানে মরবে-কীটপতঙ্গ পর্যন্ত তারই মুক্তি হবে।
আমি—সত্য বলছ ? 
মা—হাঁ, সত্য বইকি! নইলে আর স্থানমাহাত্ম কি ?
প্রসাদী মিষ্টির গন্ধে আমার হাতে একটা মাছি বসিয়াছিল ; সেটিকে দেখাইয়া বলিলাম, “এই মাছিটারও?”
মা—হাঁ, মাছিটারও হবে। এখানের সব চৈতন্যময় জীব। ভুদেব দুটো পায়রা নিতে চেয়েছিল, উপরে সিঁড়ির কোথায় বাচ্চা হয়েছিল। আমি বললুম, ‘ওরে, না, না। এরা কাশীবাসী, এদের নিতে নেই।'
“বাঙালিদেশের মেয়েছেলে সব, দেখগে বাঙালীটোলায়। এদের কি ঘরবাড়ি, আত্মীয়স্বজনের মায়া নেই ? এরা সব কাশীলাভের জন্য এখানে এসেছে। বেশ জ্ঞান, মায়া নেই।”
আমি—দেখলে বাঙালিদের কেমন জ্ঞান ?
মা—হাঁ, ও দেশের (মায়ের দেশের) লােকগুলাের কান নেই। এই তাজপু্রের (রাধুর শ্বশুরবাড়ীর)ওয়া—ওদের তাে এখানে বাড়ি রয়েছে। তবু কাশীবাসের নামে ভয় পায়। মনে করে, বাড়িতে থাকলে যেন মরবে না। মরণ ভাে সঙ্গে সঙ্গেই আছে। 
আমি—সত্য বলছ এখানে মলে মুক্তি হয় ?
মা—(বিরক্ত হইয়া) আমি তােমার কাছে তেসত্য করতে পারব না। এক সত্যেই রক্ষা নেই, তা আবার তেসত্য, কাশীতে!
আমি—(হাসিয়া) দেখাে, আমার যেন কাশীতে মৃত্যু না হয়। তা হলে আমিই বা কোথায়, আর তুমিই বা কোথায় থাকবে—দেখাই হবে না।
মা—( সহাস্যে) কি বলে—’আমার কাশী চাইনি'। 
আমি—মা, একটা কিছু প্রত্যক্ষ হলে তবে তাে সত্য বিশ্বাস হয় ?
মা—তা মানুষ মহাজনদের কথা নেবে না তাে কি করবে? মুনি ঋষিরা যা বলে গেছেন, মহাজনেরা যে পথে গেছেন, তা ছাড়া আর পথ কি ? 
আমি—প্রত্যক্ষ যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের কথা শুনব না তাে কি করব? তাইতাে তােমাকে জিজ্ঞাসা করি। তুমি বললে তবে তোমাকে ছাড়ব। 
মা—তুমি বিশ্বাস করলে আর না করলে তাতে তার কি ? শুকদেব তাে ডেয়াে পিঁপড়ে। অনন্ত তিনি, তাঁর কি বুঝবে? ঠাকুর ছিলেন—তিনি একটি দেখা ( প্রত্যক্ষদশী) লােক, তিনি সব দেখেছেন, তিনি সব জানেন, তার কথা বেদবাক্য। তাঁর কথা যদি বিশ্বাস না করবে তাে কি করবে ? 
আমি—শাস্ত্রে তাে কত কথা বলে। এ বলছে এই, ও বলছে ঐ ; কার কথা নেব ? তাই তােমাকে জিজ্ঞাসা করি।
মা—তা তাে বটে। পাঁজিতে বিশ আড়া জল লিখেছে, নেংড়ালে এক ফোঁটাও বেরােয় না। আর শাস্ত্রে অনেক বাজে কথাও ভরেছে। শাস্ত্রবিধি অত আর পারা যায় না। তিনি বলতেন, “বৈধী-ভক্তি ভক্তিই নয়।”
“কামারপুকুরে যখন ছিলুম, বৃন্দাবন থেকে আসবার পর তখন সব লােকের ভয়ে-এ ও বলছে ও তা বলছে—হাতের বালা খুলে ফেললুম। আর ভাবতুম গঙ্গাহীন স্থানে কি করে থাকব, গঙ্গাস্নানে যাব মনে করলুম। আমার বরাবরই একটা গঙ্গাবাই ছিল। একদিন দেখি কি সামনের রাস্তা দিয়ে ঠাকুর আসছেন আগে আগে (ভূতির খালের দিক থেকে) , পিছনে নরেন, বাবুরাম, রাখাল, সব যত ভক্তেরা—কত লােক। দেখি কি ঠাকুরের পা থেকে জলের ফোয়ারা ঢেউ খেলে খেলে আগে আগে আসছে—এই জলের স্রোত! আমি ভাবলুম, দেখছি ইনিই তাে সব, এর পাদপদ্ম থেকেই তাে গঙ্গা! আমি তাড়াতাড়ি রঘুবীরের ঘরের পাশের জবাফুল গাছ থেকে মুটো মুটো ফুল ছিড়ে এনে গঙ্গায় দিতে লাগলুম। তারপর ঠাকুর আমাকে বললেন, “তুমি হাতের বালা ফেলাে না। বৈষ্ণব-তন্ত্র জান তাে? আমি বললুম, ‘বৈষ্ণব-তন্ত্র কি ? আমি তাে কিছু জানি নে।' তিনি বললেন, আজ বৈকালে গৌরমণি আসবে, তার কাছে শুনবে। সেইদিনই বৈকালে গৌরদাসী এল। তার কাছে শুনলুম, ‘চিন্ময় স্বামী।’*
“এ কলিতে শুধু সত্যের আঁট থাকলেই ভগবানলাভ হয়। ঠাকুর বলতেন, “যে সত্যকথাটি ধরে আছে সে ভগবানের কোলে শুয়ে আছে। দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের অসুখের সময় তাঁকে রোজ যে দুধ দিতুম তা জ্বাল দিয়ে বেশ ঘন করে দিতুম আর এক সের দুধ হলে বলতুম আধ সের কম করে বলতুম। ঠাকুর একদিন টের পেয়ে বললেন, সেকি! সত্য ধরে থাকবে। এই আমার বেশী দুধ। খেয়ে পেটের অসুখ হয়েছে। যাই মনে করা, অমনি সেদিন পেটের অসুখ হ'ল।
“তার সব সুযােগ ছিল। আমাদের সে সব কই?” 
শেষে আমি বললাম, “মা, আমি এসব যা জিজ্ঞাসা করি, ও অমনি বলি, আমি ওসবের জন্য অত ভাবি না। আমার মনের ভাব অন্য রকম। আমি নিজে জানতে চাই, তােমাকে যে মা বলে ডাকি, তুমি আপন মা কিনা।”
মা—আপনার মা নয় তাে কি ? আপনারই মা।
আমি—তুমি তাে বললে, আমি যে ভাল বুঝতে পারছি না। গর্ভধারিণী মাকে যেমন আপনা হতেই মা বলে জানি, এমন তােমাকে মনে হয় কই ? 
মা—আহা, তাই তাে।
পরক্ষণেই বলিতেছেন, “তিনিই মা-বাপ, বাছা, তিনিই মা-বাপ হয়েছেন।” ( অর্থাৎ যে মা-বাপের দৃষ্টান্ত দিলাম তাঁহারাও তিনিই)।

*যােগেন মা কামারপুকুর যাইলে মা তাঁহাকে এই ঘটনা বর্ণনা করিয়া বলিয়াছিলেন, “ঐ অশ্বথগাছের গােড়ায় ঠাকুর তখন দাঁড়িয়েছিলেন। শেষে দেখলুম, ঠাকুর নরেনের দেহে মিলিয়ে গেলেন। তারপর যােগেন-মাকে বলিলেন, “এইখানকার ধুলি খাও, প্রণাম কর।" এই কথা স্বামীজীর কানে পৌঁছিলে তিনি বলিয়াছিলেন, “একথা (অথাৎ ঠাকুরের স্বামীজীর দেহে প্রবেশ করার কথা ) আমাকে বলা ভাল হয়নি।”

১লা পৌষ, সন্ধ্যা ৭টা 

মা তাহার ঘরে শুইয়া শুইয়াই কথা বলিতেছেন। ‘কাশীখণ্ডে’ আছে, কাশীতে মাছ খাওয়া উচিত নয়। সেই প্রসঙ্গ হইতেছিল।
আমি—তা মাছ খেলে প্রাণীহত্যা হয় তো। 
মা—ওসব মানুষের খাদ্য, মানুষ খাবে না তাে কি করবে ? 
আমি—খাদ্যের নাম করে প্রাণীকে ব্যথা দেবে?
মা— (অন্য কথার পর) তা বিচার করতে গেলে ওতেও হিংসা হয় বইকি প্রাণী তাে? কাশীপুরে ঠাকুরের জন্য শামুকের ঝােল ব্যবস্থা হল। ঠাকুর আমাকে করতে বললেন। আমি বললুম, এগুলাে জীয়ন্ত প্রাণী, ঘাটে দেখি চলে বেড়ায়। আমি এদের মাথা ইট দিয়ে ছেঁচতে পারব না।' শুনে ঠাকুর বললেন, ‘সেকি! আমি খাব, আমার জন্য করবে। তখন রেিখ করে করতে লাগলুম। 
“সব সময় মনের এক অবস্থা থাকে না। (আমার প্রতি) তুমি সব খাবে। তােমার ওসব বিচার করবার দরকার নেই।” 
আমি দর্শনাদির কথা উত্থাপন করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “মা, লােকে এই যে দর্শনাদি করে, এসব কি ভাবে, না সাদা চোখে ?” 
মা—সবই ভাবে। আমি কিন্তু সাদা চোখে দেখেছিলাম—কামারপুকুরে গৈরিকপরা, রাধুর মতাে অতটুকু মেয়ে (১১/১২ বছরের), মাথায় রুখাে রুখো চুল, রুদ্রাক্ষের মালা গলায়, যেখানে যাই সেখানেই সঙ্গে সঙ্গে ফিরছে—এই সামনে, এই পিছনে!
“তারপর বেলুড়ে তখন নীলাম্বর বাবুর বাড়িতে-পঞ্চতপা করলুম। যােগেনও করলে। সেই সাধন-টাধনের পর মিশে গেল—আর দেখিনি।”
আমি—তপস্যার কি দরকার? 

১.কাশীতে আমি মাছ খাইতাম। কিন্তু মার জীবহিংসা সম্বন্ধীয় পর্বোক্ত কথাটি আমা্র মনে লাগায় কলিকাতায় গিয়া প্রায় এক বৎসর মাছ খাই নাই। মা তাহা জানিতেন না। পরে তাহার সহিত যখন জয়রামবাটী যাই, সেখানে আমি মাছ খাইতেছি না দেখিয়া মা উহা খাইবার জন্য আমাকে বলেন; কিন্তু আমি খাইলাম না। আবার একদিন বিশেষ করিয়া বলেন, সেদিনও আমি খাই নাই। তৃতীয়বার পুনরায় খুব বলেন। “তোমরা মাছ খাবে এতে দােষ কি? তােমরা তো। বিধবা নও। বিধবাদের খেতে নেই-ইত্যাদি অনেক বলায় শেষে আমি খাই। ভাবিলাম, উনি অত করিয়া বলিতেছেন। আর দেশে মাছ ছাড়া খাইতেই বা কি দিবেন?

মা—তপস্যা দরকার। এই যােগেন এখনও কত উপবাস করে। এ তপস্বী। গােলাপ জপে সিদ্ধ।
“নরেনের মা আমাকে দেখতে এসেছিল। নরেন তাকে বললে, “এই তুমি হয়তাে তপস্যা করেছিলে বলে বিবেকানন্দকে পুত্র পেলে। আবার তপস্যা কর, আবার হয়ত একটা পাবে।”
ঠাকুরের পঞ্চবটীতে তপস্যার কথা মা বলিলেন। তাহাতে আমি বলিলাম, ‘তাঁর ব্যাকুলতায় হুঁশ থাকত না, গঙ্গার জোয়ার মাথা বয়ে যেত। তুমি তাঁর কথা কেন বলছ ? পঞ্চতপা-টপ এসব করে শরীরকে কেন কষ্ট দেওয়া ?"
মা—পার্বতীও শিবের জন্য করেছিলেন। 
আমি—শিবও তাে করেছেন-ধ্যানস্থ।
মা—হাঁ, তবে এসব করা লােকের জন্য। নইলে লােকে বলবে, কই সাধারণের মতাে খায় দায় আছে। আর পঞ্চতপা-টপা, এসব মেয়েলী-যেমন ব্রত সব করে না?
আমি—হাঁ বুঝেছি। যেমন ব্রত করে, 'এসবও তেমনি ব্রত।
মা—ঠাকুর সব সাধনা করেছেন। বলতেন, ‘আমি ছাঁচ করে গেলুম, তােরা সব ছাঁচে ঢেলে তুলে নে।
আমি—“ছাঁচে ঢালা মানে কি? 
ভুদেব—মানে ঠাকুরকে চিন্তা করা।
মা—ও বুঝেছে। ‘ছাঁচে ঢালা’ মানে ঠাকুরকে ধ্যান-চিন্তা করা। ঠাকুরকে ভাবলেই সব ভাব আসবে। তিনি যে-সব করেছেন তা চিন্তা করা। ঠাকুর বলতেন, ‘আমাকে যে স্মরণ করে তার কখনও খাওয়ার কষ্ট থাকে না।
মাকু—তিনি নিজে বলেছেন?
মা—হাঁ, তাঁর নিজ মুখের কথা। তাঁকে স্মরণ করলে কোন দুঃখ থাকে না। দেখছ না, তাঁর ভক্তেরা সকলেই ভাল আছে। তার ভক্তের মতাে এমনটি কোথাও দেখা যায় না। এই তাে কাশীতে এত সাধু দেখেছি, তার ভক্তগুলির মতো কোনটি?
আমি—তার কারণ আছে, মা। যেন এইমাত্র একটা বাজার ভেঙেছে। সব চিহ্ন, লােকজন এখনও রয়েছে—ঠাকুরের সব অন্তরঙ্গ ভক্ত-টক্ত রয়েছেন কিনা? মনে হয়, এই যেন কাছে, বেশী দুর যান নি–ডাকলেই তার সাড়া পাওয়া যাবে।
মা—আর কত লােক পাচ্ছে যে!
আমি—কৃষ্ণ, রাম এরা যেন কত কালের। যেন পাওয়ার মতাে কাছে নাই।
মা—হাঁ, ঠিক কথা। 
আমি কাশীপুর বাগানের কথা উল্লেখ করিয়া বলিলাম, “এমন স্থানে এখন কে এক সাহেব বাস করছে।”
মা—কাশীপুর বাগান তাঁর অন্ত্যলীলার স্থান। কত তপস্যা, ধ্যান, সমাধি। তাঁর মহাসমাধির স্থান-সিদ্ধস্থান। ওখানে ধ্যান করলে সিদ্ধ হয়। 
“ঠাকুর যদি তাদের (মালিকদের) স্বপ্ন দিয়ে স্থানটি করে নেন তবে হতে পারে।
“ঐ কাশীপুরে একদিন নিরঞ্জন-টিরঞ্জন ওর কাঁচা রস খাবে বলে রস চুরি করতে যাচ্ছে। আমি দেখি কি ঠাকুরও তাদের পিছে-পিছে যাচ্ছেন। পরদিন তাঁকে একথা বলায় তিনি বললেন, ‘ও রেঁধে তােমার মাথা গরম।'

১. এই ঘটনার একটু বিস্তৃত বিবরণ নীরদ মহারাজের মাতা শ্রীশ্রীমার নিকট এইরুপ শুনিয়াছিলেন। ঠাকুর তখন কাশীপুরের বাগানে অত্যন্ত পীড়িত। এত দুর্বল যে একেবারে শয্যাশায়ী। স্বামীজী প্রভৃতি অন্তরঙ্গ ভক্তগণ সর্বদা তাহার সেবা করিতেছেন। একদিন তাহারা স্থির করিলেন, বাগানের এক পাশের একটি খেজুর গাছ হইতে সন্ধ্যার সময় জিরেনের রস খাইবেন। ঠাকুরকে কিন্তু সে সম্বন্ধে কিছুই জানাইলেন না। সন্ধ্যার সময় তাহারা সকলে সেই গাছটির দিকে চলিলেন। শ্রীশ্রীমা তখন সেই বাড়িতেই থাকিতেন। তিনি হঠাৎ দেখিলেন, ঠাকুর তীরবেগে নীচে চলিয়া গেলেন। দেখিয়া চমকিয়া উঠিলেন। ভাবিলেন, ইহা কি সম্ভব। যাহাকে পাশ ফিরাইয়া দিতে হয়, তিনি ইহা কিরুপে করিলেন। অথচ চাক্ষুষ দেখিলেন। তখন ঠাকুরের ঘরে যাইয়া দেখিলেন, ঠাকুর বিছানায় নাই, ঘর শূন্য। মা ভয়বিহুল হইয়া চারিদিক খুঁজিয়াও তাঁহাকে দেখিতে পাইলেন না এবং নিজ স্থানে ফিরিয়া গিয়া উৎকট চিন্তায় অভিভূত হইলেন—এ কি ঘটনা হইল। কিছুক্ষণ পরে দেখিলেন, ঠাকুর পূর্বের ন্যায় তীরবেগে আপন ঘরে ফিরিয়া আসিলেন। মা পরে তাহার নিকট গিয়া ঐ সম্বন্ধে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করায় ঠাকুর বলিলেন, “তুমি দেখেছ নাকি?” তারপর বলিলেন, “ছেলেরা সব এখানে এসেছে সকলেই ছেলেমানুষ। তারা আনন্দ করে এই বাগানের একপাশে একটা খেজুর গাছ আছে, তারই রস খেতে যাচ্ছিল। আমি “দেখলাম, ঐ গাছতলায় একটা কালসাপ রয়েছে। সে এত রাগী যে সকলকেই কামড়াত। ছেলেরা তা জানত না। তাই আমি অন্য পথে সেখানে গিয়ে সাপটাকে বাগান থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এলুম। বলে এলুম, “আর কখনও ঢুকিস নে'।” মা ইহা শুনিয়া অবাক হইলেন। ঠাকুর তাঁহাকে উহা তখন প্রকাশ করিতে নিষেধ করিয়াছিলেন।

“ঢাকায় বিজয় গোসাইও দেখেছিল ( ঠাকুরকে)-গা টিপে। 
 ‘তাঁর যাবার পর নরেন এরা বললে, “বাড়িটা তিন দিনও থাক, আমরা ভিক্ষা করে খাওয়াব মাকে—সদ্য সদ্য মায়ের মনে কষ্ট।' রামদত্ত-টত্ত এরা বললে, “তােদের আর ভিক্ষে করে খাওয়াতে হবে না। বাড়ি চুকিয়ে দিলে।
“এই যে গিরিশবাবু এখন সব বড় ভক্ত হয়েছে ! বলরামবাবু তবে গৃহীদের মধ্যে বলরামবাবু সব চেয়ে বড়। সব ভক্ত হিসাবে ভক্ত। কে এলেন ? না ভক্ত এলেন! এলে গেলে, প্রণাম করলে ! *
“শরৎ যে কদিন আছে, সে কদিন আমার ওখানে থাকা চলবে। তারপর আমার বােঝা নিতে পারে এমন কে আছে দেখি না। যোগীন ছিল। কৃষ্ণলালও আছে, ধীর, স্থির—যােগীনের চেলা। •••শরৎটি সর্বপ্রকারে পারে। শরৎ হচ্ছে আমার ভারী। রাখাল, শরৎ-টরৎ, এরা সব আপনার শরীর থেকে বেরিয়েছে।”
আমি—মহারাজ পারেন না ?
মা—না; রাখালের সে ভাব নয়। ঝঞ্জাট পারে না। মনে মনে পারে, কি কারুকে দিয়ে করাতে পারে। রাখালের ভাবই আলাদা।
আমি—বাবুরাম মহারাজ ? 
মা—না, সেও পারে না। 
আমি—মঠ চালাচ্ছেন যে। 
মা—তা হােক। মেয়েমানুষের ঝঞ্জাট ! দুর থেকে খবর নিতে পারে।
“এই রাধুর বিয়ের কথা—এটি মায়ের বােঝা। আপনার মায়ের বােঝা কে মনে করছে ? আপনার জন কয়টি আর ? দু-চারটি। ঠাকুর বলেছিলেন, ‘কটিই বা অন্তরঙ্গ।’
আমি—কোন কোন ভক্ত কে, বল না; কিছুই চিনতে পারলুম না। 
মা—কি জানি। তবে যারা সব (পূর্বে) এসেছিল তারাই এসেছে।
একটি ভক্তের কথায় বলিলেন, “হাঁ, তাই হবে। ওর ভিতরের স্বভাবটি আনন্দময়। বাহিরে এ রকম।”
আমি –চতুর্ভুজ প্রভৃতি দর্শনের সাধ আমার হয় না, আমার যা আছে তাই।
মা–আমারও তাই। ওসব দেখে কি হবে ? আমাদের এই ঠাকুর আছেন–উনিই সব।
২রা মাঘ বুধবার, মা কাশী হইতে কলিকাতা রওনা হন।

*প্রথমবার বৃন্দাবন হইতে ফিরিয়া মা বর্ধমানের রাস্তায় কামারপুকুর যান। টাকার অভাবে বর্ধমান হইতে উচালন পর্যন্ত তাঁহাকে হাঁটিয়া যাইতে হয়। উহাতে মা খুব ক্লান্ত হইয়া পড়ে। সঙ্গে গােলাপ-মা, যোগানন্দ স্বামী প্রভৃতি ছিলেন। উচালান গােলাপ-মা কোনপ্রকারে দুটি খিচুড়ি সিদ্ধ করেন। মা ক্ষুধায় তাহাই খাইয়া বার বার বলিয়াছিলেন, “ও গোলাপ, তুমি কি অমৃতই রেঁখেছ।

১১-২-১৯১৩, উদ্বোধন 

আমি—মা, এই যে স্বামীজী কত লােককে মন্ত্র দিয়েছেন, তুমিও কত লােককে দিচ্ছ, এ যেন কেউ এলে দুটো টাকা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হ’ল, আর মনে রইল না।
মা—এত লােক আসছে, কটিকে মনে রাখা যায় ? আগুন জ্বাললে বাদলে পােকা আসে না ? সেই রকম।
আমি—এই যে মন্ত্র নেয়, কি পায় ? এমনি তাে বাহ্য দৃষ্টিতে দেখি, লােকটি যেমন ছিল তেমনি আছে।
মা–মন্ত্রের মধ্য দিয়ে শক্তি পায়। গুরুর শক্তি শিষ্যে যায়, শিষ্যের গুরুতে আসে। তাই তাে মন্ত্র দিলে পাপ নিয়ে শরীরে এত ব্যাধি হয়। গুরু, হওয়া বড় কঠিন-শিষ্যের পাপ নিতে হয়। শিষ্য পাপ করলে গুরুও লাগে। ভাল শিষ্য হলে গুরুও উপকার হয়। কারও বা হঠাৎ উন্নতি হয়, কারও বা ক্ৰমে হয়। তা যার যেমন সংস্কার।
“রাখাল তাই মন্ত্র দিতে চায় না। বলে, 'মা, মন্ত্র দিলে অমনি শরীর অসুস্থ হয়। মন্তরের নামে আমার গায়ে জ্বর আসে!”
জনৈক মহারাজ একটি ছেলেকে মন্ত্র লইবার জন্য মার কাছে পাঠাইয়াছে। মা তাহার সমস্ত পরিচয় শুনিয়া বলিলেন, “তােমাদের সব গােসাই গােবিন্দ আছেন। তাঁদের কাছ থেকে মন্ত্র নেবে।” যে কোন কারণে হউক মা তাহাকে দীক্ষা দিলেন না। 
প্রসঙ্গক্রমে বলিলেন, “কুলধর্মানুযায়ী চলা উচিত। জাতিবিচার সংসারে থাকলে মেনে চলতে হয়।” 
রাত্রে খাইবার পর পান আনিতে গিয়াছি। মা পাশের ঘরে ছেলেমেয়েদের মশারি খাটাইয়া দিতেছিলেন। শুনিলাম মা পাগলী মামীকে বলিতেছেন,‘তুই আমাকে সামান্য লােক মনে করিসনি। তুই যে আমাকে অত বাপান্ত মা-অন্ত করে গাল দিচ্ছিস, আমি তাের অপরাধ নিই না। ভাবি দুটো শব্দ বই তাে নয়। আমি যদি তাের অপরাধ নিই তা হলে কি তাের রক্ষা আছে ? আমি যে কদিন বেঁচে আছি, তােরই ভাল। তাের মেয়ে হারই হবে। যে কদিন না মানুষ হয়, সে কদিনই আমি। নতুবা আমার কি মায়া ? এক্ষণি কেটে দিতে পারি। কপূর্রের মতাে কবে একদিন উড়ে যাব, টেরও পাবিনি। 
পাগলী–আমি তােমাকে বাপান্ত করে কবে গাল দিয়েছি? আমি বাপান্ত করিনি-অমনি বলেছি। তুমি যাকে দাও, সব যে দিয়ে ফেল।
তাঁহার মনের ভাব মা যেন টাকা-পয়সা সব রাঁধুর জন্য রাখিয়া দেন।
ম—আমার বালকস্বভাব। আমার কি অত আগপাছ হিসাব থাকে? যে চাইলে দিলুম।
কাশী হইতে ফিরিয়া মা অল্প কয়েকদিন কলিকাতায় থাকিয়া জয়রামবাটী রওয়ানা হইলেন। ১৩ই ফাগুন কোয়ালপাড়া মঠে পেীঁছিলেন। ঠাকুরঘরের পাশের ঘরে মাকে থাকিতে দেওয়া হইয়াছে। একটি বটফলের বীজ বাহির করিয়া মাকে বলিতেছিলাম, “মা, দেখছ, লাল শাকের বীজের চেয়েও ছােট। এ থেকে অত প্রকাণ্ড গাছ! কি আশ্চর্য !” মা বলিলেন, “তা হবে না? এই দেখ না, ভগবানের নামের বীজ কতটুকু ? তা থেকেই কালে ভাব, ভক্তি, প্রেম, এসব কত কি হয়।” 
জয়রামবাটীতে আসিয়া রাত্রে আমরা খাইতে বসিয়াছি। আমাদের মধ্যে একজন বলিলেন, “মা, দেখলেন, এদের (মামাদের) কি আক্কেল ? আপনি এলেন, তা একটি লোকও নদীর ধারে পাঠালে না।” এই কথার উল্লেখ করিয়া মা বড় মামাকে বলিলেন, “এই যে আমি এলুম, তুই নদীর ধারে লােক পাঠালি না কেন? আমার এই ছেলেগুলি এল। তুই একটি লােকও পাঠালি নে, নিজেও গেলি নে।”
প্রসন্ন মামা-দিদি আমি কালীর ভয়ে পাঠাইনি। পাছে কালী বলে ‘দিদিকে হাত ক'রে নিতে যাচ্ছে। আমি কি বুঝি না, তুমি কি বস্তু, আর এরা ( ভক্তেরা) কি বস্তু? সব জানি, কিন্তু কিছু করবার সাধ্য নেই। ভগবান এবার আমাকে সে ক্ষমতা দেয়নি। এই আশীর্বাদ কর, যেন তােমাকে এবার যে ভাবে পেয়েছি, এই ভাবে জন্মে জন্মে পাই, অন্য আর কিছুই চাই নে।
মা—তােদের ঘরে আর ? এই যা হয়ে গেল। রাম বলেছিল, ‘মরে যেন আর না জন্মাই কৌশল্যার উদরে।' আরও তােদের মধ্যে ? বাবা পরম রামভক্ত ছিলেন, পরোপকারী, মায়ের কত দয়া ছিল ; তাই এ ঘরে জন্মেছি।
একদিন প্রসন্ন মামা আসিয়া মাকে বলিলেন, “দিদি, শুনলাম তুমি নাকি কাকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছ, তাকে মন্ত্র দিয়েছ, আবার এও বলে দিয়েছ যে তার মুক্তি হবে। আর আমাদের তুমি কোলে করে মানুষ করেছ—আমরা কি চিরদিনই এমনি থাকব।” মা উত্তরে তাঁহাকে বলিলেন, “ঠাকুর যা করবেন, তাই হবে। আর দেখ, শ্রীকৃষ্ণ রাখাল-বালকদের সঙ্গে কত খেলেছেন, হেসেছেন, বেড়িয়েছেন, তাদের এটো খেয়েছেন, কিন্তু তারা কি জানতে পেরেছিল কৃষ্ণ কে ?”
একদিন আমরা কয়েকটি ভক্ত আহারান্তে উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করিতে যাইতেছি । মা তাহাতে বাধা দিয়া বলিলেন, “না, না, ওসব রেখে দাও—তােমরা দেবের দূর্লভ জিনিস।” ভক্তেরা আপত্তি করায় বলিলেন, “ও ফেলবার লােক আছে, ঝি আছে।”

১৪-৩-১৩ (ফাল্গুন-সংক্রান্তি, ১৯১৯) জয়রামবাটী 

শ্যামবাজারের ললিত ডাক্তার ও প্রবােধবাবু আসিয়াছেন। বৈকালে প্রায় চারটার সময় তাঁহারা শ্রীশ্রীমাকে প্রণাম করিতে গিয়া কথাবার্তা বলিতেছেন।
ললিতবাবু – মা, খাওয়া-দাওয়ার কি রকম নিয়ম পালন করা উচিত।
মা—আদ্যশ্রাদ্ধের অন্ন খেতে নেই, ভক্তির বড় হানি হয়। বরং অন্য শ্রাদ্ধের অন্ন খাবে, তব; আদ্যশ্রাদ্ধের নয়, ঠাকুর নিষেধ করতেন। আর যা কিছু খাবে, ভগবানকে দিয়ে খাকে, অপ্রসাদী অন্ন খেতে নেই। যেমন অন্ন খাবে তেমন রক্ত হবে। শুদ্ধ অন্ন খেলে শুদ্ধ রক্ত হয়, শুদ্ধ মন হয়, বল হয়। শুদ্ধ মনে শুদ্ধা ভক্তি হয়, প্রেম হয়।
ললিতবাবু—মা, আমরা তাে গৃহী, আত্মীয় স্বজনের শ্রাদ্ধে কি করব ?
মা—শ্রাদ্ধে গিয়ে কাজকর্ম দেখবে, খাটবে, যেন তারা কিছু মনে না করতে পারে। কিন্তু সে দিনটা কোন রকম করে খাওয়াটা এড়াতে চেষ্টা করবে। নেহাৎ না পারলে শ্রাদ্ধে বিষ্ণু বা দেবতাদিগকে যা নিবেদন হয়, তাই গ্রহণ করবে। প্রসাদীহ'লে আদ্যশ্রাদ্ধের অন্নও ভক্তেরা খেতে পারে।
ললিতবাবু অনেক সময় শ্রাদ্ধের জন্য আনা জিনিস-পত্র বাড়তি থাকে, তা খাওয়া চলে। 
মা—তা চলতে পারে, তাতে দোষ নেই, বাবা। গৃহী আর কি করবে। 
প্রবােধবাবু—মা, তিনি যে ত্যাগ ভালবাসতেন। আমাদের ত্যাগ কোথায় ?
মা—হবে ক্রমে ক্রমে। এ জন্মে খানিকটা হ’ল পরজন্মে আবার হবে। খােলটাই তাে বদলায়, আত্মা তাে একই থাকে।
“কামিনীকাঞ্চন-ত্যাগ। তিনি বলতেন, “আমি ইচ্ছা করলে কামারপুকুরটাকে সােনার করে দিতে পারি, সেজবাবুকে বলে। কিন্তু ওতে কি হবে ? ওগুলাে তাে অনিত্য।’ কারও কারও তিনি বলতেন শেষ জন্ম। বলতেন, “আরে, এর কিছুতেই আকাক্ষা নাই রে ! এর শেষ জম্ম।”
তাঁহারা প্রণাম করিয়া বিদায় লইলেন। সন্ধ্যার সময় মায়ের বারান্দায় বসিয়া কথাবার্তা হইতেছিল। কায়স্থের উ