ঈশ্বরে কী করে মন হয়? — ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের অপূর্ব শিক্ষা
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি হলো —
“ঈশ্বরে কী করে মন হয়?”
সংসারের কাজ, দায়িত্ব, চিন্তা, কামনা-বাসনা ও অস্থিরতার মধ্যে মানুষের মন সর্বদা বাইরের জগতে ছুটে বেড়ায়। কিন্তু সেই মনকে কীভাবে ঈশ্বরের দিকে ফেরানো যায়?
এই প্রশ্নের অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর উত্তর দিয়েছেন Sri Ramakrishna তাঁর কথামৃতের বিভিন্ন আলোচনায়।
ঈশ্বরের জন্য ব্যাকুলতা দরকার
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন —
“ব্যাকুলতা হলেই তাঁকে পাওয়া যায়।”
যেমন —
- মা তার হারানো সন্তানকে খুঁজে কাঁদে
- মানুষ অর্থের জন্য দৌড়ায়
- প্রেমিক প্রেমিকার জন্য ব্যাকুল হয়
ঠিক তেমনভাবে যদি মানুষ ঈশ্বরের জন্য সত্যিই কাঁদতে পারে, তবে ঈশ্বরকে অনুভব করা সম্ভব।
আজকের দিনে আমরা অধিকাংশ সময় —
- টাকার চিন্তা করি
- সম্মানের চিন্তা করি
- ভবিষ্যতের চিন্তা করি
কিন্তু ঈশ্বরের জন্য হৃদয়ে সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা খুব কমই জাগে।
ঠাকুরের মতে, ঈশ্বরলাভের মূল চাবিকাঠি হলো —
আন্তরিক আকুলতা।
নামজপ ও ঈশ্বরচিন্তা
ঠাকুর বারবার ঈশ্বরের নাম করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলতেন —
“ঈশ্বরের নামের ভারী মাহাত্ম্য।”
প্রথমে হয়তো মন বসবে না। কিন্তু নিয়মিত নামজপ করতে করতে মন ধীরে ধীরে পবিত্র হতে শুরু করে।
যেমন —
- একটি বীজ মাটিতে পড়ে ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়
- তেমনি নামজপও একদিন হৃদয়ে ভক্তির বৃক্ষ জন্মায়
সকালে ও রাতে কয়েক মিনিট মন দিয়ে নামজপ করলে মন শান্ত হতে শুরু করে।
সাধুসঙ্গের প্রয়োজন
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন —
“সৎসঙ্গ না হলে ঈশ্বরে মন হয় না।”
মানুষ যার সঙ্গে মেশে, ধীরে ধীরে তার স্বভাবও তেমন হয়ে যায়।
যদি —
- সর্বদা বিষয়ী মানুষের সঙ্গে মেশা হয়
- সারাদিন শুধু ভোগ-বিলাসের কথা শোনা হয়
তাহলে মনও সেই দিকেই যাবে।
কিন্তু যদি —
- ভক্তদের সঙ্গ পাওয়া যায়
- ঈশ্বরের কথা শোনা যায়
- পবিত্র আলোচনা করা হয়
তাহলে মন ধীরে ধীরে ঈশ্বরের দিকে ফিরতে শুরু করে।
নির্জনে ঈশ্বরচিন্তা
ঠাকুর মাঝে মাঝে নির্জনে থাকার পরামর্শ দিতেন।
কারণ —
সংসারের কোলাহলের মধ্যে মন সবসময় বাইরের দিকে ছুটে যায়।
তাই কিছু সময় —
- একা বসে
- প্রার্থনা করে
- ধ্যান করে
- ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে
মনের গভীরে প্রবেশ করতে হয়।
যেমন দুধকে দই করে তারপর মথলে মাখন বের হয়, তেমনি নির্জন সাধনায় মানুষের অন্তরের ভক্তি প্রকাশ পায়।
কামিনী-কাঞ্চনের আসক্তি কমাতে হবে
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন —
“কামিনী-কাঞ্চনই মানুষকে ঈশ্বর থেকে দূরে রাখে।”
এখানে কামিনী-কাঞ্চন বলতে শুধু নারী ও অর্থ নয়, বরং সমস্ত রকম অতিরিক্ত আসক্তিকে বোঝানো হয়েছে।
যতক্ষণ মন —
- লোভে
- অহংকারে
- ভোগে
- আসক্তিতে
ডুবে থাকবে, ততক্ষণ ঈশ্বরে মন স্থির হবে না।
তবে ঠাকুর কখনও সংসার ছেড়ে পালাতে বলেননি। তিনি বলেছেন —
সংসারে থেকেও মন ঈশ্বরের দিকে রাখা যায়।
দাসীর উপমা
ঠাকুর একটি সুন্দর উদাহরণ দিতেন।
একজন ধনী বাড়ির দাসী সব কাজ করে, বাচ্চাদের মানুষ করে, ঘরের দায়িত্ব পালন করে — কিন্তু মনে মনে জানে —
“এই বাড়ি আমার নয়।”
তেমনি মানুষ সংসারের সব কাজ করবে, কিন্তু মনে রাখবে —
- সবই অস্থায়ী
- একমাত্র ঈশ্বরই সত্য
এই মনোভাব ধীরে ধীরে মানুষকে ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যায়।
শিশুর মতো সরল বিশ্বাস
ঠাকুর বলতেন —
“সরল না হলে ঈশ্বরে বিশ্বাস হয় না।”
একটি শিশুর মতো বিশ্বাস দরকার।
যেমন শিশু তার মাকে সম্পূর্ণ ভরসা করে, তেমনি ভক্তকেও ঈশ্বরের উপর নির্ভর করতে হবে।
অতিরিক্ত তর্ক, অহংকার ও কপটতা মানুষের মনকে কঠিন করে দেয়।
কিন্তু সরল হৃদয়ে ঈশ্বর খুব সহজে ধরা দেন।
প্রার্থনা করতে হবে
ঠাকুর নিজে মা কালীর কাছে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করতেন।
তিনি বলতেন —
“মা, আমায় শুদ্ধ ভক্তি দাও।”
আমরাও আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করতে পারি —
- “হে ঈশ্বর, তোমার দিকে মন দাও।”
- “আমার অহংকার দূর করো।”
- “আমার মন পবিত্র করো।”
সত্যিকারের প্রার্থনা কখনও বিফল হয় না।
আধুনিক জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োজন
আজকের যুগে মানুষের মন সবসময় ব্যস্ত —
- মোবাইল
- সামাজিক মাধ্যম
- প্রতিযোগিতা
- অর্থের দৌড়
- মানসিক চাপ
এই অবস্থায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের নতুন পথ দেখায়।
তিনি শেখান —
- একটু নীরব হও
- ঈশ্বরের নাম স্মরণ করো
- সৎসঙ্গ করো
- অন্তরকে সরল করো
তাহলেই ধীরে ধীরে মন শান্ত হবে।
উপসংহার
ঈশ্বরে মন হওয়া কোনো একদিনের বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে ঘটে —
- নামজপে
- প্রার্থনায়
- সাধুসঙ্গে
- ব্যাকুলতায়
- এবং আন্তরিক ভক্তিতে
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের জানায় —
“যে সত্যিই ঈশ্বরকে চায়, সে একদিন অবশ্যই তাঁকে পায়।”
আর সেই পথের শুরু হয় হৃদয়ের এক আন্তরিক ডাক থেকে।



0 Comments